কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

সমাজ ভাবনা

প্রকাশিত : ৪ জুন ২০১৫
  • এবারের বিষয় ॥ নারী ও সমাজ

পিতৃতান্ত্রিক কাঠামো

উম্মে ফারহানা

পিতৃতান্ত্রিকতার কথা উঠলেই আমার মনে পড়ে সিলভিয়া প্লাথের ‘ড্যাডি’ কবিতাটির কথা, যার শেষ লাইন হলো ‘Daddy, daddy, you bastard, I am through’। জ্ঞানকা- হিসেবে জেন্ডার স্টাডি আমার পঠিত বিষয় নয়, সাহিত্য পড়তে গিয়ে যেটুকু পড়তে হয়েছে সেই সীমিত জ্ঞান নিয়েই আমি যা বলার বলি। ব্যক্তি পিতা বা ব্যক্তি পুরুষ নারীবাদীদের আক্রমণের বিষয় নয় এটা জেনেও প্লাথের ঐ কবিতা মাথায় ঘুরপাক খায়। দোর্দ- প্রতাপশালী পিতার ছত্রছায়ায় বড় হয়ে অধিকাংশ ছেলে বেড়ে ওঠে আরেক অথরিটারিয়ান প্যাট্রিয়ার্ক হয়ে, আর বাপের আদুরে অনেক মেয়েও হয়ে যায় উগ্র পুরুষবিদ্বেষী। বিষয়টি অবশ্যই ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে না, করে সিস্টেমের ওপর। আমার মামাত ভাই নিজের শহরকে বলে ফাদারল্যান্ড, কারণ মামীর বাড়ি বরিশাল। আসলে মাদারল্যান্ড বলে কিছু নেই, মা কোন উত্তরাধিকার দেয়ার অধিকার রাখে না, দেশ যদি অধিকার দেয়ার সামর্থ্য রাখে তবে সে দেশও পুরুষ বৈ কি। দেশকে ফাদারল্যান্ড ধরে নেয়া জার্মান জাতির মেয়ে সিলভিয়া প্লাথ তার বাপকে বাস্টার্ড বলেছে বলে ধাক্কা খাওয়া যেতে পারে, কিন্তু পুত্রসন্তান কামনায় বাপেরা যে মায়েদের চেয়ে পিছিয়ে নেই তাও বুঝতে পেরেছিলাম আমার এক আত্মীয়ের সন্তানসম্ভবা স্ত্রীর লাগানো বাচ্চার পোস্টার পাল্টানো দেখে। তিনি খুব নিশ্চিত ছিলেন যে তাঁর স্ত্রীর লাগানো পোস্টারের বাচ্চাটি মেয়ে, তাই নিজে গিয়ে পাল্টে এনেছিলেন সেটি, শিশ্ন দৃশ্যমান এমন এক শিশুর ছবি ঘরে লাগিয়েছিলেন। পাসপোর্ট করতে গিয়ে আমি স্থায়ী ঠিকানা দিয়েছি বাপের বাড়ির ঠিকানা অথচ সমাজের নিয়ম অনুযায়ী ওটা নাকি আমার নিজের বাড়ি নয়, শরিয়া মোতাবেক ভাগ পেলে ভাল, কিন্তু বসবাস করতে গেলে সেটা নাকি নিন্দার, বিয়ের পরে মেয়ে বাপের বাড়ি থাকবে কেন?

আমার ভোটার আইডি কার্ডে প্রাক্তন স্বামীর নাম রয়েছে বলে বেশ হুজ্জত পোহাতে হলো আমাকে, সংশোধনের জন্য অনেক চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছি। আমি নিশ্চিত, এক সময় যিনি আমার স্বামী ছিলেন তাঁকে কোন বিচ্ছেদপরবর্তী ঝামেলা পোহাতে হয়নি, তাঁর আইডিতেতো আর আমার নাম ছিল না। পিতৃতান্ত্রিক সমাজ মেয়েদের সম্পূর্ণ মানুষ বলে মানতে নারাজ, স্বামী মেয়ের প্রভু, অভিভাবক। তাই বিয়ের পরে স্বামীর সারনেম বা পুরো নাম নিজের নামের পেছনে লাগানো যেতে পারে। বেগম রোকেয়া লাগিয়েছিলেন। যে যত বড় নারীবাদী হোক, এক্টিভিস্ট হোক, কিছুই আসে যায় না তাতে। স্বামীর চেয়ে বড় কি আর হয় কোন দিন মেয়ে মানুষ? অফিসের একটা গল্প বলে শেষ করি। মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষে কাজে যোগ দিতে অফিসে গেলে অফিস সহকারী দেবশ্রী দিদি জিজ্ঞেস করলেন, ‘ম্যাডাম, এত শুকাইলেন কেমনে?’

আমি উত্তর দিলাম, ‘আমার জামাই বাসায় নাই, রান্না কইরা খাওয়াবে কে? তাই না খাইতে পায়া শুকায় গেছি’। প্রথমে এটাকে রসিকতা মনে করে এক দফা হাসলেন, তারপর যখন জানতে পেলেন যে আমার স্বামী বাসায় থাকলে সত্যিকারেই রান্না করেন তখন বললেন, ‘ম্যাডাম, আমাকে বলছেন বলছেন, আর কাউরে বইলেন না যে ভাইয়া রান্না করেন, মানুষ খারাপ ভাববে।’ আমি বললাম, ‘কেন, আপনি আমি, আমরা মেয়ে মানুষ হইয়া অফিসে চাকরি করি, পয়সা রোজগার কইরা সংসারে ঢালতে পারি, তাইলে আমাদের স্বামীরা সংসারের কাজে সাহায্য করতে পারবে না ক্যান? কি বলেন রাজ্জাক ভাই?’ রাজ্জাক আমাদের অফিসের পিওন। আমি তাঁকে সাক্ষী মানাতে সে বেশ অপ্রস্তুত হয়ে সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল, ‘জি ম্যাডাম’। শুনে দেবশ্রী বলল ‘ম্যাডাম, আপনার সামনে বলতেছেন, আপনে চইলা গেলেই উনি বলবেন, ম্যাডামের জামাই একটা ভেড়া। আমি এইখানে চা বানায় দেই, বাসায় আমি পানিডাও ঢাইল্যা খাই না’।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে

অর্ধাঙ্গী

কাজল রোজারিও

পুরুষ নারীকে ব্যবহার করছে ভোগ্যপণ্য হিসেবে। কিন্তু নারী তো ভোগ্য নয়, ‘অর্ধাঙ্গী’। ঘরে বাইরে সর্বদা নিগ্রহের শিকার হতে হচ্ছে নারীকে। বেগম রোকেয়া বলেছেন নারী সমাজের ‘অর্ধাঙ্গী’। পুরুষের সঙ্গে সমভাবে অধিকার প্রাপ্য নারীরও। আজ এগিয়ে আসতে হবে কবি, সাহিত্যিকদের নৈতিকতা সম্পর্কিত নানা বিষয়ে লেখনী নিয়ে। অনৈতিকতা বিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। তাহলে অধিকার আদায়ে নারী হবে সফল।

কাকরাইল, ঢাকা থেকে

বাংলাদেশের নারীসমাজ

সুরাইয়া নাহার পারু

বাংলাদেশের নারীরা সবক্ষেত্রে এগিয়ে গেলেও এখনও তার পদে পদে বাধা আর তার প্রধান কারণই হলো আমাদের সামাজিক ব্যবস্থা। আমাদের এই পুরুষশাসিত সমাজে সংসারে পুরুষের সিদ্ধান্তই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রাধান্য পায়। তবে ক্ষেত্র বিশেষে কিছুটা ব্যতিক্রম হয় সেখানে, যেখানে নারীরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী। তারও হার অনেক কম। পুরো সামাজিক ধ্যান ধারণা আর চিন্তা চেতনারই একটা পরিবর্তন দরকার যেখানে একজন নারীকে শুধু নারী না ভেবে একজন মানুষ ভাবতে শেখা, আর সেভাবেই পরিবার থেকে শিক্ষা নেয়া উচিত। পরিবার থেকেই প্রথম বৈষম্যটা শুরু হয়। কারণ মেয়ের চেয়ে ছেলের গুরুত্ব দেয়া হয় বেশি। হাজার রকমের বিধিনিষেধ ছুড়ে দেয়া হয় শুধু মেয়ের বেলায়। কারণ সে মেয়ে বলে। অথচ বাবা-মা যদি ছেলে এবং মেয়ে উভয়কে সমান গুরুত্ব দিয়ে মানুষ করে গড়ে তোলেন তাহলে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ নিয়ে যারা বেড়ে উঠবে স্বাভাবিক নিয়মেই নারীর প্রতি থাকবে তাদের সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ।

তুলনামূলকভাবে যেসব নারী আত্মনির্ভরশীল তাদের চেয়ে অনেক বেশি নিগৃহীত তারা, যারা কারও না কারও ওপর নির্ভরশীল। তাই প্রত্যেকটি নারীকে হতে হবে সচেতন ও আত্মনির্ভরশীল। তাছাড়া মুক্তির কোন পথ নেই, কারণ অধিকার নিজের যোগ্যতা ছাড়া অর্জন করা সম্ভব না। আমাদের এই পুরুষশাসিত সমাজে একজন নারীকে পূর্ণ মানুষের মর্যাদা ও সম্মান দেয়ার পুরুষ মানুষের সংখ্যা খুবই কম। সেই মানসিক উদারতার জন্য প্রকৃত শিক্ষার প্রয়োজন, যে শিক্ষা শুধু পুথিগত বড় বড় ডিগ্রী পাওয়ার জন্য নয়, জীবন থেকে নেয়া মানবিক মূল্যবোধ। এই শিক্ষিত সমাজে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে সব ক্ষেত্রেই ঘটছে অসংখ্য দুর্ঘটনাÑ যার সবটাই আমাদের জানা নেই। এই সমাজে একজন নারীর সম্মান ঠুনকো কাচের চুড়ির মতোÑ পড়ে গেলেই ভেঙ্গে খান খান আর সেই ভয়েই লাঞ্ছিত হয়েও মুখ খুলতে সাহস নেই কারও। ভয় পাছে যা আছে তাও না হারিয়ে যায়। সংখ্যার দিক থেকে শিক্ষিতের হার বেড়েছে সত্যি তবে সেই শিক্ষা মানুষকে কতটা আলোকিত করতে পেরেছে? যে হারে শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বেড়েছে, সেই হারে যদি আলোকিত মানুষের সংখ্যা বাড়ত তাহলেই হতো সমাজটা আলোকিত। আর এই সমাজ বদলানোর একমাত্র হাতিয়ার হতে পারে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে শুধু আলোকিত মানুষগুলো। একজন অসহায় নারী কোথায় তার সহায় আছে সে নিজেও জানে না। বাবার বাড়ি, শ্বশুরবাড়ি সমাজ না রাষ্ট্র কে তার সহায়? জীবনের চরম দুঃসময়ে একজন নারীর কোথাও কোন নিরাপদ আশ্রয় নেইÑ না সমাজে, না রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে। কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে তার কোন প্রয়োগ নেই বলেই সামাজিকভাবে তাকে হতে হয় নানাভাবে লাঞ্ছিত।

সমাজে কিছু ভ- লেবাশধারী ধর্মান্ধ অমানুষ পুরুষ আছে যারা নারীকে পর্দার অন্তরালে রেখে ‘পর্দা’ শব্দটার যথেচ্ছ ব্যবহার করছে। এই অমানুষ পুরুষগুলো ধর্মকে অপব্যবহার করে নারীকে শুধু গৃহপালিত মেয়ে মানুষ বানিয়ে প্রতিনিয়ত ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে সমাজের কিছু মানুষকে ভুল পথে পরিচালিত করে তাদের মগজধোলাই করছে। আর সেই বিকৃত মস্তিষ্কের মানুষগুলোই প্রকাশ্য সড়কে ও সম্মিলিত উৎসবে নারী সমাজকে দেখলে তাদের মস্তিষ্ক ঠিক রাখতে পারে না। ভুলে যায় ওদের মমতাময়ী মায়ের কথাÑ সে কোন মায়ের সন্তান, কোন বোনের আদরের ভাই। ওরা হায়নার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে নারীকে ভোগের সামগ্রী ভেবে।

আমরা এই বাংলাদেশের নারীরাও সকল কুসংস্কার, অশিক্ষা, কুশিক্ষা, ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতার বেড়াজাল ভেদ করে বিশ্বের দরবারে লেখাতে পারি একটি জাতির নাম, দেশের নাম, বাঙালী জাতি আর বাংলাদেশ। আর তার জন্য দরকার নারী-পুরুষ সকল বিবেকবান মানুষের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ তথা আইনের সঠিক প্রয়োগ এবং সামাজিক আন্দোলন। কোন ধর্মের কোথাও নারীর প্রতি অসম্মান করার কথা লেখা নেই, বরং কোরআন এবং হাদিসে বার বার উল্লেখ করা আছে নারীর প্রতি শ্রদ্ধা এবং সম্মান প্রদর্শন করার কথা। কিছু তথাকথিত শিক্ষিত পুরুষ আছে এই সমাজে যারা নারীকে পরিপূরক অথবা সহযাত্রী অথবা সমান অংশীদার হিসেবে দেখতে চায় না। কারণ পৌরুষে লাগেÑ একজন নারীকে প্রতিনিয়ত দমন করাটাই যেন পৌরুষ। আর গ্রাম-গঞ্জের কথা তো বলাই বাহুল্য। শিক্ষিতের মাঝেই যদি থাকে মূর্খতা তবে মূর্খ মানুষের মাঝে আর কি থাকবে?

বাংলাদেশে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে অনেক আইন আছে। কিন্তু তার যথাযথ প্রয়োগের অভাবে আইনের ফাঁকে প্রায় সকল অপরাধীই পার পেয়ে যাচ্ছে। নির্বিচারে ঘুরে বেড়াচ্ছে যত্রতত্র। নৃশংস স্বামীর হাতে স্ত্রী খুন, ভ- প্রেমিকের হাতে প্রেমিকা খুন, ইভটিজিংয়ের শিকার কিশোরীর মৃত্যু সবার বিদেহী আত্মা আর বিচারের বাণী নীরবে-নিভৃতে কাঁদছে। সমাজের ভয়ঙ্কর দুষ্টচক্রের হাত থেকে গোটা নারী সমাজকে তথা সমাজকে বাঁচাতে সবাই একসুরে গেয়ে উঠি ‘জাগো নারী জাগো’।

লন্ডন থেকে

শায়লা আমার বোন

আশরাফুল আলম

সভ্যতা কতটুকু এগিয়েছে মানুষ জন্মের কোটি কোটি বছর পর! এখনও দেখি খুন, ধর্ষণ, অপহরণ, যৌতুক, নারী নির্যাতন, বাল্যবিবাহ, নারী পাচার, শিশু ধর্ষণ। পত্রিকার পাতা খুললে দেখি কত নারীর আত্মহত্যা। আমি আর কতকাল দেখব! দেখতে দেখতে চোখ বুঝে যায়। অসহায় শায়লার চোখের নিচে কালো বলিরেখা আমি কি মুছে দিতে পারব না? শায়লা আমার সহোদর বোন। আমরা একসঙ্গে বেড়ে উঠি গ্রামে। প্রকৃতির অনাবিল সৌন্দর্য ঘিরে ছিল এই গ্রামে। গ্রামের পাঠশালায় যেতাম। তখন অতসব বুঝতাম না। আস্তে আস্তে বড় হই। বেড়ে ওঠে আমাদের শৈশবের শরীর। জন্মের পর আমরা আলাদা হইনি। আমার মা-বাবা আমাদের আলাদা করে দেয়। আস্তে আস্তে শায়লা হয়ে ওঠে নারী আর আমি হয়ে উঠি পুরুষ। ওর জন্য আলাদা পোশাক নির্ধারিত হয়। শায়লা কত যে কাঁদত আমার শার্ট আর প্যান্ট পরার জন্য। মা বলতেন, তুমি তো মেয়ে মানুষ, তোমাকে এটা পরা যাবে না। তারপর এটা সেটা কত বিধি-নিষেধের বার্তা এই ছোট্ট বোনটির ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়। তার জন্য আলাদা বিছানা হয়ে যায়। সে যত বড় হতে থাকে ততই নতুন নতুন বিধি-নিষেধ। মেয়ে জোরে কথা বলে না, এমন করে হাসে না, এভাবে তাকায় না, ঘরে থেকে বের হয় না, গাছে ওঠে না, ছেলেদের সঙ্গে মেশে না, হাসি-তামাশা করে না। মায়ের আদেশে ওড়নায় মাথা ঢেকে নিচের দিকে তাকিয়ে সে স্কুলে যায়। এ জন্যই হয়ত একটা ছেলের সঙ্গে ধাক্কা লাগে। মা কার কাছে যেন শুনতে পায়Ñ শায়লা ধাক্কা খায়, সামান্য ধাক্কা খায়। তবুও শায়লাকে জোরে একটা চড় মারে। মেয়ে মানুষ অন্য ছেলের সঙ্গে শরীর লেগেছে কেন? আমি শায়লার পক্ষে একটা কথা বলি, ধাক্কা লেগেছে তো কী হয়েছে মা; শুধু ধাক্কা খায়, ব্যথা পায়নি। আমার কথা শুনে আমার গালেও চড় কষে দেয়। শায়লার ভেতর তখন যৌবনের কোন আলো এসে পড়েনি। সে পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্রী। শায়লা অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখত সামনে খোলা মাঠে আমরা ফুটবল খেলতাম, দৌড়াদৌড়ি, ছোটাছুটি, বউ বউ খেলতাম। শায়লার ইচ্ছে করত কিন্তু পারত না। শায়লার মনে নানা রং ধরত কিন্তু কোথাও যেতে হলে পারমিশন নিতে হয়, কারও সঙ্গে করে যেতে হতো। ধর্মীয় অনুশাসন সেগুলো পুরুষরাই তৈরি করছে, সেসব তাকে মানতে হয়। পাপ, লজ্জা, সঙ্কোচ, দ্বিধা তার মাথার ভেতর ছোটবেলায় ঢুকিয়ে দেয়া হয়। আমি দেখতাম আমার তেমন কোন কাজ নেই পড়াশোনা ছাড়া আর শায়লা আমার মতো স্টুডেন্ট কিন্তু তার কত কাজ! ছোটবেলায় প্রশ্ন জাগত আমার মনে। মা তাকে শেখায় স্বামীর ঘরে গেলে এসব কাজ করতে হয়, তাই আগ থেকেই শিখে নিতে হয়। শায়লা প্রতিদিন ঘর ঝাড়ু দেয়, কাপড় গুছিয়ে রাখে আলনায়। খাওয়ার সময় পড়া রেখে শায়লা গৃহিণীর মতো থালা-বাসন, ভাত-পানি আলমারি থেকে নামিয়ে আমাকে ডাকে, ভাইয়া এখন পড়া রাখ, খেতে আস। আমি ভাত খেতে আসি। মা আমাকে বেশি বেশি দেয় শায়লার চেয়ে। অনেক সময় শায়লা নিজে তার কাপড়-চোপড় ধুয়ে পরিষ্কার করে। আমি এসবের কাছেও না।

আমি দেখতাম শায়লা বিষণœ মনমরা হয়ে থাকত। তখন এতসব বুঝতাম না, এখন বুঝি। আমার বোনের সব চাওয়া-পাওয়ার কমতি না থাকলেও তার শৈশব ও কৈশরে মানসিক বিকাশের প্রয়োজন ছিল। খোলা আকাশ, জ্যোৎ¯œার মায়াবী আলোয় তার অবগাহন করা উচিত ছিল। কেমন মানসিক যন্ত্রণায় সে ছটফট করত। একা বন্ধুহীন থাকতে থাকতে সে অনেকটা অসামাজিক প্রাণী হয়ে যায়। শায়লা এসব দেয়াল হয়ত ভাঙ্গতে চেয়েছিল কিন্তু পারেনি। শায়লা পাশের গ্রামে গিয়েছিল দুই-একদিন বান্ধবীর বাড়িতে। কিন্তু একদিন চোখে পড়ে বাবার। তারপর আর যায়নি শায়লা। বাবা শায়লাকে ডেকে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ চোখে বলেছিলেন, ‘মেয়ে ভাল হয়ে চলিস, তেসরা পথে হাঁটিস না, তাহলে কেটে টুকরো টুকরো করে নদীতে ভাসায়ে দেব।’ এরপর কি আর যাওয়া যায়? আমার জন্য কোন নিষেধ করেনি। কত মেয়েদের সঙ্গে ইয়ার্কি, ফাজলামি করি, বাবা জানলেও কিছু বলেনি। কেন এই বৈষম্য? শায়লার মতো সব নারীর চিত্র এক রকমই। শৈশব-কৈশোর-যৌবন সব তো একরূপ নারীর। বিয়ের পর শায়লা স্বামীর সংসার কি সুন্দর সাজায়! কোথাও কোন ত্রুটি নেই, প্রতিদিন রান্নাবান্না থেকে শুরু করে সংসারের খুঁটিনাটি সব কাজ করে। নিজের দিকে বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই। আমার মায়ের মতোই সাজায়। কেন সে এসব করবে না? সে তো মাকে দেখেছে স্বচক্ষে মা কিভাবে কাজ করে। স্বামীর কথা মেনে চলে। বাবার পা টিপে দেয়। বাবা যতক্ষণ ভাত খায় ততক্ষণ পাশে দাঁড়িয়ে থাকে, গ্লাসে পানিটাও ঢেলে দেয়। তবু স্বামীর মন পায় না। গভীর রাতে মা কাঁদতেন। তাঁর কান্নার আলাদা ঘর নেই। তাই রাতে লুকিয়ে কাঁদেন। জায়নামাজ বিছিয়ে দু’হাত তুলে মোনাজাত করেন। হায় আল্লা আর কত কষ্ট দিবা। আমি যেন স্বামীর মনবুঝে চলতে পারি; মোটা কাপড় আর দু’মুঠো ভাত খেয়ে বাবা-মার ইজ্জত রক্ষা করতে পারি। হায়রে অভাগা নারী! যে স্বামী স্ত্রীকে কোন মর্যাদা দেয় নাই তার জন্য দোয়া। শায়লার কান্না আকাশ থেকে ফিরে আসে। আকাশ দেবতা তার কান্না শুনতে পায় না। শায়লা কাঁদে, তার কান্নার শেষ হয় না, কেউ শুনতে পায় না সে কান্না। শায়লা আর কেউ নয়, শায়লা আমারই বোন।

রামপুরা, ঢাকা থেকে

মানবাধিকার লঙ্ঘন শ্যামল চৌধুরী

সমাজের অর্ধেক অংশ নারী। এ অংশকে বাদ দিয়ে সামাজিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। এক পাখায় ভর করে যেমন পাখি উড়তে পারে না; এক চোখে যেমন সু-দৃষ্টি পাওয়া যায় নাÑ তেমনি নারী তথা সমাজ দেহের দ্বিতীয় নয়নকে বাদ দিয়ে জাতীয় উন্নয়ন আশা করা যায় না। সামাজিক ব্যাধি নারী নির্যাতন রোধে নারী জীবনের নিরাপত্তা বিধানে সামাজিক বিবেক জেগে ওঠার এখনই সময়। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি চাই নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর সামাজিক প্রতিরোধ।

মোহনগঞ্জ, নেত্রকোনা থেকে

পরিবারে এসে... ম্যাক্সওয়েল রিবেরু

গারো মেয়ে ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর অনেক লেখালেখি, সভা সেমিনার, মিছিল ও মানববন্ধন হলেও সরকারী বা বেসরকারী কোন কঠোর পদক্ষেপের কার্যকর ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না। কেন জানি মনে হচ্ছে নারীদের এদেশে মূল্যায়ন সঠিকভাবে হয় না। আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী নারী, স্পীকার নারী ও মন্ত্রিপরিষদে অনেক নারী নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তবে কেন এত নারী নির্যাতন, এত যৌন হয়রানি! আসলে আমরা পরীক্ষার খাতায় নারী নির্যাতন সম্পর্কে ২০ পৃষ্ঠা ২৫ পৃষ্ঠা লিখতে পারি। কিন্তু পরিবারে এসে নারীকে বেদম প্রহার করতে কুন্ঠাবোধ করি না।

লক্ষ্মীবাজার, ঢাকা থেকে

প্রকাশিত : ৪ জুন ২০১৫

০৪/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: