আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

মানবধর্মে কাজী নজরুল ইসলাম

প্রকাশিত : ২৫ মে ২০১৫
  • হাবিবুর রহমান স্বপন

বাঙালীর অফুরন্ত আবেগ, ‘বাঁধনহারা’ উচ্ছ্বাস আর প্রবল প্রাণশক্তিকে আপন আত্মায় ধারণ করে যিনি সারাজীবন দ্রোহ, প্রেম, সাম্য ও মানবতার বাণী শুনিয়েছেন, তিনি কাজী নজরুল ইসলাম। অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদে প্রবলভাবে আস্থাশীল এই মহৎ কবির আরাধ্য ছিল সত্য-শিব-সুন্দর। ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়েও নজরুল সত্য-সুন্দর ও মানবতার জয়গান গেয়েছেন।

প্রবল আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘সুন্দরের ধ্যান, তার স্তবগানই আমার উপাসনা, আমার ধর্ম। যে কুলে, যে সমাজে, যে ধর্মে, যে দেশেই জন্মগ্রহণ করি, সে আমার দৈব। আমি তাকে ছাড়িয়ে উঠতে পেরেছি বলেই কবি।’ তিনি সাম্যবাদী কবিতায় আরও লিখেছেন :

‘গাহি সাম্যের গান

মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই নহে কিছু মহীয়ান।

নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্ম জাতি,

সব দেশে, সব কালে, ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।

... ... ... ...

যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব ব্যবধান,

যেখানে মিশেছে হিন্দু বৌদ্ধ মুসলিম খ্রীস্টান।’

‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’-তে নজরুল লিখেছেন, ‘আমি কবি। আমি অপ্রকাশ সত্যকে প্রকাশ করার জন্য, অমূর্ত সৃষ্টিকে মূর্তিদানের জন্য ভগবান কর্তৃক প্রেরিত। কবির কণ্ঠে ভগবান সাড়া দেন। আমার বাণীÑ সত্যের প্রকাশিকা। ভগবানের বাণী।’

সুনির্দিষ্ট কোন ধর্ম, দর্শন কিংবা জীবনচর্যায় তিনি দীর্ঘকাল থাকতে পারেননি। তবুও সকল ধর্মের সর্বজনীন মূল্যের প্রতি ছিল তাঁর প্রগাঢ় আস্থা। আর এই আস্থা তাঁকে হিন্দু কিংবা মুসলমানের কবি না করে, করেছে বাংলা ও বাঙালীর কবি। তাই তো মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী সংগ্রামে এবং পরমতসহিষ্ণুতা প্রতিষ্ঠা ও ধর্মীয় সম্প্রীতি সাধনায় তাঁর কবিতা ও গান বাঙালীকে যোগায় অনিঃশেষ প্রেরণা।

নজরুল ইসলাম ছিলেন মূলত সকল ধরনের প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে এক অমর প্রতিদ্বন্দ্বী। ব্রিটিশ শাসনের শৃঙ্খল থেকে দেশকে মুক্ত করার প্রবল বাসনা তিনি সব সময়েই অনুভব করেছেন। ‘কালের যাত্রার ধ্বনি’ শুনে তিনি তাঁর দু’যুগের কাব্য পরিক্রমায় মাঝেমধ্যেই হয়ত পথ দর্শন এমনকি ধর্মাদর্শ বদলেছেন। কিন্তু ভেদবুদ্ধিহীন, অসাম্প্রদায়িক, মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে কখনও নিজেকে বদলাননি। ব্যক্তিগত ও সাহিত্যিক জীবনে তিনি ছিলেন যথেষ্ট পরিমাণে বাঙালী এবং সম্পূর্ণ সম্প্রদায়-নিরপেক্ষ মানুষ। বিবাহ করেছেন মুসলমান নার্গিস আক্তার খানম ও হিন্দু প্রমীলা দেবীকে। তবে ‘আহলুল কিতাব’-এর মতানুসারেই কাজী নজরুল ইসলাম ও কুমারী প্রমীলা সেনগুপ্তের বিয়ে হয়েছিল কলকাতার ৬নং হাজী লেনের বাড়িতে ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দের ২৪ এপ্রিল। প্রমীলাকে ধর্মান্তরিত করে বিয়ে করার কথা নজরুল চিন্তাও করেননি। এমনকি স্ত্রীর নামটিও পরিবর্তন করে মুসলিম নাম রাখেননি।

নজরুল তাঁর চারটি সন্তানের নাম রেখেছিলেন হিন্দু-মুসলমানের মিলিত ঐতিহ্য ও পুরাণের আলোকে। তাঁর প্রথম সন্তানের নাম রেখেছিলেন কৃষ্ণ মোহাম্মদ। চার বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়। এরপর তিন সন্তানের নাম রাখেন যথাক্রমে অরিন্দম খালিদ, কাজী সব্যসাচী ও কাজী অনিরুদ্ধ। নজরুল সন্তানদের নাম নিজেই রেখেছিলেন। যেসব পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক ব্যক্তিদের নামের সঙ্গে মিলিয়ে তিনি ছেলেদের নাম ঠিক করেছিলেন, তা থেকে কোন্ ধরনের ব্যক্তির প্রতি নজরুলের অনুরাগ ছিল, তা বোঝা যায়। যেমন কৃষ্ণ-মোহম্মদ : কৃষ্ণ হিন্দু ধর্মের প্রবর্তক। দ্বিতীয় ছেলের নাম : অরিন্দম-খালিদ। অরিন্দম শব্দের অর্থ শত্রু দমনকারী। রামায়ণে রাবণপুত্র মেঘনাদকে অরিন্দম বলা হয়েছে। মাইকেল মধুসূদন দত্তও মেঘনাদবধ মহাকাব্যে ‘অরিন্দম ইন্দ্রজিৎ’ (মেঘনাদের আরেকটি নাম ইন্দ্রজিৎ) শব্দদ্বয় ব্যবহার করেছেন। আর খালিদ হলেন ইসলামের ইতিহাসের বিখ্যাত বীর খালিদ বিন ওয়ালিদ; খলিফা হযরত আবু বকরের (রা)র সেনাপতি হিসেবে তিনি কিংবদন্তি বীরের মর্যাদা পেয়েছেন। একইভাবে অনিরুদ্ধ হলো শ্রীকৃষ্ণের পৌত্রের নাম এবং সব্যসাচী হলেন মহাভারতের অর্জুন। কাজী অনিরুদ্ধের ডাকনাম ছিল লেনিন (রাশিয়ার কমিউনিস্ট বিপ্লবের প্রাণপুরুষ) এবং সব্যসাচীর ডাকনাম ছিল সান-ইয়াৎ সেন (চীনের জিংহাই বিপ্লবের অন্যতম নেতা)। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, নজরুল ইসলাম তাঁর সন্তানদের নামের মধ্যে সচেতনভাবে হিন্দু ও মুসলিম ঐতিহ্য এবং তৎকালীন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম বিপ্লবীদের নামের সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন। বস্তুত এই হিন্দু-মুসলিমের মিলনই তিনি আজীবন চেয়েছিলেন।

নজরুলের সখ্য ও বন্ধুত্ব ছিল হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে অনেকের সঙ্গেই। শৈলজানন্দ মজুমদার, পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়, মুজাফ্ফর আহমদ, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, শরৎচন্দ্র, কাজী মোতাহার হোসেন, দিলীপ কুমার রায় প্রমুখ ছিলেন তাঁর অকৃত্রিম বন্ধু এবং অনেক শুভকর্মের সহযাত্রী।

নজরুল তাঁর ‘বিষের বাঁশী’ (১৯২৪ খ্রি.) ‘জগজ্জননীস্বরূপা মা মিসেস এম রহমানকে’, ‘চিত্তনামা’ (১৯২৫ খ্রি.) ‘মাতা বাসন্তী দেবীকে’ এবং ‘সর্বহারা’ (১৯২৬ খ্রি.) ‘মা বিরজা দেবীকে’ উৎসর্গ করেন। লক্ষণীয়, এঁরা সকলেই ছিলেন নজরুলের কাছে মায়ের মতো।

হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার সূত্রপাত হলে যে অসহনীয় পরিবেশের সৃষ্টি হয়, তখন নজরুল রচনা করেন উদ্দীপ্ত সঙ্গীত। ১৯২৬-এর ২২ মে কৃষ্ণনগরে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কমিটির বার্ষিক সম্মেলনে কবি নজরুল সবাইকে চমকে দিয়ে ‘কা-ারি হুঁশিয়ার’ উদ্বোধনী সঙ্গীত গেয়ে শোনান। তিনি যখন উচ্চারণ করেন, হিন্দু না ঐ মুসলিম জিজ্ঞাসে কোন জন/ কা-ারি বল ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মা’রÑ তখন হিন্দু-মুসলিম প্রত্যেকে একাত্ম হয়ে ওঠে। এর পর তিনি ‘হিন্দু মুসলিম যুদ্ধ’, ‘পথের দিশা’ প্রভৃতি কবিতা এবং ‘মন্দির-মসজিদ’ প্রবন্ধ লিখে দেশবাসীকে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেন।

নজরুলের কবিতায় একদিকে যেমন ঠাঁই পেয়েছে মুসলিম আদর্শ, অন্যদিকে হিন্দু আদর্শ। সর্বোপরি এ সবকিছুর মূল সুতো হচ্ছে তাঁর সাম্যবাদী মনোভাব, তাঁর মানবতাবোধ। নজরুল মানস হিন্দু-মুসলিম বৈপরীত্যের দ্যোতক না হয়ে পরিপূরক হতে পেরেছে তাঁর সাম্যবাদী চিন্তার ফলে। তিনি বলেছেনÑ ‘নদীর পাশ দিয়ে চলতে চলতে যখন দেখি একটা লোক ডুবে মরছে, মনের চিরন্তন মানুষটি তখন এ প্রশ্ন ভাবার অবসর দেয় না যে, লোকটা হিন্দু না মুসলমান, একজন মানুষ ডুবছে এইটেই... সবচেয়ে বড়, সে ঝাঁপিয়ে পড়ে নদীতে... মন বলে আমি একজনকে বাঁচিয়েছি।’ নজরুল তাঁর লেখনীতে যে সাম্যের ইঙ্গিত দিয়েছেন তা স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, মানবতা এবং সুবিচারের এষণায় তীক্ষè, তীর্য, উজ্জ্বল। তাঁর কল্পনা কখনও ধর্মীয় উদারতা, কখনও সাম্যবাদ, স্বাধীনতা, কখনও মানবতা আবার কখনও নৈরাজ্যকে স্পর্শ করেছে। সমাজ-বিধানের অসঙ্গতি, স্ববিরোধিতা, জাতি-বৈষম্য, শ্রেণী-বৈষম্যের প্রতি তাঁর কণ্ঠ সর্বদাই সোচ্চার ছিল। আর এ সকল কিছুর মূল ছিল মানবমুক্তি ও মানবকল্যাণ। ‘কুলি-মজুর’ কবিতায় তাঁর মানবতার পরিচয় ফুটে উঠেছে এভাবেÑ ‘দেখিনু সেদিন রেলে/ কুলি বলে এক বাবুসাব তারে টেনে দিল নিচে ফেলে/ চোখ ফেটে এল জল/ এমনি করে কি জগত জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল।’ নজরুল মানুষকে জাতির উর্ধে স্থান দিয়েছেন। তিনি জাতির স্বাধীনতার সঙ্গে একাত্ম করে নির্যাতিত শ্রেণীর মুক্তির কথা ভেবেছেন।

মানবতার আবেগেই তিনি সাম্যের গান গেয়েছেন। বুর্জোয়া সামন্ততন্ত্রের পরিবর্তে তিনি চেয়েছেন সাম্যের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গড়তে। তাই তাঁর কাব্য, গানে-গল্পে মানবতাবোধ থেকেই এসেছে বিদ্রোহ, অসাম্প্রদায়িক ও সাম্যবাদের চেতনা। তিনি মনে করতেন, যা কিছু মানুষের জন্য সুন্দর, মহত্ত্বর ও কল্যাণকর তাই ধর্ম। নজরুল-মানস পরিম-ল সর্বজনীন মানবতাবোধ দিয়ে বেষ্টিত। তিনি মানবতাকে প্রতিষ্ঠা করেন কল্পনার উচ্চমার্গ থেকে প্রত্যক্ষ জীবনেÑ জনসাধারণের স্তরে। সমাজে যারা নির্যাতিত, অপমানিত, অবহেলিত তারাই কবিচিত্তকে আকৃষ্ট করেছে। এ সকল মানুষের দুঃখ-দুর্দশাকে লাঘব করতে তাঁর লেখনী নিসৃত হয়েছে। নজরুল যা লিখেছেন তা তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন বলে তা জীবনে প্রয়োগ করার চেষ্টা করেছেন দ্বিধাহীনভাবে। তাঁর জীবনসাধনাকে কোনভাবেই শিল্পসাধনা থেকে আলাদা করা যায় না। প্রেম ও দ্রোহের এই সাধক মানবতার সুউচ্চ মিনারে বসে সারাজীবন সাম্য-সম্প্রীতি ও মিলনের গান শুনিয়েছেন। কবিতা ও গানে তিনি ব্যবহার করেছেন হিন্দু ও মুসলিম ধর্মের ঐতিহ্য থেকে শব্দ ও ভাষা। কিন্তু মননে-মগজে ছিলেন সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক। হিন্দু-মুসলমানের মিলিত ঐতিহ্য স্পর্শ করে তিনি চলে গেছেন অসাম্প্রদায়িকতা ও উদার মানবিকতার দিকে।

তাঁর গান-গল্প-নাটক-চিঠিপত্র এককথায় সমগ্র নজরুল সাহিত্যে দুটি ভাবকে আলাদাভাবে শনাক্ত করা যায়। প্রথমটি সমাজের নানাবিধ বৈষম্যের প্রতি তাঁর তীব্র ক্ষোভ, আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে জাতিÑধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের প্রতি তাঁর অপার ভালবাসা। প্রথমটি থেকে তাঁর জন্ম নেয় সাম্যবাদী চেতনা, আর দ্বিতীয়টি তাঁর মধ্যে জন্ম দেয় বিশ্ব মানবধর্ম।

লেখক : সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক

যৎধযসধহ.ংধিঢ়ড়হ@মসধরষ.পড়স

প্রকাশিত : ২৫ মে ২০১৫

২৫/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: