আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বিচারকের অভাবে ১৭ হাজার মামলা ঝুলে আছে বছরের পর বছর

প্রকাশিত : ১ মে ২০১৫
  • মামলাজটে সাত শ্রম আদালত
  • বিচারে দীর্ঘসূত্রতা শ্রমিকের ন্যায় বিচার প্রাপ্তিতে বড় বাধা
  • সাত আদালতের পাঁচটিতে রেজিস্ট্রার পদ শূন্য দুই বছর

আনোয়ার রোজেন ॥ কিশোরগঞ্জের মেয়ে নাঈমা আক্তার। সাভারের একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। ২০০৭ সালে কাজে যোগ দেয়ার এক বছর পর বিনা নোটিসে তাকে ছাঁটাই করে মালিকপক্ষ। চাকরি ফিরে পেতে এবং বকেয়া ২৫ হাজার টাকা আদায়ে ২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসে ঢাকার তৃতীয় শ্রম আদালতে মামলা করেন নাঈমা। একটি বেসরকারী সংস্থার সহায়তায় করা মামলায় ২০১০ সালের জুনে নাঈমার পক্ষে রায় দেয় আদালত। মালিকপক্ষ ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে। প্রায় ৫ বছর পেরিয়ে গেলেও ওই মামলার নিষ্পত্তি হয়নি। মুন্সীগঞ্জের আকবর আলী কাজ করতেন তেজগাঁওয়ের একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে। কোন কারণ না দেখিয়ে তাকেও চাকরি থেকে অব্যাহিত দেয়া হয়। বকেয়া আদায়ের জন্য তিনি ঢাকার প্রথম শ্রম আদালতে মামলা করেন। অথচ সাড়ে তিন বছরেও অগ্রগতি নেই তার মামলার।

এভাবে নাঈমা ও আকবরের মতো হাজার হাজার শ্রমিকের মামলা অনিষ্পত্তি অবস্থায় রয়েছে দেশের শ্রম আদালতে। নিষ্পত্তি না হওয়ায় প্রতি বছরই বাড়ছে মামলাজট। গত দুই বছরে অনিষ্পন্ন মামলার সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৪ হাজার। জনবল সঙ্কট ও প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিচারকের অভাবে বছরের পর বছর ধরে প্রায় ১৭ হাজার মামলা ঝুলে রয়েছে। অনুমোদন থাকার পরও রংপুর, বরিশাল ও সিলেটে নতুন তিনটি শ্রম আদালত স্থাপনের উদ্যোগ থমকে আছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায়। শ্রম আপীল ট্রাইব্যুনালে ২০১১ সালে অর্গানোগ্রামের খসড়া হলেও আজও তা চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি। সারাদেশে বিদ্যমান ৭টি শ্রম আদালতের পাঁচটিতে বিচারকের পরের অতি গুরুত্বপূর্ণ রেজিস্ট্রার পদ শূন্য রয়েছে প্রায় দুই বছর ধরে। প্রথম শ্রেণীর এই পদের কাজ বর্তমানে সামলাচ্ছেন অনভিজ্ঞ তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারীরা। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে পাবলিক সার্ভিস কমিশনকে (পিএসসি) রেজিস্ট্রার নিয়োগ দেয়ার অনুরোধ জানালেও আজ পর্যন্ত সাড়া মেলেনি। নানা জটিলতার কারণে শ্রম আদালত প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে। শ্রম আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বঞ্চিত শ্রমিকদের আশ্রয়স্থল হলেও তাদের স্বার্থই রক্ষা করতে পারছে না শ্রম আদালত।

সূত্র জানায়, শ্রম আদালতের কার্যক্রম শুরুর সময় ঢাকা ও এর আশপাশে কলকারখানা ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল হাতে গোনা। গত ২০ বছর ধরে ঢাকার তিনটি আদালতে বিচার চলছে। এই সময়ে রাজধানীসহ সকল বিভাগীয় শহরে বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে কয়েকগুণ। কিন্তু সেই অনুপাতে শ্রম আদালতের সংখ্যা ও লোকবল বাড়েনি। শ্রম আইন অনুযায়ী সময়ের প্রয়োজনে নতুন নতুন শ্রম আদালত স্থাপনের বিধান থাকলেও কার্যকর করা হচ্ছে না। তাই বিদ্যমান লোকবল সঙ্কট সমাধানের পাশাপাশি দ্রুত ন্যায় বিচার প্রাপ্তির স্বার্থে ঢাকাসহ শ্রমিক অধ্যুষিত দেশের বিভিন্ন স্থানে আরও শ্রম আদালত স্থাপন অতি জরুরী হয়ে পড়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সারাদেশে বর্তমানে সাতটি শ্রম আদালত রয়েছে। অথচ এসব আদালত শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে পারছে না। বরং পদে পদে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে শ্রমিকদের। বছরের পর বছর তাদের আদালতের বারান্দায় ঘুরতে হয়। দীর্ঘদিন আইনী লড়াই করে পাওনা আদায়ে কেউ কেউ সক্ষম হলেও বেশিরভাগ শ্রমিক এক সময় আইনী লড়াই থেকে ছিটকে পড়েন। আবার শ্রম আপীল ট্রাইব্যুনালের দেয়া রায়ের বিরুদ্ধে বিবাদীরা প্রায়ই হাইকোর্টে রিট করে স্থগিতাদেশ নিয়ে আসে। এতেও বিচার প্রক্রিয়া চরম দীর্ঘায়িত হয়। শুধুমাত্র বিচারের দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক শ্রমিক বঞ্চিত হয়েও আদালতের দ্বারস্থ হন না।

রাজধানীর দৈনিক বাংলা মোড়ের শ্রম ভবনে ঢাকা বিভাগের তিনটি শ্রম আদালত অবস্থিত। বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় সেখানে গিয়ে বিচারপ্রত্যাশী সাধারণ শ্রমিকদের ভিড় দেখা যায়। তাদেরই একজন ফরিদপুরের মোসলেম উদ্দিন। সাভারের একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন মোসলেম। নিয়োগপত্রে উল্লেখিত শর্ত ভঙ্গ করে তাকে চাকরি থেকে অব্যাহিত দেয়া হয় বলে মোসলেমের অভিযোগ। বকেয়া ৩১ হাজার ৮০০ টাকা আদায়ের জন্য একটি শ্রমিক ফেডারেশনের মাধ্যমে ২০১৩ সালের ১১ মার্চ প্রথম শ্রম আদালতে মামলাও করেন তিনি। দুই বছর পেরিয়ে গেলেও সেই মামলার নিষ্পত্তি হয়নি। অথচ শ্রম আইন অনুযায়ী ৯০ কার্যদিবসের মধ্যেই বকেয়া পাওনা সংক্রান্ত অভিযোগ নিষ্পত্তি হওয়ার কথা। অসহায় কণ্ঠে মোসলেম বললেন, আমি অহন সাভারেই আরেকটা গার্মেন্টসে কাম করি। দুই-তিন মাস পর পর মামলার তারিখ পড়ে। অনেক কষ্টে ছুটি নিয়া আসি মামলায় হাজিরা দেয়ার জন্য। রায় আইজ অইব কাইল অইব বইল্যা সবাই খালি ঘুরায়। এ বিষয়ে বাংলাদেশ গার্মেন্টস এ্যান্ড শিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি রফিকুল ইসলাম সুজন জনকণ্ঠকে বলেন, শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় শ্রম আদালত ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। অনেক সময় মামলার তারিখ পড়লেও বাদী শ্রমিকদের খুঁজে পাওয়া যায় না। মূলত বিচারে দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক শ্রমিক ন্যায্য পাওনা আদায়ের আশা ছেড়ে দিচ্ছেন।

জানা গেছে, সাতটি শ্রম আদালতের মধ্যে রাজধানীতে তিনটি, চট্টগ্রামে দু’টি, খুলনা ও রাজশাহীতে একটি আদালত রয়েছে। এ ছাড়া রাজধানীর কাকরাইলে একটি শ্রম আপীল ট্রাইব্যুনালসহ আটটি আদালতে বর্তমানে ১৬ হাজার ৮৭৬টি মামলা বিচারাধীন। ২০১৩ সালের জুন মাসে এসব আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছিল ১৩ হাজার ১৭৮। এ হিসাবে গত দুই বছরে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা বেড়েছে ৩ হাজার ৭৪০টি। ২০১৪ সালে এসব আদালতে দায়ের হওয়া ৮ হাজার ১৬৬টি মামলার মধ্যে ১ হাজার ৬৯০টি মামলার এখনও কোন সুরাহা হয়নি।

ঢাকার তিনটি আদালতে বর্তমানে মোট ১৩ হাজার ৪১৩টি মামলা ঝুলে আছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ৯২৭টি মামলা রয়েছে ঢাকার প্রথম আদালতে, ৪ হাজার ৫৪০টি রয়েছে ঢাকার দ্বিতীয় আদালতে এবং সবচেয়ে বেশি ৪ হাজার ৯৪৬টি মামলা রয়েছে ঢাকার তৃতীয় আদালতে। উল্লেখ্য, গত দুই বছরে ঢাকার প্রতিটি আদালতেই মামলার সংখ্যা বেড়েছে।

অন্যদিকে রাজশাহীর শ্রম আদালতে ৩৬৮টি, খুলনায় ৮৮০টি, চট্টগ্রামের প্রথম শ্রম আদালতে ৯৭৯টি এবং চট্টগ্রামের দ্বিতীয় আদালতে ৫০২টি মামলা দীর্ঘদিন ধরে অনিষ্পন্ন অবস্থায় রয়েছে। আর শ্রম আদালতের আপীল ট্রাইব্যুনালে ৭৩৪টি মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। গত চার বছর ধরে একজন বিচারক দিয়েই এই ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম চলছে। জনবল সঙ্কটের কারণে এ মামলার জটও বাড়ছে।

যদিও শ্রম আইন ২০০৬-এর ধারা ২১৮(৫) এ বলা হয়েছে, দুই বা ততোধিক বিচারকের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চের মাধ্যমে ট্রাইব্যুনাল চলবে। আবার খুলনা ও রাজশাহী বাদে অন্য পাঁচটি আদালতে রেজিস্ট্রার নেই প্রায় দুই বছর। প্রায় এক বছর আগে মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে রংপুর, বরিশাল ও সিলেটে নতুন তিনটি শ্রম আদালত স্থাপনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। প্রতিটি আদালতে বিচারক, রেজিস্ট্রারসহ ১৬ জন করে লোকবল নিয়োগের উদ্যোগও নেয়া হয়। কিন্তু প্রশাসনিক জটিলতার কারণে সব উদ্যোগই বর্তমানে থমকে আছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী এ্যাডভোকেট আনিসুল হক বলেন, বরিশাল, রংপুর ও সিলেটে শ্রম আদালত স্থাপনের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। রাজধানীতে বিদ্যমান তিনটি শ্রম আদালতের অতিরিক্ত হিসেবে গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে শ্রম আদালত সম্প্রারণ করা হবে। এছাড়া শ্রমিকদের যাতে কষ্ট না হয়, সেজন্য শ্রম ট্রাইব্যুনালেই মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা হবে।

একই প্রসঙ্গে লেবার কোর্ট বার এ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি এ্যাডভোকেট মাহবুবুল হক বলেন, শ্রম আদালতের বেশিরভাগ মামলাই পোশাকশিল্প শ্রমিকদের। তাই শুধু এই খাতের শ্রমিকদের জন্য পৃথক শ্রম আদালত করা প্রয়োজন। তাছাড়া মামলাজট কমাতে প্রতিটি জেলায় শ্রম আদালত গঠন করা প্রয়োজন বলেও মনে করেন এই আইনজীবী।

প্রকাশিত : ১ মে ২০১৫

০১/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: