কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বর্জ্য থেকে বিদ্যুত উৎপাদন কি অধরাই থাকবে?

প্রকাশিত : ৩০ এপ্রিল ২০১৫
  • আরিফুর সবুজ

বাংলাদেশ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। বিশ্ব অর্থনীতির বিশ্লেষণে খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাকস, এডিবি, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, জাইকা এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের আন্তর্জাতিক অর্থনীতি বিশ্লেষণকারী বিভিন্ন সংস্থাসমূহের জরিপকৃত ফলাফলে দেখা যায় বর্তমান বিশ্বে প্রথম দশ ‘অর্থনৈতিক ব্যাঘ্র’ (ইকোনমিক টাইগার) এ রূপান্তরিত হওয়ার পথে বাংলাদেশ। তাই দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এ কথাটি এখন আর কোন বাতুলতা নয়, কোন চাটুকারিতাও নয়। দিবালোকের মতো সত্য। ব্যাষ্টিক ও সামষ্টিক অর্থনীতির বিবেচনায় দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। স্বপ্ন দেখছে ২০৪১ সাল নাগাদ উন্নত বিশ্বের কাতারে পৌঁছে যাওয়ার।

সরকার ক্ষমতায় এসেই দেশের মানুষকে অন্ধকার থেকে মুক্তি দিতে বিদ্যুত উৎপাদনের ওপর জোর দেয়। ‘পাওয়ার সিস্টেম মাস্টারপ্ল্যান-২০১০’ প্রণয়ন করে। অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এড়ানোর লক্ষ্যে সরকার ‘ইমার্জেন্সি পাওয়ার এ্যান্ড এনার্জি সাপ্লাই এ্যাক্ট’ পাস করে জাতীয় সংসদে। বিশেষত পরিবেশবান্ধব বিদ্যুত প্রকল্প যেমন সূর্য, বায়ু, পানি ও বর্জ্যÑ এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে। কারণ একটি বিদ্যুত প্রকল্পের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে বাস্তবায়নে বেশ কয়েক বছর সময় অতিবাহিত হয়। তাছাড়া, পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে বিদেশী বিনিয়োগও পাওয়া সহজ হয়। দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাষ্ট্রনায়ক প্রধানমন্ত্রী তাই ৪ জুন, ২০১২ সালের মন্ত্রিপরিষদ সভায় এ বিষয়টির ওপর দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার নির্দেশ প্রদান করেন। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২১ সাল নাগাদ ২৪ হাজার মেগাওয়াট এবং ২০৩০ সালে ৪০ হাজার মেগাওয়াট চাহিদা নির্ধারণ করে সে অনুযায়ী কর্মসূচী চালিয়ে যাচ্ছে। বিদ্যুত উৎপাদন মহাপরিকল্পনায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুতকেন্দ্র স্থাপনের পাশাপাশি তেল, কয়লা, গ্যাস, নিউক্লিয়ার, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও আন্তঃদেশীয় সংযোগসহ বিদ্যুত উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য দীর্ঘমেয়াদী ও স্বল্পমেয়াদী অনেক কর্মসূচী গ্রহণ করেছে। ফলে দেশের বিদ্যুত উৎপাদন ক্ষমতা দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে তা চাহিদার তুলনায় কম। ফলে আলোকিত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন এখনও দূরে। এ স্বপ্ন পূরণে সহায়ক হতে পারে বর্জ্য দিয়ে বিদ্যুত উৎপাদন পদ্ধতি। এতে একদিকে বর্জ্যরে সঠিক ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে নাগরিকদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত ও সুন্দর পরিবেশের যেমন নিশ্চয়তা দেয়া সম্ভব, তেমনি দেশে বিদ্যুত উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে কিছুটা হলেও বিদ্যুতের ঘাটতিও লাঘব করা সম্ভব হবে।

বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ দহনে গ্যাস উৎপাদন এবং গ্যাস থেকে টারবাইনের মাধ্যমে বিদ্যুত উৎপাদন একটি নিরাপদ পদ্ধতি। বর্জ্য থেকে মিথেন গ্যাস প্রস্তুতের জন্য বর্তমানে বায়োডোম পদ্ধতির ব্যবহার অনেকটা কমে গেছে। এখন এর পরিবর্তে ল্যান্ডফিল পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। গাজন পদ্ধতিতেও বিদ্যুত উৎপাদন সম্ভব। বর্জ্য থেকে গ্যাস তৈরির জন্য জাপান, চীন ও ভারতে বর্জ্য পদার্থগুলো তরলে পরিণত করা হয়। এটা করা হয় স্মেল্টিং ও ইবারা ফ্লুইডাইজেশন পদ্ধতিতে। পরে তা থেকে থার্মোসিলেক্ট জেএফই গ্যাসিফিকেশন প্রক্রিয়ায় গ্যাস বা বিদ্যুত উৎপাদন করা হয়। গ্রীসের পেত্রা শহরে পরিত্যক্ত তরল থেকে প্রতিদিন ২৫ কিলোওয়াট বিদ্যুত এবং ২৫ কিলোওয়াট তাপশক্তি উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে। বর্জ্য থেকে ফার্মেন্টেশন বা গাঁজন প্রক্রিয়ায়ও বিদ্যুত উৎপাদন করা যায়। এতে বর্জ্যরে সেলুলোজ বা অন্যান্য জৈব পদার্থ থেকে ইথানল তৈরি হয়। তবে বর্জ্যরে মধ্যে চিনি বা চিনি জাতীয় পদার্থ থাকলে তা থেকে তৈরি হয় কার্বন ডাইঅক্সাইড ও এ্যালকোহল। সাধারণত ফার্মেন্টেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয় বায়ুর অনুপস্থিতিতে। সেখানে এস্টারিফিকেশনও ঘটতে পারে এবং তৈরি হতে পারে বায়োডিজেল। পরে পাইরোলাইসিস বা তাপীয় বিয়োজনের মাধ্যমে তৈরি করা হয় মিথেন বা ইথেন গ্যাস। পরে গ্যাস থেকে টারবাইনের মাধ্যমে বিদ্যুতশক্তি উৎপাদন করা হয়। বর্জ্য সংরক্ষণ, নিষ্কাশন ও পুনর্ব্যবহার উপযোগী করে দেশকে একদিকে পরিবেশ দূষণের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব, অন্যদিকে বিদ্যুত উৎপাদনের মাধ্যমে বিদ্যুত ঘাটতিও হ্রাস করা সম্ভব। তাই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বর্জ্য থেকে বিদ্যুত উৎপাদনকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়। কিন্তু আমাদের দেশে এখনও বর্জ্য থেকে বিদ্যুত উৎপাদনকে তেমন গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না। যদিও দেশে বর্জ্য থেকে বিদ্যুত উৎপাদনের প্রকল্প ইতোমধ্যে নেয়া হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে সে প্রকল্পগুলো আছে ফাইলবন্দী হয়ে ।

বর্জ্য থেকে বিদ্যুত উৎপাদনের জন্য ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহরকে বেছে নেয়া হয়েছিল। আজ থেকে তিন বছর আগে বেশ জোরেশোরেই বর্জ্য থেকে বিদ্যুত উৎপাদনের প্রকল্প নেয়া হয়েছিল। পত্র-পত্রিকাগুলো ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতেও এ নিয়ে বেশ আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছিল। সরকারের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছিল দেশের মানুষ। বিদ্যুত স্বল্পতার কারণে যেখানে অনেক মিল-কারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল, সেখানে ফেলে দেয়া বর্জ্য থেকে বিদ্যুত উৎপাদন বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে বলে প্রত্যাশা করছিল বিশ্লেষকরা। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, তিন বছর পরও প্রকল্পগুলো আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে এখনও পরিকল্পনার মধ্যই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। তবে সৌভাগ্য, পরিকল্পনার পরি এখনও উড়ে যায়নি। এখনও আছে। তবে আরও দিনক্ষয় করলে হয়ত পরিকল্পনার পরি উড়ে যাবে, থাকবে শুধু কল্পনা। এমনটা ঘটুক, এটা কাম্য নয়। কাম্য বর্জ্য দিয়ে বিদ্যুত উৎপাদনের মাধ্যমে পরিবেশ সুরক্ষা ও বিদ্যুতের চাহিদা মেটানোর মাধ্যমে দেশকে টেকসই উন্নয়নের দিকে নিয়ে যাওয়া।

রাজধানী ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় পাঁচ হাজার মেট্রিক টন বর্জ্য উৎপাদিত হয়। এই বিপুল পরিমাণ আবর্জনা রাজধানীর আমিনবাজার ও মাতুয়াইল ল্যান্ডফিল্ডে ফেলা হয়। দিন দিন জনসংখ্যা বাড়ছে, সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বর্জ্য উৎপাদনের পরিমাণ। জাপানী বিশেষজ্ঞ দলের ধারণা অনুযায়ী ২০১৬ সালে এই ল্যান্ডফিল্ডগুলোতে আর বর্জ্য ফেলা যাবে না। তখন ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনকে অন্যত্র জায়গা খুঁজতে হবে। কিন্তু ঢাকার আশপাশেও খালি জায়গার পরিমাণ সীমিত হয়ে আসছে। বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যবস্থা না করা হলে, ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনকে এ নিয়ে বেশ বিপাকেই পড়তে হবে। বর্তমানে বর্জ্য মাটি চাপা দেয়ার সনাতন পদ্ধতি আন্তর্জাতিক পরিবেশ আইনের পরিপন্থী। কারণ বর্জ্য থেকে প্রচুর মিথেন গ্যাস সৃষ্টি হয়Ñ মিথেন গ্যাস কার্বন ডাইঅক্সাইড থেকে বিশ গুণ অধিক পরিবেশের জন্য ক্ষতিকারক। তাছাড়া ভূগর্ভস্থ পানি দূষিত হওয়ার অন্যতম কারণ বর্জ্য মাটি চাপা দেয়া। এতে প্রচুর পরিমাণ জমি নষ্ট হয়। এ জেনেও দুই সিটি কর্পোরশনের কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষের কারণে আটকে আছে বর্জ্য দিয়ে বিদ্যুত উৎপাদন প্রকল্প।

ঢাকা শহরে বর্জ্য থেকে বিদ্যুত ও গ্যাস উৎপাদনের লক্ষ্য বিগত ২০১৩ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ইতালির ম্যানেজমেন্ট এনভায়রনমেন্ট ফিন্যান্স ‘এসইএল’ কোম্পানির সঙ্গে একটি চুক্তি করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। চুক্তির মেয়াদ বিশ বছর। প্রকল্পটিতে ইতালিয়ান কোম্পানিটি ৩০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করার পরিকল্পনা করেছিল। দুই সিটি কর্পোরেশনকে কোম্পানিটি বছরে ৬৯ লাখ ৪৪ হাজার টাকা প্রদান করবে। তবে প্রতি পাঁচ বছর পর পর লিজের টাকার পরিমাণ ২০ ভাগ হারে বৃদ্ধি করার কথাও ছিল। ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের বর্জ্যে উত্তরের আমিনবাজার এবং দক্ষিণের মাতুয়াইলে পৃথক বিদ্যুতকেন্দ্র স্থাপন করার কথা কোম্পানিটির। প্রাথমিকভাবে এই দুই কেন্দ্র থেকে ২৪ মেগাওয়াট করে মোট ৪৮ মেগাওয়াট বিদ্যুত উৎপাদন করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল। পরবর্তীকালে এ প্রকল্প থেকে ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত উৎপাদনের আশাও করা হয়েছিল। চুক্তি অনুযায়ী ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের মাতুয়াইল স্যানিটারি ল্যান্ডফিলে ১ম পর্যায়ে ১৮ মাসে দৈনিক ১৩০০ টন বর্জ্য ব্যবহার করে ৫ মেগাওয়াট, ২য় পর্যায়ে ২৪ মাসে দৈনিক ১৬০০ টন বর্জ্য ব্যবহার করে ১২ মেগাওয়াট এবং ৩য় পর্যায়ে ৩৬ মাসে দৈনিক ২৩০০ টন বর্জ্য ব্যবহার করে ২৪ মেগাওয়াট বা তদুর্ধ বিদ্যুত উৎপাদন করার কথা। প্রকল্পটির কার্যক্রম শুরু হলে প্রায় দুই হাজার লোকের কর্মসংস্থান হওয়ার কথা। চুক্তিতে বলা হয়েছিল প্রকল্পটির বর্জ্য ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন যোগান দেবে আর তা দিয়ে বিদ্যুত উৎপাদন করবে কোম্পানিটি। এমনটাই চুক্তি হয়েছিল। এই প্রকল্পের মাধ্যমে ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুত উৎপাদন করা যাবে বলে প্রত্যাশা করা হয়েছিল এবং সেই উৎপাদিত বিদ্যুত বাংলাদেশ সরকার কিনে নেবে কিলোওয়াটপ্রতি ৮ দশমিক ৭৫ টাকা দরে এবং প্রকল্পটির তত্ত্বাবধানে থাকবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়।

কিন্তু দুর্ভাগ্য, চুক্তি-পরবর্তী এক বছরের মধ্যে এ প্রকল্পের কাজ শুরুর কথা থাকলেও, এখনও তা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থেকে মুক্তি পেয়ে কাজ শুরু করতে পারেনি। মাতুয়াইল স্যানিটারি ল্যান্ডফিল্ডে বিদ্যুত উৎপাদন কেন্দ্রটি স্থাপনের জন্য ল্যান্ডফিল্ডের ভেতর ৩০ একর জমি চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু ডিসিসি ঐ এলাকায় সর্বোচ্চ ৮ একর জমি দিতে রাজি। এ জমি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য অপ্রতুল। ফলে জমি সঙ্কটই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পথে অন্যতম বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের কিছু স্বার্থান্বেষী কর্মকর্তার খামখেয়ালিপনা ও অপতৎপরতা। এটাই মূলত বর্জ্য দিয়ে বিদ্যুত উৎপাদন প্রকল্পটির ভবিষ্যত অনিশ্চিত হওয়ার অন্যতম কারণ। এতে শুধু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সিটি কর্পোরেশনই। আবার কেউ কেউ কাজ শুরু না হওয়ার জন্য দায়ী করছেন কোম্পানিটিকে। সেক্ষেত্রে কোম্পানিটির সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে অন্য কোন দক্ষ কোম্পানিকে যাচাই-বাছাই করে বর্জ্য দিয়ে বিদ্যুত উৎপাদনের দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে। তাহলে বর্জ্য নিয়ে জমির সঙ্কট নিয়ে যেমন ডিসিসিকে ভুগতে হবে না, তেমনি সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা রাজধানীতে স্বাস্থ্যকর ও টেকসই পরিবেশ নিশ্চিতকরণে ভূমিকা রাখবে। সবচেয়ে বড় কথা, বর্জ্য দিয়ে বিদ্যুত উৎপাদন নাগরিকদের কিছুটা হলেও লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণা থেকে মুক্ত করবে।

বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী ও দেশের বৃহত্তম বন্দর নগরী চট্টগ্রাম শহরের সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং বিদ্যুত ঘাটতি মেটানোর জন্য প্রাথমিকভাবে বর্জ্য দিয়ে ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুত উৎপাদন প্রকল্প গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল ২০১২ সালে। প্রায় ষাট লাখ লোকের বসবাস চট্টগ্রাম মহানগরীতে। এই বিপুল জনগোষ্ঠী প্রাত্যহিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি শিল্প-কারখানা, হাসপাতাল, হাটবাজার প্রভৃতি স্থাপনার মাধ্যমে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য সৃষ্টি করে। জরিপ অনুযায়ী নগরীতে প্রতিদিন আনুমানিক ১২শ’ থেকে ১৫শ’ টন বর্জ্য তৈরি হয়। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এই বিপুল পরিমাণ বর্জ্য সংগ্রহ করে নগরীর দুটি ডাম্পিং ইয়ার্ডে ফেলে। একটি ইয়ার্ড রয়েছে হালিশহরের আনন্দবাজার এলাকায়, অন্যটি বায়েজিদ বোস্তামী এলাকার আরেফিন নগরে। ফেলে দেয়া বর্জ্য বিভিন্নভাবে ধ্বংস করার চেষ্টা করে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) অথচ এই বর্জ্য দিয়েই বিদ্যুত উৎপাদন করে মেটানো যেতে পারে বিদ্যুত ঘাটতি। বর্জ্য থেকে বিদ্যুত উৎপাদনের জন্য সম্পূর্ণ বৈদেশিক বিনিয়োগের মাধ্যমে বিশ্বখ্যাত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কোম্পানির প্রস্তুতকৃত মেশিনারিজ ও কারিগরি সহায়তায় স্থাপিত প্রকল্পটির কাজের জন্য আবেদনকৃত চৌদ্দটি বিদেশী কোম্পানি থেকে যাচাই-বাছাই করে চসিক রিনিউবেল এনার্জি কোম্পানিকে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যই বলতে হবে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও কিছু কর্মকর্তার সদিচ্ছার অভাবে এই প্রকল্পটি এখনও আলোর মুখ দেখেনি অথচ প্রকল্পটি চালু হলে চসিকের বাৎসরিক কয়েক শ’ কোটি টাকা সাশ্রয় হতো। সবচেয়ে বড় কথা, পরিবেশের উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের ঘাটতি কিছুটা হলেও লাঘব হতো। পাশাপাশি বন্দরনগরীর দুঃখ জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকেও মুক্তি পেত। প্রকল্পের সম্পূর্ণ অর্থ বৈদেশিক মুদ্রায় বিদেশী বিনিয়োগ দেশে আসত। সঙ্গে উন্নত প্রযুক্তি স্থানান্তরিত হতো বাংলাদেশে। বিপুলসংখ্যক লোকের কর্মসংস্থান ছাড়াও উচ্চ কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন বিশেষজ্ঞ সৃষ্টি হবে যারা পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশের ৬৪টি জেলা শহর ও পরবর্তীতে উপজেলাগুলোতেও এই প্রকল্প স্থাপনে সক্ষম হবে।

ঢাকা ও চট্টগ্রামের বর্জ্য থেকে বিদ্যুত উৎপাদন প্রকল্পগুলো আলোর মুখ না দেখায় হতাশাই ব্যক্ত করতে হয়। মহাজোট সরকার পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ বিদ্যুত প্রকল্প স্থাপনের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করছে। কিন্তু তারপরও থমকে আছে পরিবেশবান্ধব বর্জ্য দিয়ে বিদ্যুত উৎপাদন প্রকল্প অথচ এতে একদিকে যেমন তেলভিত্তিক বিদ্যুত প্রকল্পের কাঁচামাল আমদানিজনিত খরচ হ্রাস পেত, তেমনি রোগজীবাণু ও দুর্গন্ধময় শহরের পরিবর্তে নির্মল সুন্দর শহরে বাস করতে পারত নগরবাসী। গোটা দেশে বর্জ্য দিয়ে বিদ্যুত উৎপাদন প্রকল্পের মাধ্যমে ১৩০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুত উৎপাদন সম্ভব, যা সরকার নির্ধারিত বিদ্যুতের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়ক। তাই সর্বাগ্রে ঢাকা ও চট্টগ্রামে ফাইলবন্দী হয়ে যাওয়া এই প্রকল্প দুটি চালু করা জরুরী। এরপর ক্রমে প্রতিটি বিভাগীয় শহর এবং জেলা শহরে এ ধরনের প্রকল্প গ্রহণ করা হলে দেশের বিদ্যুত সমস্যার অনেকটাই কেটে যাবে। আলোকিত হয়ে উঠবে দেশ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর (বিদ্যুত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব) বিশেষ উদ্যোগের ফলেই বাংলাদেশ আজ বিশ্বে সোলার সিস্টেমে শীর্ষস্থান দখল করেছে। এখন বর্জ্য দিয়ে বিদ্যুত উৎপাদনের মতো জনহিতকর প্রকল্পটিকে ফাইলবন্দিত্বের হাত থেকে রক্ষা করে বাস্তবায়নের জন্য প্রধানমন্ত্রীর জরুরী হস্তক্ষেপ আবশ্যক।

প্রকাশিত : ৩০ এপ্রিল ২০১৫

৩০/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: