কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

মনজুরের ভীতি বৃষ্টি ॥ নাছিরের যুব ও ছাত্রলীগের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড

প্রকাশিত : ২৩ এপ্রিল ২০১৫

মোয়াজ্জেমুল হক, চট্টগ্রাম অফিস ॥ জলাবদ্ধতা নিরসনে ব্যর্থতার কারণে চট্টগ্রামের সদ্য বিদায়ী মেয়র ও আসন্ন সিটি নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী মনজুর আলম ব্যাপকভাবে সমালোচিত। আগামী ২৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিতব্য এ নির্বাচনের আগে মনজুর আলমের প্রধান ভীতি বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতা। এ সময়ের মধ্যে নগরীতে বর্ষণ হলে মনজুর আলমের কপাল পুড়বে নিশ্চিতভাবে। অপরদিকে আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র প্রার্থী আ জ ম নাছিরের সমর্থনে দল ও দলের অঙ্গ সংগঠনসমূহের নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে মাঠে নেমেছেন। পাশাপাশি প্রগতিশীল শক্তিগুলোও নাছিরের পক্ষ হয়ে তাঁর বিজয় নিশ্চিত করতে কাজ করে চলেছে। নগরজীবনে তাঁকে নিয়ে ভীতিতে রয়েছে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের একশ্রেণীর নেতাকর্মীর সমাজবিরোধী তৎপরতায়। ইতোমধ্যে এদের একটি অংশ সংবাদকর্মীদের পেটানোয় ব্যাপকভাবে সমালোচনায় পড়েছে মূল দল আওয়ামী লীগ। সঙ্গত কারণে মনজুর আলমকে নিয়ে ব্যর্থতার অভিযোগ যেমন সমালোচনা রয়েছে, তেমনি সরকারী দলের অঙ্গ সংগঠন ও ছাত্র সংগঠনসমূহের বেপরোয়া একশ্রেণীর নেতাকর্মীদের অপতৎপরতা নিয়েও সমালোচনার কমতি নেই।

এদিকে, নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে চট্টগ্রামের ভোটের মাঠ ততই গরম হয়ে উঠছে। আজ বৃহস্পতিবার থেকে আর মাত্র চারদিন নির্বাচনী প্রচারের সময় রয়েছে। ২৬ এপ্রিল মধ্যরাত থেকে নির্বাচনী প্রচার বন্ধ হয়ে যাবে।

চট্টগ্রামে মেয়র পদে ১২ ও সাধারণ এবং সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে ২৭৫ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছেন। মেয়র পদে দুই প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমর্থিত দুই হেভিওয়েট প্রার্থী যথাক্রমে আ জ ম নাছির উদ্দিন ও এম মনজুর আলমের মধ্যে ভোটের লড়াই সীমাবদ্ধ থাকবে। চট্টগ্রামে এবার ভোটার সংখ্যা ১৮ লক্ষাধিক। ভোট কেন্দ্র বৃদ্ধি করে ৭১৯টিতে উন্নীত করা হয়েছে। পুলিশ প্রশাসন এসব কেন্দ্রের মধ্যে ৫৯৫টিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, আনসারের পাশাপাশি সেনাবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত হওয়ায় ভোটার মহলে ভিন্ন ধরনের আস্থার সৃষ্টি হয়েছে। উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম থেকে বিএনপি সর্বপ্রথম সেনা মোতায়েনের দাবি জানিয়ে আসছিল। এরপরে ঢাকায় বিএনপির পক্ষ থেকে অনুরূপ দাবি জানানোর পর কয়েক দফায় বৈঠক করে নির্বাচন কমিশন গত মঙ্গলবার তিন সিটি কর্পোরেশনের জন্য তিন প্লাটুন সেনাসদস্য মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয়। এরপরও বিএনপি আবারও দাবি জানিয়েছে সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা প্রদানের জন্য, যা ইতোমধ্যে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। অপরদিকে, চট্টগ্রামে ভোট গণনার জন্য কন্ট্রোলরুম হিসেবে চট্টগ্রাম স্টেডিয়াম সংলগ্ন জিমনেসিয়ামকে নির্দিষ্ট করার পর গত মঙ্গলবার বিএনপির পক্ষ থেকে তা অন্যত্র স্থানান্তর করার দাবি জানানো হলেও তাও টিকেনি। ইতোমধ্যেই পূর্বঘোষিত জিমনেসিয়াম চত্বরে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে কন্ট্রোলরুম স্থাপনের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। অপরদিকে, চট্টগ্রামে প্রতিবছর ঐতিহ্যবাহী যে আবদুল জব্বারের বলী খেলা ও মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এবার শুধু বলীখেলা রেখে মেলার পর্বটি বাতিল করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ। ব্যাখ্যা হিসেবে বলা হয়েছে নির্বাচনের জন্য এ মেলা ঝুঁকিপূর্ণ। তবে মেলা নিয়ে উৎসুক মহলে ইতোমধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।

চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার দফতর সূত্রে জানানো হয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি জোরালো করা হবে। সেনাবাহিনী ও বিজিবি সদস্যরা স্ট্রাইকিং ও রিজার্ভ ফোর্স হিসেবে কাজ করবে। যে কোন কেন্দ্রে গোলযোগের খবর পাওয়া গেলে সেনা ও বিজিবি সদস্যরা দ্রুত সেখানে হাজির হয়ে পরিস্থিতি অনুকূলে রাখতে সচেষ্ট থাকবে। রিটার্নিং অফিসার দফতরের দায়িত্বশীল একটি সূত্র বুধবার জনকণ্ঠকে জানান, চট্টগ্রামের সিটি নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করতে তারা সর্বশক্তি নিয়ে কাজ করবে। এ পর্যন্ত তারা কোন ধরনের কারচুপির আশঙ্কা নিয়ে শঙ্কিত নয়। এছাড়া মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের পক্ষে আচরণবিধি ভঙ্গের যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে প্রত্যেকটি তারা বিবেচনা করে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। মেয়রসহ কাউন্সিলর প্রার্থীদের সতর্ক করা হয়েছে। জরিমানা করা হয়েছে কাউন্সিলর প্রার্থীকে। আচরণবিধি ভঙ্গ করে সমাবেশ করার সুযোগ কাউকে দেয়া হয়নি। যে কারণে চট্টগ্রামে এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কোন অবস্থাতেই খারাপ বলা যাবে না বলে ঐ সূত্রের দাবি।

এদিকে, ২৮ এপ্রিল সপ্তাহের মাঝামাঝি দিন। অর্থাৎ মঙ্গলবার হওয়ায় এ নগরীর ভোটারদের অধিকাংশ ভোট কেন্দ্রে যাবেন বলে রিটার্নিং অফিসার দফতরের ধারণা। এর পাশাপাশি মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীরা যেভাবে ভোটার মহলকে ভোটদানে কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য অনুনয়-বিনয় করছেন এবং নিজ নিজ পক্ষে ভোট চাইছেন তাতে প্রতীয়মান হচ্ছে পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

অপরদিকে, এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ ও এর সপক্ষের বিভিন্ন সংগঠন ও অরাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো কোন অবস্থাতেই আন্দোলনের নামে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী, পেট্রোলবোমা মেরে মানুষ হত্যাকারী দল সমর্থিত প্রার্থীদের প্রত্যাখ্যান করার আহ্বান জানিয়ে আসছেন। পক্ষান্তরে, বর্তমান সরকারকে অগণতান্ত্রিক সরকার এবং ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে ভোটারবিহীন নির্বাচন আখ্যা দিয়ে এ সরকারী দল সমর্থিত মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের বিরুদ্ধে ব্যালটের মাধ্যমে বিপ্লব ঘটানোর আহ্বান জানিয়ে আসছে প্রতিপক্ষ। শুধু তাই নয়, সরকারবিরোধী পক্ষ এ নির্বাচনকে আগামী জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবেও আখ্যায়িত করছে। চট্টগ্রামে মেয়র পদে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেহেতু আ জ ম নাছির উদ্দিন ও মনজুর আলমের মধ্যেই হবে সেক্ষেত্রে তা প্রকারান্তরে আওয়ামী লীগ-বিএনপি বা ১৪ দল ও ২০ দলীয় জোটের লড়াই হিসেবে দেখছে ভোটার মহল। সে হিসেবে বলা যায়, অরাজনৈতিক হলেও এ নির্বাচন রাজনৈতিক দলীয় সমর্থনের গ-ির বাইরে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই। এক্ষেত্রে প্লাস পয়েন্ট হিসেবে কাজ করবে প্রার্থীদের ব্যক্তি ইমেজ।

নির্বাচনের আর মাত্র বাকি ৬ দিন। চট্টগ্রামের ভোটার মহলেও প্রার্থীদের নিয়ে নানা আলোচনা ও বিশ্লেষণ সমাপ্তির পথে। এখন ভোট কেন্দ্রে গিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগের সময় একেবারে আসন্ন। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র প্রার্থী আ জ ম নাছিরের পক্ষে প্রচার এত বেশি যে, মনজুর আলম সে তুলনায় অনেকাংশে পিছিয়ে রয়েছেন। বিএনপির কয়েক শীর্ষ নেতা তার পক্ষে শুরু থেকে প্রচার কাজে নামলেও দীর্ঘদিন নীরব থেকে এখন যুবদল ও ছাত্রদল কর্মীরা প্রচারে নামতে শুরু করেছে। এর মধ্যে নগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ডা. শাহাদাত হোসেন, যিনি বিএনপির পক্ষ থেকে মেয়র পদে প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছিলেন। কিন্তু তিনি তা থেকে বঞ্চিত হন। ফলে অভিমান নিয়ে এতদিন একেবারে নীরব ছিলেন। এছাড়া লাগাতার অবরোধ ও হরতালে নাশকতার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলাও রয়েছে। গ্রেফতারী পরোয়ানা মাথায় নিয়ে ডা. শাহাদাত হোসেন মনজুর আলমের সঙ্গে বুধবার থেকে গণসংযোগে নেমেছেন। সঙ্গে ছিলেন যুবদল ও ছাত্রদলের বেশকিছু নেতাকর্মী ও সমর্থক।

এদিকে, বুধবার আ জ ম নাছির উদ্দিন তাঁর দীর্ঘ নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করেছেন। মনজুর আলমের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে আজ বৃহস্পতিবার তাঁর নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করা হবে। এ দুই প্রধান প্রার্থীর নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে স্ব স্ব দলের পক্ষে নেতাকর্মীরা যেভাবে মাঠে নেমেছে তাতে নির্বাচনী লড়াই বেশ জমবে বলেই প্রতীয়মান। এক্ষেত্রে নির্বাচনের আগ মুহূর্তে যদি বৃষ্টিপাত হয় তাহলে তা মনজুর আলমের জন্য বড় ধরনের ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। অনুরূপভাবে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের একশ্রেণীর নেতাকর্মীর অনভিপ্রেত উৎপাত বন্ধ না হলে তা আ জ ম নাছিরের জন্যও কাল হয়ে দাঁড়াতে হতে পারে বলে সর্বত্র আলোচিত হচ্ছে।

প্রকাশিত : ২৩ এপ্রিল ২০১৫

২৩/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

দেশের খবর



ব্রেকিং নিউজ: