আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

প্রকাশ্যে ব্লগার খুন

প্রকাশিত : ৩১ মার্চ ২০১৫
প্রকাশ্যে ব্লগার খুন
  • সকাল নয়টায় বাড়ির সামনে খুন ওয়াশিকুর রহমান বাবু
  • খুনী জিকরুল্লাহ হাটহাজারী মাদ্রাসা আর আরিফ মিরপুরের দারুল উলুমের ছাত্র। ‘ব্লগার বুঝি না, ইমানী দায়িত্ব বুঝি’
  • জনতার হাতে খুনীরা ধরা পড়ে
  • জিকরুল্লাহ চট্টগ্রাম থেকে এসে যাত্রাবাড়ী মাদ্রাসায় অবস্থান নিয়েছিল
  • এরা আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সিøপার সেলের সদস্য

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ বিজ্ঞানমনস্ক লেখক ও ব্লগার অভিজিত হত্যার জট না খুলতেই মাত্র এক মাসের ব্যবধানে সোমবার খুন হয়েছেন আরেক ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবু। এবার ইস্টিশন নামের ব্লগার ওয়াশিকুর খুনের ঘটনায় খুনে ব্যবহৃত চাপাতিসহ ধরা পড়েছে জিকরুল্লাহ ও আরিফ নামের মাদ্রাসার ছাত্র পরিচিত দুই খুনী। গ্রেফতারকৃত দুই মাদ্রাসার ছাত্র আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সিøপার সেলের সদস্য বলে ধারণা করছে পুলিশ। ব্লগার ওয়াশিকুর খুনের ঘটনায় খুনীরা হাতেনাতে ধরা পড়ায় এতদিন ধরে কারা কিভাবে ব্লগারদের একের পর এক খুন করে যাচ্ছে সেই রহস্যের জট উদ্ধারে সহায়ক হবে। সোমবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান তার দক্ষিণ বেগুনবাড়ির বাসা থেকে কর্মস্থল মতিঝিল ফারইস্ট ট্রাভেল এজেন্সি অফিসে যাওয়ার জন্য বের হলে বাসা থেকে বের হলে বাসার সামনের সরু গলিতে তিন জনে চাপাতি দিয়ে নির্মম ও নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করে ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবুকে। হাতেনাতে ধরা পড়া দুই মাদ্রাসার ছাত্র জিকরুল্লাহ ও আরিফ তেজগাঁও থানায় আটক অবস্থায় বলেছে, তারা এই খুনের জন্য মোটেই অনুতপ্ত নয়। ধর্মের নামে কটূক্তি করায় তারা ঈমানী দায়িত্ব পালন করেছে বলে পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছে জানিয়েছে গ্রেফতারকৃত দুই খুনী।

সোমবার সকাল প্রায় সাড়ে নয়টা। তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের বেগুনবাড়ির ৪/৩-এ এর বিসমিল্লাহ মঞ্জিলের পাঁচ তলার বাড়ির সামনের সরু রাস্তা। বাড়ির সামনেই দাঁড়ানো ছিল উগ্র মৌলবাদী ধর্মান্ধ নিষিদ্ধ জঙ্গীগোষ্ঠীর সদস্য ঘাতকরা। পাঁচ তলা বাড়ির দোতলায় বাবার সঙ্গে একটি কক্ষে থাকতেন ওয়াশিকুর রহমান। সোমবার সকালে গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুরে চলে যান তার বাবা। মতিঝিলের কর্মস্থল মতিঝিল ফারইস্ট ট্রাভেল এজেন্সি অফিসে যাওয়ার জন্য বাসা থেকে কয়েক গজ সামনে এগুতেই ওঁৎ পেতে থাকা তিন ঘাতক ঝাঁপিয়ে পড়ে তার ওপর। চাপাতি দিয়ে উপর্যুপরি এলোপাতাড়ি কুপিয়ে ক্ষত-বিক্ষত করে রাস্তায় ফেলে দেয় তাকে। তাকে যখন কোপানো হয় তখন আশপাশের অসংখ্য পথচারী, দোকানি, বাসাবাড়ির লোকজন রাস্তায় ও বাড়ির বিভিন্ন তলা থেকে হত্যাকা-ের দৃশ্য দেখতে পান। এমনকি হত্যাকা-ের সামান্য দূরেই ছিল কর্তব্যরত পুলিশ। খুনীদের এলোপাতাড়ি কোপানোর মধ্যে ঘুরে দাঁড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টার মধ্যেই ওয়াশিকুর চিৎকার করে ‘বাঁচাও-বাঁচাও’, বলতে-বলতেই রাস্তায় ঢলে পড়েন। পীচঢালা সরু এই রাস্তায় চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে দৌড়ে পালানোর সময়ে এক দোকানে বসে থাকা রফিক নামের এক ড্রাইভার দৌড়ে খুনীদের পিছু নেয়।

যেভাবে ধরা পড়ে খুনীরা ॥ তাহের, জিকরুল্লাহ ও আরিফ এই তিন জনে খুন করে ব্লগার ওয়াশিকুর রহমানকে। আগের দিন রবিবার বিকেলে যেই বাসায় সে থাকত সেই বাসাটি রেকি করে আসে তারা। তাদের নেতা হচ্ছে মাসুম নামের এক ব্যক্তি। মাসুম নিজে ওয়াশিকুর রহমানের ছবি, বাসার ঠিকানাসহ রেকি করে তিন জনকে খুনের দায়িত্ব দিয়ে চলে আসে। সোমবার তাহের, জিকরুল্লাহ ও আরিফকে তিনটি ব্যাগে তিনটি চাপাতি দেয়া হয়। বাসা থেকে বের হলেই তাকে হত্যা করার জন্য পরিকল্পনা করা হয়। পরিকল্পনা মোতাবেক সোমবার সকাল সাড়ে নয়টায় বাসা থেকে বের হয়ে কয়েক গজ এগুনো মাত্রই পেছন দিক থেকে ও সামনের দিক থেকে তিন জনের মধ্যে তাহের ও জিকরুল্লাহ দুই জনে মিলে কোপায় ওয়াশিকুরকে। ধারালো চাপাতির কোপে ওয়াশিকুর রহমান বাবুর শরীর থেকে মাথা প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

আরিফের চাপাতিটি তার ব্যাগেই পাওয়া যায়। তাহের ও জিকরুল্লাহ দুই জনে মিলে ওয়াশিকুরকে কুপিয়ে হত্যা করার পর চাপাতি দুইটি ঘটনাস্থলে ফেলে রেখে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করে। এ সময় এক দোকানে বসে থাকা রফিক নামের এক দুঃসাহসিক ড্রাইভার খুনীদের পিছু নেয়। ‘ডাকাত-ডাকাত’- বলে খুনীদের পেছনে দৌড়াতে থাকে। এ সময়ে খুনীরাও বাঁচার জন্য সামনের দিকে দৌড়াচ্ছে আর মানুষজনকে বিভ্রান্ত করার জন্য ‘ডাকাত-ডাকাত’ বলে চীৎকার করছে। সামনেই কর্তব্যরত পুলিশ দল। কিন্তু ডাকাত কারা? যে সামনে দৌড়াচ্ছে সেও বলছে ‘ডাকাত-ডাকাত’ আবার যে তাদের পিছু নিয়েছে সেও বলছে ‘ডাকাত-ডাকাত’। এ সময়ে যেই খুনীরা ডাকাত-ডাকাত বলে পালানোর চেষ্টা করছে তাদের সামনে পড়ে দুই হিজড়া। দুই হিজড়া দুই খুনী জিকরুল্লাহ ও আরিফকে ঝাপটে ধরে ফেলে। রফিকসহ জনতা চলে আসে। চলে আসে কর্তব্যরত পুলিশ দলও। হাতেনাতে ধরা পড়ে যায় দুই খুনী জিকরুল্লাহ ও আরিফ। তখনও ওয়াশিকুর রহমানের লাশ পড়ে ছিল রাস্তায়। প্রায় ঘণ্টা খানেক রাস্তায় পড়ে থাকার পর তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। কর্তব্যরত ডাক্তার মৃত ঘোষণা করেন ওয়াশিকুর রহমানকে।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও তদন্তভার ডিবিতে ॥ ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবুকে হত্যাকা-ের খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন র‌্যাব, পুলিশ, সিআইডিসহ গোয়েন্দা সংস্থা। সিআইডির ক্রাইম সিন টিমও ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করেছে। ওয়াশিকুর রহমানের ব্যবহৃত ল্যাপটপ, বাসা থেকে কাগজপত্র জব্দ করেছে পুলিশ। তার ল্যাপটপটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের কললিস্টও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে হত্যাকা-ের আগে কারা তার সঙ্গে কথা বলেছে, তাকে হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছে কিনা তাও পরীক্ষা করা হচ্ছে। ওয়াশিকুর রহমান বাবু হত্যাকা-ের তদন্তভার ডিবিতে হস্তান্তর করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

জিকরুল্লাহ ও আরিফের পরিচয় ॥

খুনের পর পালিয়ে গেছে সহযোগী খুনী তাহের। তাহের ও জিকরুল্লাহ দুই জনে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেছে ওয়াশিকুর রহমান বাবুকে। এর মধ্যে জিকরুল্লাহ হচ্ছে হেফাজতের আমির শফির পরিচালনাধীন চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসার ছাত্র। তার গ্রামের বাড়ি নরসিংদীর রায়পুরা থানার গজারিয়াকান্দিতে। তার বাবার নাম মইনউদ্দিন। আর রাজধানীর মিরপুরের দারুল উলুম মাদ্রাসার ছাত্র আরিফুল ইসলাম। তার গ্রামের বাড়ি হচ্ছে কুমিল্লার তিতাস থানার বারোকাউনিয়াতে। তার বাবার নাম তাজুল ইসলাম। তাদের দুই জনকেই রক্তমাখা চাপাতিসহ আটক করে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। গত শনিবার জিকরুল্লাহ চট্টগ্রামের হাটহাজারি মাদ্রাসা থেকে এ কাজের জন্য ঢাকায় এসে যাত্রাবাড়ীর একটি মসজিদে অবস্থান নেন। রবিবার হত্যার মিশন নিয়ে পরিকল্পনার জন্য তারা একসঙ্গে মিলিত হন এবং নিহত ওয়াশিকুরের বাসা রেকি করেন।

ঈমানী দায়িত্ব পালন করেছি ॥ ব্লগ কি বুঝি না। আর তার (ওয়াশিকুর) লেখাও আমরা দেখিনি। হুজুরের পরামর্শ দিয়েছেন সে (ওয়াশিকুর) ইসলামবিরোধী। তাকে হত্যা করা ঈমানী দায়িত্ব। ঈমানী দায়িত্ব পালন করলে বেহশতে যাওয়া যাবে। সেই ঈমানী দায়িত্ব পালন করতেই ওয়াশিকুরকে হত্যা করেছি। এই কথাগুলো বলেছেন তেজগাঁও থানায় আটক জিকরুল্লাহ ও আরিফ। খুনের ঘটনায় তারা মোটেই অনুতপ্ত নয় বলে জানিয়েছেন।

পরিকল্পনাকারী দলনেতা ॥ ওয়াশিকুর রহমান বাবু হত্যাকা-ের মূল পরিকল্পনকারী দলনেতা হচ্ছে মাসুম। এই মাসুমই জিকরুল্লাহ, আরিফ ও পালিয়ে যাওয়া তাহেরকে খুনের জন্য সংগঠিত করে। তবে মাসুম কে সেই সম্পর্কে মুখ খোলেনি গ্রেফতারকৃত খুনীরা। এমনকি খুনে সরাসরি অংশগ্রহণকারী পালিয়ে যাওয়া তাহের কে, কি তার পরিচয় তাও জানায়নি তারা। এখনও পর্যন্ত খুনীদের পরিচয় শুধু মাদ্রাসার ছাত্রতে সীমাবদ্ধ থাকলেও তারা যে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গী সংগঠনের সদস্য তাতে বিন্দুমাত্র কোন সন্দেহ নেই বলে জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তারা। খুনীরা সম্ভবত আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সিøপার সেলের সদস্য বলে মনে করা হচ্ছে। তারা একে অপরকে চিনে না বা চিনতে দেয়া হয় না। এ জন্য খুনের প্রকৃত পরিকল্পনাকারী দল নেতা মাসুমের প্রকৃত পরিচয় সম্পর্কে এখনও পর্যন্ত জানতে পারেনি পুলিশ কর্মকর্তারা।

ছোপ ছোপ রক্তের দাগ॥ ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেছে, প্রখর রৌদ্রের তাপে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ জমাট বেঁধে শুকিয়ে আছে। দেয়াল ঘেঁষা কুপিয়ে হত্যার রক্তমাখা স্থানটিতে কাদা মাটি স্তূপাকার করে ফেলে রাখা হয়েছে। পথচারী যারা যাচ্ছে তারাই একনজর এই জায়গাটিকে এক নজর দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে যাচ্ছেন। কিন্তু কেউ সাহস করে ওয়াশিকুর কোন বাড়িতে থাকতেন, চিনতেন কিনা, হত্যাকা-ের ঘটনা ইত্যাদি বিষয়ে মুখ খুলতে চাননি ভয়ে। তেজগাঁও সাতরাস্তা থেকে পূর্ব দিকের ২০০ গজ দূরে মধ্য বেগুনবাড়ির অবস্থিত পাঁচ তলা বিসমিল্লাহ মঞ্জিল নামের বাড়ি ও আশপাশের এক সরু গলির রাস্তায় জটলা বাধা লোকজন ভিড় করে আছে। বিসমিল্লাহ মঞ্জিল ভবনেই ওয়াশিকুর ও তার বাবা টিপু সুলতান দুজনে মিলে ৬ হাজার টাকায় এক কক্ষের সাব লেট বাসায় থাকতেন। যে ফ্ল্যাটটিতে সাবলেট নিয়ে থাকতেন সেটির পুরো ভাড়া ১৬ হাজার টাকা। বাবা টিপু সুলতান খুব ভোরে বাসা থেকে বের হয়ে যেতেন আর ফিরতেন রাতের বেলায়। আর ওয়াশিকুর রহমান বাবু সকাল প্রায় নয়টা-সাড়ে নয়টায় বাসা থেকে বের হতেন আর ফিরতেন রাতের বেলায়। তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকায় ওয়াশিকুর ছোটবেলা থেকে বড় হলেও কারও সঙ্গে তেমন একটা মিশতেন না। কথা বলতেন খুবই কম। সারাক্ষণ ল্যাপটপ নিয়ে থাকতেন। ল্যাপটপে কী করতেন কেউ জানত না। ওয়াশিকুর যে একজন ব্লগার এলাকার কেউ জানা তো দূরের কথা তাঁকে ভালমতো চিনতেনই না। গ্র্যাজুয়েশন করার পর মাস্টার্স করার জন্য ভর্তি হয়েছিলেন তেজগাঁও কলেজে। ২৭ বছর বয়সী ওয়াশিকুরের গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে। সোমবার সকালে গ্রামের বাড়ি চলে যান নিহত ওয়াশিকুরের বাবা টিপু সুলতান। ছেলের খুনের ঘটনার খবর পেয়ে আবার সোমবারই ঢাকায় ফিরে এসেছেন বলে জানা গেছে।

অভিজিত হত্যার জট খোলেনি ॥ এক মাস পার হলেও লেখক-ব্লগার অভিজিত রায় হত্যা মামলার জট খোলেনি এখনও। মামলার তদন্ত নিয়ে অনেকটাই অন্ধকারে পুলিশ। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি বইমেলা থেকে ফেরার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার টিএসসি সংলগ্ন এলাকায় খুন হন মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা ও বিজ্ঞান লেখক অভিজিত রায়। এ ঘটনায় তাঁর স্ত্রী বন্যাও মারাত্মক আহত হন। মার্কিন নাগরিক অভিজিত হত্যাকা- বিশ্ব মিডিয়ায় আলোড়ন সৃষ্টি করে। এরপর মার্কিন সরকার এ হত্যাকা- তদন্তে সহযোগিতার প্রস্তাব দেয়ার পর সরকার রাজি হলে এফবিআইয়ের কয়েকজন সদস্য হত্যাকা-ের স্থানসহ বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বইমেলাস্থল পরিদর্শন করেন। গত ২ মার্চ ফেসবুকে অভিজত রায়কে হত্যার হুমকি দিয়ে আসা ছাত্রশিবিরের সাবেক নেতা ফারাবি শফিউর রহমানকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করে র‌্যাব। এরপর অভিজিতের বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. অজয় রায় এ হত্যাকা-ে বুয়েটের এক শিক্ষককে সন্দেহ করেন। গত ২৪ মার্চ ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী নামে বুয়েটের ওই শিক্ষককে জিজ্ঞাসাবাদ করে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইটে অভিজিতকে যারা হত্যার হুমকি দিয়েছিল, তাদের ১০ জনের একটি তালিকা পুলিশের হাতে রয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্মকমিশনার মনিরুল ইসলাম। এরই মধ্যে প্রকাশ্য দিবালোকে খুন হলেন আরেক ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবু।

পুলিশ প্রতিবেদনে সমন্বয়ে ঘাটতি ছিল ॥ অভিজিত হত্যাকা-ের সময়টাতে কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যদের কাজে সমন্বয়ের ঘাটতি ছিল বলে পুলিশ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ কথা বলেছেন ঢাকা গোয়েন্দা পুলিশের মুখপাত্র মনিরুল ইসলাম। পুলিশ প্রতিবেদনে সুনির্দিষ্টভাবে কোন পুলিশ সদস্যের অবহেলার কথা বলা হয়নি। তবে সেদিন ওই এলাকায় পুলিশের তদারকি ও কাজে সমন্বয়ের অভাবের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে বলে জানান তিনি। বইমেলার জন্য নিরাপত্তার কড়াকড়ির মধ্যে অভিজিত হত্যাকা- এবং পরবর্তী সময়ে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর তা তদন্তের উদ্যোগ নেয় পুলিশ। পুলিশের গাফিলতি না থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, ঘটনাটি যেখানে ঘটেছিল, তার থেকে প্রায় আড়াই শ’ ফুট দূরে ছিল পুলিশের একটি চেকপোস্ট, যেখানে ঘটনাটি ঘটেছিল তার আশপাশে প্রচুর যান চলাচল করছিল। জায়গাটিও ছিল অন্ধকার। পুলিশের চেকপোস্ট থেকে হামলার জায়গাটি ছিল আড়ালে। পুলিশের তিন সদস্যের কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন এক সপ্তাহ আগে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারের কাছে জমা পড়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তারা।

যা বলেছেন পুলিশ কর্মকর্তারা ॥ তেজগাঁও জোনের উপ-কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার আটককৃত জিকরুল্লাহ ও আরিফকে জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ধর্মীয় মতাদর্শের কারণে ওয়াশিকুরকে হত্যা করা হয়েছে বলে আটককৃতরা স্বীকার করেছে। তাদের হুজুর জানিয়েছেন, ওয়াশিকুর রহমান ধর্মের বিরুদ্ধে ব্লগে লেখালেখি করেন। আর এ কারণে তাঁকে হত্যা করা ইমানী দায়িত্ব। আর এ দায়িত্ব পড়ে তাদের ওপর। কারা হত্যার নির্দেশদাতা, তারা কোন ধর্মীয় উগ্রবাদী সংগঠন কিনা, এ বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছুই বলেননি ডিসি বিপ্লব কুমার সরকার।

ডিএমপির ডিসি মোঃ মাসুদুর রহমান বলেছেন, সর্বশেষ লেখক-ব্লগার অভিজিত, চ্যানেল আইয়ের জনপ্রিয় ইসলামী অনুষ্ঠান উপস্থাপক মাওলানা নুরুল ইসলাম ফারুকী, লুৎফর রহমান, ব্লগার রাজীবসহ বেশকিছু হত্যাকা-ের ঘটনা একই ধরনের হওয়ায় আটককৃতদের কাছ থেকে এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। যেহেতু তারা হাতেনাতে ধরা পড়েছে, এমনকি যে চাপাতি দিয়ে হত্যা করা হয়েছে সেই রক্তমাখা চাপাতিও উদ্ধার হয়েছে, সেহেতু এ মামলাসহ কারা এসব ধারাবাহিক হত্যাকা- ঘটাচ্ছে সেসব বিষয়েও বিশদ তথ্য পাওয়া যাবে। তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার ওসি সালাহ উদ্দীন আহমেদ জানান, এ ঘটনায় এখনও মামলা হয়নি। নিহতের পরিবারের লোকজন থানায় এলে হত্যা মামলা দায়ের করা হবে।

গণজাগরণ মঞ্চ ॥ ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবু হত্যার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে গণজাগরণ মঞ্চ। সোমবার দুপুরে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার বলেন, মৌলবাদী সন্ত্রাসীদের হাতে বিজ্ঞানী ও ব্লগার ড. অভিজিত রায় নৃশংসভাবে খুন হওয়ার পর এক মাসের বেশি সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত তাঁর খুনীদের গ্রেফতারে কোন অগ্রগতিই নেই। বিচারহীনতার এই নির্লজ্জ সংস্কৃতির মধ্যে আজ খুন হলেন আরেকজন প্রগতিশীল ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবু। ওয়াশিকুরের এই নৃশংস হত্যাকা-ের প্রতিবাদে তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ হিসেবে সোমবার বিকেল ৫টায় শাহবাগ প্রজন্ম চত্বর থেকে বিক্ষোভ মিছিল করে গণজাগরণ মঞ্চ।

প্রকাশিত : ৩১ মার্চ ২০১৫

৩১/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: