কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

উনি ছেড়ে দিয়ে তেড়ে ধরতে চান

প্রকাশিত : ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • ওয়াহিদ নবি

স্বামী কর্তৃক আবিষ্কৃত একটি জাতীয়তাবাদের উত্তরাধিকারিণী বেগম জিয়া একুশের প্রভাতে শহীদ স্মৃতিমিনারে এলেন না। আমরা জানি না কেন তিনি আসেননি। না আসার কোন কারণ অবশ্য থাকতে পারে না। আমরা শুধু জানতে উৎসুক কি অজুহাতে তিনি আসেননি। তিনি বা তাঁর অনুসারীরা কি অজুহাত আবিষ্কার করেন সেটা জানার আগ্রহ রইল। না আসার ব্যাপারটা অবশ্য তাঁর অনুশীলন করা আছে। সংসদে আসা তাঁর কর্তব্য ছিল কিন্তু তিনি আসতেন না। সংসদে না আসতে আসতে একদিন তাঁর সংসদে আসার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেল। অবশ্য এই প্রয়োজন ফুরাবার ব্যাপারটার আয়োজন তিনি নিজেই করলেন। এই আয়োজনটির ব্যবস্থাপনার সমস্ত কৃতিত্ব তাঁর নিজের। এই কৃতিত্বের অংশীদার আর কেউ হতে পারেন না।

তিনি ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদের নির্বাচন বর্জন করলেন। তিনি বর্জন করলেন এজন্য যে তাঁর মর্জিমাফিক পদ্ধতিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে ক্ষমতাসীন সরকার রাজি হয়নি। তিনি দাবি করলেন নির্বাচন একটি অনির্বাচিত সরকারের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত হতে হবে। নিরপেক্ষতার দাবিদার একটি দৈনিক একটি জরিপ কাজের আয়োজন করে দাবি করল যে, অধিকাংশ জনগণ অনির্বাচিত সরকারের অধীনে নির্বাচন চায়। কিন্তু জরিপ কাজের পদ্ধতি ছিল ভুল। এই ভুলগুলো একটি বহুল প্রচারিত দৈনিকে প্রকাশিত হয়। বেগম জিয়ার অনুসারীরা দাবি করল যে, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ অনির্বাচিত সরকারের অধীনে নির্বাচন দাবি করে আন্দোলন করেছিল। এই দাবিদাররা যে বিষয়টি বুঝতে পারেননি সেটি হচ্ছে, ১৯৯৬ সাল আর ২০১৪ সালের ভেতরে ১৮ বছরের পার্থক্য। এই ১৮ বছরে মেঘনার অনেক পানি বঙ্গোপসাগরে মিশেছে। ১৯৯৬ সালে যে কারণে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দাবি করেছিল আওয়ামী লীগ সেই কারণগুলো ২০১৪ সালে ছিল না। মাগুরা নির্বাচনের মতো কোন ঘটনা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ঘটেনি। যে নির্বাচনগুলো অনুষ্ঠিত হয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে সেগুলোতে কারচুপি ঘটেছে এমন দাবি বিএনপি করেনি। কিন্তু তারা বলল, ঐ নির্বাচনগুলো ছিল স্থানীয় নির্বাচন। জাতীয় নির্বাচনে কারচুপি ঘটবে। অর্থাৎ তারা যা করেছে তাদের প্রতিপক্ষ তাই করবে। কি আর বলা যাবে! ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জিতেছিল সেটা নাকি সরকারের কারসাজিতে। কিন্তু সরকার ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার। তাহলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবির যৌক্তিকতা কোথায়? তারা বলল, অন্যান্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ভাল ছিল। শুধু ২০০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ভাল ছিল না। তা হলে দেখা যাক ঐ সরকারটির দিকে। তত্ত্ব¡াবধায়ক সরকারের উদ্দিন-ত্রয়ীর কথা ভাবা যাক। সরকার প্রধান ফখরুদ্দীনকে বিশ্বব্যাংক থেকে নিয়ে এসে স্টেট ব্যাংকের প্রধান করেছিলেন সাইফুদ্দিন সাহেব। ইয়াজউদ্দিন সাহেবকে পুরস্কৃত করেছিলেন বেগম জিয়া রাষ্ট্রপতির পদটি দিয়ে। আর জে. মইনউদ্দিনকে তাঁর আনুগত্যের জন্য প্রমোশন দেয়া হয়েছিল অন্যদের ডিঙ্গিয়ে। এর পরে সেই তত্ত্ব¡াবধায়ক সরকারের বিরুদ্ধে নালিশ ধোপে টিকে না।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রথা যে একটা নিখুঁত প্রথা সেটা প্রমাণিত হয়নি। লতিফুর রহমান আর অবসর প্রাপ্তির বয়স বাড়ানোর বিষয়টি কেউ পছন্দ করেনি। ফখরুদ্দীন সরকার নিজের ইছামতো দু’বছর ক্ষমতা আঁকড়ে থাকল গায়ের জোরে। তত্ত্ব¡াবধায়ক সরকারের কাজ সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা। আর সরকারের দৈনন্দিন কাজ চালিয়ে যাওয়া। আর ফখরুদ্দীন সরকার এমন কাজ নেই যা করেনি। তারা দুই নেত্রীসহ হাজার হাজার মানুষকে গ্রেফতার করে। জিজ্ঞাসাবাদের নামে দৈহিক নির্যাতন করে। বেশ কয়েকজন মারা যায় জিজ্ঞাসাবাদের সময়। ব্যাংক ভবনের মৃতদেহগুলোর স্মৃতি তত্ত্ব¡াবধ্যক সরকারের কথা আমাদের মনে করিয়ে দেবে।

বেগম জিয়া আন্দোলন শুরু করলেন ২০১৩ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবিতে। মনে হয় তাঁর স্মৃতিপটে জাগরূক ছিল ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের সাফল্যের কথা। কিন্তু অন্য বহু কিছু যে অন্য রকম সে কথা তিনি চিন্তা করলেন না। তিনি বুঝলেন যে তাঁর আন্দোলনের সমর্থনে জনগণ এগিয়ে আসেনি। কেন তারা আসেনি এর বিশ্লেষণ করার মতো রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা বা প্রজ্ঞা তাঁর ছিল না। তাঁর স্তাবকরা তাঁকে তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ইত্যাদি বলে আকাশে তুলে দিয়েছেন। আর ‘ম্যাদাম’ সম্ভাষণ? কর্তৃস্থানীয়দের তাঁর অধীনস্থরা ম্যাডাম বলে ডাকে। সমান স্তরে কাউকে কেউ ম্যাদাম বলে সম্ভাষণ করে না। কোন গণতান্ত্রিক দলে এই জাতীয় সম্ভাষণ দুঃখজনক। এই সমস্ত কারণে তাঁকে সঠিক পরামর্শ দেওয়ার কেউ আছেন বলে মনে হয় না। যাই হোক যখন দেখা গেল যে তাঁর আন্দোলনে জনগণ অংশ নিচ্ছে না তখন সমস্ত ব্যাপারটি বিশ্লেষণ করা উচিত ছিল। কিন্তু তা হলো না। একগুঁয়েমির সঙ্গে আন্দোলন চালানো হলো। স্বাভাবিকভাবেই হিংসাত্মক রূপ নিল আন্দোলন। এখানে স্বভাবতই মনে আসে একটা কথা আর সেটি হচ্ছে দলের অভিজ্ঞ নেতারা কি এসব বুঝতে পারছিলেন না? আমরা এ প্রশ্নের উত্তর জানি না। তবে মনে হয় ম্যাদাম ইত্যাদি কালচারের দ্বারা এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল যে অন্য নেতারা তাঁকে সেইসব কথাই বলতেন যা তিনি শুনতে চাইতেন। নইলে নেতাদের বিতাড়িত হতে হতো। আর একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ কথা দেশবাসীর মনে জাগে সেটি হচ্ছে বিএনপিতে আছেন কারা? এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। আছেন মুসলিম লীগ আর ভাসানী ন্যাপ থেকে আসা নেতারা। এই দুটি দলের অতীত কার্যকলাপের কথা মনে করতে হবে। আছেন কিছু একাডেমিক যাঁদের কেউ কেউ জাতির ইতিহাস বিকৃতভাবে পাঠ্যপুস্তকের অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করেছিলেন। আছেন কিছু অবসরপ্রাপ্ত আমলা যাদের একজন ’৬৯-এর আন্দোলনের সময় সামরিক কর্তাদের খুশি করার জন্য ১৪৪ ধারার অপপ্রয়োগ করে একজনের বেশি ব্যক্তির একত্রিত হওয়াকে বেআইনী ঘোষণা করেছিলেন। আছেন কিছু অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মচারী যাঁদের কীর্তিকলাপের জন্য দলের লোকেরাই তাঁদের লাঞ্ছিত করেছিল। তারেক ইব্রাহিমের ভাষায়, বিএনপিতে সমবেত হয়েছিল ‘কিছু দলছুট, পেশাছুট আর আদর্শ ছুট ব্যক্তিরা। এঁদের মিল কোথায় ? সম্ভবত আওয়ামী বিরোধিতা আর ভারতবিরোধিতা। আর একটি মিল রয়েছে আর সেটি হচ্ছে জিয়াউর রহমানের ‘পারসোনালিটি কাল্ট।’ আওয়ামী লীগ তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী কিন্তু বঙ্গবন্ধুর কোন প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। জিয়াউর রহমানকে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী বানাবার চেষ্টা করা হলো। ‘স্বাধীনতার ঘোষক’? ধোপে টিকে কি? ছেঁড়া গেঞ্জি আর ভাঙ্গা বাক্স? বিদেশ থেকে আমদানি করা দামী বুট জুতো আর কালো চশমার সঙ্গে খাপ খায় না।

যাই হোক, ২০১৩-১৪ সালের হিংসাত্মক আন্দোলনে প্রাণ হারায় ৫ শতাধিক নিরীহ মানুষ। আহত হয় অসংখ্য মানুষ। বাস পুড়ানো আর গাছ কাটার ধুম পড়ে যায়। দেশের সীমাহীন অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। বিদ্যাশিক্ষা রসাতলে যায়। এসবের বিশদ বিবরণ জনকণ্ঠের ২০১৪ সালের ১৩ নবেম্বর সংখ্যার সম্পাদকীয়তে লিপিবদ্ধ করেছেন স্বদেশ রায় ।

মনে হয় ২০১৩-১৪ সালের ঘটনা থেকে তেমন কিছু শিক্ষালাভ করেনি বিএনপি। তাই নির্বাচন বর্জন করে আবার নির্বাচন লাভের জন্য তারা একই পথ অনুসরণ করছে। কিন্তু জনগণ আর সরকার ঠেকে শিখেছে। নাশকতার দ্বিতীয় পর্বে তাই দেখছি জনগণ প্রতিরোধ করতে শুরু করেছে। ‘ইট ছুড়লে পাটকেল খেতে হয়’ এই সোজা কথাত আমাদের এক শ্রেণীর মানুষ যাদের ‘সুশীল’ বলা হয় তাঁরা শিখেননি। রক্তক্ষয়ী ধ্বংসাত্মক কাজ সরকারকে বন্ধ করতেই হবে আর তা যেমন করেই হোক।

লেখক : রয়াল কলেজ অব সাইকিয়াট্রিস্টের একজন ফেলো

প্রকাশিত : ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

২৫/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: