কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

সরেজমিন নীলফামারী ॥ সহিংসতা চান না বিএনপি নেতারাও

প্রকাশিত : ৮ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • জ্বালাও-পোড়াওয়ের আরও খবর পৃষ্ঠা-১৫
  • নাশকতায় গ্রেফতারকৃতদের অধিকাংশই জামিনে মুক্ত

রাজন ভট্টাচার্য /তাহমিন হক ববি ॥ রাজনৈতিক কর্মসূচীর নামে হত্যা ও সহিসংতা চান না নীলফামারীর বিএনপি নেতাকর্মীরা। কে শোনে কার কথা। ২০ দলের লাগাতার অবরোধ ও হরতালের ফাঁদে জেলার প্রায় প্রতিটি সেক্টরে বিষেরবাঁশী বেজে উঠেছে। কৃষিপণ্যের দামে মারাত্মকভাবে ধস নেমেছে। তবে স্বাভাবিক হতে চলেছে গণপরিবহন চলাচল। পোল্ট্রি শিল্প, কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম। কাঁচামাল সঙ্কটে ইতোমধ্যে জেলার সৈয়দপুর বিসিক শিল্পনগরীর ৪ টি শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। পেট্রোলবোমায় দগ্ধ হয়ে প্রাণ হারিয়েছে আবদুল মালেক (৫৫) নামের এক বিএনপি নেতার পিতা। নাশকতার আশঙ্কায় পুলিশ এ পর্যন্ত জামায়াত ও বিএনপির ৬০ জনকে গ্রেফতার করেছে। জেলা প্রশাসন ও বিজিবি, পুলিশ ও র‌্যাবের কঠোর পদক্ষেপে সন্ত্রাসী তৎপরতা তুলনামূলক কম।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে, জেলা প্রশাসক জাকীর হোসেন জনকণ্ঠকে বলেন, জেলার জীবনযাত্রার মান স্বাভাবিক রাখতে জেলা প্রশাসন, পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাব ও আনসার সদস্যরা সম্মিলিতভাবে জনগণের সহায়তায় তৎপর রয়েছে। পুলিশ সুপার জোবায়েদুর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, প্রতিটি সেক্টরের প্রতিনিধিদের নিয়ে সভা করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা এবং স্থানীয় জনগণের সহায়তায় পরিস্থিতি এখন পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণে।

পেট্রোলবোমায় নিহত মালেক ॥ জাতীয়তাবাদী মৎস্যদলের সভাপতি আব্দুল মতিন। ইউনিয়নের সহাদেব বড়গাছা বানিয়াপাড়া গ্রামে তার বাড়ির চারপাশজুড়ে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের ছবিসহ পোস্টারে ভরে রয়েছে। মনেপ্রাণে বিএনপির রাজনীতি মতিনের অন্তরে। আজ সেই মতিন বিএনপির সহিংসতা কর্মকা- প্রত্যাখ্যান করেছেন। আব্দুল মতিন বলেন, আমি বিএনপি করি, কিন্তু এই সহিংসতার রাজনীতি আমি চাই না। আজ এই সহিংসতার রাজনীতিতে আমি আমার পিতাকে হারিয়েছি পেট্রোলবোমায়। লাগাতার অবরোধে অবরোধকারী সমর্থকদের ছোড়া পেট্রোলবোমায় দগ্ধ হবার ৬ দিন পর মারা যায় ট্রাকের যাত্রী আবদুল মালেক (৫৫)। তিনি এই গ্রামের বাসিন্দা এবং বিএনপি নেতা মতিনের জন্মদাতা পিতা। তার মেজ ছেলে আব্দুল মতিন ইউনিয়ন মৎস্যজীবী দলের সভাপতি । আব্দুল মতিন কান্নাজরিত কণ্ঠে বলেন, আমি বিএনপির রাজনীতি করে দলের ডাকা লাগাতার অবরোধে উপহার হিসাবে পিতার লাশ পেয়েছি। নিহতের বড় মেয়ে মাজেদা খাতুন (৩০) ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, দুই নেত্রী ঠিকই থাকবে, আমরা বাবা হারাব, ভাই হারাব, স্বামী হারাব, স্বজন হারাব; এমন রাজনীতি আমরা দেখতে চাই না।

নাশকতার অগ্নিকা- ॥ সৈয়দপুর রেলওয়ে বাজার পৌর কাপড় মার্কেট ও মনিহারিপট্টিতে সংঘটিত অগ্নিকা-ের তদন্ত শুরু হয়েছে। রহস্যজনক এ অগ্নিকা-ের কারণ উদ্ঘাটনে নীলফামারী জেলা প্রশাসনের গঠিত তিন সদস্যের কমিটির সদস্যরা তদন্ত করছেন। কমিটির প্রধান নীলফামারীর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) লিয়াকত আলীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের কমিটির অপর দুই সদস্য হলেনÑসৈয়দপুর সার্কেলের জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) এ এন এম সাজেদুর রহমান ও সৈয়দপুর বণিক সমিতির সভাপতি মোঃ ইদ্রিস আলী। তদন্ত কমিটির প্রধান নীলফামারীর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) মোঃ লিয়াকত হোসেন জানান, সোমবার থেকে তাদের এ তদন্ত কাজ শুরু হলো। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তদন্ত রিপোর্ট নীলফামারী জেলা প্রশাসক বরাবরে দাখিল করা হবে।

গত ২৬ ও ২৭ জানুয়ারি দিবাগত গভীর রাতে সৈয়দপুর শহরের রেলওয়ে বাজার পৌর কাপড় মার্কেট ও মনিহারিপট্টিতে পৃথক পৃথকভাবে ভয়াবহ অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটে। এতে ওই কাপড় মার্কেট ও মনিহারিপট্টির দুই শতাধিক দোকানপাটসহ মালামাল সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক এক শ’ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী এ অগ্নিকা-কে পরিকল্পিত নাশকতা বলে দাবি করেন। পাশাপাশি নীলফামারী ৪ (সৈয়দপুর আংশিক কিশোরীগঞ্জ) আসনের জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য বিরোধীদলীয় হুইপ পর পর দুই রাতে এই অগ্নিকা-ের ঘটনাকে বিএনপি- জামায়াতের নাশকতা বলে অভিযোগ তুলেন। তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, বিষয়টি আমি সরেজমিনে ঘুরে দেখেছি এবং তা সংসদে তুলে ধরেছি। এদিকে অগ্নিকা-ের ঘটনাটি নাশকতা নয় দাবি করে গত ৩০ জানুয়ারি সৈয়দপুর রাজনৈতিক জেলা বিএনপির সভাপতি অধ্যক্ষ আলহাজ আব্দুল গফুর, সাধারণ সম্পাদক আমজাদ হোসেন সরকার সৈয়দপুর দলীয় কার্যালয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করেন। তারা বলেন, বিএনপিকে ফাঁসাতে এটি ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে।

আলু নিয়ে বিপাকে কৃষক ॥ জেলায় আলুর বা¤পার ফলন হয়েছে। কিন্তু অবরোধ আর হরতালে বাজারে দাম না থাকায় আলু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষক। গত বছরও একই কারণে তাদের আলুতে লোকসান গুনতে হয়। জেলার কিশোরীগঞ্জ উপজেলা হলো আগাম আলু উৎপাদনের দিক থেকে দেশের সূতিকাগার। অবরোধের আগে একবিঘা জমির আলু বিক্রি করে উৎপাদন খরচের দ্বিগুণ লাভ করেছে আলু চাষীরা। অবরোধের কারণে ঢাকা,চট্টগ্রাম, কুমিল্লা থেকে আলু ব্যবসায়ীরা আসছে না। ফলে এখানকার আলু চাষীরা এখন উৎপাদন খরচও তুলতে পারছে না।। আলুর দাম তলানীতে। আলু চাষীরা বলছেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে তারা আলুতে প্রায় ১ কোটি টাকা লোকসান গুনছেন। অপরদিকে জেলার অন্যান্য সবজি যেমন ফুলকপি,পাতাকপি,টমেটো, বেগুন,কাঁচামরিচ পানির দামে বিক্রি হচ্ছে।

পোল্ট্রি শিল্পে ধ্বস ॥ জেলায় প্রায় আড়াই শ’ পোল্ট্রি খামার রয়েছে। এসব খামারে বাচ্চা উৎপাদন থেকে ডিম বাজারজাতকরণ করা যাচ্ছে না। অবরোধের কারণে উৎপাদিত মুরগির বাচ্চা বাজারজাত করতে না পারা এবং সেগুলো রক্ষণাবেক্ষণ কঠিন হয়ে পড়ায় সেই বাচ্চা ডাম্পিং করে মেরে ফেলতে হচ্ছে। ফলে এ খাতে এখন পর্যন্ত প্রায় দেড় কোটি টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে বলে জানালেন পোল্ট্রি মালিক আজগর আলী।

শিল্পকারখানা বন্ধ ॥ অবরোধে নীলফামারীর সৈয়দপুর বিসিক শিল্প নগরীর ৪৪টি শিল্পকারখানার মধ্যে ৪ টি শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। যেগুলো চালু রয়েছে তাও এক শিফটে নামমাত্রে চলছে। এতে বিসিকসহ অন্য শিল্প কারখানায় সব মিলিয়ে প্রায় দেড় হাজার শ্রমিক কর্মহীন হওয়ার পথে। সড়ক ও মহাসড়কে চলাচলকারী পণ্যবাহী ট্রাকে সহিংসতার কারণে শিল্পের কাঁচামাল আনতে পারছেন না মালিকরা। এর ফলে অধিকাংশ কারখানায় দুই শিফটের বদলে কাজ হচ্ছে এক শিফটে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় দৈনিক ক্ষতি হচ্ছে গড়ে ১৮ লাখ টাকারও বেশি।

নাশকতায় নীলফামারী ॥ ২০১৩ সালের ১২ডিসেম্বর যুদ্ধাপরাধ মামলায় আব্দুল কাদের মোল্লার মৃত্যুদ- কার্যকর হওয়ার পর নীলফামারীর টুপামারী, পলাশবাড়ি, লক্ষ¥ীচাপ ও রামগঞ্জে দোকানপাট ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ ও হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে হামলা চালায় জামায়াত-শিবির। জামায়াতের তা-বে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো ওই বছরের ১৪ ডিসেম্বর পরিদর্শন শেষে টুপামারীর রামগঞ্জে জামায়াত, শিবির ও বিএনপি কর্মীরা হামলা চালায় সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নুর এমপির গাড়ি বহরে। এ ঘটনায় একাধিক মামলায় হয়। প্রতিটি মামলায় জামায়াত, শিবির ও বিএনপির নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়। এ ব্যাপারে নীলফামারী সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ শাহজাহান পাশা বলেন, ওই ঘটনায় দুইটি মামলা হয়েছে, ওই দুই মামলার তিনজন আসামি মারা গেছে, গ্রেফতার হয়েছে ৬০জন। তদন্ত এখন শেষ পর্যায়ে, শীঘ্রই মামলার অভিযোগপত্র (চার্জশীট) আদালতে দাখিল করা হবে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নীলফামারী সদর থানার উপ-পরিদর্শক মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন দুটি মামলাকে একত্র করেই তদন্ত শেষ করা হয়েছে। শীঘ্রই মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশীট প্রদান করা হবে।এদিকে এসব মামলার গ্রেফতারকৃত অধিকাংশ আসামি উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেয়ে এখন ঘুরে বেড়াচ্ছেন বলে অভিযোগ নিহতের পরিবারের স্বজনদের।

অপরদিকে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের নীলফামারীর ডোমার, ডিমলা ও জলঢাকা উপজেলায় ভোটকেন্দ্রে হামলায় ৩০টি মামলা হয়েছে। এসব মালায় পুলিশ প্রায় আড়াই শ’ জনকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতাকৃত জামায়াত-বিএনপির আসামিরা একে একে উচ্চ আদালত হতে জামিন নিয়ে রয়েছেন। এসব মামলার এখনও অভিযোগপত্র আদালতে জমা দিতে পারেনি পুলিশ।

নীলফামারী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি দেওয়ান কামাল আহমেদ বলেন, হরতাল-অবরোধের নামে চলমান নৈরাজ্য রোধে নীলফামারীর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। এ জন্য দলের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি এলাকার সাধারণ জনগণের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রম চলছে। নীলফামারী জেলা সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের সভাপতি শাহজাহান আলী জানান, নীলফামারী জেলার ১৯টি রুটে ৬ জানুয়ারি থেকে গণপরিবহন নিরাপত্তাহীনতার কারণে চলাচল বন্ধ ছিল। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা বিধানের আশ্বাস দেয়ার পর বাসের মালিকরা রাস্তায় কিছুদিন থেকে গাড়ি নামাচ্ছেন। জেলা পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আখতার হোসেন বাদল জানান, জেলার সব রুটে গণপরিবহন আবার চালু করা হয়েছে। তিনি জানান, এ পর্যন্ত এ জেলার মধ্যে কোন যানবাহনে নাশকতার ঘটনা ঘটেনি। নীলফামারী চেম্বারের সভাপতি এসএম সফিকুল ইসলাম ডাবলু বলেন, বর্তমানে নীলফামারী জেলায় সহিংসতা না থাকলেও অবরোধ আর হরতালে শিল্পকখানাসহ সকল ব্যবসা সেক্টর বন্ধ হয়ে গেছে। কয়েক কোটি টাকা লোকসানে আমাদের ব্যবসায়ীরা; যা অর্থনৈতিকভাবে আমাদের বিষেরবাঁশী বেজে উঠেছে।

প্রকাশিত : ৮ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

০৮/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: