কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

সাতক্ষীরায় স্কুলফিডিং কার্যক্রমে সাড়া, সঙ্কট বিশুদ্ধ পানির

প্রকাশিত : ৭ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • উপস্থিতির হার বেড়েছে ১৫ ভাগ

মিজানুর রহমান, সাতক্ষীরা ॥ স্বল্পমেয়াদী ক্ষুধা নিবারণ করে পুষ্টিহীনতা কমাতে সাতক্ষীরায় স্কুলফিডিং কার্যক্রমে সাড়া মিলেছে। পুষ্টিহীনতা কমিয়ে ছাত্রছাত্রীদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি এবং তাদের শিক্ষা গ্রহণের ক্ষমতা বৃদ্ধি করার লক্ষ্য নিয়ে এই প্রকল্প চালু করা হয়। ডব্লিউএফপির অর্থায়নে চালু হওয়া এই কার্যক্রমে জেলার ৫টি উপজেলার দেড় লাখ ছাত্রছাত্রীকে এই প্রকল্পের আওতায় নেয়া হয়েছে। তবে প্রকল্পভুক্ত বেশিরভাগ স্কুলে বিশুদ্ধ খাবার পানি সরবরাহের ব্যবস্থা নেই। সরবরাহ করা পুষ্টিকর বি¯ু‹টের সঙ্গে বেশি পরিমাণ পানি খাওয়ার পরামর্শ দেয়া হলেও প্রকল্পভুক্ত বেশিরভাগ স্কুলগুলোতে থাকা নলকূপের পানি লবণাক্ত ও আর্সেনিক যুক্ত। প্রকল্পভুক্ত শিক্ষার্থীদের বিশুদ্ধ খাবার পানি নিশ্চিত করা এই প্রকল্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা। গত ডিসেম্বরে শেষ হওয়া স্কুলফিডিং প্রকল্প চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে সরকারী অর্থায়নে নতুন করে শুরু হচ্ছে। ৫ম শ্রেণীর ছাত্রী সাথী পারভীন। আশাশুনি উপজেলার কোলা গ্রামের দিনমজুর এখলাস উদ্দিনের বড় মেয়ে। তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ার সময় অভাবের কারণে তার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। পরিবারের ৫ সদস্যের সবাইকে বেশিরভাগ দিন সকালে না খেয়েই থাকতে হয়। ঘুম থেকে উঠেই কাজের জন্য মা চলে যায় অন্যের বাড়িতে। স্কুলে খাবার দেয়া হচ্ছে এই খবর দিয়ে স্কুলের শিক্ষক সাথীর মাকে মেয়েকে পুনরায় স্কুলে পাঠানোর জন্য পরামর্শ দেন। সাথী জনায়, স্কুলে দেয়া এনার্জি বিস্কুট খেয়ে সে এখন সকালের ক্ষুধা নিবারণ করছে। নিয়মিত বিস্কুট খাওয়ার এক মাসের মধ্যেই তার শারীরিক দুর্বলতা কেটে গেছে। মানসিক শক্তি বৃদ্ধি পেয়েছে। লেখাপড়ায় প্রতি আগ্রহ বেড়েছে। তবে খাওয়ার পানি সংগ্রহ করতে তাকে যেতে হয় ২ কিলোমিটার দূরের অন্য গ্রামে। স্কুলফিডিং কার্যক্রমের বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আশরাফ হোসেন জনকণ্ঠকে বলেন, পুষ্টিকর খাবার দেয়ায় শিক্ষার্থী শিশুদের পুষ্টির ঘাটতি পূরণ হচ্ছে। পাশাপাশি ঝরেপড়া কমে যাওয়াসহ স্কুলে উপস্থিতির হার প্রায় ১৫ ভাগ বেড়েছে। স্কুলগুলোতে বিশুদ্ধ খাবার পানির সঙ্কটের কথা স্বীকার করেন তিনি। পাশাপাশি জেলার অবশিষ্ট দুটি উপজেলায় স্কুলফিডিং কার্যক্রম চালু করা জরুরী বলে তিনি মনে করেন। স্কুলফিডিং কার্যক্রমে ব্যাপক সাড়া মেলার পাশাপাশি অপুষ্টি রোধে সফলতা মিললেও সাতক্ষীরা সদর ও দেবহাটা উপজেলাকে এই প্রকল্পভুক্ত করা হয়নি। এই দুটি উপজেলার ১শ’ ৭৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১৯ হাজার ৫শ’ শিক্ষার্থী স্কুলফিডিং কার্যক্রমের সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছে।

স্কুলফিডিং সুবিধা বঞ্চিত সাতক্ষীরা সদর উপজেলার লাবসা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যায়ের প্রথম শ্রেণীর ছাত্র কাদের। বাবা আবুল কালাম পেশায় একজন ভ্যানচালক। সংসারে ৪ ভাই বোনের মধ্যে সে তৃতীয়। অভাবের সংসারে পরিবারে তিন বেলা খাওয়া হয় না। মা সকালে চলে যায় অন্যের বাড়িতে কাজ করতে। সপ্তাহের বেশিরভাগ দিন কাদের না খেয়ে স্কুলে আসে। কাদেরের চোখে মুখে অপুষ্টি আর ক্লান্তির ছাপ। দুপুর সোয়া ১টা পর্যন্ত তাকে স্কুলে থাকতে হয়। স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা আছপিয়ারা খাতুন জনকণ্ঠকে বলেন, স্কুলের মোট ৩শ’ ৬৫জন ছাত্রছাত্রীর মধ্যে ১৫ থেকে ২০ ভাগ শিক্ষার্থী প্রতিদিন না খেয়ে স্কুলে আসে। বিডিএইচএস-এর তথ্যানুযায়ী সাতক্ষীরা জেলায় কমওজনের শিশু জন্মের হার শতকরা ৩৫ দশমিক ৫ ভাগ। অপুষ্টিজনিত কারণে খর্বাকৃতি শিশুর সংখ্যা ৩৪ দশমিক ১ ভাগ, খীনকায় এর সংখ্যা ১৪ দশমিক ৬ ভাগ এবং কম ওজনের শিশুর সংখ্যা ২৯ দশমিক ১ ভাগ। সরকারের প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের প্রকল্পে ডব্লিউএফপির অর্থায়নে সাতক্ষীরা জেলায় স্কুলফিডিং কার্যক্রম শুরু হয় ২০১১ সালে। তিনটি উদ্দেশ্য নিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে এই প্রকল্প চালু করা হয়। স্বল্পমেয়াদী ক্ষুধা নিবৃত্ত করা, পুষ্টিহীনতা কমিয়ে ছাত্রছাত্রীদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং তাদের শিক্ষা গ্রহণের ক্ষমতা বৃদ্ধি করাই এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য। এছাড়া ঝরেপড়ার হার কমিয়ে আনার বিষয়টি রয়েছে এই প্রকল্পের স্বল্পমেয়াদী উদ্দেশ্যের মধ্যে। দীর্ঘমেয়াদী উদ্দেশ্যের মধ্যে বিদ্যালয়গামী বয়সের শিশুদের মৌলিক শিক্ষা গ্রহণের ক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ডব্লিউএফপির স্কুলফিডিং কর্মসূচীর তথ্যানুযায়ী উপকূলীয় জেলাসমূহের খাদ্য সঙ্কট পূর্ণ এলাকার বসবাসরত শিশুরা অপুষ্টিতে ভুগছে। এ সকল অপুষ্টির শিকার শিশুরা শতকরা ৫৩ ভাগ লৌহ, ৪৩ ভাগ আয়োডিন, ২৫ ভাগ ভিটামিন এ’র অভাবে ভোগে। এই পুষ্টি ঘাটতির কারণে শিশুদের চিন্তা শক্তি বিকাশের অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। এ কারণে স্কুলে ঝরে পড়া শিশুর সংখ্যা বাড়তে থাকে।

সরকারের স্কুলফিডিং কার্যক্রমে স্কুলে উপস্থিত প্রতি ছাত্রছাত্রীকে প্রতিদিন ৭৫ গ্রাম করে হাই প্রোটিন বিস্কুট সরবরাহ করা হচ্ছে। সরবরাহ করা এই বিস্কুটে রয়েছে ভিটামিন এ, লৌহ, দস্তা, আয়োডিনসহ অন্যান্য পুষ্টি উপাদানসহ ১৪ প্রকার ভিটামিন। সূত্রমতে, প্রতিদিনের সরবরাহ করা বিস্কুটে ভিটামিন ও খনিজ লবণের চাহিদার শতকরা ৬৭ ভাগ পূরণ করে। এদিকে শিক্ষার্থীদের পুষ্টি সমৃদ্ধ এনার্জি বিস্কুট সরবরাহ করা হলেও ছাত্রছাত্রীদের বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা যাচ্ছে না। বেশিরভাগ স্কুলের নলকূপের পানিতে রয়েছে অতিরিক্ত লবণাক্ততা। পাশাপাশি অনেক নলকূপে রয়েছে আর্সেনিক। স্কুল সময়ের মধ্যে হাই এনার্জি বিস্কুট খাওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের স্কুলে প্রতিদিন কমপক্ষে আধা লিটার পানি আনতে পরামর্শ দেয়া হলেও দিনভর একজন শিক্ষার্থীর এই পানিতে চাহিদা মেটে না। প্রাথমিক বিদ্যালয়সমূহে বিশুদ্ধ ও বিপদমুক্ত খাবার পানির সংকটের কথা স্বীকার করে জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জনকণ্ঠকে বলেন, গত ২ বছরে প্রায় সাড়ে ৩শ’ স্কুলে নলকূপ বসানো হয়েছে। লবণাক্ততার কারণে এর মধ্যে ৫০টি নলকূপ সফল হয়নি। চলমান প্রকল্পে আরও ২শ’টি নলকূপ বসানোর প্রক্রিয়া চলছে। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা সুশীলন-এর কর্মসূচী ব্যবস্থাপক গোলাম মোস্তফা জনকণ্ঠকে বলেন, ডিসেম্বর ১৪ পর্যন্ত জেলায় ৭শ’ ৫৯টি স্কুলে এই কর্মসূচী বাস্তবায়ন করা হয়েছে। উপকার ভোগী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১ লাখ, ৫২ হাজার ৯শ’ ২১ জন। এর মধ্যে ৭০টি এনজিও পরিচালিত স্কুল ও ১৫টি ইবতেদায়ী মাদরাসা রয়েছে।

প্রকাশিত : ৭ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

০৭/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

দেশের খবর



ব্রেকিং নিউজ: