মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

রিকশা ও রিকশা ভ্যানের কথা

প্রকাশিত : ৭ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ২০১৩ সালে নমুনা জরিপের ভিত্তিতে বাংলাদেশে চলমান রিকশা ও রিকশা ভ্যান সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে। নমুনা জরিপে প্রাপ্ত এসব তথ্য-উপাত্তাদি পরিসংখ্যান ব্যুরো ২০১৪ সালের জুন মাসে প্রকাশ করে। জরিপে অনুসৃত সংজ্ঞা অনুযায়ী ব্যাটারিচালিত রিকশাকে অটো-রিকশা হিসেবে রিকশার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বলা হয়েছে, মোট রিকশার মধ্যে শতকরা ৫ ভাগ অটো-রিকশা। সম্প্রতি অটো-রিকশার চলাচল অজ্ঞাত কারণে স্থান বিশেষে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে বলে জানা গেছে। উত্তরবঙ্গে এসব অটো-রিকশার সংখ্যা আনুপাতিকভাবে বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। এসব অটো-রিকশা চীন থেকে বৈধ পথেই আমদানি হয় বলে জানা গেছে।

সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী ২০১১-২০১২ সালে দেশে ১১২০৪৮০ রিকশা এবং ২২৭২৪৬ রিকশা ভ্যান ছিল। সাম্প্রতিককালে এদের সংখ্যা বাড়ছিল বার্ষিক শতকরা ১.২ হারে। এই হিসাব অনুযায়ী ২০১৫ সালে দেশে চলমান রিকশার সংখ্যা দাঁড়ায় ১১৬১৩০৩। একই হিসাবে রিকশা ভ্যানের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৩৫৫২৩। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এক যুগের আগের তুলনায় যান্ত্রিক যানবাহন ক্রমাগতভাবে বাড়ার ফলে রিকশা ও রিকশা ভ্যানের বৃদ্ধি কমে এসেছে বলা চলে। জরিপে দেখা গেছে যে সারাদেশে সকল রিকশার মধ্যে মালিকচালিত রিকশা শতকরা ৪০ ভাগ এবং ভাড়ায় চালিত রিকশা শতকরা ৬০ ভাগ। রিকশা ভ্যানের ক্ষেত্রে মালিক চালিত শতকরা ৭৩ ভাগ এবং ভাড়ায় চালিত শতকরা ২৭ ভাগ। নগরাঞ্চলে সকল রিকশার প্রায় শতকরা ৩৬ ভাগ মালিক এবং শতকরা ৬৪ ভাগ ভাড়ায় চালিত। গ্রামাঞ্চলে মালিক ও ভাড়ায় চালিত রিকশার সংখ্যা প্রায় সমান সমান। নগরাঞ্চলে মালিকচালিত রিকশা ভ্যানের সংখ্যা প্রায় শতকরা ৭০ ভাগ এবং ভাড়ায় চালিত রিকশা ভ্যানের সংখ্যা শতকরা ২১ ভাগ। গ্রামাঞ্চলে মালিকচালিত রিকশা ভ্যানের সংখ্যা শতকরা ৭৯ ভাগ।

রিকশা ও রিকশা ভ্যানের মালিকানা ও চালনা-বিন্যাস ইঙ্গিত করে যে নগরাঞ্চলের রিকশা ও রিকশা ভ্যান চালকগণ সংখ্যাগরিষ্ঠ সংখ্যায় বহিরাগত ও ভূমিহীন এবং গ্রামাঞ্চলের রিকশা ভ্যান চালকগণ বেশি সংখ্যায় নিজেরা ভ্যানবাহিত ব্যবসায় রত আছেন। অধিকন্তু গ্রামাঞ্চলের রিকশা ও রিকশা ভ্যান চালকগণ ভূমির মালিকানার সঙ্গে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সম্পর্কবিহীন নন।

নগরাঞ্চলে অর্থাৎ সিটি কর্পোরেশন এবং প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর পৌরসভার আওতাধীন এলাকার প্রতিটি রিকশা ও রিকশা ভ্যানকে নির্ধারিত ফি দিয়ে নিবন্ধন করতে হয়। সিটি কর্পোরেশন এলাকার নিবন্ধনীয় রিকশা ও রিকশা ভ্যানের সংখ্যা লিখিত বা অলিখিতভাবে নির্ধারিত থাকায় নতুন মালিকরা নির্ধারিত সংখ্যার ওপর সহজে এবং যুক্তিসঙ্গত ব্যয়ে তাদের রিকশা বা রিকশা ভ্যান নিবন্ধিত করতে পারেন না। ফলত, এরূপ নগরাঞ্চলে রিকশা ও রিকশা ভ্যান নিবন্ধন করার প্রকৃত ব্যয় বিধি অনুসারে নির্ধারিত ব্যয়ের চাইতে তাৎপর্যমূলকভাবে বেশি বলে ধরে নেয়া সঙ্গত হবে। সম্ভবত এ জন্যই সিটি কর্পোরেশন এলাকায় নিবন্ধন বহির্ভূতভাবে বেশ সংখ্যক রিকশা ও রিকশা ভ্যান পরিচালিত হয়। এ সবকে মাঝে মাঝে পুলিশী অভিযানে জব্ধ করা হয় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট স্থানে একত্রিত করে প্রকৃতির হাতে তাদেরকে অযৌক্তিভাবে অবচয়িত করা হয়। জব্ধকৃত রিকশা ও রিকশা ভ্যান এবং এসবে অববায়িত দেশের মূলধন সামগ্রীর এ এক দৃশ্যমান অপব্যবহার। এ অপব্যবহার বন্ধকরণের লক্ষ্যে নিলামের মাধ্যমে নগরাঞ্চলে জব্ধকৃত অবৈধ রিকশা ও রিকশা ভ্যান গ্রামাঞ্চলে ব্যবহারের শর্তে ছেড়ে দেয়া যেতে পারে। নিলামে প্রাপ্ত মূল্যের শতকরা ৭০ ভাগ মালিককে দিয়ে শতকরা ৩০ ভাগ সংশ্লিষ্ট স্থানীয় প্রতিষ্ঠান প্রশাসনিক ব্যয় ও জরিমানা হিসেবে রাখতে পারে। সিটি কর্পোরেশন এবং প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর পৌরসভার বাইরে রিকশা নিবন্ধন সংশ্লিষ্ট তৃতীয় শ্রেণীর পৌরসভা ও ইউনিয়ন কর্তৃক যথা আইন সমাপ্য। তথাপিও মনে করা যায় যে, অধিকাংশ রিকশা ও রিকশা ভ্যান এসব এলাকায় নিবন্ধনের বাইরে প্রায় মুক্তভাবে ব্যবহৃত হয়। নিবন্ধনের ফির হার কমিয়ে এবং লাগসই প্রশাসনিক পদ্ধতি গ্রহণ করে এক্ষেত্রে নিবন্ধন সকল ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বা সর্বজনীন করা যেতে পারে।

সারাদেশে সকল রিকশার শতকরা ৭৮ ভাগ এবং রিকশা ভ্যানের শতকরা ৭১ ভাগ ১ শিফটে ব্যবহৃত হয়। সারাদেশে ভাড়ায় চালিত রিকশার শতকরা ৫৭ ভাগ ১ শিফটে এবং শতকরা ৪৩ ভাগ ২ শিফটে ব্যবহৃত হয়। নগরাঞ্চলে স্বচালিত রিকশার শতকরা ৭৪ ভাগ এক শিফটে এবং শতকরা ২৬ ভাগ দুই শিফটে ব্যবহৃত হয়। নগরাঞ্চলে ভাড়ায় প্রদত্ত রিকশার শতকরা ৫৭ ভাগ এক শিফ্ট এবং শতকরা ৪৩ ভাগ ২ শিফটে ব্যবহৃত হয়। নগরাঞ্চলে রিকশা ভ্যানের শতকরা ৭৫ ভাগ ১ শিফটে এবং ২৫ ভাগ ২ শিফটে ব্যবহৃত হয়। ভাড়ায় প্রদত্ত রিকশা ভ্যানের ক্ষেত্রে শতকরা ৬৫ ভাগ ১ শিফটে এবং শতকরা ৩৫ ভাগ ২ শিফটে ব্যবহৃত হয়। এসব তথ্য থেকে মনে করা যেতে পারে যে রিকশা ও রিকশা ভ্যানের ২ শিফটে ব্যবহার মূলত সংশ্লিষ্ট পরিবহনের যথাযথ সংরক্ষণ ও চালকের বা মালিকের অধিকতর আয় অর্জনের প্রবণতার ওপর নির্ভরশীল। সারাদেশে সকল রিকশা ও রিকশা ভ্যান মাসে গড়ে ২৬ দিন চালিত হয়। এর অর্থ রিকশা চালকরা মালিকানা নির্বিশেষে মাসে চার দিন ছুটি ভোগ করে থাকেন। এর মধ্যে স্বচালিত রিকশা ভাড়ায় প্রদত্ত রিকশার তুলনায় প্রতিমাসে সামান্য কম সময় ব্যবহৃত হয়। এর অর্থ স্বচালিত রিকশা মালিকের ক্ষেত্রে আয় উপার্জনের বাধ্যবাধকতা প্রান্তিকভাবে কম।

জরিপে দেখা গেছে যে সমকালে গড়ে রিকশার ক্ষেত্রে প্রতি কিলোমিটার এর জন্য ভাড়া দিতে হয় ১৮ পয়সা আর রিকশা ভ্যানে প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া পড়ে ৩৩ পয়সা। গড়ে ১টি রিকশা দৈনিক ১ শিফটে ৪২ কিলোমিটার চলে আর রিকশা ভ্যান চলে ৪০ কিলোমিটার। নগরাঞ্চলে রিকশা প্রতি দৈনিক আয় হয় ৪৬৬ টাকা এবং রিকশা ভ্যান প্রতি আয় হয় ৫২১ টাকা। নগরাঞ্চলে শতকরা ৩৪ ভাগ রিকশার ক্ষেত্রে দিন প্রতি আয় ৫০১ টাকা বা বেশি। এর বিপরীতে গ্রামাঞ্চলে শতকরা মাত্র ১৫.৭ ভাগ রিকশার বিপরীতে দিন প্রতি আয় ৫০১ টাকা বা তার চাইতে বেশি। নগরাঞ্চলে গড়ে প্রতি মাসে রিকশা প্রতি আয় হয় ১২০২৯ টাকা। গ্রামাঞ্চলে এরূপ মাসিক আয়ের পরিমাণ ১০৩৭৩ টাকা। রিকশা ভ্যানের ক্ষেত্রে গ্রামাঞ্চলে মাসিক আয় হয় ১১৩৭৫ টাকা আর নগরাঞ্চলে ১৩২৬০ টাকা। সারাদেশে প্রায় শতকরা ৫৯ ভাগ রিকশাচালক প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা বা এর চাইতে বেশি এবং প্রায় শতকরা ৬৫ ভাগ রিকশা ভ্যান চালক প্রতিমাসে ১০ হাজার টাকা বা তার চাইতে বেশি আয় করে থাকেন। জরিপে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী গড়ে সারাদেশে একজন রিকশাচালক বছরে ১৩৮২০৪ টাকা আয় করেন এবং রিকশা ভ্যান চালক ১৫১৪৪০ টাকা আয় করেন। নগরাঞ্চলের রিকশার ক্ষেত্রে বার্ষিক আয় ১৪৪৩৪৮ টাকা এবং রিকশা ভ্যানের ক্ষেত্রে ১৫৯১২০ টাকা। রিকশা ক্ষেত্রে গড় বার্ষিক পরিচালন ব্যয় (মেরামত ইত্যাদি) ৭৩১২ টাকা এবং রিকশা ভ্যানের ক্ষেত্রে ৭৮৭৬ টাকা। এই হিসেবে ১ জন রিকশা চালকের বার্ষিক নিট আয় ১১৪৮১৬ এবং রিকশা ভ্যান চালকের বার্ষিক নিট আয় ১২৬৬০০ (অবচয় ব্যয় না ধরে)। জরিপে দেখা গেছে যে, একজন রিকশা চালক ভাড়া নেয়া রিকশার ক্ষেত্রে শিফট প্রতি ৬০ টাকা ভাড়া রিকশা মালিককে দেন। আর একজন রিকশা ভ্যান চালক দেন ৬১ টাকা। এই হিসাবে মালিকচালিত রিকশা ও রিকশা ভ্যানের ক্ষেত্রে বার্ষিক নিট আয় ভাড়ায়চালিত রিকশা ও রিকশা ভ্যানের চালকের তুলনায় বেশ বেশি। হিসাব করে দেখা গেছে যে, গড়ে একটি নতুন রিকশা বানাতে বা কিনতে ব্যয় হয় ১৩০৮০ টাকা এবং একটি রিকশা ভ্যান কিনতে বা বানাতে ব্যয় হয় ১১৭৮৯ টাকা। নগরাঞ্চলে এরূপ কেনা বা বানানোর ব্যয় রিকশার ক্ষেত্রে ১৩১৫০ টাকা এবং রিকশা ভ্যানের ক্ষেত্রে ১১৭৭৬ টাকা। গ্রামাঞ্চলে এরূপ ব্যয় রিকশার ক্ষেত্রে ১২৯২৩ টাকা এবং রিকশা ভ্যানের ক্ষেত্রে ১১৮১৪ টাকা। এর অর্থ মোটা দাগে প্রায় ১ মাসের আয় থেকে ১ জন রিকশা বা রিকশা ভ্যানচালক রিকশা বা রিকশা ভ্যানের মালিক হতে পারেন। রিকশা ভ্যান হতে প্রাপ্ত বার্ষিক নিট আয় রিকশার আয় থেকে বেশি হওয়া সত্ত্বেও রিকশা ভ্যানের তুলনায় রিকশার সংখ্যা বেশি। এর কারণ, সম্ভবত রিকশা ভ্যান মাধ্যমে পরিবহন যোগ্য সড়কের বিস্তৃতি রিকশা চালনযোগ্য সড়কের তুলনায় কম। এক হিসাবে দেশের সার্বিক পরিবহন ক্ষেত্রের মূল্য সংযোজনের শতকরা ৩৪ ভাগ রিকশা এবং রিকশা ভ্যান থেকে আসে। একমাত্র রাজধানী ঢাকাতে শতকরা ৭০ ভাগ যাত্রী রিকশা বহন করে এবং মোট পরিবাহিত যাত্রী-মাইলের শতকরা ৪৩ ভাগ রিকশার পরিবহন ক্ষমতা নির্দেশ করে। লন্ডনের ভূ-গর্ভস্থ রেল লাইনের চেয়ে রিকশায় ঢাকাতে প্রায় দ্বিগুণ যাত্রী পরিবাহিত হয় বা চলাচল করে। বাংলাদেশে একজন রিকশাচালকের বার্ষিক আয় স্বল্প বিত্ত জনগণের আয়ের তুলনায় নেহায়েত কম নয়। স্পষ্টত গ্রামাঞ্চলের একজন গড় রিকশা চালক নিজের গৃহে থাকেন এবং সকল ক্ষেত্রে তিনি ভূমিহীন নন। একজন রিকশা ভ্যান চালক রিকশা চালকের চাইতে বেশি আয় করেন সম্ভবত এই জন্য যে তিনি ভ্যানকে তার পরিবাহিত ছোট ব্যবসার নিলয় হিসাবেও প্রযুক্ত করেন। নগরাঞ্চলে গড়ে একজন রিকশা ও রিকশা ভ্যান চালকের গড় বার্ষিক আয় গ্রামাঞ্চলের চালকদের তুলনায় বেশি। বেশি আয় সত্ত্বেও এ কথা স্বীকার্য যে, নগরাঞ্চলে একজন গড় রিকশা বা রিকশা ভ্যানচালক ভাড়া বাড়ি বা বস্তিতে থাকতে বাধ্য হন এবং তার আহার বাবদ ব্যয় ও তার গ্রামীণ সহযোগীর তুলনায় বেশি। এ কথা ধরে নেয়া সম্ভবত অসত্য হবে না যে নগরাঞ্চলে কর্মরত রিকশা ও রিকশা ভ্যান চালক গ্রামে কর্মরত তার সহকর্মীর তুলনায় প্রকৃত আয়ের হিসাবে নিম্নতর কুশল ভোগী। দুই ক্ষেত্রেই মনে রাখা সঙ্গত হবে যে, রোগ-ব্যাধি চিকিৎসায় কিংবা প্রতিরোধে রিকশা চালকদের ব্যয় স্বল্প-বিত্ত লোকদের ব্যয়ের চাইতে বেশি। এ ছাড়া ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা, নগরাঞ্চলে রিকশা ও রিকশা ভ্যান চালক অপেক্ষাকৃত সহজে মাদকাসক্তির কবলে পড়েন।

সংশ্লিষ্ট সেবক ও সমাজকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করে এ কথা বলা যায় যে, গ্রাম ও নগর উভয় ক্ষেত্রেই রিকশা ও রিকশা ভ্যানচালকদের সুষ্ঠুতর জীবিকা অর্জনের জন্যে সবচাইতে বড় প্রয়োজন নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং দ্রুত সাধারণ রোগ ব্যাধির চিকিৎসা লাভ নিশ্চিত করা। গ্রামাঞ্চলে জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার কর্তৃক অধুনা প্রতিষ্ঠিত প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নের সমাজ-স্বাস্থ্য ক্লিনিক ঐ এলাকার রিকশা ও রিকশা ভ্যানচালকদের এই সেবা দিতে সক্ষম। সমাজ-স্বাস্থ্য ক্লিনিকে এদেরকে এলাকাভিত্তিক নিবন্ধন করে সাধারণ জনগণের তুলনায় এসব কেন্দ্র থেকে দ্রুততর চিকিৎসা সেবা এবং ওষুধপত্র দেয়ার ব্যবস্থা নিলে রোগ ব্যাধিতে সহজেই এবং প্রায়ই আক্রান্ত এসব পরিশ্রমী জনগোষ্ঠীকে সুস্থ ও সবল রেখে সমাজের পরিবহন সেবা পরিব্যাপ্ত রাখা বা সংরক্ষণ করার সঙ্গে সঙ্গে এরা যাতে রোগাক্রান্ত বা ক্ষীণস্বাস্থ্য হয়ে সমাজের দায়ে পর্যবশিত না হন তার নিশ্চয়তা দেয়া উত্তম হবে।

পৌর ও সিটি কর্পোরেশন এলাকায়ও অনুরূপভাবে সরকার কিংবা এসব স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক স্থাপিত ও পরিচালিত চিকিৎসা কেন্দ্রে সেখানকার রিকশা ও রিকশা ভ্যানচালকদের পৃথকভাবে নিবন্ধিত করে তাদেরকে স্বাস্থ্যসেবা দেয়া কর্মানুগ হবে। সারথি প্রকল্প হিসেবে এই লক্ষ্যে এদের জন্যে বিশেষভাবে প্রণীত বীমার প্রচলন করা উত্তম হবে। এক্ষেত্রে ভারতের কেরালায় প্রচলিত এবং প্রযুক্ত লোকবীমার সূত্রাদি স্মর্তব্য। একই সঙ্গে সিটি কর্পোরেশন এবং প্রথম শ্রেণীর পৌরসভাধীন এলাকায় রিকশা ও রিকশা ভ্যান চালকদের জন্যে বিশেষ পরিকল্পনার আওতায় নির্বাচিত মহল্লায় সুলভে এবং ভাড়ার মাধ্যমে কিস্তিতে পরিশোধযোগ্য গৃহায়নের ব্যবস্থা করা লক্ষ্যানুগ হবে। এই ধরনের কার্যক্রমের মোড়কে অনধিক ৩০ বছরের ব্যাপ্তিতে পরিশোধযোগ্য ঋণ ও বন্ধকী ব্যবস্থার মাধ্যমে রিকশা ও রিকশা ভ্যানচালকদের আবাসন দেয়া খুব কঠিন কোন কাজ হবে না। সিটি কর্পোরেশন এলাকায় সিটি কর্পোরেশন বা নগর উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও আর্থিক সংস্থার মাধ্যমে এ কাজটি করা যেতে পারে। অন্যান্য পৌর এলাকায় পৌরসভা, গৃহনির্মাণ ঋণদান সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংক এই দায়িত্ব নিতে পারে। রিকশা ও রিকশা ভ্যানচালকদের আবাসন এভাবে বিস্তৃত করার পর নগরাঞ্চলে অন্যান্য ভাসমান জনগোষ্ঠীর অনুকূলে অনুরূপ প্রাকৃতিক পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা বিধেয় হবে।

রিকশা ও রিকশা ভ্যানচালকরা যাতে বেশি সংখ্যায় নিজেরা এসব পরিবহনের মালিক হতে পারেন তার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক উৎস থেকে তাদের ঋণ দেয়া সঙ্গত হবে। এই উদ্দেশ্যে কর্মসংস্থান ব্যাংক যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। এও মনে রাখা প্রয়োজন যে, ক্রমান্বয়ে যন্ত্রচালিত যান, বিশেষত বেবি ট্যাক্সি, হিউম্যান হলার, মিনি বাস, মাইক্রোবাস, রিকশা ও রিকশা ভ্যানকে প্রতিস্থাপিত করবে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এরূপ প্রতিস্থাপন সহজে ও দ্রুত করার জন্য তেমনি কর্মসংস্থান ব্যাংক এবং অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে এখনকার রিকশা ও রিকশা ভ্যান চালকদের প্রগতি ও সমৃদ্ধির মই ধরে উপরে ওঠার জন্যে ঋণ সহায়তা দেয়া উত্তম হবে।

সবশেষে সকলের স্মরণে রাখা প্রয়োজন যে, একটি প্রগতিশীল ও কল্যাণমুখী সমাজে সকল কর্মজীবী জনগণের জন্যে পেনশন তহবিল সৃষ্টি করে বার্ধক্যে পেনশন বা অবসর ভাতা দেয়া ঈপ্সিত। সারথি বা পাইলট প্রকল্প হিসেবে নগরাঞ্চলে রিকশা চালকদের জন্য তাদের মাসিক আয়ের শতকরা ৫ ভাগ পেনশন তহবিলে জমা দেয়া হলে ৫০ বছর বয়স হলে তাদেরকে পেনশন বা অবসর ভাতা দেয়া সম্ভব। এ লক্ষ্যে একটি রাজনৈতিক দিক নির্দেশনা দেয়া হলে যথাযথ পদক্ষেপ রিকশা চালকদের ক্ষেত্রে নিয়ে ক্রমান্বয়ে সকল কৃষক ও শ্রমিকদেরকে কোন না কোন প্রকার পেনশন প্রকল্পের আওতায় আনার কথা এখন থেকে চিন্তা করা ও তার রূপরেখা প্রণয়ন করা সমীচীন হবে।

প্রকাশিত : ৭ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

০৭/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: