মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

চোরাগোপ্তা হামলাকারীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে, প্রতিরোধ কমিটি হয়নি

প্রকাশিত : ৩০ জানুয়ারী ২০১৫
  • সরেজমিন ময়মনসিংহ

রাজন ভট্টাচার্য/বাবুল হোসেন ॥ বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের অবরোধ ও হরতালে ময়মনসিংহ শহরসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে চলছে চোরাগোপ্তা হামলা। নাশকতার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে রেজিস্ট্রেশনবিহীন মোটরসাইকেল। জামায়াত-শিবিরের নেতৃত্বে পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে নাশকতা চালিয়ে যাচ্ছে অবরোধকারীরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রায় অর্ধশত সন্ত্রাসীর তালিকা নিয়ে মাঠে নেমেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এদিকে টানা অবরোধের ২৫ দিনে জেলায় বড় ধরনের পাঁচটি নাশকতার ঘটনা ঘটেছে। শহরজুড়ে আছে পেট্রোলবোমা আতঙ্ক। এসব ঘটনায় আলাদা মামলা হলেও এজাহারভুক্ত আসামি গ্রেফতারের চিত্র হতাশাজনক। পুলিশের দাবি, এ পর্যন্ত ২৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এদের মধ্যে ১৯ জন বিএনপি ও আটজন জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী ও সমর্থক। কেন্দ্রের নির্দেশ অনুযায়ী বোমা মেরে আতঙ্ক সৃষ্টি ও যোগাযোগ খাত অচল করে দেয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে শিবিরের প্রশিক্ষিত সন্ত্রাসীরা।

জেলা পুলিশ ও প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে জেলা শহরসহ বিভিন্ন উপজেলায় বেশকিছু হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে অনেকে গ্রেফতার হলেও হামলাকারীদের অনেকে এখনও পলাতক। বার বার ঠিকানা পরিবর্তনের কারণে অপরাধীদের দ্রুত গ্রেফতার করা সম্ভব হচ্ছে না বলেও জানান তারা। অবরোধে যে কোন ধরনের নাশকতা ঠেকাতে সতর্ক অবস্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। এ কারণে চোরাগোপ্তা হামলাকারীরা কৌশল পরিবর্তন করেছে। তারা রেজিস্ট্রেশনবিহীন হোন্ডা ব্যবহার করে নাশকতা চালাচ্ছে বলে গোয়েন্দা সংস্থার কাছে খবর রয়েছে। বিশেষ লেবাসের হোন্ডারোহী দুর্বৃত্তরা নাশকতা শেষে হোন্ডায় দ্রুতবেগে সটকে পড়ছে।

এ ব্যাপারে ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক মুস্তাকীম বিল্লাহ ফারুকী জনকণ্ঠকে জানান, মোটিভেশনের পাশাপাশি প্রতিটি উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা কমিটির সদস্যকে সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এছাড়া সড়ক, মহাসড়ক ও রেলপথে যে কোন ধরনের নাশকতা প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

চলমান পরিস্থিতি মোকাবেলায় পুলিশ রেজিস্ট্রেশনবিহীন হোন্ডা আটক অভিযান শুরু করেছে। এছাড়া নাশকতাকারী ৪০-৫০ জনের একটি তালিকাও করা হয়েছে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে। তাদের ঠিকানাসহ অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা চলছে। তালিকা ধরে এখন অভিযান চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। অবরোধ ও হরতালে নাশকতাকারীরা বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী ও সমর্থক বলে দাবি পুলিশের।

স্থানীয় সূত্র জানায়, বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটের টানা অবরোধ চলাকালে গত ২০ জানুযারি ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ত্রিশালে অবরোধ সমর্থকরা একটি বাসে পেট্রোলবোমা নিক্ষেপ করে আগুন ধরিয়ে নাশকতা চালায়। সংবাদপত্রবাহী বাসটি ঢাকা থেকে শেরপুর যাচ্ছিল। তবে এই ঘটনায় হতাহতের কোন ঘটনা ঘটেনি। এ ব্যাপারে দায়ের করা মামলায় পুলিশ বৃহস্পতিবার ভোরে ত্রিশালের রায়মনি গ্রাম থেকে উপজেলা ছাত্রশিবিরের সভাপতি নুরুল আখের ও সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আজিজসহ জামায়াত-শিবিরের চারজনকে গ্রেফতার করেছে। আটকরা হলেন- স্থানীয় উপজেলা ছাত্রশিবিরের সভাপতি নুরুল আখের, সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আজিজ ও দুই শিবিরকর্মী আবু বক্কর সিদ্দিক, এনামুল। গ্রেফতারকৃতরা বিভিন্ন সময়ে নাশকতার সঙ্গে জড়িত ও মামলার আসামি।

এর আগে গত ৫ জানুয়ারি ময়মনসিংহ শহরের জিলা স্কুল মোড়ে অটোরিকশায় পেট্রোলবোমা হামলার ঘটনা ছিল প্রথম নাশকতা। হামলায় মারাত্মক দগ্ধ অটোরিকশার চালক সিদ্দিকুর রহমান এখন রাজধানীর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। এ ঘটনায় জড়িত কোন হামলাকারীকে পুলিশ গ্রেফতার করতে পারেনি। এর আগে গত ৪ জানুয়ারি শহরের চরপাড়া মেডিক্যাল কলেজ গেটের সামনে প্রকাশ্য দিনে দুপুরে যাত্রীবাহী বাসে পেট্রোল ঢেলে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা।

পুলিশ জানায়, এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে জেলা ছাত্র ও যুবদলের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ প্রায় অর্ধশত নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে কোতোয়ালি মডেল থানায় মামলা হয়। এ ব্যাপারে শহরের চামড়াগুদাম এলাকা থেকে এজাহারভুক্ত একজনকে গ্রেফতার করার কথা পুলিশ দাবি করলেও অন্য সবাই রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। গত ১২ জানুযারি শহরের গোলাপজান রোডে পুলিশের ওপর পিকেটারদের হামলার ঘটনাও ঘটেছে। একই দিন রাতে ফুলবাড়িয়া উপজেলা সদরে অন্তত ১৫টি যানবাহনে হামলা ও ভাংচুরের ঘটনা ঘটেছে। গত ১৫ জানুয়ারি ময়মনসিংহ-শেরপুর সড়কের শম্ভুগঞ্জ বাজারসংলগ্ন আলালপুর নামক স্থানে হোন্ডারোহী দুর্বৃত্তরা চালবোঝাই একটি ট্রাকে অগ্নিসংযোগ করে বীরদর্পে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হোন্ডারোহী দুর্বৃত্তরা জোরপূর্বক ট্রাক থামিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ ব্যাপারে জাহাঙ্গীর, লিটন, মইজুসহ ১৫ জনের নাম উল্লেখসহ আরও ১৫-২০ জন অজ্ঞাতনামা আসামি দিয়ে কোতোয়ালি থানায় মামলা হয়েছে। এখন পর্যন্ত জড়িত কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।

নাশকতাকারীদের গ্রেফতারে পুলিশের ভূমিকায় হতাশ ময়মনসিংহ শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার আমিনুল ইসলাম তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিভিন্ন পয়েন্টে চিহ্নিত নাশকতারীদের সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য দেয়ার পরও পুলিশ নির্বিকার। বিএনপি-জামায়াতের নাশকতা প্রতিহত করতে পাড়ায় পাড়ায় ও ওয়ার্ডপর্যায়ে কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। দ্রুতই কমিটি চূড়ান্ত হবে। জান ও মালের নিরাপত্তায় সবাই মিলে কাজ করব।

ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সভাপতি মজিবুর রহমান খান মিল্কী জানান, পাড়া-মহল্লায় সন্ত্রাস প্রতিরোধ কমিটি গঠনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ ও পরিস্থিতি মোকাবেলায় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের এক সভা আহ্বান করা হয়েছে। বৈঠকে সার্বিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে।

এদিকে বৃহস্পতিবার বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট ময়মনসিংহ জেলায় হরতাল আহ্বান করে। হরতাল সমর্থনে শুধুমাত্র মিছিল ছাড়া আর কোন কর্মকা-ে দেখা যায়নি জোটের নেতাকর্মীদের। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে শহরের হরিকিশোর রায় সড়কে দলীয় কার্যালয় থেকে একটি মিছিল বের করে বিএনপির নেতাকর্মীরা। হরতালে ময়মনসিংহ-ঢাকা রুটে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক ছিল। তবে শহরের মাসকান্দা কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালসহ বিভিন্ন স্ট্যান্ড থেকে দূরপাল্লার কোন বাস ছেড়ে যায়নি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শহরে মোতায়েন রয়েছে অতিরিক্ত পুলিশ। ময়মনসিংহ জেলা গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর আলম জানান, হরতাল চলাকালে ভালুকায় দুইজন, হালুয়াঘাটে একজন (বিএনপি নেতা) এবং কোতোয়ালিতে একজনকে (শিবিরকর্মী) আটক করা হয়েছে।

প্রকাশিত : ৩০ জানুয়ারী ২০১৫

৩০/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: