কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে কোকোর আকস্মিক মৃত্যু

প্রকাশিত : ২৫ জানুয়ারী ২০১৫
খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে কোকোর আকস্মিক মৃত্যু

স্টাফ রিপোর্টার ॥ মুদ্রা পাচারের মামলায় ৬ বছরের কারাদ-ের সাজা নিয়ে বিদেশে পালিয়ে থাকা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন (ইন্নালিল্লাহি... রাজিউন)। শনিবার দুপুর সাড়ে বারোটায় মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে মালোয়া ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে তিনি ইন্তেকাল করেন। সোমবার তাঁর লাশ দেশে আনা হতে পারে। আজ রবিবার বাদ জোহর তাঁর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হবে মালয়েশিয়ার জাতীয় মসজিদ নেগারায়। জানাজা শেষে তাঁর লাশ কুয়ালালামপুর মালোয়া ইউনিভার্সিটি হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হবে। এদিকে ছোট ভাইয়ের মৃত্যু সংবাদ পেয়ে খালেদা জিয়ার সঙ্গে ফোনে কয়েকবার কথা বলেছেন তারেক রহমান। তিনি লন্ডন থেকে মালয়েশিয়া যাচ্ছেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া গুলশান কার্যালয়ে সাংবাদিকদের জানান, তারেক রহমান লন্ডন থেকে মালয়েশিয়া যাওয়ার পর আরাফাত রহমান কোকোর লাশ দেশে আনা ও দাফনের দিনক্ষণ চূড়ান্ত হবে।

মৃত্যুর আগে আরাফাত রহমান কোকোর বয়স হয়েছিল ৪৫ বছর। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী শর্মিলা রহমান, মেয়ে জাফিয়া রহমান ও জাহিয়া রহমানকে রেখে গেছেন। তাঁরাও কোকোর সঙ্গেই প্রথমে থাইল্যান্ড ও পরে মালয়েশিয়ায় একটি ভাড়া বাড়িতে বসবাস করতেন। গত বছর লন্ডন থেকে মালয়েশিয়া গিয়ে বড় ভাই তারেক রহমান পিনু ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকো ও তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করে আসেন।

এদিকে কোকোর মৃত্যুর খবর শুনে আত্মীয়স্বজন ও বিএনপির বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে তার গুলশান কার্যালয়ে যান। এক পর্যায়ে গুলশান কার্যালয়ে মানুষের ভিড় বেড়ে গেলে প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ করে খালেদা জিয়ার নিরাপত্তায় নিয়োজিত সিএসএফের সদস্যরা। এক পর্যায়ে সেখানে প্রবেশ করতে গিয়ে দলের কিছু নেতাকর্মী ও সাংবাদিকরা হুড়োহুড়ি ও ধাক্কাধাক্কিতে লিপ্ত হয়। এ সময় তাঁদের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয় সিএসএফের সদস্যদের।

দুপুরের পর খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয়ে গুলশান কাঁচাবাজার সংলগ্ন মসজিদের ক’জন আলেম গিয়ে কোরআন তিলাওয়াত ও দোয়া কালাম পাঠ করেন। এরই মধ্যে খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয়ে পুলিশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। এ সময় মিডিয়া কর্মীরাও সেখানে গিয়ে ভিড় করে। এর আগে কোকোর মৃত্যু সংবাদ শুনে কুয়ালালামপুর মালোয়া ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে জড়ো হন স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা। মালয়েশিয়া বিএনপির একাংশের সভাপতি মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ ও অপরাংশের সদস্যসচিব মোশাররফ হোসেনসহ অনেকেই সেখানে যান। গুলশান কার্যালয়ে খালেদা জিয়ার সঙ্গে যারা সাক্ষাত করতে যান তাঁরা হলেন- ভাই সাঈদ এস্কান্দারের স্ত্রী নাসরিন সাঈদ ও শামীম এস্কান্দারের স্ত্রী কানিজ ফাতেমা, খালেদা জিয়ার মেঝো বোন সেলিমা ইসলাম, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, লে. জেনারেল (অব) মাহবুবুর রহমান, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, ভাইস চেয়ারম্যান চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা সাবিহ উদ্দিন আহমেদ, শওকত মাহমুদ, রুহুল আলম চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি এমাজউদ্দীন আহমেদ, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর স্ত্রী ফারহাত কাদের চৌধুরী প্রমুখ।

সরকারবিরোধী আন্দোলন সফলের উদ্দেশে ৩ জানুয়ারি থেকে ২২ দিন ধরে বাসা ছেড়ে গুলশান কার্যালয়ে অবস্থান করা বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া তাঁর ছোট ভাই শামীম এস্কান্দারের স্ত্রী কানিজ ফাতেমার কাছ থেকে প্রথম তাঁর ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যু সংবাদ শোনেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। এক পর্যায়ে শোকে কাতর হয়ে পড়েন। এ সময় গুলশান কার্যালয়ে তাঁর সঙ্গে থাকা বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমানসহ অন্য নেতারা শোক-বিহ্বল খালেদা জিয়াকে সান্ত¡না দেয়ার চেষ্টা করেন। এক পর্যায়ে কিছুক্ষণ নিকটাত্মীয়দের সঙ্গে নিয়ে কাঁদতে থাকেন। এরপর তিনি অসুস্থ বোধ করলে দরজা বন্ধ করে সেখানে অবস্থান করেন। লন্ডনে অবস্থানরত খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমানও কোকোর মৃত্যু সংবাদ শুনে শোকে কাতর হয়ে পড়েন। তবে টেলিফোনে খালেদা জিয়া তারেক রহমান ও তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন। এছাড়া আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী ও সন্তানদের সঙ্গেও খালেদা জিয়ার কথা হয়েছে বলে জানা গেছে।

খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুতে শনিবার সন্ধ্যায় তার গুলশান কার্যালয়ে শোক বই খোলা হয়। এ শোক বইয়ের তত্ত্বাবধানে রয়েছেন বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও তারেক রহমানের ব্যক্তিগত আইনজীবী ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৮ সালের ১৭ জুলাই কারাবন্দী থাকা অবস্থায় শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিজন সেল থেকে বিদেশে চিকিৎসার জন্য প্যারোলে মুক্তি দেয়া হয়েছিল কোকোকে। তারপর থেকে প্রথমে কয়েক বছর থাইল্যান্ডে চিকিৎসার জন্য অবস্থানের পর ২০১১ সালে মালয়েশিয়া চলে যান তিনি। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর কোকোর প্যারোলে (সাময়িক) মুক্তির মেয়াদ আর না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। আরাফাত রহমান কোকোর বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে মুদ্রা পাচারের মামলায় ২০১১ সালের ২৩ জুন ছয় বছরের কারাদ- হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে। এই মামলায় তাকে ১৯ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়। আদালতের ডাকে না ফিরলে তাকে পলাতক দেখিয়েই বিচার এবং সাজার রায় হয়। আর পলাতক থাকায় আপীলের সুযোগ পাননি তিনি। উল্লেখ্য, আরাফাত রহমান কোকের বিরুদ্ধে ৭টিসহ জিয়া পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে ২৭টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর মা বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার সঙ্গে ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে যৌথবাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়েছিলেন আরাফাত রহমান কোকো। পরে তাকে কেন্দ্রীয় কারাগারে সাধারণ বন্দী হিসেবে রাখা হয়। গ্রেফতারের পর পরই কোকো অসুস্থ হয়ে পড়েন। আর তার আগেই ৭ মার্চ একই বাড়ি থেকে গ্রেফতার হয়েছিলেন তার বড় ভাই তারেক রহমান। তবে ২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর মুক্তি পেলেও কিছুদিন হাসপাতালে থেকে ১১ সেপ্টেম্বর তারেক রহমান তার মা খালেদা জিয়ার মুক্তির দিনে লন্ডনের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন।

২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় যাওয়ার পর আকস্মিকভাবে আরাফাত রহমান কোকোকে জাতীয় ক্রিকেট বোর্ডের উপদেষ্টা কমিটির সদস্য নিয়োগ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, বিসিবির নির্বাচিত কমিটিকে হটিয়ে আইনের মারপ্যাঁচে উপদেষ্টা কমিটি গঠন করে বিসিবিকে তখন দখল করেছিল কোকো ও তার সঙ্গীরা। আওয়ামী লীগ নেতা সাবের হোসেন চৌধুরীকে সরিয়ে তখন বিসিবির ডেভেলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যানের পদ নিয়েছিলেন আরাফাত কোকো।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া সাংবাদিকদের জানান, তারেক রহমান লন্ডন থেকে মালয়েশিয়া যাওয়ার পর আরাফাত রহমান কোকোর লাশ দাফনের দিনক্ষণ চূড়ান্ত হবে।

কোকোর মৃত্যু সংবাদ পাওয়ার পর বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান গুলশান কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে বলেন, তার অকাল মৃত্যুতে পরিবারের পক্ষ থেকে দেশবাসীর কাছে কোকোর জন্য দোয়া চেয়েছেন খালেদা জিয়া। তিনি বলেন, হৃদরোগে আক্রান্ত হলে আরাফাত রহমান কোকোকে হাসপাতালে নেয়ার পথেই মারা যান।

কোকোর বিরুদ্ধে ৭ মামলা ॥ ১. সিঙ্গাপুরে ২০ কোটি টাকার বেশি অর্থের অবৈধ লেনদেনের অভিযোগে ২০০৯ সালের ১৭ মার্চ কাফরুল থানায় আরাফাত রহমান কোকোর বিরুদ্ধে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ মামলায় সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী প্রয়াত আকবর হোসেনের ছেলে সায়মন হোসেনকেও আসামি করা হয়। ২০১১ সালের ২৩ জুন এ মামলার রায় হয়। তাতে পলাতক দেখিয়ে আরাফাত রহমান কোকোকে ছয় বছরের সশ্রম কারাদ-াদেশ দেন আদালত। একই সঙ্গে সাড়ে ১৯ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়। এর মধ্যে সিঙ্গাপুর থেকে কোকোর পাচার করা অর্থের একটা অংশ দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।

২. আরাফাত রহমান কোকোর বিরুদ্ধে আয়কর ফাঁকির অভিযোগে ২০১০ সালের ১ মার্চ জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) একটি মামলা করে। এ মামলাটি এখন বিচারাধীন রয়েছে।

৩ ও ৪. তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আরাফাত রহমান কোকোর বিরুদ্ধে গুলশান থানায় দুটি চাঁদাবাজির মামলা হয়। এ মামলা ২টিও বিচারাধীন। ৫. অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) একটি মামলা করে কোকোর বিরুদ্ধে। যা বিচারাধীন রয়েছে।

৬ ও ৭. সোনালী ব্যাংকের ঋণখেলাপি মামলায় বড় ভাই তারেক রহমানের সঙ্গে একটি এবং গ্যাটকো দুর্নীতি মামলায় মা খালেদা জিয়ার সঙ্গে আরাফাত রহমান কোকো আসামি। এ ২টি মামলাও বিচারাধীন রয়েছে।

এদিকে আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুতে বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোটের বিভিন্ন দলের পক্ষ থেকে শোক প্রকাশ করা হয়েছে। তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন বিকল্পধারার প্রেসিডেন্ট সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমির মকবুল আহমাদ, ডক্টরস এ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব), সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদ, জাতীয় নাগরিক কমিটি, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, জাতীয়তাবাদী লেখক পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠন।

এদিকে কোকো মারা যাবার পর শনিবার নয়াপল্টন বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের নিচে দোয়া মাহফিল করতে চাইলে পুলিশ অনুমতি দেয়নি বলে দলের সহ-দফতর সম্পাদক আবদুল লতিফ জনি জানিয়েছেন।

কোরানখানি ও দোয়া মাহফিল ॥ বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে তারেক রহমানের মৃত্যুতে ২৫ ও ২৬ জানুয়ারি দেশব্যাপী কোরানখানি ও দোয়া মাহফিল করবে বিএনপি। মসজিদে মসজিদে এই কোরানখানি ও দোয়া মাহফিলের অনুষ্ঠিত হবে বলে বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়।

প্রকাশিত : ২৫ জানুয়ারী ২০১৫

২৫/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: