মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও আমাদের সংবিধান

প্রকাশিত : ৬ নভেম্বর ২০১৪

এম আমীর-উল ইসলাম

৪ নবেম্বরের পর

এমন একটি পরিবর্তিত অবস্থায় বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ ঐকমত্যের ভিত্তিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য সকল ক্ষমতা অর্পণ করেন এবং তিনি যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন সেটাই হবে বাংলাদেশ গণপরিষদের সিদ্ধান্ত। কার্যত ঐদিন থেকে বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রতিনিধিগণই উবভধপঃড় বাংলাদেশ গণপরিষদে রূপান্তরিত হলো এবং গণপরিষদের পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সকল ক্ষমতা অর্পণ করা হয় এবং আরও বলা হয় যে, তিনি যে সিদ্ধান্ত দিবেন সেটাই বাংলাদেশের গণপরিষদের সিদ্ধান্ত বলে পরিগণিত হবে। গণপরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নির্বাচিত হুইপ হিসেবে বঙ্গবন্ধু আমাকে ১ মার্চের সভা অনুষ্ঠান আহ্বানসহ সকল কার্য পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। এই সিদ্ধান্তটিও আমি নিজের হাতে খসড়া তৈরি করি। বঙ্গবন্ধু অনুমোদন করলে আমি এটা পাঠ করি। তুমুল করতালির মাধ্যমে সর্বসম্মতিক্রমে এটা পাস হয়। এরপর সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এভাবেই ১ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত দলের সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার জন্য একটি কার্যকর ব্যবস্থা চালু ছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের তিনজন সহ-সভাপতি ও পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ ও পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এএইচএম কামরুজ্জামান এই ‘হাইকমান্ড’ পরিচালনা করতেন। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সকল প্রশাসন পরিচালনা এই হাইকমান্ডের নির্দেশে পরিচালিত হচ্ছিল। সিভিল প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসনসহ সকল সরকারী অফিস-আদালত থেকে শুরু করে ব্যাংক, টেলিযোগাযোগ, শিল্প-কল-কারখানা, ব্যবসা বাণিজ্য, আমদানি-রফতানি, জাহাজ যান চলাচল সব কিছু জনগণের নির্বাচিত প্রধানের আদেশ ও নির্দেশে পরিচালিত হতে থাকে। এমনিভাবে ১ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত এই হাইকমান্ডটি একটি নির্বাচিত বৈধ অনানুষ্ঠানিক সরকারে পরিণত হয়। ইয়াহিয়া সরকার পরিণত হয় একটি অবৈধ, অসাংবিধানিক ও অগণতান্ত্রিক সামরিক জান্তায় এবং বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রতিনিধিগণের দ্বারা গঠিত হাইকমান্ড আইনানুগ ও কার্যত ‘উবমঁৎব’ এবং ‘উবভধপঃড়’ উভয়ই বৈধতা অর্জন করে। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে তাই যুদ্ধকালীন সময়ে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও কেবিনেট একই সঙ্গে কেবিনেট সভা করতেন। সরকার গঠনে ও কার্য পরিচালনায় এই নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে। শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা এতে সংযোজন করা হয়েছিল।

দিল্লীতে বসে যখন সরকার গঠনের আলোচনা হয়, তখন তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে মতবিনিময় করি। চিন্তা, যুক্তি, পাল্টা-যুক্তি, ভবিষ্যত পরিকল্পনা এবং কর্মধারা, যুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য প্রয়োজনীয় অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক সমর্থন, প্রচার, বঙ্গবন্ধুর জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বিভিন্ন রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানের কাছে ভারতের কূটনৈতিক তৎপরতা ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের যৌক্তিকতা বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের নিকট তুলে ধরা থেকে শুরু করে ভারতে সম্ভাব্য এক কোটি শরণার্থীর আশ্রয়, খাদ্য ব্যবস্থাপনা, তরুণ ও যুবকদের একত্রিত করে ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা সকল বিষয় সেই আলোচনায় স্থান পায়। সকল খুঁটিনাটি বিষয় নিয়েও আলোচনা করা হয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দু’দফা আলোচনায় সরকারের আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে সুসজ্জিত পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে স্বতঃস্ফূর্ত যে জনযুদ্ধ শুরু হয়েছে একে সুসংগঠিত করার জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়, ট্রেনিং ও ৎবমৎড়হঢ়রহম, ছোট অস্ত্র ও ভারী অস্ত্রের ব্যবহার ও সরবরাহের ব্যবস্থা এবং প্রায় এক কোটি শরণার্থী যারা ওপার বাংলায় আশ্রয় নেবে তাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা, কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর জীবনের নিরাপত্তা বিধানের জন্য প্রয়োজনীয় ও সঠিক সমর্থন ও সহযোগিতার বিষয়ে সম্ভাব্য কী কী আলোচনা হতে পারে, সে বিষয়েও মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়। এছাড়াও বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আমাদের প্রচার-প্রচারণার পাশাপাশি বেতার বাণী প্রচারেরও ব্যবস্থা রাখা হয়। আলোচনার মূল বক্তব্য ছিল, এই যুদ্ধ মূলত বাঙালীর, বাংলাদেশের মানুষের। এই যুদ্ধ যাতে আন্তর্জাতিকীকরণ না হয় তার দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে এবং এই যুদ্ধ যেন ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধে পরিণত না হয়। এই বক্তব্যে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী খুবই সন্তুষ্ট হয়েছিলেন। একটি সাংবিধানিক, বৈধ ও আইনানুগ সরকার ছাড়া কি করে ভারত সরকারের সমর্থন ও সহযোগিতা পাওয়া যাবে বা দুই সরকারের সঙ্গে যোগাযোগের ভিত্তি ও মাধ্যম কিভাবে স্থাপিত হবে সেই সঙ্গে এসব বিষয় নিয়েও আলোচনার প্রকৃতি ও কৌশল ঠিক করা হয়। এতদুদ্দেশ্যে সম্ভাব্য সকল প্রশ্নের জবাব কি হতে পারে, সে বিষয়ে চিন্তা ও প্রস্তুতির জন্য দিল্লীতে ভারত সরকারের একটি অতিথি ভবনে বসে তাজউদ্দীন আহমদ প্রশ্ন করেছিলেন, ‘সরকার গঠন করার কথা বলছেন, কাদের নিয়ে সরকার গঠন করবেন?’ উত্তর প্রস্তুত ছিল, সরকার তো বঙ্গবন্ধু তৈরি করে রেখে গেছেন। ১ থেকে ২৫ মার্চ যে সরকার দেশ পরিচালনায় সার্বিক নির্দেশনা দিয়ে আসছিল এবং তা অক্ষরে অক্ষরে পালিত হচ্ছিল সেটি তো শুধুমাত্র ‘ফবভধপঃড় মড়াবৎহসবহঃ’-ই নয়। পরবর্তীকালে পাকিস্তান সুপ্রীমকোর্টের রায় অনুযায়ী (আছমা জিলানি বনাম পাঞ্জাব সরকার চখউ ১৯৭২ (ঝ.ঈ ১৩৯), আমার সেই বাক্যটিই সঠিক প্রমাণিত হয়েছিল। পাকিস্তানে ইয়াহিয়ার অবৈধ সামরিক সরকারের বিপরীতে বাংলাদেশ সরকার ছিল একমাত্র সাংবিধানিক বৈধ সরকার। তফাৎ শুধু একটিই যে, বঙ্গবন্ধু শত্রুর হাতে বন্দী। তাঁর জীবন রক্ষা, মুক্তি ও মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য আনুষ্ঠানিক সরকার গঠন জরুরী প্রয়োজন। সশস্ত্র সংগ্রাম ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। ঢাকা থেকে চুয়াডাঙ্গা পর্যন্ত দীর্ঘপথ পরিক্রমায় এবং বিভিন্ন শহর ও গ্রামে আমরা যে প্রতিরোধ ও পাল্টা আক্রমণ এবং প্রাথমিক পর্যায়ে যে যুদ্ধ এবং শত্রু সেনাদের অবরোধ করে জনগণের যে প্রত্যয়ী ও সাহসী ভূমিকায় অংশগ্রহণের যে চিত্র দেখেছি তাতে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ একটি জনযুদ্ধে পরিণত হয়েছে।

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচারিত হয়েছে। এ বিষয়ে আমরা ইতোমধ্যেই নিশ্চিত হয়েছি। সারাদেশেই প্রচারিত বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছে, বেতারেও তারা শুনেছে। পদ্মার এপার দোহার থানার ওরঙ্গবাদ গ্রামে শুকুর মিয়ার বাড়িতে যখন আমরা রাত্রি যাপন করছি তখনই আমরা রেডিওতে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণার কথা প্রথম শুনতে পাই। পরে ফরিদপুর থেকে মাগুরা যাবার পথে রাজবাড়ী তৎকালীন এসডিও শাহ ফরীদের ও পরে ঝিনাইদহের এসডি পিও মাহাবুদ্দীন আহাম্মদ এবং চুয়াডাঙ্গা পৌঁছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের মুখে এবং মেহেরপুরের এসডিও তৌফিক এলাহী চৌধুরী সক্রিয় অংশগ্রহণের ফলে এটা প্রতীয়মান হয় যে, মেসেজ এসেছে কি আসেনি তা কারও মুখে আলোচনার বিষয় নয়। চুয়াডাঙ্গার ইপিআরের অধিনায়ক মেজর ওসমান, ক্যাপ্টেন আজম এঁরা সবাই স্বতঃস্ফূর্ত যুদ্ধ করে পাকিস্তানী সেনা বাহিনীকে রুখে দাঁড়াতে জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন। (চলবে)

স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও আমাদের সংবিধান

(৬ নবেম্বরের পর)

এঁরা কোন মেসেজের জন্য অপেক্ষা করেননি। তাঁদের সংকেতের জন্য ৭ মার্চের ভাষণই ছিল যথেষ্ট। সারাদেশের সাধারণ মানুষ কোন সবংংধমব বা ঘোষণা বা নির্দেশের অপেক্ষায় ছিলেন না। ২৫ মার্চের রাত্রে ঙঢ়বৎধঃরড়হ ঝবধৎপয খরমযঃ-এর প্রথম কামানের আওয়াজটাকেই বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের বক্তৃতার নির্দেশ অনুযায়ী স্বাধীনতার ঘোষণার সঠিক মুহূর্ত বলে দেশবাসী মনে করে। “আর যদি একটা গুলি চলে, তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সব কিছু বন্ধ করে দিতে হবে-আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে।”

কিন্তু প্রথম দালিলিক প্রমাণ আমাদের হাতে এলো যখন সীমান্ত পার হবার পর আমাদেরকে গোলক মজুমদার অভ্যর্থনা জানাতে সীমান্তে এলেন তখন। তিনি জানালেন বিএসএফের কাছে বঙ্গবন্ধুর ডরৎবষবংং সবংংধমব তাদের ডরৎবষবংং-এ ধরা পড়ে। পরে তার একটা কপি আমাদেরকে দেন। তখনই আমার মনে পড়ে ২৫ মার্চ বেলা গড়িয়ে দুইটা বা আড়াইটার সময় ডরৎবষবংং ঊহমরহববৎ নূরুল হক সাহেবের সঙ্গে আমার শেষ সাক্ষাত। আমি অনেক দেরি করে বাসায় এসেছি দুপুরের খাবার খেতে। আমি যখন গেট দিয়ে ঢুকছি তখন দেখি ইঞ্জিনিয়ার নূরুল হক আমার আগে তার গাড়ি নিয়ে আমার বাসায় ঢুকছেন। পূর্বের একটি আলোচনার সূত্র ধরে তিনি বললেন বঙ্গবন্ধু আমাকে একটি ট্রান্সমিটার আনতে বলেছিলেন। সেটি খুলনা থেকে আমি আনিয়ে রেখেছি। আমি এখন ওটা দিয়ে কি করব সে বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে নির্দেশনা চাই। আমি তাঁকে বললাম বঙ্গবন্ধু যা বলার তা ৭ মার্চেই নির্দেশনা দিয়েছেন। আমার কাছে সংগঠন আছে আর কলম আছে। আমি এটা দিয়ে কাজ করব। আপনার কাছে ট্রান্সমিটার আছেÑ সেটা দিয়ে আপনি শত্রুর মোকাবিলা করবেন। আমি আপনাকে কি লিখে দিবো কি বলতে হবে? উনি বললেন তার প্রয়োজন হবে না। ‘আমি জানি কি বলতে হবে। নঁঃ ঃযধঃ সধু পড়ংঃ সু ষরভব; ুবঃ রঃ সধু নব ড়িৎঃয ফড়রহম ধহফ ও রিষষ ফড় রঃ’

আমি তাজউদ্দীন সাহেবকে বললাম ইঞ্জিনিয়ার নূরুল হক তাঁর প্রতিশ্রুতি রেখেছেন। পরে জানতে পেরেছি তিনি তাঁর এ প্রতিশ্রুতির মূল্য দিয়েছেন তাঁর জীবন দিয়ে। কয়েকদিন তাঁকে সেনাবাহিনী বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে খুঁজে বের করতে বলেন যে, ট্রান্সমিটার কোথায় রেখেছেন। তাঁরা তাঁর বাড়িতেও তল্লাশি করান। এরপর তাঁকে নিয়ে যাওয়া হলে তিনি আর ফিরে আসেননি। অনেকদিন পর হাজী গোলাম মোর্শেদের কাছ থেকে জানতে পারি যে, আমরা বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ত্যাগ করার পর বঙ্গবন্ধু ও গোলাম মোর্শেদকে বন্দী করার পূর্বে একটা টেলিফোন আসে। কণ্ঠটি খুব গভীর ও দৃঢ়। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথা বলতে চান। তিনি বলেন, আমি বলদা গার্ডেন থেকে বলছি। আমার কাজ শেষ করেছি। আমি এখন কি করব। মুর্শেদি ভাই বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞাসা করলে বঙ্গবন্ধু বলেন ওটা ভেঙ্গে চুরে দিয়ে চলে যেতে বলো।

দিল্লীতে যখন এম আর সিদ্দিকী আমাদের সঙ্গে দেখা করতে এলেন তখন তিনিও ঐ ডরৎবষবংং সবংংধমব-এর প্রিন্টটি দেখে ঈড়হভরৎস করেন যে এটাই সেই মেসেজ যেটা তাঁরা চট্টগ্রামেও পেয়েছিলেন।

৯ এপ্রিলে গভীর রাতে কলকাতায় বিএসএফের অতিথিশালায় বসে আমি স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র লিখতে শুরু করি। তখন ঐ একটি মাত্র দলিল বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার বার্তা আমার সামনে ছিল। আর কোন দলিল বা বই আমার কাছে ছিল না। ঐ ঘোষণাটির ওপর নির্ভর করেই আমি স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি রচনা করি। বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের কাছে আমাদের স্বীকৃতি প্রাপ্তির যে চিঠিটি পড়ে আমি তৈরি করি তার সঙ্গে সংযুক্তি ছিল ঐ ঘোষণাটি। আমার তৈরি করা স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র এবং প্রধানমন্ত্রীর ইংরেজিতে লেখা বক্তৃতাটি যেটা ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে পাঠ করা হয় এবং সাংবাদিকদের কাছে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও তাজউদ্দীন সাহেবের লিখিত ইংরেজি বক্তৃতাটি বিলি করা হয়।

ইতোমধ্যে সরকার গঠন করার জন্য বিভিন্ন জায়গা থেকে চাপ আসছে। রংপুর থেকে তরুণ এমপি আব্দুর রউফ দিল্লী এসেছেন। কসবার এমপি সিরাজুল হক এমপি এবং চট্টগ্রাম থেকে এমআর সিদ্দিকীÑ আরও চিঠি পেয়েছি ময়মনসিংহ থেকে রফিকউদ্দিন ভূইঞা ও আবদুস সুলতানের কাছ থেকে। তাঁরা সবাই অবিলম্বে সরকার গঠনের তাগিদ দিচ্ছেন।

আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, ছাত্র-যুবক দলমত নির্বিশেষে সকল রাজনৈতিক নেতাকর্মীর সমন্বয়ে সারাদেশে যে সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়েছে তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে তৎকালীন ইপিআর, সামরিক বাহিনীতে কর্মরত অফিসার থেকে শুরু করে সাধারণ সৈনিকবৃন্দ এবং পুলিশ ও প্রশাসনসহ সর্বস্তরের জনগণ। এই যুদ্ধ ২৫ মার্চের রাত থেকে শুরু হয়-যার সুপরিকল্পিত নেতৃত্ব দেয়া হবে এ সরকারের মূল কাজ। দ্বিতীয় প্রশ্ন ছিল, বঙ্গবন্ধু শত্রু শিবিরে বন্দী, তাঁকে রাষ্ট্রপতি রাখলে তাঁর জীবনের ঝুঁকি কমবে, না বাড়বে। এর যৌক্তিক উত্তরও ছিল। তাঁকে রাষ্ট্রপতি রাখলে তাঁর জীবনের ঝুঁকি অনেক কম হবে। কারণ, তাঁর জীবনের নিরাপত্তার জন্য আন্তর্জাতিক চাপ স্বাভাবিকভাবেই আরও বৃদ্ধি পাবে। তিনি মুক্ত বা বন্দী যেভাবেই, যেখানেই থাকুন না কেন, তিনিই হবেন এই যুদ্ধের মূল নায়ক। তাজউদ্দীন আহমদ সে কথায় সায় দিলেন এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেছিলেন, ‘আমি আমার নেতাকে যেভাবে জানি বা চিনি, তিনি আমাদের এই ঘোষণা বা তাঁকে রাষ্ট্রপতি করে সরকার গঠনের পদক্ষেপ নিলে জীবন গেলেও তিনি তা অস্বীকার করবেন না।’ তৃতীয় প্রশ্ন ছিল, আমাদের প্রধানমন্ত্রী কে হবেন? আমার উত্তর ছিল, বঙ্গবন্ধু বন্দী হবার পর থেকে যিনি এই মুক্তিসংগ্রামে প্রধান ভূমিকা পালন করছেন তিনিই হবেন যুদ্ধকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী।

জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের যে অধিকার সেই অধিকারের ওপর প্রথম আঘাত হানা হয় ১৯৫৪ সালে পূর্ব বাংলার প্রথম নির্বাচনের মাধ্যমে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠিত হয়। তা ভারত শাসন আইনের ৯২ (ক) ধারা জারির মাধ্যমে গবর্নর শাসন প্রবর্তন করে। পরবর্তীকালে ১৯৫৫ সালের ২৪ অক্টোবর, যেদিন পাকিস্তান গণপরিষদকে অন্যায়ভাবে ভেঙ্গে দেয়া হয়। পাকিস্তানের ইতিহাসের এসব কলঙ্কজনক অধ্যায়ের পূর্ণ সংস্করণ ঘটল ১৯৭১ সালে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে। নির্বাচিত গণপরিষদের পূর্ব নির্ধারিত ৩ মার্চের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করে নিরস্ত্র মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করে নিরপরাধ মানুষের ওপর জিঘাংসা নিয়ে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী গণহত্যা, নরহত্যা, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে নগরের সব বস্তি এবং শহরের বাইরে গ্রামকে গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়। পাকিস্তান সৃষ্টির শুরু থেকে বাংলাদেশের আপামর মানুষ বার বার আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। সামরিক জান্তা ও বেসামরিক আমলাতন্ত্রের ষড়যন্ত্রের শিকার হয় দেশের সর্ব অঞ্চলের জনগণ। তাদের দুঃশাসনের সর্বাধিক বঞ্চনার শিকার বাংলার জনগণ। সামরিক আইনের দুঃশাসন, সেই সঙ্গে শোষণ, বঞ্চনা ও বৈষম্যের সর্বগ্রাসী থাবা বাংলার মানুষের কাছে প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায় ‘সোনার বাংলা শ্মশান কেন?’ আওয়ামী লীগ প্রদত্ত ৬ দফা ও ছাত্রসমাজের ১১ দফা আন্দোলনের প্রথম দফায় সার্বজনীন ভোটাধিকারের দাবি রূপ পেয়েছিল ‘এক মানুষ, এক ভোট’ সেøাগানে। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধিকারের আন্দোলন এবং তা থেকে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের দাবি পরবর্তীতে স্বাধীনতা আন্দোলনের রূপ পরিগ্রহ করে। রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক বিকাশের বিরুদ্ধে যে বাধা, তা উন্মোচনের সংগ্রামই ছিল বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলন এবং তা থেকে সৃষ্টি হয় স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল স্রোতধারা।

তাই বাংলাদেশের সংবিধানে বলা হয়েছে ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ।’ এ বক্তব্য আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার সংবলিত আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারনামায় বর্ণিত আত্মনিয়ন্ত্রণের নতুন সংজ্ঞায়ন। আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণ স্বাধীনভাবে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করতে পারবে এবং নির্ণয় করতে পারবে তাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নের পন্থা ও কৌশল।

কোন আন্তর্জাতিক দলিলে বা আইনে একই অনুচ্ছেদের পুনরাবৃত্তি খুবই বিরল। আন্তর্জাতিক দুটি অঙ্গীকারনামা তৈরি হয় ১৯৬৬ সালে। একটি ঈড়াবহধঃং ড়হ ঈরারষ ধহফ চড়ষরঃরপধষ জরমযঃং অন্যটি ঈড়াবহধহঃং ড়হ ঊপড়হড়সরপ ঝড়পরধষ ধহফ ঈঁষঃঁৎধষ জরমযঃং. আন্তর্জাতিক আইনে এ দুটি অঙ্গীকারনামা মানবাধিকার সংরক্ষণ ও বাস্তবায়নে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারসহ মানবাধিকারের পাশাপাশি অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক অধিকারের বিষয়টি সুনিশ্চিত করেছে। জনগণ যাতে তাদের নিয়মমাফিক ও আইনানুগভাবে এই আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার অক্ষুণœ রাখতে পারে, সে লক্ষ্যে নির্বাচন ও জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে জনগণের অভিপ্রায় অনুযায়ী আইনের শাসন তথা সবার নাগরিক, মানবিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার অক্ষুণœ রাখতে পারে তা ছিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র তথা বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা ও সংবিধান প্রণয়নের মূল লক্ষ্য। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে যেসব লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য স্থান লাভ করেছে যেমন, ‘মানবিক মর্যাদা’, আমাদের সংবিধানেও যা পুনঃস্থাপিত হয়েছে তা অন্য কোন সংবিধানে এমনভাবে উল্লিখিত নেই। জনগণের সার্বভৌমত্বের বিষয়টি আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে প্রাধান্য লাভ করেছে, তা দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের ফসল। আমাদের সংবিধানেও সেটির প্রতিফলন ঘটেছে। এখানে আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন যে, বাংলাদেশের জনগণের আন্দোলন ও সংগ্রামের ফসল বারবার অসাংবিধানিক চোরাগলিতে ছিনতাই হওয়ার সময়ে বাংলার জনগণ জাগ্রত প্রহরীর মতো তা প্রতিরোধ করেছে-বারবার রক্ত দিয়েছে। জনগণের অর্জিত সাংবিধানিক সার্বভৌমত্ব কখনও তারা বিসর্জন হতে দেয়নি।

বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের মূল যুক্তি ছিল জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠা। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র এবং বাংলাদেশ সৃষ্টির পটভূমিকে হৃদয়ে ধারণ করে সঠিকভাবে সংবিধানকে অনুধাবন ও আত্মস্থ করলে বাংলাদেশের নাগরিক তার নিজ সত্তায় আলোকিত ও গৌরবান্বিত হওয়ার সক্ষমতা অর্জন করবে। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের লক্ষ্য ও চেতনা, সংবিধানের প্রস্তাবনা এবং তার প্রতিফলিত চেতনায় উদ্দীপ্ত ৭ ও ১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ’ এবং সে ক্ষমতা সংবিধান ও আইনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত। ঘোষণাপত্রের সূত্র ধরেই সংবিধান রচনায় রত জনপ্রতিনিধিগণ বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ থেকে এই কথাটি উচ্চারণ করেন যে, ‘আমরা, বাংলাদেশের জনগণ, ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসের ২৬ তারিখে স্বাধীনতা ঘোষণা করিয়া জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত করিয়াছি।’

স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের আইনানুগ অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য বলতে ১৯৬৬ সালের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারনামা দুটি (নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারসমূহের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারনামা এবং সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার সংবলিত অঙ্গীকারনামা) প্রথম অনুচ্ছেদে উল্লিখিত জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠার কথাই প্রস্ফুটিত হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে বাংলাদেশের মর্যাদা রক্ষার্থে নিজেদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে একটি গণপরিষদ গঠন এবং গণপরিষদের পক্ষ থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধি নিয়োগ করা হয়। অধ্যাপক ইউসুফ আলী নির্বাচিত চীপ হুইপ হিসাবে তাকে রাষ্ট্রপতি ও উপরাষ্ট্রপতির শপথ পরিচালনার দায়িত্ব প্রদান করা হয়। সেই সঙ্গে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বাংলাদেশের জনগণকে একটি নিয়মতান্ত্রিক ও ন্যায়ানুগ সরকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কার্যভার অর্পণ করা হয়। জাতিসংঘের সনদ মেনে চলার সব প্রতিশ্রুতি জ্ঞাপন করা হয়। জনগণের সার্বভৌমত্বের বিষয়টি তাই প্রাধান্য লাভ করেছে সংবিধানের এই প্রস্তাবনায়। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে, সংবিধানের প্রস্তাবনায়, ৭ ও ১১ অনুচ্ছেদে ও মৌলিক অধিকার এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে বাংলাদেশের জনগণের ক্ষমতায়ন এবং স্বাধীনতার চেতনা ও গণতন্ত্র, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ ও বাস্তবায়নের দৃঢ় প্রত্যয় এবং অভিপ্রায়ের প্রকাশ ঘটেছে। জাতিসংঘ সনদ, সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র, নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারনামা এবং অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার সংবলিত অঙ্গীকারনামার মূল ভাবধারার সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও সংবিধানের মূলনীতিসমূহ একীভূত।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনা ও স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য হিসেবে জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার এবং ন্যায়ানুগ ও নিয়মতান্ত্রিকতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি সরকার প্রতিষ্ঠা করা এবং স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের দৃঢ় প্রত্যয় ও উদ্দেশ্য সাধনের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্বাধীনতা এবং সুবিচার নিশ্চিতকরণের জন্য প্রণীত হয়েছে আমাদের সংবিধান। বাংলাদেশের সংবিধানকে এমনভাবে সুবিন্যস্ত করা হয়েছে যে, এর প্রস্তাবনা ব্যতিরেকে ১১টি ভাগে এটা বিভক্ত। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র সংবিধানের প্রস্তাবনার আলোকে পুরো সংবিধান বুঝতে এবং আত্মস্থ করা প্রতিটি নাগরিকের জন্য আবশ্যকীয় একটি কর্তব্য। প্রথম ভাগে প্রজাতন্ত্রের চরিত্রের বিবরণ, ৭ অনুচ্ছেদ প্রজাতন্ত্রের মৌলিক চরিত্রের নির্দেশক এবং ১১ অনুচ্ছেদে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। ১১ অনুচ্ছেদের একটি বাক্যের মাধ্যমে অনেক প্রশ্নের জবাব মেলে। যেমনÑ প্রজাতন্ত্র বলতে কি বুঝায়; উত্তর মেলে গণতন্ত্র। এ উত্তরের সঙ্গে ৭ অনুচ্ছেদের একটি গভীর যোগসূত্র রয়েছে। ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং জনগণের পক্ষে ক্ষমতা প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হবে।’ প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী, আইন প্রণয়ন এবং বিচারিক এই তিন ধরনের ক্ষমতা কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নিজস্ব ক্ষমতা নয়। শুধু জনগণের পক্ষে এবং জনগণের কল্যাণে সংবিধানের অধীনে আইনানুগভাবে ক্ষমতার প্রয়োগ ছাড়া অন্য কোন স্বার্থ বা কারণে ক্ষমতার অপব্যবহার সংবিধানবহির্ভূত বলে বিবেচিত হবে। সংবিধান এবং আইনবহির্ভূত কোন কাজ অবৈধ বলে গণ্য হবে। এরূপ ঘোষণা প্রদানের সাংবিধানিক দায়িত্ব বিচার বিভাগের ওপর ন্যস্ত। সংবিধান অনুসারে আইন সভার আইন প্রণয়ন করার ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সংবিধানবহির্ভূত আইন বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার মাধ্যমে অবৈধ গণ্য হওয়ার দাবি রাখে। সুবিন্যস্ত ক্ষমতা বিভাজনের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মূল কার্যধারা ও উদ্দেশ্য সফল করার লক্ষ্যে সংবিধানের দ্বিতীয় ও তৃতীয় ভাগে যথাক্রমে, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি এবং মৌলিক অধিকারসমূহ বিধৃত হয়েছে। চতুর্থভাগে ৫৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে প্রজাতন্ত্রের সব নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর ওপর সংবিধান অনুসারে ন্যস্ত থাকবে। মন্ত্রিসভা যৌথভাবে সংসদের নিকট দায়ী থাকবে এবং নির্বাহী বিভাগ সংসদের মাধ্যমে জনগণের নিকট দায়বদ্ধ থাকবে। পঞ্চমভাগে আইন বিভাগ এবং ষষ্ঠভাগে বিচার বিভাগ নিজ নিজ অধিক্ষেত্রে স্বাধীন সত্তা বজায় রেখে সংবিধানে সহজাতভাবে নির্মিত ক্ষমতা পৃথকীকরণের নীতি নিশ্চিত করেছে। তাই সুপ্রীমকোর্ট কর্তৃক মাসদার হোসেন মামলার রায়ে ক্ষমতা পৃথকীকরণ তথা বিচার বিভাগ পৃথক থাকার সাংবিধানিক স্বীকৃতি কার্যকর করা হয়েছে (এটি অবশ্য সংবিধানে বরাবরই বিদ্যমান ছিল)। মাসদার হোসেন মামলার রায়ের মাধ্যমে এর কার্যকারিতা শুরু হয়েছে বলা যেতে পারে। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের কোন সরকারই এই রায় পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন করেনি, বরং মামলার রায় বছর বছর ধরে অমান্য করে চলেছে। ৭ম, ৮ম ও ৯ম ভাগে যথাক্রমে নির্বাচন কমিশন গঠন, মহা-হিসাব নিয়ন্ত্রক ও সরকারী কর্ম বিভাগ ও তার নিয়োগ-পদায়ন, পদোন্নতি, নীতি ও প্রক্রিয়া নির্ধারণের জন্য সরকারী কর্মকমিশন গঠনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। উপরোক্ত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহ রাষ্ট্রের অঙ্গসমূহের ওপর তদারকি তথা মনিটরিং করবে। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচন কমিশন স্বাধীন থাকবে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে আলাদাভাবে ক্ষমতা প্রদান করা যেতে পারে। সরকারী অর্থ, সরকারী হিসাব বা অনুরূপ হিসাব মহা-হিসাব নিয়ন্ত্রক কর্তৃক তদারকি ও পরীক্ষিত হবে। পাশাপাশি সংসদ আইনের মাধ্যমে মহা-হিসাব নিয়ন্ত্রককে আরও ক্ষমতা প্রদান করতে পারে।

বাংলাদেশের কর্ম বিভাগে একটি নিরপেক্ষ সরকারী কর্মকমিশন গঠনের মাধ্যমে প্রজাতন্ত্রের চাকরিতে নিয়োগ ও কর্মের শর্তাবলী নিয়ন্ত্রণ করা হবে। উপরোক্ত তিনটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নিজ নিজ ক্ষেত্রে তদারকির ভূমিকা ছাড়াও সংবিধানের ৭৭ অনুচ্ছেদে ন্যায়পাল নিয়োগের বিধান রয়েছে। অনেক বছর হলো আইন পাস হয়েছে; কিন্তু ন্যায়পাল আজও পর্যন্ত নিয়োগ হয়নি। দ্বিতীয় সংশোধনীর মাধ্যমে নবম (ক) বিভাগে জরুরী অবস্থার বিধান সংযোজিত হয়েছে। ১০ম ভাগ অনুযায়ী সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় সংবিধান সংশোধনের কথা বলা হয়েছে। একাদশ ভাগে প্রজাতন্ত্রের সম্পত্তি তার ওপর নির্বাহী কর্তৃত্ব ও ব্যবস্থাপনা, চুক্তি ও দলিল, আন্তর্জাতিক চুক্তি বিষয়ে ও বাংলাদেশের পক্ষে বা বিপক্ষে মামলা, সাংবিধানিক পদধারীদের পারিশ্রমিক, পদের শপথ, প্রচলিত আইনের হেফাজত, ক্রান্তিকালীন ও অস্থায়ী বিধানাবলী, রহিতকরণ ও সংবিধানে ব্যবহৃত কিছু কিছু শব্দ ও বর্ণের প্রাসঙ্গিক (পধঃবমড়ৎু) সংজ্ঞা ও ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়েছে।

আমাদের সংবিধান মূলত দুই ভাগে বিভক্ত। একটি ভাগ প্রজাতন্ত্রের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, প্রতিশ্রুতি ও বৈশিষ্ট্য অর্থাৎ জনগণের অধিকার, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি, নাগরিকের মৌলিক অধিকার। দ্বিতীয় ভাগে এগুলো বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ ও সংসদকে কি ভূমিকা রাখবে তার বর্ণনা রয়েছে। স্থানীয় সরকারের কাঠামোতে সর্বস্তরে প্রশাসন জনগণের প্রতিনিধিদের তত্ত্বাবধায়ন বলবৎ থাকবে। এবং এগুলো বাস্তবায়ন ও ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরির মূল নক্সা রচনা করা হয়েছে সংবিধানে। এই উদ্দেশ্য সাধনে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা ও দিক নির্দেশনাও বিদ্যমান।

এক সর্বব্যাপী রক্তক্ষয়ী ঐতিহাসিক সংগ্রামের পটভূমিতে সংবিধান ও স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের সৃষ্টি। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র অনুযায়ী ১৯৭১-এর ২৬ মার্চ তারিখ থেকে এটা কার্যকর এবং এতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক উক্তরূপ স্বাধীনতার ঘোষণা দৃঢ়ভাবে অনুমোদন ও সমর্থন করা হয়েছে। এই ঘোষণাপত্রে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর অস্থায়ী সংবিধানে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের স্বীকৃতি রয়েছে। একইভাবে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের সমর্থন ও স্বীকৃতি মেলে সংবিধানের প্রস্তাবনার প্রথম বাক্যে সংবিধানের ১৫০ (৩) অনুচ্ছেদে। যেখানে বলা হয়েছে, ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র এতদ্বারা অনুমোদিত ও সমর্থিত হইল এবং তাহা আইন অনুযায়ী যথার্থভাবে প্রণীত, প্রযুক্ত ও কৃত হইয়াছে বলিয়া ঘোষিত হইল।’ সেই কারণে ৮ম সংশোধনী মামলার রায়ে বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রকে বলেছেন, ‘এবহবংরং ড়ভ ঈড়হংঃরঃঁঃরড়হ’ এবং এ কারণে আমাদের ঈড়হংঃরঃঁঃরড়হ ঁহয়ঁরব এবং ঐ রায়ে বলা আরও বলা হয়েছে, ‘ইধহমষধফবংয ঈড়হংঃরঃঁঃরড়হ রং ধহ ধঁঃড়পযঃযড়হড়ঁং ঈড়হংঃরঃঁঃরড়হ.’

স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে ও সংবিধানের মূল দলিলে এবং এর প্রস্তাবনায় যে মৌলিক মূল্যবোধের কথা বলা হয়েছে তা আমাদের রাষ্ট্রের ভিত্তি। সংবিধানের ভিত্তি কিন্তু দু’বার সামরিক ডিক্রির মাধ্যমে পরিবর্তন করা হয়েছে। এই সম্পর্কে অষ্টম সংশোধনী মামলার রায়ে এ বিষয়ে আমার যুক্তি ও বক্তব্য সমর্থনমূলক ভাষায় প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদ তার ৮ঃয অসবহফসবহঃ ঈধংব ঔঁফমবসবহঃ, চধৎধ ৩২৪-এ উল্লেখ করেছেন : ‘গৎ. গ. অসরৎ-টষ ওংষধস যধং ৎবভবৎৎবফ ঃড় ঃযব চৎড়পষধসধঃরড়হ ড়ভ ওহফবঢ়বহফবহপব ফধঃবফ ১০ঃয অঢ়ৎরষ ১৯৭১ সধফব যিবহ ঃযব ডধৎ ড়ভ ওহফবঢ়বহফবহপব নবমধহ. ঞযরং ফড়পঁসবহঃ ধহফ ঃযব ঈড়হংঃরঃঁঃরড়হ রহপষঁফরহম রঃং চৎবধসনষব ংযড়ি ঃযব ঢ়ৎরহপরঢ়ষবং ধহফ রফবধষং ভড়ৎ যিরপয ড়ঁৎ হধঃরড়হধষ সধৎঃুৎং ংধপৎরভরবফ ঃযবরৎ ষরাবং ধহফ ড়ঁৎ নৎধাব ঢ়বড়ঢ়ষব ফবফরপধঃবফ ঃযবসংবষাবং ঃড় ঃযব ংধরফ ধিৎ. ঊংংবহঃরধষ ভবধঃঁৎবং ড়ভ ঃযবংব ফড়পঁসবহঃং ধৎব চবড়ঢ়ষব’ং ঝড়াবৎবরমহঃু, ঈড়হংঃরঃঁঃরড়হ’ং ংঁঢ়ৎবসধপু, ওহফবঢ়বহফবহঃ ঔঁফরপরধৎু, উবসড়পৎধঃরপ চড়ষরপু নধংবফ ড়হ ভৎবব বষবপঃরড়হ ধহফ লঁংঃরপব. ঐব যধং বসঢ়যধংরুবফ ঃযব ভধপঃ ঃযধঃ ঃযবংব ভঁহফধসবহঃধষ ঢ়ৎরহপরঢ়ষবং বিৎব হড়ঃ ভড়ষষড়বিফ, ধহফ ঃযব নধংরপ ৎরমযঃং বিৎব ফবহরবফ ঃড় ঁং, ফঁৎরহম ঃযব চধশরংঃধহ ৎবমরসব ধহফ ঃযধঃ রং যিু ঃযব ধিৎ ড়ভ ওহফবঢ়বহফবহপব ধিং ভড়ঁমযঃ ধহফ ড়িহ ধহফ পড়হংবয়ঁবহঃষু ঃযবংব ৎরমযঃং ধহফ ঢ়ৎরহপরঢ়ষবং যধাব নববহ বহংযৎরহবফ রহ ঃযব ঈড়হংঃরঃঁঃরড়হ ধং ঃযব ংড়ষবসহ বীঢ়ৎবংংরড়হ ড়ভ ঃযব ঢ়বড়ঢ়ষব’ং রিষষ ধহফ ঃযধঃ ঃযবংব ড়নলবপঃরাবং ধৎব রহঃবহফবফ ঃড় ষধংঃ ভড়ৎ ধষষ ঃরসব ঃড় পড়সব ধহফ হড়ঃ ঃড় নব ংপৎধঢ়বফ নু ধহু সবধহং রহপষঁফরহম ধসবহফসবহঃ ড়ভ ঃযব ঈড়হংঃরঃঁঃরড়হ.’

বাংলাদেশের স্বাধীনতার মাত্র চার বছরের মাথায় জাতির জনক ও তাঁর পরিবারকে নির্মমভাবে হত্যা করে পাকিস্তানের এদেশীয় দোসররা পাকিস্তানী আদলে ’৭৫ সালের ২০ আগস্ট তারিখে সামরিক আইন জারি করে এবং ১৫ আগস্ট তারিখ থেকে তা কার্যকর করে। ’৭৯ সালের ৬ এপ্রিল তারিখ রাত ৮টায় প্রকাশিত এক চৎড়পষধসধঃরড়হ দ্বারা সামরিক আইন প্রত্যাহার করা হয়। যা পরদিন ৭ এপ্রিল তারিখের বাংলাদেশ গেজেটে প্রকাশিত হয়। জরুরী আইন ’৭৯ সালের ২৭ নভেম্বর তারিখে প্রত্যাহার করা হয়। এমনকি ৬ এপ্রিল তারিখে দ্বিতীয় সংসদ, সংবিধান (পঞ্চম সংশোধন) আইন ১৯৭৯, মারফত ’৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ’৭৯ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত সকল সামরিক আইনের বৈধতা প্রদান করে। পরবর্তীতে বাংলাদেশ সুপ্রীমকোর্টের মাননীয় প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের রায়ে অবশ্য সংবিধান (পঞ্চম সংশোধন) আইন অনেক বিলম্বে হলেও বাতিল করা হয়েছে। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ তারিখে লে. জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে এবং দেশে পুনরায় সামরিক শাসন বলবৎ হয়। বাংলাদেশের মানুষ পুনরায় তাদের নাগরিক স্বাধীনতা ও অধিকার হারায়।

১৯৮৬ সালের ১১ নবেম্বর তারিখে প্রণীত সংবিধান (সপ্তম সংশোধন) আইন, ১৯৮৬ মারফত চতুর্থ সংসদ, ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ তারিখ থেকে ১৯৮৬ সালের ১১ নবেম্বর পর্যন্ত সকল সামরিক আইনের বৈধতা প্রদান করে। সুপ্রীমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ অবশ্য আবারও উক্ত সামরিক শাসন অবৈধ ঘোষণা করে সংবিধান (সপ্তম সংশোধন) আইন বাতিল করে। ১৯৮৮ সালের ৯ জুন তারিখে সংবিধান (অষ্টম সংশোধন) আইন, ১৯৮৮, মারফত প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম নির্ধারণ করা হয় এবং সংবিধানের ১০০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করত; হাইকোর্ট বিভাগের স্থায়ী বেঞ্চগুলো বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরে স্থাপন করা হয়। সুপ্রীমকোর্টের আপীল বিভাগ অহধিৎ ঐড়ংংধরহ ঠ. এড়াবৎহসবহঃ ড়ভ ইধহমষধফবংয ১৯৮৯ ইখউ (ঝঢ়বপরধষ ওংংঁব) মোকদ্দমায় এর ০২-৯-১৯৮৯ তারিখের রায়ে সংবিধানের ১০০ অনুচ্ছেদের সংশোধন বাতিল ঘোষণা করে। অতঃপর, রাজধানীর বাইরে অবস্থিত হাইকোর্ট বিভাগের স্থায়ী বেঞ্চগুলো ঢাকায় প্রত্যাবর্তন করে।

সমগ্র বাংলাদেশে প্রচ- বিক্ষোভ ও দুর্বার গণআন্দোলনের মুখে লে. জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর তারিখে রাষ্ট্র্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করে। এর পূর্বে দলমত নির্বিশেষে সকল রাজনৈতিক দল ও জোট বাংলাদেশের তদানীন্তন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদকে একটি নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের আহ্বান জানান। ইতোমধ্যে উপ-রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করে। উক্ত শূন্য পদে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদকে উপ-রাষ্ট্রপতি পদে নিয়োগ প্রদান করে ৬ ডিসেম্বর তারিখে তার নিকট রাষ্ট্রপতি এরশাদ পদত্যাগ করে। উক্ত তারিখেই দেশের তিনটি প্রধান রাজনৈতিক জোট ও দলের স্বতঃস্ফূর্ত আহ্বানে সাড়া দিয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের উদ্দেশ্যে তদানীন্তন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিরপেক্ষ সরকার পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। অতঃপর ’৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে একটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ঐ নির্বাচনে একটি রাজনৈতিক দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে ’৯১-এর ২০ মার্চ সরকার গঠন করে।

উল্লেখ্য যে, আমেরিকার প্রধান বিচারপতি ‘মারবুরি বনাম মেডিসন’ মামলার রায়ে বলেছেন যে, ‘ঞযব ঢ়বড়ঢ়ষব যধাব ধহ ড়ৎরমরহধষ ৎরমযঃ ঃড় বংঃধনষরংয, ভড়ৎ ঃযবরৎ ভঁঃঁৎব মড়াবৎহসবহঃ, ংঁপয ঢ়ৎরহপরঢ়ষবং ধং, রহ ঃযবরৎ ড়ঢ়রহরড়হ, ংযধষষ সড়ংঃ পড়হফঁপব ঃড় ঃযবরৎ ড়হি যধঢ়ঢ়রহবংং. ঞযব বীবৎপরংব ড়ভ ঃযরং ড়ৎরমরহধষ ৎরমযঃ রং ধ াবৎু মৎবধঃ বীবৎঃরড়হ; হড়ৎ পধহ রঃ হড়ৎ ড়ঁমযঃ রঃ ঃড় নব ভৎবয়ঁবহঃষু ৎবঢ়বধঃবফ. ঞযব ঢ়ৎরহপরঢ়ষবং ঃযবৎবভড়ৎব, ংড় বংঃধনষরংযবফ, ধৎব ফববসবফ ভঁহফধসবহঃধষ. অহফ ধং ঃযব ধঁঃযড়ৎরঃু ভৎড়স যিরপয ঃযবু ঢ়ৎড়পববফ রং ঝঁঢ়ৎবসব, ধহফ পধহ ংবষফড়স ধপঃ, ঃযবু ধৎব ফবংরমহবফ ঃড় নব ঢ়বৎসধহবহঃ.’

১৯৬৬ সালের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সংবলিত আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারনামা এবং অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারের সংরক্ষণপুষ্ট আরেকটি অঙ্গীকারনামা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে গৃহীত হয়। এই অঙ্গীকারসমূহের প্রথম অনুচ্ছেদে ঘোষণা করা হয়েছে যে, ‘প্রত্যেক মানুষেরই আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার রয়েছে। সেই অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রত্যেকের স্বাধীনভাবে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক উন্নয়নের অধিকার স্বীকৃত।’ রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকারের এই আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারনামার ২৫ অনুচ্ছেদে ভোটের অধিকার অর্থাৎ স্বাধীন, অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে প্রশাসনে জনগণের অংশগ্রহণের অধিকার স্বীকৃতি পায়। এই অঙ্গীকারনামায় স্বাধীন ও অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সরকার গঠনের অধিকার স্বীকৃতি লাভ করে। তেমনি একইভাবে বাংলাদেশের সংবিধানের ৭ ও ১১ অনুচ্ছেদে সংবিধানের প্রাধান্য, মানবিক ও মানব সত্তার মর্যাদা, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিশ্চিত করার বিধানও প্রণীত হয়। জনগণের ক্ষমতা কার্যকর ও সচল রাখার প্রয়োজনে মত প্রকাশের, তথ্য জানার এবং বৈধ উদ্দেশ্যে সংগঠিত হবার অধিকার; পাশাপাশি সংবিধানের সপ্তম ভাগে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং জনগণের পক্ষে তার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে’ বাস্তবায়ন সম্ভব। তাই এটা নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা সংবিধানে নিশ্চিত করা হয়। ১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ‘প্রজাতন্ত্র হইবে গণতন্ত্র, যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকিবে, মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হইবে এবং প্রশাসনের সকল পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হইবে।’

গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে জনগণের স¤পদ ও মালিকানা এবং উৎপাদন ও বণ্টন প্রণালীসমূহ নিয়ন্ত্রণে জনগণের অধিকার এবং কৃষক, শ্রমিক ও জনগণের অনগ্রসর অংশসমূহকে শোষণ থেকে মুক্তির প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। মানুষের মৌলিক প্রয়োজন নিশ্চিত করার জন্যে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণ নিশ্চিত করা এবং সামাজিক নিরাপত্তা ও বেকারত্ব থেকে মুক্তি এবং ব্যাধিগ্রস্ত, পঙ্গু, বিধবা, এতিম, বৃদ্ধ ও ভাগ্যহতদের জন্য রাষ্ট্রের বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ রয়েছে। সেই সাথে গ্রামের উন্নয়ন, নগর ও গ্রামের মধ্যে বৈষম্য দূরীকরণ, কৃষিবিপ্লবের বিকাশ, গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সৃষ্টি, শিক্ষা, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও জনস্বাস্থ্যের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলের আমূল পরিবর্তনের ব্যবস্থা, গণমুখী সার্বজনীন শিক্ষা, অবৈতনিক বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা, সময়ের সঙ্গে শিক্ষাকে সঙ্গতিপূর্ণ করা এবং শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রকৃত দেশপ্রেমিক নাগরিক সৃষ্টি, নিরক্ষরতা দূরীকরণ, পুষ্টি ও জনস্বাস্থ্য এবং নৈতিকতার উন্নয়ন, সবার জন্য সুযোগের সমতা, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবিচার থেকে মুক্তি, স¤পদের সুষম বণ্টন, কর্মের অধিকার ও কর্মকে কর্তব্যে পরিণত করা, নির্বাহী বিভাগ হতে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ, নাগরিক ও সরকারী কর্মচারীদের কর্তব্য বিধান, জাতীয় সংস্কৃতির বিকাশ, ইতিহাস ও ঐতিহাসিক বস্তু এবং স্থানসমূহের বিকৃতি ও ক্ষতিসাধন রোধ, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার উন্নয়ন সবই আমাদের সংবিধানের প্রত্যয় ও প্রতিশ্রুতি। সেই সঙ্গে প্রতিটি নাগরিকের জন্য মৌলিক অধিকার-যথা আইনের দৃষ্টিতে সমতা, নারী ও পুরুষের সমান অধিকার, ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণের কারণে বৈষম্য দূরীকরণ, সরকারী নিয়োগলাভে সুযোগের সমতা, আইনের আশ্রয়লাভের অধিকার, জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতার অধিকার রক্ষা, গ্রেফতার ও অবৈধ আটক স¤পর্কে অধিকারের রক্ষাকবচ, জবরদস্তি শ্রম ও নিবর্তনমূলক আটকের ব্যাপারে বিধিবদ্ধতা, বিচার ও দ- স¤পর্কে বিধিবদ্ধতা রক্ষাকরণ, ভ্রমণের স্বাধীনতা, সংগঠনের অধিকার, চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক্ স্বাধীনতা, পেশা, ধর্ম পালন ও স¤পত্তি ভোগের অধিকার, গৃহ ও যোগাযোগের রক্ষণ, মৌলিক অধিকার বাস্তবায়নের অধিকার। এ সবই আমাদের মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা বিধান করে। এই সকল অধিকার বিশ্বজনীন মানবাধিকার সনদে এবং আন্তর্জাতিক দুটি অঙ্গীকারনামায় সন্নিবেশিত। উপরন্তু মানবিক মর্যাদা ও মানবসত্তার মর্যাদা আমাদের সংবিধানেই শুধু স্থান লাভ করেছে। কারণ, যুগ যুগ ধরে আমাদের এ অধিকার স্বেচ্ছাচার, স্বৈরাচার ও শক্তিধরদের কাছে নিষ্পেষিত হয়ে বংশপরম্পরায় আমরা স্বেচ্ছাচারী শাসকদের দুঃশাসনের শিকার হয়েছি। প্রতিটি মানুষ ও তাদের পরিবার বংশপরম্পরায় শোষণ, বঞ্চনা, অন্যায় ও অত্যাচারের শিকার ও সাক্ষী।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে, সংবিধানের প্রস্তাবনায়, ৭ ও ১১ অনুচ্ছেদে মানবিক মর্যাদা ও মৌলিক অধিকার এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে বাংলাদেশের জনগণের ক্ষমতায়ন, স্বাধীনতার চেতনা ও গণতন্ত্র, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ ও বাস্তবায়নের দৃঢ় প্রত্যয় এবং অভিপ্রায়ের প্রকাশ ঘটেছে। জাতিসংঘ সনদ, সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র, আন্তর্জাতিক দুটি অঙ্গীকারনামায় সংবলিত মূল ভাবধারার সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও সংবিধানের মূলনীতিসমূহ একীভূত। আমাদের সংবিধান ও স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র সৃষ্টি হয় এক রক্তক্ষয়ী ঐতিহাসিক সংগ্রামের পরিপ্রেক্ষিতে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মানব সভ্যতার বিরুদ্ধে প্রচ- হুমকিস্বরূপ হিটলারের আবির্ভাব পৃথিবীতে যেমন এক অসহনীয় ত্রাসের সৃষ্টি করে, তেমনি ’৭১-এর নৃশংস গণহত্যা, ভয়াবহ অত্যাচার, মর্মান্তিক অবিচার ও সামরিক ব্যাভিচারের মাধ্যমে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী মানবতাবিরোধী অপরাধের আরেকটি কলঙ্কময় অধ্যায় সৃষ্টি করেছিল। বিশ্বজুড়ে ফ্যাসিবাদের একই রূপ। মানব সভ্যতা ও মানবাধিকারের বিরুদ্ধে একই হুমকি কখনও বাংলাদেশের নর-নারী ও শিশুকে নরকঙ্কালে, গলিত মৃতদেহে, গণকবরে ও শবদাহে পরিণত করেছে। কখনও বসনিয়া, রুয়ান্ডা, ইথিওপিয়া অথবা প্যালেস্টাইনের শিশু, নারী ও নিরীহ জনগণের ওপর হামলা, হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ বা আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর অত্যাচার বা আমেরিকার রেড ইন্ডিয়ানদের নির্মূলন ও কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের অধিকারহরণ, মধ্যযুগে আফ্রিকার মানুষদের নিয়ে পশ্চিমা দেশে দাস বিক্রির ব্যবসা, শোষণ ও লুণ্ঠনের জিঘাংসা, হিটলারের গ্যাস চেম্বার ও সশস্ত্র সংঘর্ষে বিভিন্ন দেশে গণহত্যা, ধর্মের নামে জঙ্গী হামলা এসব অন্যায় যুদ্ধ যেমন মানব সভ্যতার বিরুদ্ধে ভ্রƒকুটি তেমনি বাংলাদেশের গণহত্যা, গণকবর, বুদ্ধিজীবীদের হত্যা, নারী ধর্ষণ, লুট ও অগ্নিসংযোগ, গ্রামের পর গ্রাম পুড়িয়ে দেয়া, এক জনপদ থেকে অপর জনপদে বাস্তুহারা মানুষের দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর মিছিল, শরণার্থীদের আশ্রয় শিবিরে গুলিবর্ষণ, শিশুহত্যার পৈশাচিকতা এ সবই বাঙালী জাতির কালরাত্রির দুঃস্বপ্নের মতো বিশ্ব মানবাধিকারের বিরুদ্ধে তীব্র ভ্রƒকুটি।

বাংলাদেশের বীর যোদ্ধাদের লড়াই ছিল জঘন্য গণহত্যার বিরুদ্ধে মানুষের মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দৃঢ় অঙ্গীকার। তাই বাংলাদেশের সব মানুষই মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার বীর যোদ্ধা। সেই গৌরবোজ্জ্বল বীরত্বের ঐতিহ্য নিয়ে বাঙালী তাই এগিয়ে চলেছে জনগণের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা ও প্রতিটি মানুষের মানবিক সত্তার মর্যাদা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে। স্বাধীনতার চেতনাবোধ আর স্বাধীন সত্তার গৌরবম-িত অধিকারের উচ্চারণ ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ।’ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালে বাঙালী জাতি স্বাধীন সত্তা প্রতিষ্ঠা করেছে; কিন্তু ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ’ এই উপলব্ধি আজও বাস্তবায়িত হয়নি। সংবিধানের কর্তৃত্ব ও প্রাধান্য অক্ষুণœ রাখার পবিত্র অঙ্গীকার বারবার ব্যর্থ হয়েছে। ’৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা, জাতীয় চার নেতাকে কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে নৃশংসভাবে হত্যা বাঙালী জাতির ললাটে কলঙ্ক লেপন করেছে। এই কলঙ্কের সঙ্গে যোগ হয়েছে একটার পর একটা ব্যর্থতা। সংবিধানে স্বাধীনতার প্রথম স্বাক্ষরে জাতির পিতা উচ্চারণ করেছিলেন ‘জনগণ সকল ক্ষমতার মালিক’ এবং ‘যে কোন ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা স¤পত্তির নিশ্চয়তা বিধান হবে আইনের আশ্রয় লাভের মাধ্যমে।’ ৪৩ বছর পর, ’৭১-এর গণহত্যার বিচার আজ চলছে। স্বাধীনতার প্রাণ-পিতাকে হত্যা করা হলো। তাঁর জীবন ও দেহের নিরাপত্তা ঘাতকরা ছিনিয়ে নিল। সেই জঘন্য অপরাধের বিচার হয়ে কারও কারও শাস্তি হলেও কিছু ঘাতক এখনও পলাতক। তেমনি বিচার হয়নি আরও অনেক হত্যা ও অপরাধের। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শিকার হয়েছে কেউ বন্দীশালায়, কেউ পুলিশ হেফাজতে কেউবা স্বগৃহে বা শিক্ষাঙ্গনে। অজস্র হত্যা, ধর্ষণের বিচার এখনও হয়নি। অনুসন্ধান বা তদন্ত থামিয়ে দেয়া অথবা ধামাচাপা পড়েছে নানাভাবে। এভাবে অতীতে রাজনীতিকে অপরাধ আর সন্ত্রাসের সঙ্গে সংযুক্ত করে সমাজকে ধ্বংসের শেষসীমায় নিয়ে যাওয়া হয়। আইন এবং আদালতকে করা হয় নীরব দর্শক। রাজনৈতিক ও সন্ত্রাসী হত্যাকা- সংঘটিত করে জনগণের মৌলিক অধিকারকে শৃঙ্খলিত করা হয়। আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার, জীবন এবং দেহের নিরাপত্তা এসব থেকে জাতির পিতা ও তাঁর পরিবারের মতো সাধারণ মানুষও হয় বঞ্চিত। প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী শাহ এএসএমএস কিবরিয়া গ্রেনেড হামলার শিকার হন। তারই প্রতিবাদে ২০০৪-এর ২১ আগস্ট সন্ত্রাসবিরোধী জনসভায় গ্রেনেড হামলা করা হয়; লক্ষ্য ছিল বঙ্গবন্ধু তনয়া বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব। শীর্ষ নেতৃবৃন্দের নিরাপত্তা বেষ্টনির চাদরের মধ্য থেকে শেখ হাসিনা প্রাণে রক্ষা পান। কিন্তু আইভি রহমানসহ ২২ জন নেতাকর্মী নিহত ও শতাধিক জন আহত হন। তার সঠিক তদন্ত করতে দেয়া হয়নি। তদন্তের নামে আসল আসামিদের আড়াল করে জজ মিয়ার নাটক তৈরি করা হয়। এই ঘৃণ্য ও পৈশাচিক ঘটনার নেপথ্য পরিকল্পনায় যারা ছিল; যারা ঘটনার পূর্বে ও পরে সহায়তা করে অর্থ ও অস্ত্র যোগান দিয়েছে-তারা এখনও আড়ালে থেকে ষড়যন্ত্র করে চলেছে। এ কোন্্ আইনের শাসন? এ কোন্্ মানবাধিকারের বাস্তবায়ন? আইনী প্রক্রিয়ার এই সীমাবদ্ধতা বা অক্ষমতা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন; আইনের শাসনের এমন অসহায় পরাজয় জনগণ মেনে নেয়নি। তাই সরকারের কাছে বাংলার মানুষের সাংবিধানিক প্রত্যাশা আর এই সরকারের সাংবিধানিক প্রতীতির আন্তরিক বাস্তবায়ন এবং সে জন্য উপযুক্ত কৌশল রচনা সময়ের সবচেয়ে জরুরী দাবি আজ।

এছাড়াও রয়েছে সংবিধানের স্খলন। পঞ্চম, সপ্তম ও অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় মূলনীতির পরিবর্তন, রাষ্ট্রধর্ম সৃষ্টির মাধ্যমে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের মাঝে অনৈক্য সৃষ্টি, অর্পিত ও শত্রু স¤পত্তি আইনকে অব্যাহত রাখার মাধ্যমে নাগরিকদের অধিকারের বৈষম্য সৃষ্টি, অবৈধ ক্ষমতা দখল ও অসাংবিধানিক সকল ক্রিয়া-কর্ম ও পরিবর্তনকে বৈধতা দান এসবই ঐরূপ স্খলনের উদাহরণ। সংবিধান রক্ষা করার অঙ্গীকার করে যারা শপথ নিয়েছিল তাদের স্খলন আর সেই সঙ্গে সংবিধানকে রক্ষা করতে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের ব্যর্থতা এক ধরনের হতাশায় রূপ নিয়েছিল। এই অন্ধকারের অমানিশা থেকে বেরিয়ে এসে সংবিধানের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের জন্য দিনবদলের যে প্রত্যাশা সেই আহ্বানে সাড়া দিয়েছে এদেশের বীর জনগণ; বারবার ছিনিয়ে এনেছে নিরঙ্কুশ বিজয়। জনগণের এই বিজয় সংহত করে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক স্তরে সাংবিধানিক প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটাতে হবে।

সংবিধান রচনার ৪২ বছর পরও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় একটি ন্যায়ানুগ ও নিরপেক্ষ প্রশাসন গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের জন্য সংবিধানের ১৩৩ অনুচ্ছেদে সংসদে যে আইন প্রণয়ন করার কথা ছিল তা আজও পর্যন্ত করা হয়নি। রাষ্ট্রপতি কর্তৃক রুলস ও রেগুলেশনের মাধ্যমে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের চাকরি সংক্রান্ত নীতিমালা এখন

প্রকাশিত : ৬ নভেম্বর ২০১৪

০৬/১১/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: