কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

পাগড়ি

প্রকাশিত : ৬ নভেম্বর ২০১৪

মাখরাজ খান

বিয়ের বর যখন পাগড়ি মাথায় দিয়ে কনেবাড়ি যান, তখন তিনি রাজা। কারণ পাগড়ি রাজা এবং সম্রাটদের মাথার শোভাবর্ধন করত, তাঁদের পাগড়িকে বলা হতো মুকুট আর নওশার মুকুটকে বলা হয় পাগড়ি। পাগড়ির ইতিহাস দীর্ঘ; মানুষ সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এর আবির্ভাব ঘটেছে। মুসলমানদের পাগড়ির সঙ্গে একটি ঐতিহ্যগত সম্পর্ক রয়েছে, এ কারণেই বোধহয় আরব দেশে জাতীয় পোশাকের অপরিহার্য অংশ হচ্ছে পাগড়ি। পরে আরবের এই জাতীয় পোশাকের অপরিহার্য অংশটি অন্যান্য মুসলিম দেশে ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় প্রত্যেক মুসলিম শাসকই পাগড়ি পরতেন, পরবর্তী সময় মুসলিম সামরিক কর্মচারী এবং বেসামরিক লোকজনও পাগড়ি পরতে থাকেন। জনশ্রুতি আছে, বাদশা সিকান্দার তাঁর মাথায় গজানো শিং লুকিয়ে রাখার জন্য পাগড়ি ব্যবহার করতেন। অবশ্য ওই সময় অন্যান্য মুসলমান বাদশা এবং সম্রাট সোনার মুকুট ব্যবহার করতেন বলে ইতিহাসে প্রমাণ পাওয়া যায়। পাগড়ি যে শুধু মুসলমানেরা ব্যবহার করতেন তা কিন্তু নয়, খ্রীস্টান এবং ইহুদীদের মধ্যেও পাগড়ি ব্যবহারের প্রচলন ছিল। হারুন-উর রশীদের সময় খ্রীস্টানদের পাগড়ি ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হয়েছিল। তবে শর্ত ছিল যে, তারা শুধু হলুদ রঙের পাগড়ি ব্যবহার করতে পারবে। কোনভাবেই সাদা বা অন্য কোন রঙের পাগড়ি ব্যবহার করতে পারবে না। অন্যদিকে ফাতেমীয় বংশের খলিফা হাকিম খ্রীস্টানদের কালো রঙের পাগড়ি ব্যবহারের ইজাজত দিয়েছিলেন।

ঐতিহাসিকদের ধারণা, আব্বাসীয় খলিফাদের ওপর ক্রুদ্ধ হয়ে বিধর্মীদের তিনি কালো রঙের পাগড়ি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিলেন, কারণ আব্বাসীয় খলিফারা কালো পাগড়ি পরতে পছন্দ করতেন। রাজ কর্মচারী এবং সভাসদের মধ্যে পাগড়ির ব্যবহার ছিল এ কথা আগেই উল্লেখ করেছি। পাহারাদার এবং শাস্ত্রীদের মধ্যেও পাগড়ির ব্যবহার ছিল। শাস্ত্রীরা আসামি বেঁধে আনার কাজে পাগড়ির ব্যবহার করতেন এবং কোন কোন সময় জল্লাদেরা পাগড়ি দিয়ে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত আসামির দ- কার্যকর করার জন্য পাগড়ি ব্যবহার করতেন। ওই সব পাগড়ির রং ছিল লাল। মিসরসহ কয়েকটি মুসলিম দেশে একসময় পাগড়ি ব্যবহারের জন্য বয়সসীমা নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছিল। ওই সময় ৭ থেকে ১০ বছর বয়সী বালকদের পাগড়ি ব্যবহার করতে দেয়া হতো না।

কম বয়সী বালকদের পাগড়ি ব্যবহার নির্লজ্জতার বহির্প্রকাশ হিসেবে গণ্য করা হতো।

পাগড়ির কাপড় কি রঙের হবে এবং কতটুকু মাথার পেছনে থাকবে এ নিয়েও বিভিন্ন সময় বিতর্কের অবতারণা হয়েছে। অনেক মুসলিম মনীষী মনে করতেন, পাগড়ি বাঁধার পর ঘাড়ের ওপর এক বিঘত কাপড় থাকলেই পাগড়ি উত্তম হবে। আবার অনেকেই বলেছেন, পাগড়ির কাপড়ের কোন মাপজোক নেই এবং এর রঙেরও কোন বাধাধরা নিয়ম নেই। তবে কালো রঙের পাগড়িকে শোকের প্রতীক হিসেবে মনে করা হতো। অবশ্য এটা শক্তির প্রতীকরূপে চিহ্নিত ছিল। বিখ্যাত আধ্যাত্মিক সাধক এবং কোন কোন সাহাবা কালো রঙের পাগড়ি ব্যবহার করতেন বলে জানা যায়। হাসান বশরী এবং আমির মুয়াবিয়ার নাম এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে। পাগড়ির বহুবিধ ব্যবহারের মধ্যে কূপ থেকে পানি তোলার উল্লেখ রয়েছে। শেখ সাদী তাঁর বুস্তায় একটি ঘটনার উল্লেখ করে বলেছেন, এক পথচারী পিপাসার্ত কুকুরকে পানি পান করানোর জন্য টুপিকে বালতি এবং পাগড়িকে দড়ি হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন।

লেখার শুরুতেই বিয়ের বরের পাগড়ির কথা উল্লেখ করেছিলামÑ পাগড়ি ছাড়া যেমন বরকে মানায় না, শূন্য শূন্য লাগে, মনে হয় কি যেন নেই, প্রকৃতপক্ষে ঐতিহ্যের সঙ্গে পাগড়ির মেলবন্ধন ঘটেছে বলেই এমন মনে হয়। হিন্দুরা বিয়ের সময় টোপর পরে থাকে, তাদের মধ্যেও পাগড়ি পরার নজির আছে।

প্রকাশিত : ৬ নভেম্বর ২০১৪

০৬/১১/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: