কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

নিজামীর ফাঁসির রায়ে সন্তুষ্ট শহীদ রুমি বদির বন্ধুরা

প্রকাশিত : ৩০ অক্টোবর ২০১৪

সুমি খান ॥ একাত্তরের জঘন্য ঘাতক মানবতাবিরোধী অপরাধী আলবদর বাহিনীর প্রধান নিজামীর বিরুদ্ধে একাত্তরে ধর্ষণ, হত্যা ও গণহত্যাসহ প্রসিকিউশন আনীত ১৬ অভিযোগের মধ্যে আটটি প্রমাণিত হয়েছে। এর মধ্যে চারটিতে তাকে মৃত্যুদ- এবং অন্য চারটিতে যাবজ্জীবন কারাদ- দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল।

মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াত আমির মতিউর রহমান নিজামীর চারটি যুদ্ধাপরাধ সন্দেহাতীত প্রমাণিত হওয়ায় তাকে চূড়ান্ত সাজা দেয়া হয়েছে। রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে আদালতে সাক্ষ্য দেয়া বুদ্ধিজীবী, শহীদ পরিবারের সদস্য ও মুক্তিযোদ্ধারা।

১৯৭১ সালের ১৫ নবেম্বর সোমবার ভোরে হাতিরপুল-ফ্রি স্কুল স্ট্রীট এলাকা কর্ডন করে ঘিরে ফেলে আলবদর, রাজাকার বাহিনী ও পাকিস্তানী সেনারা। সে সময় ঢাকা মেডিক্যালের সার্জারি বিভাগের তরুণ উদ্যমী এবং মানবতাবাদী চিকিৎসক ডাক্তার আজহারুল হক তার স্ত্রী সালমা হককে নিয়ে ২২ হাতিরপুল (বর্তমান ইস্টার্ন প্লাজা) এলাকায় থাকতেন। এর মাত্র এক বছর ৯ মাস আগে ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৭০ সালে তরুণ উদ্যমী এবং মানবতাবাদী চিকিৎসক ডাক্তার আজহারুল হকের সঙ্গে বিয়ে হয় সালমা হকের। তখন প্রায় প্রতিদিনই হাতিরপুল এলাকার গলি খুপচিতে লুকিয়ে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের শেল্টারগুলোতে গিয়ে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা সেবা দিতেন ডা. আজহার। এই তথ্য জানতে পারে আলবদর বাহিনীÑএমন সন্দেহ করেন সালমা হক। ১৯৭১ সালের ১৫ নবেম্বর সোমবার ভোরে ডা. আজহারের একমাত্র এ্যাপ্রোনটি ধোপার দোকান থেকে আনতে বলেন কাজের ছেলেকে। রবিবার সাপ্তাহিক ছুটি থাকার কারণে সেদিনই ডা. আজহারের সারা সপ্তাহ ব্যবহার করা একমাত্র এ্যাপ্রোনটি ধোপার দোকান থেকে ইস্ত্রি করে সোমবার সেটা পরে হাসপাতালে যেতেন। একাত্তরের সেই শেষ সোমবার আসে ডাক্তার আজহারের জীবনে। সেদিনের ঘটনা বলতে গিয়ে জনকণ্ঠকে সালমা হক বললেন, গৃহকর্মী ছেলেটি এসে জানায়, এলাকা চারিদিকে ঘিরে রেখেছে অনেক লোক। সালমা হক তার কাছে জানতে চাইলেন, সেসব লোক কোন ভাষায় কথা বলেÑ বাংলা না উর্দু? ছেলেটি জানায়, তারা বাংলাতেই কথা বলছে। সালমা হক বলে ওঠেন, ‘আরে তুই রাজাকার দেখে ভয় পেলি?’ ডাক্তার আজহারুল হকসহ অন্যদের নিতে আসা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের এ্যাম্বুলেন্সটিও গলিতে ঢুকতে দেয়া হয়নি। এ্যাম্বুলেন্স এবং এ্যাপ্রোন না পেলেও তরুণ উদ্যমী এবং মানবতাবাদী চিকিৎসক ডাক্তার আজহারুল হক ঘরে বসে থাকতে পারলেন না। বিপদ মাথায় নিয়ে অস্থির হয়ে স্টেথোস্কোপ গলায় ঝুলিয়ে হাসপাতালে যাবার জন্য বেরুতে উদ্যত হন। এ সময়ে আলবদর বাহিনীর ৫ সদস্য এসে চোখ আর হাত বেঁধে ডাক্তার আজহারুল হককে নিয়ে যায়। ডাক্তার আজহারুল হক ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ক্লিনিক্যাল প্যাথলজির শিক্ষক ছিলেন। ৫ জনের মধ্যে অস্ত্রধারী ৪ জন হাল্কা জলপাই রঙের একই রকমের ইউনিফর্ম পরিহিত ছিল। একজন সাধারণ পোশাকে মাফলার গলায় এবং সানগ্লাস পরা ছিল। পরবর্তীতে এই ঘাতকের পরিচয় খোঁজ নিতে গিয়ে জানা গেছে, আলবদর বাহিনীর এই নেতা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজেরই ক্লিনিক্যাল প্যাথলজি বিভাগের ইন্টার্নির ছাত্র এবং ইসলামী ছাত্রসংঘ সংগঠক এহসানুল করিম। এই ঘাতক পরবর্তীতে মধ্যপ্রাচ্যে পালিয়ে গেছে বলে জানা যায়। আদালতে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে শহীদ জায়া সালমা হক বলেন, মতিউর রহমান নিজামীর নির্দেশনাতেই ইসলামী ছাত্রসংঘ সদস্যরা বাঙালী নিধনে মেতে উঠেছিল। যার ধারাবাহিকতায় তরুণ উদ্যমী এবং মানবতাবাদী চিকিৎসক ডাক্তার আজহারুল হককে নিয়ে হত্যা করে ঘাতক বদর বাহিনী। ১৬ নবেম্বর সকালে নটরডেম কলেজের পাশের রাস্তার নালায় ডাক্তার আজহারের মুখ এবং হাত বাঁধা লাশ পাওয়া যায়। নিজামীর রায় শুনে সালমা হক জনকণ্ঠকে বলেন, অনেক স্বস্তি বোধ করছি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পর ভেবেছিলাম এদেশে কখনো আর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে না। বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রমাণ করলেন, স্বাধীন বিচার ব্যবস্থায় অপরাধী তার প্রাপ্য শাস্তি পাবেই। শহীদদের কাছে সারা জাতি কৃতজ্ঞ। তিনি বলেন, এই রক্তঋণ শোধ করার দায় সকলের। নতুন প্রজন্মের কাছে তাই একাত্তরের মহান আত্মদানের ইতিহাস উঠে আসবে। আর লুকিয়ে রাখা যাবে না। উল্লেখ্য, নিজামীর বিরুদ্ধে ১৬ নম্বর অভিযোগে বলা হয়েছে, দেশের বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করতে নীলনক্সা করেছেন মতিউর রহমান নিজামী ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানিয়ে ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন বলেন, একাত্তরের ঘাতকদের বিচার শুরু করেছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, যা বিশ্বের ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক অধ্যায়। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করা যাবেÑ কখনও এটা ভাবা যায়নি। এখন সেটা সম্ভব হয়েছেÑ এটাই সবচেয়ে বড় কথা। তিনি বলেন, রায় যাই হোক, কিছু রায় অন্তত আমরা পাচ্ছি। মতিউর রহমান নিজামীর অপরাধ প্রসঙ্গে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন বলেন, “নিজামীর রাজনীতি পাকিস্তানপন্থী। তার মতো নিষ্ঠুর মানুষ বাংলাদেশে কম আছে। তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মারলেও নির্যাতিত মানুষদের কম মনে হবে। তার নির্দেশে নিরীহ বাঙালীদের নির্যাতনকারী যত পাকিস্তানী রাজাকার আছে, সবাইকে একে একে শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

রায় ঘোষণা উপলক্ষে বুধবার সকাল থেকেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বাইরে হাইকোর্ট এলাকায় অবস্থান নেয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড, মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

ঢাকার গেরিলা যোদ্ধা শহীদ রুমি, বদি, জুয়েল ও আজাদ হত্যার দায়ে জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে উত্থাপিত ৮ নম্বর অভিযোগ আদালতে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলেছেন ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি ইনায়েতুর রহিম। জীবনপণ করে দেশমাতৃকাকে স্বাধীন করতে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশ নেন গেরিলা যোদ্ধা রুমি, বদি, জুয়েল ও আজাদসহ অনেকে। শহীদ রুমি এবং আজাদের বন্ধু ছিলেন নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু ও বিচ্ছু জালাল। আদালত কক্ষে রায় শুনে সন্তোষ প্রকাশ করেন এই দুই গেরিলা যোদ্ধা। রায়ে বলা হয়, একাত্তরের ৩০ আগস্ট নাখালপাড়ার পুরনো এমপি হোস্টেলে গিয়ে সেখানে আটক রুমি, বদি, জালালদের হত্যায় প্ররোচণা দেন নিজামী।

জনকণ্ঠকে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে অশ্রুসজল চোখে নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু বলেন, আমি আজ খুব আবেগতাড়িত। এই নিজামী পাকিস্তানী বাহিনীকে প্ররোচিত করে আমার বন্ধু রুমি, আজাদসহ দেশের তিরিশ লাখ মানুষকে হত্যা করেছে। রুমি, বদি, জুয়েলকে ধরে যে নির্যাতন ক্যাম্পে নেয়া হয়েছিল সেখানে নিজামী প্রায়ই যেত। তখন নিজামী পাকিস্তানী ক্যাপ্টেনকে বলেছিল, “রাষ্ট্রপতির সাধারণ ক্ষমার আগেই ওদের মেরে ফেলতে হবে।” তাদের হত্যার পরে তাদের পরিবারের সদস্যরাও কাঁদতে কাঁদতে মারা যায়। আমরা বন্ধুরাও ঠিক থাকতে পারিনি ওই সময়। সারা বাংলাদেশের মানুষ কেঁদেছে তখন। একাত্তরের স্মৃতিচারণ করে এমন ঘৃণ্য ঘাতকের মৃত্যুদ-ের রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বলেন, “সেই হত্যাযজ্ঞের অপরাধসহ বুদ্ধিজীবী হত্যা ও অন্যান্য হত্যার ঘটনায় আজ নিজামীর বিচার হয়েছে। এই বিচারে একটি ঐতিহাসিক রায় হয়েছে। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমি এই রায়ে সন্তুষ্ট।” শহীদ রুমিদের সঙ্গেই পাকবাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়েছিলেন বিচ্ছু জালাল। পরে পালিয়ে বাঁচেন তিনি।

রায়ের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ঢাকার গেরিলা যোদ্ধা বিচ্ছু জালাল জনকণ্ঠকে বলেন, “তাকে আমরা মারবার চেষ্টা করেছি অনেকবার, কিন্তু পারি নাই। মৃত্যুদ- নিজামীর প্রাপ্য ছিল। একাত্তরে ঢাকার গেরিলা এবং সাধারণ মানুষ এই নিজামী-মুজাহিদদের আতঙ্কে ছিলাম। “এ আতঙ্ক এবং তার অপরাধের হাত থেকে মানুষকে বাঁচাতে তাকে আমরা ওই সময়ে কয়েক বার হত্যার চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমরা পারিনি। আজ আদালত রায়ের মাধ্যমে তাকে মৃত্যুদ-ে দন্ডিত করল।” মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক জনকণ্ঠকে বলেন, “আদালত রায়ে বলেছে, ধর্মকে ব্যবহার একাত্তরে বুদ্ধিজীবী হত্যা, সাধারণ নাগরিক হত্যা, ধর্ষণসহ মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করেছে নিজামী। চারটি অভিযোগে তার মৃত্যুদ- দেয়া হয়েছে। এটি একটি ব্যতিক্রমী রায়।”

মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ভাইস প্রেসিডেন্ট ইশমত কাদির গামা সকাল থেকেই ট্রাইব্যুনাল এলাকার বাইরে এসে রায়ের অপেক্ষায় ছিলেন। ফাঁসির খবর শুনে উল্লাস প্রকাশ করে তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, “এ রায় বাঙালীর অত্যন্ত প্রত্যাশিত রায় ছিল। এ রায়ের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে- স্বাধীনতাবিরোধী একটি চক্র অতীতে দেশ নিয়ে ষড়যন্ত্রে সক্রিয় ছিল।” বর্তমানেও তারা বিভিন্ন জায়গায় সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে মন্তব্য করে তাদের প্রতিহত করার আহ্বান জানান তিনি। রায় ঘোষণার পর মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ডের সভাপতি মেহেদী হাসান বলেন, “জাতির দীর্ঘদিনের আশা পূরণ হয়েছে। ফাঁসির রায়ের মাধ্যমে জাতির কিছুটা হলেও কলঙ্ক মোচন হয়েছে। এখন এই রায় বাস্তবায়ন করতে হবে।”

প্রকাশিত : ৩০ অক্টোবর ২০১৪

৩০/১০/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: