মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

অস্থির সমাজ শেষ ॥ বখাটেদের নিত্যদিনের উৎপাত ঠেকাতে চাই প্রতিবাদ, প্রতিরোধ

প্রকাশিত : ২৭ অক্টোবর ২০১৪

ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে সামাজিক সচেতনতা

রশিদ মামুন ॥ নিত্যদিনের সেই উৎপাত। বখাটেরা পথ আটকায়। পায়ের স্যান্ডেল খুলে বখাটের মুখে এক ঘা বসিয়ে দেয় মেয়েটি। রাগে মনের ভেতরটা জ্বলতে থাকে। ইচ্ছা হয় এখনই মেয়েটিকে শেষ করে ফেলতে। কিন্তু একজন দুইজন করে অসংখ্য মানুষ এসে ঘিরে ধরে। এবার পালানোর পথ খোঁজে বখাটে ছেলের দল। সম্প্রতি এমন একটি টিভি কমার্শিয়াল (টিভিসি) প্রচারিত হচ্ছে। প্রতিবাদ করতে শেখা মানুষের বিপদে মানুষকে এগিয়ে আসতে শেখার এই দৃষ্টান্ত সমাজেও স্থাপন করতে হবে। আর তা হচ্ছেও। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর হার বৃদ্ধি করতে হবে। এর সঙ্গে জীবন সুন্দর, আকাশ, বাতাস, পাহাড়, সমুদ্র, সবুজ বনানী ঘেরা প্রকৃতি সুন্দর আর সবচেয়ে সুন্দর এই বেঁচে থাকা। এই কথাটা সকলকে বুঝতে হবে। বেঁচে থাকাটা যেন অর্থহীন না হয়ে ওঠে সেই চেষ্টাই সব সময় করতে হবে। প্রয়োজনে প্রতিবাদ করতে হবে প্রতিরোধ করতে হবে। মানসিকভাবে দৃঢ় হতে হবে। তাহলেই নির্যাতন থেকে রেহাই মিলতে পারে। একইসঙ্গে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা বাড়াতে হবে। এজন্য পরিবার আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোঃ কামাল উদ্দিন এ প্রসঙ্গে বলেন, জীবন নদীর মতোই প্রবাহমান। নদীকে বাঁধ দিলে যেমন কর্দমাক্ত হয়ে নষ্ট হয় জীবনও ওই রকম। বখে যাওয়া প্রতিরোধে খেলাধুলা এবং সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চার ব্যবস্থা করতে হবে। এখন রাজধানীর অধিকাংশ স্কুলগুলোতে যার ব্যবস্থা নেই। ছেলেমেয়েরা বই আর ইন্টারনেটে মুখ ডুবিয়ে থাকে। যা জীবনের প্রবাহকে বিঘিœত করছে। এছাড়া সন্তান পালন পদ্ধতিতে সন্তানের মতামতের গুরুত্ব দেয়া তাদের সঙ্গে বন্ধুর মতো আচরণ করা তাদের সমস্যা শোনা এবং সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। তিনি বলেন, একই ঘটনায় একজন ভেঙ্গে পড়ছে আবার অন্যজন পাত্তা দিচ্ছে না। অর্থাৎ সে মানসিকভাবে দৃঢ়তা অর্জন করতে পেরেছে সেজন্যই প্রতিবাদ করছে। আবার এটাও ঠিক নয়, শুধু প্রতিবাদ করেই যাবে সামাজিকভাবে এর কোন ব্যবস্থা নেয়া হবে না। এজন্য প্রত্যেক নাগরিককে সামাজিক দায়িত্ব পালন করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে যথাযথভাবে কাজ করতে হবে।

বাংলাদেশে প্রচলিত দ-বিধির ৫০৯ ধারা অনুযায়ী কেউ যদি কোন নারীর শালীনতার অমর্যাদা করার জন্য কোন মন্তব্য বা অঙ্গভঙ্গি বা কোন বস্তু প্রদর্শন করে তাহলে ওই ব্যক্তি এক বছর কারাদ- বা অর্থদ- বা উভয় দ-ে দ-িত হবে। উৎপাতের ফলে কেউ যদি মানসিক বা শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, দ-বিধির ৩৫২ ধারায় উৎপাতকারীকে শান্তি দেয়া যাবে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন (সংশোধিত), ২০০৩-এর ১০ (২) ধারায় বলা হয়েছে, কোন পুরুষ তার যৌন কামনা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে কোন নারীর শ্লীলতাহানি করলে বা অশোভন অঙ্গভঙ্গি করলে তার জন্য এ কাজ হবে যৌন হয়রানি এবং এ কাজের জন্য ওই পুরুষকে অনধিক সাত বছর অন্যূন তিন বছরের সশ্রম কারাদ- দেয়া যেতে পারে। ঢাকা মহানগরীর পুলিশ অধ্যাদেশ, ১৯৭৬-এর ৭৬ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কেউ রাস্তায় বা সাধারণের ব্যবহার্য স্থানে কোন নারীকে পীড়ন করে বা তার পথ রোধ করে অথবা অশালীন ভাষা ব্যবহার করে, অশ্লীল আওয়াজ বা অঙ্গভঙ্গি বা মন্তব্য করে তবে সেই ব্যক্তি এক বছর পর্যন্ত মেয়াদের কারাদ- বা দুই হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা উভয় প্রকার দ-ে দ-িত হবে। এছাড়া দ-বিধির ১৮৬০ এর ২৯৪ ধারা, দ-বিধির ৪৯৩ ধারা, পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১২ তে নির্যাতনের শিকার করা হয়েছে। যৌন হয়রানির ভয়াবহতা বিবেচনা করে ২০১১ সালের ২৬ জানুয়ারি উচ্চ আদালত ইভটিজিং শব্দের ব্যবহার নিষিদ্ধ করে তার বদলে ‘যৌন হয়রানি’ শব্দটি ব্যবহার করতে নির্দেশ দিয়েছেন। এত সব আইন আদেশ থাকার পরও কমছে না নির্যাতনের ঘটনা।

তবে এত সব হতাশার মধ্যেও আশার খবর হচ্ছে এখনও কোন কোন ক্ষেত্রে মানুষ এগিয়ে আসছে। রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া যৌনপল্লীতে শনিবার সকালে ১৩ বছরের এক কিশোরীকে বিক্রি করার সময় নারী পাচারকারী চক্রের দালাল রুবেলকে (২২) স্থানীয়রা গণধোলাই দিয়ে পুলিশে দিয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আখাউড়া উপজেলার মসজিদ পাড়া গ্রামের গোলাম সারোয়ারের ছেলে রুবেল মেয়েটিকে আখাউড়া স্টেশন থেকে ফুসলে গোয়ালন্দ নিয়ে আসে। রুবেল তাকে গার্মেন্টেসে ভাল চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে শনিবার ভোরে দৌলতদিয়া রেলস্টেশনে বসিয়ে রেখে তাকে যৌনপল্লীতে বিক্রির তদ্বির করছিল। স্থানীয়রা এ সময় বিষয়টি টের পেয়ে রুবেলকে পাকড়াও করে গণধোলাই দিয়ে পুলিশে খবর দেয়। এ বিষয়ে স্থানীয় থানায় মামলা হয়। কিশোরীকে তার অভিভাবকের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

প্রতিবাদ বা সামাজিক উদ্যোগ নিলে এসব ঘটনা এখনও প্রতিরোধ করা সম্ভব। মেয়েদের জন্য নিরাপদ নাগরিকত্ব (মেজনিন) প্রকল্পর মাধ্যমে বেসরকারী সংস্থা ব্র্যাকের এ ধরনের একটি প্রকল্প রয়েছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের নিয়ে পৃথক কমিটি করে বখাটেদের হয়রানির প্রতিরোধ করা হচ্ছে। মেয়েদের শেখানো হচ্ছে কিভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হয়। এই উদ্যোগ নেয়ার ফলে দেখা যাচ্ছে যেসব স্কুলে এই প্রকল্প নেই তাদের চেয়ে এই স্কুলগুলোর অবস্থা ভাল।

মেজনিন প্রকল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্র্যাকের এসএম সাদিয়া আলম বলেন, আমরা প্রথম যখন কাজ শুরু করেছিলাম তখনকার তুলনায় এখন পরিস্থিতি অনেক ভাল। কেউ নির্যাতনের শিকার হলে আগে যেমন প্রতিবাদ করতে কেউ আসত না এখন প্রতিরোধ হচ্ছে। মেয়েরা নিজেও সচেতন হচ্ছে। এ ধরনের পদক্ষেপ আরও নেয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।

জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামাল বলেন, আগে যেভাবে সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যমে শিশুরা বড় হতো এখন তা একেবারে নেই। আমরা যেমন কচিকাঁচার মেলা-ছায়ানট করেছি এখন আর তা তেমন কেউ করে না। পরিবারগুলোও উৎসাহ দেয় না। আমরা কোন দিন ভাবতে পারিনি আমাদের বন্ধুরা এ ধরনের কাজ করবে। এখনকার ছেলেরা যা করছে। তিনি বলেন, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মধ্যেই অনেক রকম শিক্ষা রয়েছে এসব শিক্ষাকেও যদি বাস্তব জীবনে কাজে লাগানো যায় তাহলেও সমাজে শান্তি ফিরে আসবে। তিনি বলেন, এছাড়াও দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে যাবে যাতে এ ধরনের ঘটনা ঘটলেও তার যথাযথ শাস্তি হয়।

প্রকাশিত : ২৭ অক্টোবর ২০১৪

২৭/১০/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: