আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ব্রাজিলের ফুটবলে বিশ্বকাপের ভূত!

প্রকাশিত : ১ জুলাই ২০১৫
  • অতশী রহমান

ব্রাজিলের ফুটবল থেকে এখনও বিশ্বকাপের ভূত কাটেনি! কোপা আমেরিকা ফুটবলের কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নেয়ার পর আবারও বিষয়টি চাউর হয়েছে। ফুটবল বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জার্মানির কাছে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে হারের ধাক্কা এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি রেকর্ড সর্বোচ্চ পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।

বিশ্বকাপের পর টানা এগারো ম্যাচে জয় পায় ব্রাজিল। কিন্তু সেগুলো ছিল আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ। মূল আসরে এসে কেমন যেন খেই হারিয়ে ফেলেছে সেলেসাওরা। কোপা আমেরিকায় কোন ম্যাচেই তেমন ঔজ্জ্বল্য ছড়াতে পারেনি কার্লোস দুঙ্গার দল। অধিনায়ক নেইমার লালকার্ড দেখে বহিষ্কার হয়েছেন। সব মিলিয়ে ব্রাজিলিয়ান ফুটবল ধুঁকছে সাফল্যের জন্য।

চার বছর আগে কোপা থেকে টাইব্রেকারে ছিটকে যাওয়ার ক্ষতটা এখনও তরতাজা। এবার তাই দারুণ সুযোগ ছিল সেই পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয়ার। কিন্তু না, এবারও সেই ২০১১ কোপার চিত্রনাট্য। কোপা আমেরিকার কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হয় ব্রাজিল-প্যারাগুয়ে। একই মঞ্চে ঠিক একইভাবে হেরে আরেকবার স্বপ্ন-ভঙ্গের বেদনায় ডুবেছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। ২০১১ কোপায় ব্রাজিলের কোচ ছিলেন লুইস ফিলিপ সোলারি। যার অধীনে নিজেদের মাটিতে বিশ্বকাপেও লজ্জাজনকভাবে বিদায় নিয়েছিল ব্রাজিল। তার উত্তরসূরি হিসেবেই গত বিশ্বকাপের পর ব্রাজিলের দায়িত্ব গ্রহণ করেন কার্লোস দুঙ্গা। দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই রীতিমতো উড়তে থাকে ব্রাজিল। গড়ে টানা এগারো ম্যাচ জয়ের রেকর্ডও। কিন্তু কোপা আমেরিকার মূল মঞ্চে এসেই নিস্প্রভ তার দল। ফেবারিট হিসেবে টুর্নামেন্টে যাত্রা শুরু করলেও কোয়ার্টার ফাইনালের বাধা পেরুতে পারেনি তারা।

প্যারাগুয়ের বিরুদ্ধে কেন এমন পরাজয়? ব্রাজিলের কোচ জানিয়েছেন, তার দলের খেলোয়াড়রা নাকি শেষ আটের লড়াইয়ের আগে থেকেই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন। কেউ মাথা ব্যথা আবার কেউবা পিঠের ব্যথায় ভুগছিলেন। যদিও বা সেগুলোকে হারের অজুহাত হিসেবে দাঁড় করাতে নারাজ দুঙ্গা, ‘এটাকে হারের অজুহাত হিসেবে দাঁড় করাব না। কিন্তু এই সপ্তাহে আমাদের ১৫ জন খেলোয়াড় ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। খেলোয়াড়দের অনেকে মাথা এবং পিঠের ব্যথায় ভুগছিলেন। কারও অসুস্থতা অন্যের চেয়ে বেশি ছিল। অনেকে বমিও করেছেন। ম্যাচের প্রথমার্ধের পর উইলিয়ানের অবস্থা ভাল ছিল না। ম্যাচের শেষে রবিনহোরও একই অবস্থা ছিল।’ টুর্নামেন্টের গ্রুপপর্বে কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচে ঝামেলায় জড়িয়ে লালকার্ড দেখেন নেইমার। শাস্তি হিসেবে কোপা থেকেই বাদ। ফলে নেইমারবিহীন ব্রাজিল কিছুটা দুর্বলই ছিল প্যারাগুয়ের বিরুদ্ধে। দলের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় না থাকায় কিছুটা প্রভাব যে ম্যাচে পড়েছে তা স্বীকার করেছেন দুঙ্গাও। তার মতে, ‘ঐতিহাসিকভাবে কোপা আমেরিকা বেশ জটিল একটি টুর্নামেন্ট। ব্রাজিল এখানে বেশ কয়েকবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। যখন আপনি জিতবেন তখন কেউ কিছুই বলবে না। কিন্তু হারলে সবাই বলবে কিছু একটা যেন ছিল না। নেইমার আমাদের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ একজন, যেমনটা বার্সিলোনার জন্যও। কিন্তু আমাদের আরও কিছু ভাল মানের খেলোয়াড় ছিল, যারা তাদের নামের সুবিচার করতে পারেনি।’

এরপরও অবশ্য হতাশ হচ্ছেন না ব্রাজিলের কোচ। সামনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই এগুনোর প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন দুঙ্গা, ‘আমরা কোপা জিততে চেয়েছিলাম কিন্তু পারিনি। তবে বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করাই এখন আমাদের সর্বোচ্চ লক্ষ্য।’ কোপা আমেরিকায় ঢুস-কা-ে নিষিদ্ধ হওয়ার পর ক্ষমা চেয়েছিলেন নেইমার। সেই ঘটনার পর বেফাঁস এক মন্তব্যের কারণে ক্ষমা চাইতে হয়েছে কার্লোস দুঙ্গাকেও। সাম্প্রতিক পারফর্মেন্সের কারণে ব্রাজিল দলের ওপর যথেষ্ট চাপ ছিল। আর তা ব্যাখ্যা করতে গিয়েই ঝামেলাটা পাকিয়েছেন দুঙ্গা। তিনি বলেছিলেন, ‘৪০ বছর ধরে কোপা আমেরিকা ও ২৪ বছর ধরে বিশ্বকাপ না জেতার চাপ সইতে হয়েছে আমাকে। সবকিছুই তখন বিরুদ্ধে ছিল। যা করি, তাতেই সমালোচনা। আমি কি আফ্রিকান বংশোদ্ভূত যে আমাকে এত সমালোচনা সইতে হচ্ছে।’ দুঙ্গার এই আফ্রিকান বংশোদ্ভূত শব্দযুগল নিয়েই সমালোচনার ঝড় ওঠে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখেই ব্রাজিল ফুটবল ফেডারেশনের ওয়েবসাইটে এক বিবৃতির মাধ্যমে ক্ষমা চেয়ে নেন দুঙ্গা।

অবাক করা বিষয় হচ্ছে, বিশ্বকাপ ও কোপা দু’জায়গাতেই ব্রাজিল ব্যর্থ হয়েছে নেইমারের অভাবের কারণে। ঘরের মাঠে বিশ্বকাপে কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে আঘাত পাওয়ার কারণে নেইমার সেমিফাইনাল খেলতে পারেননি জার্মানির বিরুদ্ধে। যার পরিণতি কি হয়েছিল সবাই জানে। ইতিহাসের লজ্জাজনক হার বরণ করতে হয়েছিল সেলেসাওদের। কোপার শেষ আট থেকেও বিদায়ঘণ্টা বেজেছে ব্রাজিলের। এখানেও নিষেধাজ্ঞার কারণে খেলতে পারেননি নেইমার। গ্রুপপর্বে কলম্বিয়ার কাছে দুই যুগ পর হারের জ্বালা সইতে পারেননি ব্রাজিল অধিনায়ক নেইমার। যে কারণে মেজাজ হারিয়ে বসেন তিনি। ওই ম্যাচ শেষে গোটা ব্রাজিল দল রেফারির কড়া সমালোচনা করে। কোচ কার্লোস দুঙ্গা, অধিনায়ক নেইমার, ডিফেন্ডার দানিয়েল আলভেজসহ প্রায় সবাই চিলিয়ান রেফারির মু-ুপাত করছেন। তাদের মতে, সবাই যেন উঠেপড়ে লেগেছে ব্রাজিলকে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় করতে। কেউ কেউ তো বলে দিয়েছেন, সবাই ব্রাজিলের শত্রু!

কলম্বিয়ার বিপক্ষে প্রথমার্ধের শেষ দিকে হাত দিয়ে বল থামিয়ে হলুদ কার্ড দেখেন নেইমার। কিছুক্ষণ পর হতাশায় বলে ঘুষি মেরেও পার পেয়ে যান বার্সিলোনার এই ফরোয়ার্ড। ম্যাচের শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই হতাশায় কলম্বিয়ার পাবলো আরমেরোকে লক্ষ্য করে বলে লাথি মারেন নেইমার। এরপরই বিবাদে জড়িয়ে পড়েন দু’দলের খেলোয়াড়রা। নেইমার ধাক্কা মারেন কলম্বিয়ার গোলদাতাকে। আর কলম্বিয়ার কার্লোস বাক্কা পেছন থেকে নেইমারকে ধাক্কা মারেন। এই ঘটনায় ম্যাচ শেষে ফেরার সময় রেফারি ছুটে গিয়ে লালকার্ড দেখান নেইমারকে। বাক্কাকেও পেতে হয় একই শাস্তি। ২০১৪ বিশ্বকাপে কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে কোয়ার্টার ফাইনালে জুয়ান জুনিগার মারাত্মক ফাউলে চোট পেয়ে পরের ম্যাচগুলো আর খেলতে পারেননি নেইমার। ব্রাজিল সেমিফাইনালে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলে হেরে যায়।

কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচ নিয়ে ব্রাজিলের ফুটবলাররাও সমালোচনা করেন রেফারির। তাদের মতে, সবাই যেন ব্রাজিলের বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লেগেছে। টুর্নামেন্টে নেইমার যে দুটো হলুদ কার্ড দেখেছেন সেটা নিয়েও কথা হচ্ছে। প্রথম ম্যাচে নেইমারকে হলুদ কার্ড দেখানো হয় হাত দিয়ে ভ্যানিশিং স্প্রে মুছে ফেলার জন্য! আর দ্বিতীয় ম্যাচে হাত দিয়ে বল ধরার অপরাধে। অবশ্য রিপ্লেতে দেখা গেছে, নেইমারের হ্যান্ডবলটি সম্ভবত ইচ্ছাকৃত ছিল না। অভিযোগ আছে শুরু থেকে নেইমারকে লক্ষ্য বানিয়ে কলম্বিয়ার ফুটবলাররা একের পর এক ফাউল করে যাওয়ারও। বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দানি আলভেজ বলেন, জানি না নেইমার কেন নার্ভাস ছিল। তবে দোষ কিন্তু রেফারির। ওরা তো জানেই নেইমার কেমন। ওকে প্রথমেই যে হলুদ কার্ডটা দেখানো হলো, সেটা একেবারেই ভুল সিদ্ধান্ত। ওই ধাক্কা থেকে আর বের হতে পারেনি ব্রাজিল। টানা দ্বিতীয়বারের মতো কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নিতে হয়েছে সাবেক বিশ্বসেরাদের। সুসময় হারিয় তাই ধুঁকছে এখন ব্রাজিলের ফুটবল।

প্রকাশিত : ১ জুলাই ২০১৫

০১/০৭/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: