কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

পাইলস কি একটি গোপন রোগ

প্রকাশিত : ৩০ জুন ২০১৫

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। আধুনিক ও বিজ্ঞান মনস্ক মানুষ। তারপরও তার যত আক্ষেপ ও অনুশোচনা। মনে হয় কোন পাপ করেছি। নইলে আজ এভাবে একটা বিব্রতকর অবস্থায় পড়লাম কেন? কি সেই অনুশোচনা? কি সেই পাপ? আমাদের দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এখনও পাইলস হওয়াকে একটি গোপন রোগ হিসেবে মনে করেন। কেউ কেউ বলেন, এটি কি কাউকে বলা যায়? আমার স্ত্রীও জানে না যে আমার পাইলস হয়েছে। মূল সমস্যা হলো চিকিৎসকের কাছে এসে পাইলসের গোপন স্থানটি দেখাতে হবে। এখানেই যত সমস্যা। অনেকেই এতে লজ্জা পান। কারও হার্টে কোন অসুবিধা হলে বা টনসিলে ব্যথা হলে যে কারও সঙ্গে খোলামেলা আলাপ করেন। অথচ পাইলসের ব্যাপারে সম্পূর্ণ উল্টো। আধুনিক এক যুবকের কথা বলছি। চেম্বারে ঢুকে প্রথমে তার সঙ্গী সকলকে বাইরে যেতে বললেন, তারপর স্ত্রীকেও। এরপর রুমে আমি এবং সেই যুবক রোগী। আমাকে অনুরোধ করলেন চেম্বারের পর্দাঘেরা অংশে যেতে। আমিও কিছু বারণ করছি না। ভাবছি হয়ত তার গোপন কোন রোগ বা যৌন রোগ আছে। আশ্চর্য হলাম তখন যখন রোগীটি খুবই বিব্রতভাবে আমাকে বললেন যে স্যার আমার মলদ্বার দিয়ে রক্ত যায়। আমি খুবই বিব্রতকর অবস্থায় আছি। আমার স্ত্রীকেও জানাতে চাই না। দয়া করে আমাকে একটু চিকিৎসা দিন।

অন্য একজন রোগী বয়স ৬০। হাউজিং-এর অফিসার ছিলেন। বহু বছর আগে ঢাকা শহরে এক হাতুড়ে চিকিৎসকের হাতে মলদ্বারে ইঞ্জেকশন নিয়েছেন। পরে খোঁজখবর নিয়ে জেনেছেন, মলদ্বারে নাইট্রিক এ্যাসিড ইঞ্জেকশন দেয়া হয়েছে। ঐ ইঞ্জেকশন দেয়ার পর মলদ্বারের আশপাশে মাংস পচে গিয়ে মলদ্বার এমনই সরু হয়েছে যে তিনি এখন মলত্যাগ করতে পারেন না। সামান্য ছিদ্র দিয়ে সবসময় পায়খানা চুঁইয়ে পড়ে। ভিতরে সর্বদা তুলার প্যাড পড়ে থাকেন।

তাকে বললাম, দেশে আইন রয়েছে, শরীরে এ্যাসিড দিলে তার সাজা হয়, আপনি বিচার চান। রোগীর উত্তর ছিল এরূপ, ‘স্যার বয়স হয়েছে মেয়ে জামাই আছে, নাতি আছে, সমাজে এটি জানাজানি হয়ে গেলে মুখ দেখাতে পারব না। তাই এ ঘটনা প্রকাশ করতে চাইনা। আপনি দেখুন কিছু করতে পারেন কিনা।’

এ কারণে আমাদের দেশে পাইলসের হাতুড়ে চিকিৎসার এত প্রসার। প্রতিদিন মলদ্বারে হাতুড়ে অপচিকিৎসার জটিলতা নিয়ে রোগীরা আমাদের কাছে আসেন। যখন তিনি বুঝতে পারেন, অপচিকিৎসায় তার মলদ্বার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তখন লোকলজ্জার ভয়ে এবং বোকামির কথা ভেবে কেউই হাতুড়ে ডাক্তারের বিচার চাইতে যান না। সবারই একই কথাÑ হাতুড়ে চিকিৎসার কুফল আমাদের জানা ছিল না এবং সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হবার কারণে কেউই নিজের দুরবস্থার কথা পর্যন্ত প্রচার করতে চান না।

অনেকে বলেন, স্যার আমার পাইলস অপারেশন হয়েছে শুনে সহকর্মীদের অনেকেই বলল, তারও বহুদিন যাবত এ সমস্যা আছে কিন্তু কাউকে দেখাননি। এ সমস্ত সহকর্মী আগে কখনও এ ব্যাপারে মুখ খোলেননি।

অনেক রোগী বিশেষত মহিলা রোগীরা বছরের পর বছর ভোগেন কিন্তু কাউকে দেখান না। শেষ পর্যন্ত যখন বয়স বেড়ে যায়, ৬০-৭০ হয়, তখন আর সহ্য করতে পারেন না। শরীরে অন্যান্য রোগ যেমন ডায়াবেটিস, স্ট্রোক ইত্যাদি হয়েছে তখন ছেলে বা নাতিপুতিদের নিয়ে আসেন এবং বলেন, দীর্ঘ ২৫ বছর যাবত উনি কাউকে দেখাবেন না বলে জেদ ধরেছিলেন। এখন আর সহ্য করতে পারছেন না। এই ভোগান্তির মূল কারণ কুসংস্কার। দেশের একজন নামকরা উপাচার্যের স্ত্রীর পাইলস হয়েছে বহু বছর যাবত। কিন্তু তিনি ডাক্তার দেখাবেন না। শেষে এমন অবস্থা যে পায়খানা না করলেও রক্ত যায়। তার কয়েক ছেলেমেয়ে ডাক্তার ও ইঞ্জিনিয়ার। শেষ পর্যন্ত তাকে দেখলাম এবং বললাম, বিনা অপারেশনে তিনি ভাল হবেন। কিন্তু রোগী বিশ্বাস করলেন না। অতঃপর দু’বার তার রিংলাইগেশন পদ্ধতিতে বিনা অপারেশনে পাইলস চিকিৎসা করায় তিনি সম্পূর্ণ ভাল হন। এরপর তিনি মন্তব্য করলেন, ভেবেছিলাম পাইলস নিয়েই কবরে যাব। এখন দেখলাম এত সহজে ভাল হওয়া যায়। কেন যে অযথা এত ভুগলাম।

সম্মাানিত রোগীদের জ্ঞাতার্থে বলছি, মলদ্বারের প্রতিটি রোগ বিজ্ঞানসম্মত এবং এর প্রতিটি রোগই চিকিৎসার সম্পূর্ণরূপে ভাল হয়। বিশেষ করে পাইলস ৯০% বিনা অপারেশনে ভাল করা যায়। বিগত নয় বছরে ২,৩৪৫ জন রোগীকে রিংলাইগেশন পদ্ধতিতে বিনা অপারেশনে চিকিৎসা করে আমি দৃঢ়ভাবে আস্থাবান যে, শতকরা ৯০% পাইলস রোগী বিনা অপারেশনে ভাল হন।

অধ্যাপক ডা. একেএম ফজলুল হক

বৃহদন্ত্র ও পায়ুপথ সার্জারি বিশেষজ্ঞ

ফেলো, কলোরেকটাল সার্জারি (সিংগাপুর)

ইন্টারন্যাশনাল স্কলার, কলোরেকটাল সার্জারি (যুক্তরাষ্ট্র)

প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান (অব), কলোরেকটাল সার্জারি বিভাগ বিএসএমএমইউ, ফোন : ০১৭২৬-৭০৩১১৬।

প্রকাশিত : ৩০ জুন ২০১৫

৩০/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: