কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

নারীর জন্য চাই নিরাপত্তা

প্রকাশিত : ২৬ জুন ২০১৫
  • রেজাউল করিম খোকন

আজকাল ঘরে-বাইরে নানাভাবে যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন নারী। পাঁচ বছরের শিশু থেকে শুরু করে কিশোরী, তরুণী, যুবতী, গৃহবধূ এমনকি পঞ্চাশোর্ধ নারীও ধর্ষণ ও নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। চরিত্রহীন, লম্পট, বিকৃত রুচির পুরুষের পাশবিকতার শিকার হতে হচ্ছে অসহায় নারীদের। কাউকে নিজের বাড়ি থেকে অপহরণ করা হচ্ছে, আবার কাউকে রাস্তা থেকে জোর করে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, আবার কারও অসহায়ত্ব, দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে হিংস্র হায়নার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ছে মানুষরূপী পশুগুলো। প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শুরু করে মফস্বল শহর এমনকি ঢাকার মতো রাজধানী শহরেও প্রতিদিনই ঘটছে নারী ধর্ষণ ও নিপীড়নের ঘটনাগুলো। প্রতিদিন পত্রিকার পাতা ওল্টালেই চোখে পড়ছে এ ধরনের অসংখ্য খবর। আমাদের চারপাশে ঘটে যাওয়া সব ঘটনার বিবরণ তো পত্রিকার পাতায় আসে না। পুরুষের জান্তব লালসার শিকার হওয়া নির্যাতিতা নারীদের ধর্ষণের বেশিরভাগই লজ্জা-অপমানে ভয়ে সঙ্কোচে ব্যাপারটি লুকিয়ে রাখেন।

অনেক ধর্ষণের ঘটনার কথা কেউ জানতে পারে না। ধর্ষিতা মেয়ের বাবা-মা ইচ্ছে করেই সন্তানের ভবিষ্যত জীবনের কথা ভেবে বিষয়টি অন্যদের পারতপক্ষে জানতে দেন না। যে ধরনের ঘটনাগুলোর কথা প্রকাশ পায়, সেগুলোর বিবরণ খবরের কাগজের পাতায় দেখি। আজকাল ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায়ও প্রকাশ পায়। এ নিয়ে তোলপাড় হয়, থানা পুলিশ, মামলা-সালিশ হয়। কোথাও গ্রাম্যসালিশে ধর্ষণকারীর সঙ্গে জোর করেই ধর্ষিতা মেয়েটির বিয়ের রায় ঘোষণা করা হয়। আবার ধর্ষিতার শাস্তি হিসেবে অর্থ জরিমানা করা হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ধর্ষণকারীরা সামাজিক, রাজনৈতিক, প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় থাকার কারণে অভিযোগ থেকে সহজেই রেহাই পেয়ে যায়। অনেক সময় অপমানের জ্বালা সইতে না পেরে ধর্ষিতা আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। যদি ধর্ষিতা নারীটি জঘন্য অপরাধের শাস্তি দাবি করে বিচারপ্রার্থী হয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষের কাছে ধর্ষণের বিচার চেয়ে অভিযোগ করে, তবে তাকে যে পরিমাণ হয়রানি, লাঞ্ছনা আর অপমানের শিকার হতে হয়, তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। ধর্ষিতার ডাক্তারি পরীক্ষায় লঙ্ঘিত হচ্ছে হাইকোর্টের নির্দেশনা। হাসপাতালে সাধারণত যে কোন ধরনের অপারেশনে নারীর শরীরে কোন না কোন পোশাক পরানো হলেও ধর্ষিতাকে মেডিক্যাল টেস্ট করার সময় তার শরীরে কোন কাপড় রাখা হয় না বলে হরদম অভিযোগ পাওয়া যায়। ডাক্তারের সামনে সহকারীরা ধর্ষিতার শরীরের নানা অংশ টেপাটেপি করে পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে। তারা যেভাবে পরীক্ষা করেন, তা নিন্তাতই অমানবিক ও অপমানজনক। অনেক ধর্ষিতা নারী আক্ষেপ করে বলেছেন, এমন করে পরীক্ষা করে আগে জানলে ধর্ষণের অভিযোগই করতাম না। একে তো ধর্ষণের অভিজ্ঞতা, তারপর ধর্ষণ প্রমাণ করার পরীক্ষা হিসেবে মেডিক্যাল পরীক্ষার নামে নিপীড়ন। এভাবেই চলছে দিনের পর দিন। সবার বিরক্তি, অস্বস্তি কিংবা আপত্তি কোন কিছুকেই আমলে না নিয়ে প্রশ্নাতীতভাবেই জারি রাখা হয়েছে দীর্ঘদিন ধরে চর্চিত ধর্ষণ প্রমাণের ‘টু ফিঙ্গার টেস্ট’। ধর্ষণ প্রমাণের এ ব্যবস্থা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত অপমানজনক। মূলত বিশ্বব্যাপী ফৌজদারি আইনবিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, পুলিশ এবং ফরেনসিক বিজ্ঞানীরা বলেছেন, টু ফিঙ্গার টেস্ট পরীক্ষার কোন বৈজ্ঞানিক গ্রহণযোগ্যতা নেই। বাংলাদেশে ধর্ষিতা নারীর ধর্ষণের আলামত পরীক্ষার নামে ‘টু ফিঙ্গার টেস্ট’ পরীক্ষার মাধ্যমে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের মানদ- লঙ্ঘন করা হচ্ছে জঘন্যভাবে। দুই আঙুলের মাধ্যমে ধর্ষণ পরীক্ষা পদ্ধতির বিরুদ্ধে জনমত গড়ে ওঠার প্রেক্ষিতে টু ফিঙ্গার টেস্ট বাতিল করে একটি নীতিমালা করতে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালককে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। এতদিনেও হাইকোর্টের সেই নির্দেশনা মানা হয়নি। ‘টু ফিঙ্গার টেস্ট‘ কখনই নারী শরীরের ভিন্নতর গঠন বাস্তবতাকে নির্ণয় করার ক্ষমতা রাখে না। ধর্ষণ মামলার মেডিক্যাল সনদের সামগ্রিক পদ্ধতিগুলো ধর্ষণের শিকার নারীর প্রতি যৌন আক্রমণ, হয়রানি এবং নারীর শারীরিক ও মানবিক নির্যাতনের ইতিহাস নয়, বরং নারীর অতীত যৌন ইতিহাস দেখতেই যেন আগ্রহী।

গত চার বছরে যৌন হয়রানির শিকার হয়ে ৯৯ নারী আত্মহত্যা করেছেন। যৌন হয়রানিতে বাধা দেয়ায় লাঞ্ছিত হয়েছেন ২ হাজারেরও বেশি নারী। সাম্প্রতিক সময়ে জনসমক্ষে নারীর যৌন হয়রানি বিষয়ে এক সেমিনারে দেশের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী প্রস্তুতকৃত প্রবন্ধে একজন গবেষক তুলে ধরেছেনÑ গত চার বছরে ১১ থেকে ১৫ বছরের মেয়েরা সবচেয়ে বেশি যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে। যৌন নিপীড়করা মেয়েদের হাত বা ওড়না ধরে টানার মধ্যে থেমে থাকেনি। ধর্ষণ ও অপহরণের হুমকিও দিয়েছে। পহেলা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বর সংলগ্ন স্থানে নারীদের ওপর যে সংঘবদ্ধ যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে, তাতে গোটা জাতি স্তম্ভিত হয়ে গেছে। সবাই প্রতিবাদে ফেটে পড়লেও আজও প্রকৃত অপরাধী, ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের আটক করতে পারেনি অইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর ঢাকা শহরের কুড়িল থেকে চলন্ত মাইক্রোবাসে একজন তরুণীকে তুলে নিয়ে গণধর্ষণের ঘটনাটি আমাদের সমাজের বিকট ও বীভৎস চেহারাই তুলে ধরেছে। কয়েকদিন আগে চলন্ত বাসে তরুণী যাত্রীকে বাসের ড্রাইভার হেলপারসহ কয়েকজন মিলে উপর্যুপরি ধর্ষণ করেছে। এ ধরনের ঘটনাগুলো আমাদের ভীষণভাবে আলোড়িত করে, বিক্ষুব্ধ করে, আমরা প্রচ-ভাবে বিচলিত হই। রাজধানীর মোহাম্মদপুরে একটি অভিজাত স্কুলে ছাত্রীদের যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়ার সংবাদে আমরা অস্থির এবং দুশ্চিন্তাগ্রস্ত না হয়ে পারি না।

আমাদের কন্যা কিংবা বোনকে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়ে যদি তাদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত থাকি, তাহলে এর চেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার আর কী হতে পারে। একের পর এক এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্পৃহতা, উদাসীনতা, নিষ্ক্রিয়তার প্রমাণ দেয়। মেয়েদের পথে-ঘাটে, কর্মক্ষেত্রে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, শপিংমলে, যানবাহনে যৌন হয়রানি এবং ধর্ষণের শিকার হতে হচ্ছে প্রায়ই। তারা কি চায় না মেয়েরা ঘরের বাইরে যাক? নিরাপদে নির্ভয়ে নিঃসঙ্কোচে বিচরণ করুক সর্বত্র? পুরুষ যদি বাইরে বেরোতে পারে, নারীরা কেন পারবে না? একজন নারীকে রাষ্ট্র ও সমাজ নিরাপত্তা দিতে পারছে না কেন? একজন নারী কেন ঘর থেকে নিরাপদে কাজের জায়গায় যেতে কিংবা কাজের জায়গা থেকে নির্ভয়ে নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারবে না? এই দেশটাতো নারী-পুরুষ সবার। কুড়িলে রাস্তা থেকে আদিবাসী মেয়েটিকে গাড়িতে তোলার সময় আশপাশে তো অনেক মানুষ ছিল। রাত তখন বেশিও হয়নি। কিন্তু সমাজ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কারোরই সহায়তা পায়নি অসহায় মেয়েটি। এর চেয়ে লজ্জার ব্যাপার আর কী হতে পারে? আমরা নারীর জন্য নিরাপদ শহর চাই, নিরাপদ গ্রাম চাই, আমরা চাই নারী নির্ভয়ে চলাফেরা করুক।

প্রকাশিত : ২৬ জুন ২০১৫

২৬/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: