রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

কবিতা ॥ লু স্যুনের কবিতা

প্রকাশিত : ১৯ জুন ২০১৫
  • ভাষান্তর : আলমগীর রেজা চৌধুরী

লু স্যুন সাহিত্যিক, চিন্তানায়ক, বিপ্লবী, দেশপ্রেমিক ও আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব। চীনা জনগণের

বিপ্লবের সঙ্গে তাঁর সাহিত্যিক ও মতাদর্শ নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে। বিংশ শতাব্দীর

সাহিত্যের কা-ারি রূপে তাঁর রচনায় সমকালীন রাজনৈতিক এবং সামাজিক অবস্থা ফুটে

উঠেছে। তাঁর সাহিত্যে চীনা জনগণের আদর্শ, আকাক্সক্ষা এবং শেকড়সন্ধানী গুণাবলীর সঙ্গে

গভীর বিপ্লবী আদর্শ, আপোসহীন, সংগ্রামী মনোভাব একীভূত হয়েছে।

চীনা জনগণের প্রগতি, বিপ্লব আর চূড়ান্ত মুক্তির সঙ্গে গভীরভাবে এক হয়ে যাওয়ায়

লু স্যুনের চিন্তাধারা অন্তর্ভেদী, স্বাপ্নিক এবং কল্যাণকর। বলা হয়, লু স্যুনের পথ চীনা

জাতির নতুন সংস্কৃতির পথ।

২৫ সেপ্টেম্বর, ১৮৮১ চেচিয়াং প্রদেশের শাওসিং শহরে জন্ম।

তারুণ্যে সাহিত্যকে সংগ্রামের হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ এবং ১৯১১ সালের বিপ্লবে

অংশগ্রহণ করেন। লু স্যুন মূলত ছোটগল্পকার ও প্রাবন্ধিক। এছাড়া লিখেছেন বেশ কিছু

ক্ষুদ্র আকৃতির কবিতা, এমনকি গদ্যরীতিতে ‘বুনো ঘাস’ নামে কবিতার সঙ্কলন প্রকাশ

করেন ১৯২৭ সালে। চৈনিক সাহিত্যই শুধু নয়, লু স্যুন বিশ্বজুড়েই সম্মানিত সাহিত্য

সংগ্রামীর নাম। গদ্য-পদ্য-প্রবন্ধ-অনুবাদসহ শতাধিক গ্রন্থের জনক। তাঁর প্রতিটি রচনায়

রয়েছে মানুষের জীবনবোধের গভীরতম অনুসন্ধিৎসা, যা তাঁকে আধুনিক এবং ধ্রুপদী

সাহিত্যের অকুতোভয় লেখক হিসেবে সম্মানিত করেছে।

১৯ অক্টোবর, ১৯৩৬, শাংহাই শহরে এই মহান সাহিত্যিকের জীবনাবসান হয়।

এরকম যোদ্ধা

তারা এ রকম যোদ্ধা।

তাই ওই রকম যোদ্ধা চাই না, যারা আফ্রিকান আদিবাসী সৈন্যদের মতো সঙ্গীন

উঁচিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, অথবা চীনা গ্রীন সৈন্যদের মতোন বহন করছে স্বয়ংক্রিয় পিস্তল।

তারা লৌহ নির্মিত কোন বর্ম ব্যবহার করবে না। তাদের কিছু নেই কিন্তু

অনেক কিছু আছে, কোন অস্ত্র নেই, এমনকি বর্বরদের মতো সজোরে নিক্ষেপ

করার বর্শাও নেই।

তারা শূন্যতার দিকে হেঁটে যাবে। সবাই পরস্পরকে অভিবাদন করবে

অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে। তারা জানে এই অভিবাদন শত্রুর প্রতি কোন অস্ত্র নয়,

রক্তপাতহীন। এতে কিছু যোদ্ধা এমনিতেই ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে। বিনিময়ে কামানের

গোলার মতো তাদের করে তুলবে সাহসী।

তাদের মাথায় উপর শোভা পাবে ছোট ছোট পতাকা এবং ব্যানার, নক্সি করা

শিরোনামে লেখা আছেÑ জনহিতৈষী ব্যক্তি, প-িত, লেখক, প্রবীণ, তরুণ, কাব্য

অনুরাগী, ভদ্রলোক...

নিচের ওভারকোটে নক্সি করা শিরোনামে ছোট করে লেখা সুন্দর সুন্দর নামসমূহ

নৈতিকতা, জাতীয় সংস্কৃতি, জনগণের বক্তব্য, যুক্তি, বিচার, প্রাচ্যের সভ্যতা...

কিন্তু সে তার বর্শা উঁচিয়ে ধরে।

তাদের মৃদু হাসি এবং সজোরে নিক্ষেপ করা বর্শা এক পাশে সরে গিয়ে সরাসরি

বিদ্ধ করে হৃৎপি- বরাবর।

সব ধুলায় লুটিয়ে যাবে, বেঁচে থাকবে একমাত্র একজন ওভারকোট পরিহিত মানুষ,

যার কিছু নেই। শূন্যতা পলাতক এবং সুন্দর বিজয়ী হয়েছে। এখন জানতে হবে

কে সে অপরাধী? যারা জনহিতৈষী ব্যক্তিসহ অন্যদের হত্যা করেছে!

কিন্তু সে তার বর্শা উঁচিয়ে ধরে।

এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে যোদ্ধাদের সারি। দেখ, ঠিক আগের মতোন অভিবাদন

জানাচ্ছে এবং শোভা পাচ্ছে একই ব্যানার ও ওভারকোট...

সে তার বর্শা উঁচিয়ে ধরে।

অবশেষে এ শূন্যতার মাঝে বয়স্ক এবং মৃতদের সুদৃঢ় অবস্থান। তারা সত্যিকার

অর্থে যোদ্ধা নয় এবং শূন্যতার জয় হয়েছে। এ রকম প্রশান্তির সময় তাদের অন্তরে

নেই যুদ্ধের ক্রন্দন। তারা শান্তিতে আছে, শান্তি...

কিন্তু সে তার বর্শা উঁচিয়ে ধরে।

ভিখিরি

আমার পরনে লম্বা ঘাগরা, পাশে ছাঁচকাটা দেয়াল, দেয়ালের উপর বিদ্যমান ধূলিকণার

আস্তরণ। বিচিত্র রকমের লোকজন একাকী হেঁটে যাচ্ছে। মৃদুমন্দ বাতাস লাফিয়ে

লম্বা গাছের ডালপালা নাড়িয়ে দিচ্ছে, পাতারা দুলছে এবং ক’টি পাতা রোমাঞ্চকর

ভাবে আমরা মাথা ছুঁয়ে যায়। বাতাস লাফিয়ে বইছে, সর্বত্র ধূলিকণা উড়ছে।

একটি শিশু ভিক্ষা চায়। সে অন্যের মতো কিছু কাপড় চায়, কিন্তু তাকে দেখতে

অসুখী মনে হয় না। সে আমার পথ রুদ্ধ করে, ভূমিতে নত হয়ে প্রণাম করে এবং

ঘ্যান ঘ্যান করে আমাকে অনুসরণ করতে থাকে। আমি তার কণ্ঠস্বর এবং আচরণ

অপছন্দ করি। আমি অতিশয় ঘৃণা করি ওর দুঃখময় ভাগ্যকে। যদিও এটা ছিল

খেলার মতো। আমি ওর পথরুদ্ধতা অতিক্রম করার চেষ্টা করি। সে ঘ্যান ঘ্যান

করে আমাকে অনুসরণ করতে থাকে।

আমি হাঁটতে থাকি। বিচিত্র রকম লোকজন একাকী হেঁটে যায়। মৃদুমন্দ বাতাসের

ঝাপটা আসে। সর্বত্র ধূলিকণা উড়ছে।

একটি শিশু ভিক্ষা চায়। সে অন্যের মতো কিছু কাপড় চায়। কিন্তু তাকে দেখতে

অসুখী মনে হয় না। কিন্তু সে বোবা। সে তার হাত দিয়ে বাকশক্তিহীনতা প্রকাশ করে।

আমি ওর বাকশক্তিহীনতা অবজ্ঞা করি। হয়ত সে বোবা নয়, ভিক্ষা করার জন্য

এ পথ বেছে নিয়েছে। আমি তাকে ভিক্ষা দেব না। আমার কোন ইচ্ছেই নেই

তাকে ভিক্ষা দেয়ার। আমি অটল, তাকে ভিক্ষা দেব না। ওর জন্য আমার একান্ত

বিরাগ, অবিশ্বাস, ঘৃণা।

আমার পরনের ঘাগরা আটকে যায়। কর্দমাক্ত দেয়ালে ভাঙা ইটের তীক্ষè খ- ইতস্তত

ছড়ানো। মৃদুমন্দ বাতাস লাফিয়ে বয়ে যাচ্ছে, বহমান শরতকালীন শৈত্য

এলোমেলো করে দিচ্ছে পরনের গাউন। সর্বত্র ধূলিময়।

আমি বিস্ময় নিয়ে ভাবি, কি প্রক্রিয়ায় আমি ভিক্ষা করবো! কি ভাষায় কথা বলবো!

কিভাবে আমার বাকশক্তিহীনতা প্রকাশ করবো...? বিচিত্র রকমের মানুষ একাকী

হেঁটে যাচ্ছে। আমি কোন ভিক্ষাগ্রহণ করবো না। আমার ইচ্ছার সমতলে কোন

ভিক্ষা নেই।

আমি ওর জন্য গ্রহণ করবো অবজ্ঞা, অবিশ্বাস ও ঘৃণা।

তাদের ভিক্ষা দেবার মধ্যে কোন বাহাদুরি নেই। আমি ভিক্ষা করবো বেকারত্ব

এবং নির্জনতা।

শেষ পর্যন্ত আমি গ্রহণ করবো শূন্যতা।

মৃদুমন্দ বাতাস লাফিয়ে বয়ে যায়।

সর্বত্র ধূলিময়। বিচিত্র রকমের মানুষ একাকী হেঁটে যাচ্ছে।

ধূলি, ধূলি...

ধূলিময়...।

প্রকাশিত : ১৯ জুন ২০১৫

১৯/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: