কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ খেলা

প্রকাশিত : ১৩ জুন ২০১৫
  • পুতুল খেলা নিজেকে চিনতে শেখায়

ছেলেবেলার দিনগুলোর মাটির গন্ধে প্রাণের ছোঁয়ার সেই খেলা এখন আর দেখা যায় না। আজকের শিশু জন্মগ্রহণ করে যন্ত্র জীবনের মধ্যে। বেড়ে ওঠে যুগের আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে। গ্রামের ছেলেমেয়েরা তাও ঘরের আঙিনা, মেঠোপথ, নদীর তীর ও ঢেউ, গাছগাছালি ঝাউবন, নীল আকশে মেঘের ভেলা, ভরা চাঁদের পূর্ণিমা, শুকতারা, দূরের আলোকছটার কোন গ্রহ দেখে। এর মধ্যেই অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে কম বয়সেই নামতে হয় জীবন লড়াইয়ে। তারপরও কিছুটা হলেও প্রকৃতির সান্নিধ্য পায় ওরা। শহরের ছেলেমেয়েরা বেড়েই ওঠে হাইরাইজ কংক্রিটের বনে। যেখানে বিকালের সোনামাখা রোদ লুকোচুরিও খেলে না। অথচ অরূপের অন্ধকার থেকে মর্তে আগমনের সঙ্গে এই শিশুদের ওপর আলোর বিন্দু এসে ঝরে পড়ে রূপের জগতে। প্রথম আবির্ভাবেই জন্ম হয় চেতনার। আত্মচেতনা উপলব্ধির মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে বলে ‘মা মা গো মা আমি এলাম তোমার কোলে, তোমার ছায়ায় তোমার মায়ায় মানুষ হবো বলে...’। সকল মা (তা শহরের হোক আর গ্রামের হোক) শিশুকে কোলে আগলে মনুষ্যত্বের আশ্বাসে গড়ে তোলেন। সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে আকাশের চাঁদকে আমন্ত্রণ জানিয়ে সুর তোলেন ‘আয় আয় চাঁদ মামা টিপ দিয়ে যা.....’। অপার স্নেহে বেড়ে ওঠা শিশু মায়ের কোল থেকে নেমে হাঁটি হাঁটি পা পা করে পৌঁছে কৈশোরের উচ্ছলতায়। কিশোর থেকে যৌবনের মধ্যবর্তী সময়টি তারুণ্যের উদ্দীপনার দাপট এতটাই বেড়ে যায় যে ওদের কাছে সব অসম্ভবই সম্ভব, সব অগম্য গম্য। ওরা গেয়ে ওঠে ‘আমি রাজি রাখো বাজি একডুবে ভরা নদী হয়ে যাবো পার...’। এই বাজি রাখতে গিয়ে ওরা ওপর থেকে লাফিয়ে পড়ে কোন খাল-বিল জলাশয় বা নদীতে। তখন এদের এতটাই সাহস যে কি পারা যায়, আর যায় নাÑ তা নিয়ে ভাবে না। ওরা তখন বন্ধু বেছে নিয়ে দল গঠন করে। দলছুট হয়ে থাকতে চায় না। এমনই ধারায় বেড়ে ওঠা শিশুরা নিজেদের আঙিনায়, গ্রামের স্কুল ঘরের মাঠে, সদ্য ধান কাটা জমির নাড়ার ওপর আপন মনের খেয়ালে ছুটোছুটি দৌড়ঝাঁপ করে এগিয়ে যায় তারুণ্যের দিকে। এরা যখন যা মনে করে তাই খেলে। কিছু খেলা দেখে শেখে বংশপরম্পরার ধারায়। পূর্বপরুষেরা দাদা-দাদি নানা নানি, বাবা-মা, চাচা-চাচি, খালা-খালু, ফুপা-ফুপু তাদের শিশুবেলায় যা খেলে বড় হয়েছে প্রজন্মের শিশু তাই শেখে। মজার বিষয় হলোÑ তারুণ্যের বেলায় যে জেন্ডার রিলেশন্স নিয়ে সর্বকালেই ভাবা হয় শিশুবেলায় তা প্রকৃতির মধ্যেই গড়ে ওঠে। অর্থাৎ শিশুবেলায় খেলায় ছেলেমেয়ে একসঙ্গেই খেলে। হারজিৎ নির্ণয় হয় একই ভাবে। সেই জীবনে কতই না খেলা ছিল। দুরন্তপনার সঙ্গে কাগজ দিয়ে নকশা করা, কোন কিছু বানিয়ে উড়িয়ে দেয়া বা জলে ভাসিয়ে দেয়া। এ নিয়ে কতই না প্রতিযোগিতা। শিশু মনের গভীরে থাকা ভাবনাগুলোও একে একে প্রকাশ পেত কাগজ দিয়ে কিছু বানানোর মধ্যে। কাগজ কায়দা করে ভাঁজ করার পর জায়গা ছেটে দিয়ে বিশেষভাবে এঁেট উড়োজাহাজ বানিয়ে আকাশে উড়িয়ে দেয়ার মজাই ছিল আলাদা। নিজেকে প্রকাশ করা সুদূর নীলিমায় উড়ে যাবে সে কোন একদিন। প্রতীকী এই খেলার মধ্যে নিজের জীবনের ভাবনাগুলো প্রকাশ পেত। কেউ কাগজের নৌকা বানিয়ে ভাসিয়ে দিত পানিতে। বিশেষ করে বৃষ্টির দিনে টিনের চালার বারান্দার নিচে ভার্টিক্যাল রেখায় বৃষ্টির পানি অঝোর ধারায় ঝরে নিচে নেমে জলের ছোট আধার তৈরি হলে তার ওপর কাগজের নৌকা ভাসিয়ে দিয়ে কত মজা করা হতো। কখনও ভাসিয়ে দেয়া হতো কোন পুকুরে এমন কি নদীর কিনারেও। বৃষ্টির পানির ঢেউয়ে সেই নৌকা এগিয়ে গেলে আরও আনন্দ। বিকালে বৌছি খেলা ছিল রোমান্টিকতার খেলা। কেউ মনে মনে বৌ হয়ে ছুটোছুটির মধ্যে ছুঁয়ে দিলেই বিজয় নির্ধারণ। কানামাছি ভোঁ ভোঁ খেলা খেলেনি এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া কঠিন। চোখ বেঁধে একজনকে আঙিনায় ছেড়ে দিয়ে বাকিরা নীরবে এদিক সেদিক ছড়িয়ে থাকা। তারপর কানামাছি (চোখ বাঁধা শিশু) জাপটে ধরলেই পয়েন্ট। ওপানটি বায়োস্কোপ টেন টেন তেইশকোপ... মধুময় খেলার কথা মনে পড়েলে কে না নস্টালজিক হয়। একজনে কোমরে হাত দিয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে রেলগাড়ি খেলার সেই ছড়া কি ভোলা যায় সহজে- আইকম বাইকম তাড়াতাড়ি যদু মাস্টার শ্বশুরবাড়ি রেলগাড়ি ঝমাঝম, পা পিছলে আলুর দম.......। ছড়ার একটি লাইনের মধ্যে ভাবনার কত উপাদান আছে। আঙিনায় কাঠি দিয়ে ঘর কেটে বাঘবকরি খেলা ছিল বুদ্ধিদীপ্ত। গাছের শাখা কেটে ত্রিকোন করে রাবার পেঁচিয়ে ছোট্ট টুকরো বসিয়ে ছুড়ে দিয়ে বাটুল খেলা। আবার গাছের শাখা একটু চেঁছে তার সামনে কাঠের টুকরো ফেলে ছুড়ে দিয়ে একধরনের চেঙু পানটি খেলা (যা অনেকটা ক্রিকেটের মতো তবে বলের বদলে কাঠি) ছিল দুরন্তপনা। মেয়েশিশুরা আঙিনায় মইয়ের মতো ঘর এঁকে মাটির হাঁড়ির ভাঙা টুকরো বা কোন টুকরো ফেলে কুতকুত শব্দ বলে এক পা ধরে এগিয়ে যাওয়ার খেলা ছিল আনন্দের। দড়ি খেলা এতটাই জনপ্রিয় যে গ্রামের প্রায় প্রত্যেক ঘরের মেয়েশিশুর বালিশের নিচে থাকত খেলার উপকরণ। দাঁড়িয়াবান্ধা খেলা না খেললে শিশু জীবনই বৃথা। গোল হয়ে বসে কারও পেছনে রুমাল রেখে দিয়ে রুমাল চুরি খেলার কথা মনে নেই এমন কাউকে কি খুঁজে পাওয়া যাবে! ককফাইট খেলার কথা মনে হলে এখনও হাসি পায় অনেকের। এক হাত দিয়ে এক পা টেনে তুলে আরেক পায়ে লাফিয়ে লাফিয়ে এগিয়ে প্রতিপক্ষকে কাবু করে তোলা যে কি আনন্দের ভাবাই যায় না। হাডুডু (বর্তমান নাম কাবাডি) যা গ্রামীণ জীবনের অনুসঙ্গের খেলা থেকে বর্তমানে বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে স্থান পেয়েছে। গ্রামের মাঠে এমন কি কাদামাটিতে নেমে এই খেলা যৌবনের শক্তিকেই তুলে ধরে। শিশুকাল থেকে বালক পর্যায়ে যাওয়ার পরই সাধারণত এই খেলা শুরু হয়। গ্রামের মাঠে বড় জাম্বুরা দিয়ে অথবা পুরনো কাপড়ের পোটলা আঁটেসাঁটো করে বেঁধে ফুটবল খেলা যতটা ছিল প্রতিযোগিতার তার চেয়ে বেশি ছিল আনন্দে দৌড়ে বেড়ানো। বিশেষ করে সদ্য ধান কাটা জমির ওপর এমন ফুটবল খেলায় বৃষ্টির মধ্যে লুটোপুটিতে যে কী মজা তা স্মৃতিতে জেগে উঠলে আপন মনেই কতই না হাসি পায়। মনের মুকুরে গেয়ে ওঠে রবীন্দ্রনাথের গান ‘.......সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি’। ছেলেবেলার সেই দিনগুলোতে মার্বেল খেলা ছিল নেশার মতো। পকেটে দুটা মার্বেল নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে যে অনেকগুলো মার্বেল নিয়ে ফিরত তার দেমাগ দেখে কে! খেলা চলাকালে এমন কিছু শব্দ বলা হতো যা শুনলে আজও হাসি পায়। যেমন নট আউটকে বলা হতো নটপটকে। কেউ অনেকবার মার্বেল প্লেস করলে বলা হতো যাতে আসতে নট পটক্যে। কেউ ছোট্ট গর্তে মার্বেল ফেলতে না পারলে গুচ্চি মিস এগেইন। যারা মার্বেল খেলত তারা বাড়িতে পিটুনি খায়নি এমন কাউকে পাওয়া যাবে কি! গ্রামে কত রকমের যে খেলা...। একটা সময় রেল লাইনের ধার দিয়ে টেলিফোনের তারের পোলের সঙ্গে কান পেতে শোঁ শোঁ শব্দ শোনাও ছিল এক ধরনের খেলা। লুকোচুরি খেলা তো শিশুদের চিরন্তন খেলা হয়ে আছে। ঘরের কোথাও লুকিয়ে থেকে টুউউ—-কু আওয়াজ দিলে খোঁজার পালা শুরু হয়ে যেত। ছোট চিরকুট কাগজে চোর-ডাকাত-পুলিশ লিখে খেলার কতা কী সহজে ভোলে কেউ। কতই না খেলা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে গ্রামে। শিশুবেলার এইসব ছোট্ট অথচ আনন্দের খেলা নিয়েই বেড়ে ওঠে একেকজন শিশু। সেই শিশু বড় হয়ে উৎসব পার্বণে বা দেশ-বিদেশের কোথাও একে অপরের সঙ্গে দেখা হলে কি-ই না মধুময় হয়ে ওঠে সেই ক্ষণটি। তখন মনে হয় জীবনের সবচেয়ে বড় সুখের অনুভূতি সেই ছোট্ট বেলার খেলাগুলো। যেখান থেকে মানুষ নিজেকে ভাবতে শেখে। যেমন মেয়ে শিশু খেলনাপাতি হাঁড়ি পাতিল পুতুল ইত্যাদি নিজের সম্পদ বলে মনে করে। যতœ করে। আগলে রাখে। পুতুল খেলা নিজেকে চিনতে শেখায়। ছেলে শিশুরাও পথে ঘাটে ঘুরে ঘুরে নানা কিসিমের খেলা খেলে নিজেদের ভাবতে শেখে। এভাবেই এগিয়ে যায় মানবের জীবন চক্র।

Ñসমুদ্র হক, বগুড়া থেকে

প্রকাশিত : ১৩ জুন ২০১৫

১৩/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: