আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

দুখু মিয়া থেকে বিদ্রোহী কবি

প্রকাশিত : ২৩ মে ২০১৫
  • রবিউল হুসাইন

অনেক দুঃখে পাওয়া সন্তান বলে ছোটবেলায় তার নাম রাখা হয়েছিল দুখু মিয়া। তার জীবনের সঙ্গেও এই নামটি অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেল। সেই ছোট্ট দুখু মিয়া বড় হয়ে অনেক বড় কবি হয়েছিলেন। তবে এমনটি যে হবে সে লক্ষণ দেখা গিয়েছিল সেই ছোটবেলাতেই। বুঝতেই পারছ কার কথা বলছি। তিনি আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। কবি নজরুলের জীবন ধূমকেতুর মতো বৈচিত্র্যময়। তাঁর জন্ম পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার অন্তর্গত আসানসোলের চুরুলিয়া গ্রামে। কাজী ফকির আহমেদ আর জাহিদা খাতুনের ঘর আলো করে ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ জন্ম নেন কাজী নজরুল ইসলাম। ছাত্রজীবনে নজরুল ছিলেন অসম্ভব প্রতিভাধর। ক্লাসে বরাবরই প্রথম হতেন তিনি। লেখালেখি শুরু করেন ১০-১২ বছর বয়সে। দশম শ্রেণী পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া হয়েছিল তাঁর।

হঠাৎ ১৯১৭ সালে সামরিক বাহিনীতে ৪৯ নং বাঙালী প্লাটুনে যোগ দেন। এখানেই তার সত্যিকারের লেখালেখি শুরু হয়। ১৯১৯ সালে তাঁর প্রথম গদ্য ‘বাউন্ডুলের আত্মকথা’ সওগাত পত্রিকায় প্রকাশ পায় এবং একই সালে বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য পত্রিকায় নজরুলের প্রথম কবিতা ‘মুক্তি’ ছাপার অক্ষরে প্রকাশ হয়। তখন তার বয়স মাত্র ২০। কবিতাটি ছিল একজন ফকিরের দুর্ঘটনায় ‘মারা যাওয়ার ঘটনা’ নিয়ে।

নজরুল ময়মনসিংহে আসার আগে আসানসোলের এক রুটির দোকানে খাওয়া-দাওয়াসহ মাসিক এক টাকা বেতনে কাজ করতেন। সেখানে তাঁর সঙ্গে তখনকার বিখ্যাত কবিয়াল শেখ চকোর নজরুলের লেটো গান রচনায় মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন, এই ব্যাঙাচি (নজরুলকে স্নেহ করে ব্যাঙাচি বলে ডাকতেন) একদিন বড় হয়ে সাপ হবে। সেই সময় থেকেই তাঁর মানবিক সহমর্মিতার গুণ প্রকাশ হতে থাকে। এখানে দুটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা যায়।

এক. খোঁড়া বোবা ফকির তার কাছ থেকে মাঝে মাঝে সাহায্য নিত। হঠাৎ সে মারা গিয়ে রাস্তায় পড়ে থাকে অনেক সময় ধরে। কেউ দাফন করতে এগিয়ে আসে না। নজরুল তখন চাঁদা তুলে তার দাফনের ব্যবস্থা করেছিলেন। এই নিয়ে খুব দরদ দিয়ে কবিতাও লিখেছিলেনÑ চাহনি ভিক্ষা কোনদিন কথা কহে/খোঁড়ায়ে খোঁড়ায়ে হেঁটে যেতে রয়ে রয়ে/ঘুঙুর লাগান লাঠি এক হাতে ধরে/টিনের মগটি ঝুলিতে কোমর ’পরে।

দুই. নজরুল তখন সিয়ারসোল রাজ হাইস্কুলে মুসলিম ছাত্রাবাসে থাকতেন। সেখানের কড়িকাঠে এক চড়ুই পাখি বাসা বেঁধে থাকত। হঠাৎ তার বাচ্চা নিচে পড়ে যায়। নজরুল মা- চড়ুইয়ের ডানা ঝটপটানি চেঁচামেচি ওড়াউড়ি দেখে বাচ্চাটিকে অতিযতেœ বাসায় রেখে দেন। পরে এই ঘটনা নিয়ে মা ও সন্তানের ভালবাসা দেখে দীর্ঘ এক কবিতা লেখেন। তখন তাঁর বয়স ১৫ বছর। কবিতার নাম চড়ুই পাখির ছানা।

ছোটবেলা থেকেই নজরুল মানুষের প্রতি ভালবাসার পাশাপাশি প্রকৃতি-পশুপাখির প্রতি ছিলেন উদার। আবার নজরুলের নাম নিলেই চলে আসে ‘বিদ্রোহী’ শব্দটি। তার অনেক কবিতার মধ্যেই ফুটে উঠেছে শোষণের বিরুদ্ধে দৃঢ় উচ্চারণ। কঠিন-কোমলে মেশানো এই কবি যে কবিতা লিখে বাঙালীর হৃদয়ে চিরদিনের জন্য ঠাঁই করে নেয় সেই কবিতাটির নাম ‘বিদ্রোহী।’ দীর্ঘ এই কবিতা এতই খ্যাতি আর জনপ্রিয়তা পেয়েছিল যে, তার নামের আগে ‘বিদ্রোহী’ শব্দটিই বসে যায়।

নজরুল বাংলাসাহিত্যের শিশুতোষ শাখাটি জাদুকরী হাতের ছোঁয়ায় পূর্ণ করেছেন। শিশুদের জন্য রচিত তাঁর ছড়া, কবিতা, গল্প, গান ও নাটক আজও সমান প্রিয় যা চিরায়ত শিশুসাহিত্য। ঢাকার বাইরেও কলকাতায় ছোটদের জন্য লেখা তাঁর অনেক বই প্রকাশিত হয়েছে। এ বইগুলোর মধ্যে : ফুলে ও ফসলে, তরুণের অভিযান, সাতভাই চম্পা, ভোরের পাখি ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য ।

কাজী নজরুল ইসলাম ১৯৪২ সালে মাত্র ৪৩ বছর বয়সে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে বাকশক্তিহীন হয়ে পড়েন। এ সময় তাঁর স্মৃতিশক্তিও নষ্ট হয়ে যায়।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে ১৯৭২ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কবিকে সপরিবারে কলকাতা থেকে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন এবং জাতীয় কবির মর্যাদা দেন। সরকারীভাবে এখানে স্থায়ী বসবাস ও ভরণ-পোষণেরও ব্যবস্থা করেন। ১৯৭৫ সালে কবিকে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। পরে তাঁকে বাংলাদেশের নাগরিকত্বও দেয়া হয়। ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট কবি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়। ১১ জ্যৈষ্ঠ ২৪ মে কবির জন্মদিন- তাঁর প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালবাসা।

অলঙ্করণ : আইয়ুব আল আমিন

প্রকাশিত : ২৩ মে ২০১৫

২৩/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: