মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ফিলিস্তিনী দুর্ভোগের অবসান না হওয়া পর্যন্ত শান্তি নয়

প্রকাশিত : ৬ মে ২০১৫

অসলো শান্তি প্রক্রিয়ার চাকচিক্যময় খোলস ছেড়ে এর মর্মমূলে লুকিয়ে থাকা রূঢ় সত্যটা প্রকাশ পেতে চার বছর সময় লেগেছে। শান্তিচুক্তি বলে কিছুই হয়নি। বরং ফিলিস্তিনীরা লোকসান ও অবমাননার এক ভয়াবহ সর্পিল পথে প্রবেশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও মিডিয়ার দ্বারা প্রতারিত হয়ে তারা ভেবেছে যে, শেষ পর্যন্ত আমরা খানিকটা মর্যাদা অর্জন করেছি। ইসরাইলের তীব্র অত্যাচার নির্যাতনের মুখে তারা এই রাষ্ট্রের নিরাপত্তার অস্বাভাবিক সংজ্ঞাটি মেনে নিয়েছে। এসব কিছুর ফলে আমাদের জনগণ আরও বেশি হীনবল হয়েছে এবং তারা এমন দৃশ্য দেখতে বাধ্য হচ্ছে যে, আরও বেশি ইহুদীবসতি নির্মিত হচ্ছে, আরও বেশি ভূখ- কেড়ে নেয়া হচ্ছে, আরও বেশি ঘরবাড়ি ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে, আরও বেশি নিষ্ঠুরভাবে সম্মিলিত জনগোষ্ঠীকে শাস্তি দেয়া হচ্ছে। অবিচারের শিকার অন্য আর সকলেরই যেখানে ক্ষতিপূরণ লাভের, ক্ষমা প্রার্থিত হওয়ার ইত্যাদি অধিকার আছে, সেখানে আমাদের কেন অতীতকে ভুলে যাওয়া উচিত, ক্ষতিপূরণ না পাওয়া উচিত এবং আমাদের দুঃখ-কষ্ট, বেদনা-যন্ত্রণা অস্বীকৃত থাকা উচিত, ইসরাইলকে তা ব্যাখ্যা করতে হবে। এর কোনই যুক্তি নেই, আছে কেবল নৈতিকতাবিবর্জিত শক্তির শীতল, কঠিন ও বিকৃত ধরনের ঔদাসীন্য।

এখন কুখ্যাত নেতানিয়াহু এবং তার সঙ্গে ঐকতানজুড়ে দেয়া আমেরিকানরা স্থায়ী মর্যাদার প্রশ্নে আলাপ-আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে, যার উদ্দেশ্য হলো দীর্ঘদিনের অবিচারের অবস্থাটিকে পাল্টে দেয়া নয় বরং কেবল ইসরাইলের ‘নিরাপত্তা’ সুনিশ্চিত করা। বাজারে বোমাবাজির ঘটনার পর থেকে মিডিয়া এবং ইসরাইলী ও মার্কিন সরকার জোর দাবি জানিয়ে আসছে যে, ফিলিস্তিনীদের সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। এমনকি ‘শান্তির অবতার’ এমোস ওজ বলেছেন যে, আমাদের শান্তি ও সহিংসতার এই দুটির যে কোন একটিকে বেছে নিতে হবে। ব্যাপারটা এমন যেন ইসরাইল তার বিমানগুলোকে নামিয়ে রেখেছে, তার পারমাণবিক অস্ত্রগুলোকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলেছে, দক্ষিণ লেবাননে বোমাবর্ষণ ও দখলদারি বন্ধ করেছে এবং প্রধান প্রধান প্রতিটি ফিলিস্তিনী শহরের মধ্যে বসানো তল্লাশি ফাঁড়িসহ পশ্চিম তীর থেকে তার সমস্ত সৈন্য সরিয়ে নিয়েছে। ইসরাইল ও তার মার্কিন সমর্থকরা এসব ঘটনার কোনটির জন্য কদাচিত বিব্রত বোধ করেছে। ইসরাইলী নেতারা কিভাবে যে আমাদের প্রতি আঘাত করেছে, সেগুলো আমলেও নেয় না। অথচ এখনও নিজেদের ‘রক্ষা পেয়ে যাওয়ার’ ছদ্মাবরণে মুড়িয়ে রাখে? নিহতদের প্রতি তাদের কি কোন শ্রদ্ধাবোধ নেই? ইসরাইলের যা খুশি তাই করার পথে কি কোন বাধা নেই?

প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন ও ম্যাডেলিন অলব্রাইট যখন ইসরাইলী লবীর এই প্রচারণার পুনরাবৃত্তি করেন যে, ‘বোমা ও বুলডোজারের মধ্যে সমান্তরাল কিছু নেই’, তখন সম্প্রতি কারফিউর মধ্যে উচ্ছেদ হওয়া ফিলিস্তিনী পরিবার বা ফিলিস্তিনীদের কাছে কিংবা যেসব ফিলিস্তিনী পরিবারের তরুণ-তরুণী ইসরাইলী কারাগারে ধুঁকছে বা যাদের ইসরাইলী সৈন্যরা নগ্ন করে দেহ তল্লাশি করছে কিংবা রুশ ইহুদীদের থাকার ব্যবস্থা করার জন্য জেরুজালেম থেকে যেসব ফিলিস্তিনীদের বিতাড়িত করছে কিংবা ইসরাইলী দখলদারি প্রতিহত করার অধিকার থেকে যেসব ফিলিস্তিনীকে বঞ্চিত করেছে, তাদের কাছে ব্যাখ্যা করা দরকার যে, এমন পরিস্থিতিতে ইসরাইলী-মার্কিন বুলডোজারের সমজাতীয় জিনিস কি হতে পারে। শান্তি পক্রিয়ার মর্মমূলে রয়েছে এই বর্ণবাদী ধারণা যে, আরবদের জীবন ইহুদীদের জীবনের মূল্যের সমান নয়।

সন্ত্রাসীদের পরিচালিত বোমাবাজি ভয়ঙ্কর। এটাকে সমর্থন করা যায় না। কিন্তু বিস্তৃতি ও ঔদ্ধত্যের বুলডোজারগুলোও ভয়াবহ।

পরিস্থিতি স্বচ্ছ করে তোলা দরকার। ব্যবহৃত ভাষা থেকে পুরনো কপচানো বুলিগুলো ছেঁটে ফেলা প্রয়োজন। সততা ও ন্যায়পরায়ণতাকে সুযোগ দিতে হবে। ফিলিস্তিনীরা শান্তি চায়। তবে সেই শান্তি যে কোন মূল্যে নয়। লাখ লাখ শর্ত আরোপ করে ফিলিস্তিনীদের সমতাকে লৌহ কঠিনভাবে প্রত্যাখ্যানের বিষয়টি গোপন করার ব্যবস্থা সংবলিত যে পথ নেতানিয়াহু বাতলে থাকেন, সেই পথেও নয়। কোন না কোন জায়গা থেকে শুরু করতে হবে।

দোষারোপ ঠিকমতো করতে হবে। দায়িত্ব আনুপাতিকভাবে দিতে হবে। রাষ্ট্রহীন, অধিকারহীন ও আশা ভরসাহীন এক জনগোষ্ঠী সেমিনার কক্ষে বসে কূটনীতিকদের মতো আচরণ করবে এবং বিমূর্ত দৃশ্যপট ও আস্থা গড়ে তোলার ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করবে, এমনটা আশা করা যায় না।

ফিলিস্তিনীদের দুঃখ-কষ্ট-যন্ত্রণা অব্যাহত থাকবে এবং এই দুঃখ-কষ্ট, যন্ত্রণা-বঞ্চনার কারণগুলো নিয়ে একটি শব্দও উচ্চারিত হবে না, এমন অবস্থায় শান্তি ও নিরাপত্তা অর্জিত হতে পারে না।

মূল : এডওয়ার্ড ডব্লিউ সাঈদ

[প্রয়াত লেখক এডওয়ার্ড সাঈদের এই লেখাটি ‘দি নেশন’ সাপ্তাহিক পত্রিকায় ১৯৯৭ সালের ৮ সেপ্টেম্বর সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল। পত্রিকার ১৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে গত ৬ এপ্রিল বিশেষ সংখ্যায় এটি পুনর্মুদ্রিত হয়।]

চলমান ডেস্ক

সূত্র : দি নেশন

প্রকাশিত : ৬ মে ২০১৫

০৬/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: