মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ভিন্ন এক জুটির গল্প

প্রকাশিত : ২ এপ্রিল ২০১৫

সাদিয়া ইসলাম মৌ। নব্বইয়ের দশকের মৌ আর এই সময়ের মৌ’র মধ্যে পার্থক্য একটাই শুধু চোখে পড়ে, তা হলো স্ট্যারিজম। সেই সময়ে মৌ ছিলেন একেবারেই নবীন। তারপর কেটে গেছে অনেক সময়। মৌ এখন পরিণত একজন মডেল, পরিণত একজন মানুষ, একজন সফল গৃহবধূ, একজন সফল মা। তাঁর সঙ্গে জুটিবদ্ধ হয়ে অভিনয় করেছেন ছোটপর্দার আরেক রাজপুত্তুর অপূর্ব। তাঁদের দু’জনকে নিয়ে বিশেষ

প্রতিবেদন। লিখেছেন অভি মঈনুদ্দীন

মূল ফিচার

এদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে যারাই কাজ করতে এসেছেন বা আসছেন তাঁদের যদি প্রশ্ন করা হয় আপনার প্রিয় মডেল (নারী) কে, সবাই নির্দ্বিধায় এককথায় উত্তর দেন ‘মৌ’। সবারই আদর্শ মডেল মৌ। সবার আদর্শে পৌঁছাতে মৌকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। সাধনা আর অধ্যাবসায়ের বিকল্প কিছু নেই। আজীবন তা মেনে এসেছেন মৌ। নিজে মেনে নিয়ে নিয়ম করে চলেছেন বিধায় মৌ আজও একজন কিংবদন্তি মডেল হিসেবেই সবার কাছে অনুকরণীয়-অনুসরণীয়। বেশ কয়েকবছর যাবত বিজ্ঞাপনে মডেল হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি হঠাৎ করেই যেন মৌ নাটকে একটু বেশি নিয়মিত হয়ে উঠেছেন। বিশেষ করে গত বছর ঈদ থেকে মৌ অভিনয়ের প্রতি আগের চেয়ে বেশি মনোযোগী এবং নিয়মিত হয়ে উঠেছেন। গত বছর যে কাজগুলো তিনি করেছিলেন সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল দীপঙ্কর দীপনের পরিচালনায় ‘ওরা সাতজন’, সরদার রোকনের পরিচালনায় ‘ভালোবাসার সুখ-অসুখ’, নাসিম শাহনিকের ‘প্রেম ও প্রতারণার গল্প’, অঞ্জন আইচের পরিচালনায় ‘তবুও’, বাদল আহমেদ সাগরের পরিচালনায় ‘নীল বসন্ত’সহ দীপঙ্কর দীপনের পরিচালনায় ‘আর কিছু নয় বাকি’ ইত্যাদি। এসব নাটকে সহশিল্পী হিসেবে মৌ পেয়েছেন রওনক হাসান, কল্যাণ, মাজনুন মিজানসহ অনেককে।

গল্প ভাল হলে চরিত্রে নিজের মনের মতো অভিনয় করার সুযোগ থাকলেই অভিনয় করছেন মৌ। হঠাৎ অভিনয়ে এত ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন কেন? জবাবে মৌ বলেন, ‘এতদিন আমার বাচ্চারা ছোট ছোট ছিল। তাই কাজ করার তেমন ফুরসুরত ছিল না। এখন ওরা একটু বড় হয়েছে। নিজেদের কাজগুলো নিজেরা অন্তত বুঝে। তাই আমি সময় সুযোগ করে নিয়ে কাজ করছি। তাছাড়া আমি মনেকরি আমার নাটকের কিছু স্পেশাল দর্শক আছে। তাঁরা আমাকে সবসময় স্ক্রিনে দেখতে ভালবাসেন। তাঁদের জন্যই এখন চেষ্টা করছি নিয়মিত নাটকে অভিনয় করা।’ নিয়মিত নাটকের মধ্যেই মৌ এবারই প্রথম জুটিবদ্ধ হয়ে অভিনয় করেছেন এই সময়ে টিভি নাটকের রাজপুত্তুর অপূর্বর সঙ্গে। রুদ্র মাহফুজের রচনায় ও সাখাওয়াতের পরিচালনায় ‘ব্ল্যাক কফি’ নাটকে তাঁরা দু’জন প্রথম জুটিবদ্ধ হয়ে অভিনয় করেছেন। ‘আমার কাছে মনেই হয়নি মৌ আপুর সঙ্গে এটা আমি প্রথম কাজ করছি। বারবার কেন যেন মনে হচ্ছিল এর আগেও তাঁর সঙ্গে আমার কাজ হয়েছে। খুবই প্রফেশনাল একজন শিল্পী। তাঁর সময় জ্ঞান আমাকে যেমন মুগ্ধ করেছে ঠিক তেমিনি আরেকটি কথা বলতে চাই, তাঁর নাম যে ভক্ত-দর্শক কিংবা সেলিব্রেটিদেরও মুখে মুখে থাকে এটা আসলে এমনি এমনি হয়নি। সত্যিকার অর্থেই ডেডিকেসন আছে বলেই তিনি এ পর্যায়ে পৌঁছাতে পেরেছেন এবং তাঁর কাছে সত্যিই অনেক কিছু শেখার আছে নতুনদের’, বললেন অপূর্ব।

এরইমধ্যে নাটকটি প্রচারও হয়েছে। অপূর্ব সাড়া মিলেছে নাটকটিতে দু’জনের অভিনয়ের। নাটকে মৌ অভিনয় করেছিলেন মৌমিতা চরিত্রে এবং অপূর্ব অভিনয় অভিক চরিত্রে। ‘ব্ল্যাক কফি’ নাটকে কাজ করা প্রসঙ্গে সাদিয়া ইসলাম মৌ বলেন, ‘আগের চেয়ে নিঃসন্দেহে নাটক কিংবা টেলিফিল্মে কাজের ব্যস্ততা অনেক বেড়েছে। এইতো ক’দিন আগেই আগেই তৌকির ভাইয়ের সঙ্গে একটি নাটকে কাজ করেছি। বেশ ভাল গল্প এখন আসছে। রুদ্রর লেখা গল্পটিও ভাল। অপূর্বর সঙ্গে কাজ করে ভাল লাগছে।’ ‘ব্ল্যাক কফি’ নাটকটি গত ঈদে চ্যানেলে প্রচারের পর মৌ এবং অপূর্ব দু’জনই অভূতপূর্ব সাড়া পেয়েছেন। অপূর্ব বলেন, ‘অনেক নাটকে কাজ করার সময় অনেক ভাল রেসপন্স পেয়েছি আমি। কিন্তু ব্ল্যাক কফি ছিল আমার ক্যারিয়ারের অন্যতম একটি নাটক। মৌ আপুর প্রতি কৃতজ্ঞ যে তিনি আমাকে তাঁর সঙ্গে কাজ করার সুযোগ দিয়েছেন।

এদিকে মৌ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনেতা শতাব্দী ওয়াদুদ ও মডেল কাম অভিনেত্রী সাদিয়া ইসলাম মৌ এবারই প্রথম জুটিবদ্ধ হয়ে একটি নাটকে অভিনয় করেছেন। যদিও নাটকের বিষয়বস্তু নিয়ে এর আগে আরও বেশ কয়েকটি নাটক নির্মিত হয়েছে। কিন্তু একই বিষয় নিয়ে এবার গল্প বলার ধরন পাল্টেছেন নির্মাতা মাহমুদ দিদার। মাহমুদ দিদারের নিজের রচনা ও পরিচালনায় ‘গুম’ নাটকে প্রথমবারের মতো জুটি হিসেবে দেখা যায় মৌ ও শতাব্দী ওয়াদুদকে। একজন সাধারণ দম্পতি শতাব্দী ও মৌ। তাদের ঘরে এক সন্তানও আছে। তবে সংসারের প্রতি কোনরকম খেয়াল নেই শতাব্দীর। অভিনয় করারই প্রবল আগ্রহ তাঁর। একদিন শতাব্দী অভিনয় করার সুযোগও পেয়ে যান। নিজের কষ্টার্জিত টাকা নিয়ে যখন স্ত্রী আর সন্তানের কাছে ফিরছিলেন তখনই তিনি গুম হন। যাঁরা গুম করেন তারা মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শেষ রক্ষা আর হয়নি। এমনই গল্প নিয়ে নির্মিত হয়েছে ‘গুম’ নাটকটি। ‘গুম’ নাটকে একসঙ্গে অভিনয় প্রসঙ্গে মৌ বলেন, ‘দিদারের গল্প বলার ধরনটি সত্যিই ভাল লেগেছে আমার। শতাব্দী ওয়াদুদের সঙ্গে এটা প্রথম কাজ ছিল। আমরা চেষ্টা করেছি গল্পটিকে প্রাণবন্ত করে তোলার জন্য।’ গল্পের প্রয়োজনে নাটকের শূটিং হয়েছে পুরোনো ঢাকায়। আমাদের নাট্যাঙ্গনে ‘এক্সপ্রেসন মাস্টার’ হিসেবেও রয়েছে অপূর্বর খ্যাতি। রোমান্টিক নাটকে এই সময়ে আনপ্যারালাল অপূর্ব। সাধারণত নির্মাতারা তাঁর সিডিউলের সঙ্গে সমন্বয় না করতে পারলে অন্য কারও ওপর নির্ভর করেন। তারপরও নির্মাতার অতৃপ্তি থেকে যায়, উফ! অপূর্ব থাকলে অসাধারণ হতো। ক্যামেরার সামনে অপূর্ব প্রতিদিনিই সেই প্রথমদিনের মতোই নিজেকে দাঁড় করাতে ভালবাসেন যেন অভিনয় জীবনের শুরুটাই হলো আজ থেকে। আর একারণেই অপূর্ব অসাধারণ অভিনয় করেন। এক্সপ্রেসনে অপূর্বর জুড়ি মেলা ভাড়। যে কারণে আমাদের নাট্যাঙ্গনে এক্সপ্রেসন মাস্টার হিসেবেও অপূর্বও এক আলাদা পরিচিতিই রয়েছে যা সাধারণত একজন অভিনেতার আলাদাভাবে তৈরি হতে অনেকটা সময়ই লেগে যায়। অপূর্বও নাটকে ক্যারিয়ার থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত তাকে রোমান্টিক গল্পের নাটকেই সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। অপূর্ব তার এই ধারাটা আরও কিছুদিন অব্যাহত রাখতে চান। কারণ অপূর্ব মনে একবার একটা ইমেজ ভেঙ্গে গেলে তা আবার প্রতিষ্ঠা করা কঠিনই বৈকি। যে কারণে অপূর্ব আপাতত রোমান্টিক গল্পের নাটকগুলোতেই বেশি কাজ করছেন। চাইলেই তিনি তা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন। যেমন পেরেছিলেন গত বছরের ঈদের সময়। কিন্তু অনেক দর্শকই অপূর্বকে তাঁর ঘরানার বাইরে যেতে বিশেষভাবে নিষেধ করেছেন। অপূর্বও ঠিক তাই মেনে নিয়েছেন। কারণ অপূর্ব মনে করেন, তিনি কাজ করেন কোটি কোটি দর্শকের জন্য। কিছু দর্শক যা পছন্দ করেন তা করতে তিনি নারাজ। অপূর্ব অভিনয়ে প্রতিনিয়তই নিজেকে ভাঙ্গার চেষ্টা করেন। তাঁর সর্বোচ্চ চেষ্টাটুকু করেছেন প্রথম চলচ্চিত্র আশিকুর রহমান পরিচালিত ‘গ্যাংস্টার রিটার্ন’ ছবিতে। এই ছবিতে অভিনয় করতে গিয়ে অপূর্ব প্রচ- পরিশ্রম করেছেন। শুটিংয়ের প্রয়োজনে টানা ১৮ ঘণ্টা যেমন পানিতে থেকেছেন ঠিক তেমনি সকাল ৬টা থেকে পরের দিন ৬টা পর্যন্ত শূটিং করে আবার দু’ঘণ্টা ঘুমিয়ে শূটিং শুরু করেছেন। অপূর্ব তাঁর ক্যারিয়ারে এত কষ্ট করেননি যতটা না তার প্রথম ছবির জন্য করেছেন। কেনই বা এত কষ্ট করেছেন? জবাবে অপূর্ব বলেন, ‘সত্যি বলতে কি গ্যাংস্টার রিটার্ন অনেক বাজেটের কোন ছবি না। যে কারণে ছবিটিকে দর্শকের কাছে সর্বোচ্চ লেবেল পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য যত কষ্ট করা যায়, করেছি। মন দিয়ে যেমন অভিনয় করেছি ঠিক তেমনি পরিশ্রমের জায়গায় শতভাগ পরিশ্রম করেছি। পুরো ইউনিট অনেক অনেক কষ্ট করেছে যা বলার ভাষা আমার জানা নেই। তাই ছবিটি নিয়ে আমি খুব বেশি আশাবাদী। আমার মনে হয় দর্শক যা চেয়েছেন এতদিন, তা পাবেন।’ এত কষ্ট করেছেন কিন্তু ছবি মুক্তির পর যদি দেখেন ছবি ঠিকই দর্শক দেখেছেন, সুপারহিট ব্যবসাও করেছে কিন্তু কোন পুরস্কার জুটেনি ভাগ্যে? ‘পুরস্কার! এটা তো একটা জড় পদার্থ। এটার প্রতি আমার এত লোভ নেই। তা ছাড়া অনেক সময়ই আমাদের এখানে যোগ্য লোক সঠিক বিচার পায় না। যেখানে এই অনিয়ম হয় সেখানে কি পুরস্কারের কোন সত্যিকারের মূল্যায়ন আছে! তা ছাড়া আমি মনেকরি আমার পুরস্কার আমার কোটি কোটি ভক্ত-দর্শক। তাদের ভালবাসা নিয়েই আমি আজীবন কাজ করে যেতে চাই।

এখানে আরেকটি বিষয় আমি স্পষ্ট করতে চাই, সেটা হচ্ছে স্যাটেলাইটের এ যুগে আমাদের এখন প্রতিনিয়ত টম ক্রুজ, শাহরুখ খান কিংবা সালমান খানের মতো সুপারস্টারদের সঙ্গে কাজ করে একজন অপূর্ব কিংবা একজন মোশাররফ করিম কিংবা একজন চঞ্চল চৌধুরী হতে হয়। কারণ রিমোট কন্ট্রোল এখন দর্শকের হাতে। তিনি যখন খুশি যে কোন চ্যানেলে দেখবেন। সেখানে আমাদের কোন কন্ট্রোল নেই। তাই খুব কম বাজেটে নাটক নির্মাণ করেও সবার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থেকে থেকে আমাদের শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে হয় যা খুব সহজ কোন কথা নয়। তাই আমাদের দেশের নাটক অনেক ভাল এবং মানসম্পন্ন।’ এদিকে অপূর্ব আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানালেন। আর সেটা হলো তার অভিনীত নাটকগুলো কলকাতাতেও ভীষণ জনপ্রিয় ইউটিউবের কল্যাণে সেসব নাটক দর্শক দেখেন। যে কারণে কলকাতাতেও তাঁর একটি ‘ফেন পেজ’ আছে। অপূর্ব বলেন, ‘বিষয়টি রীতিমতো আমাকে মুগ্ধ করেছে। অভিনেতা হিসেবে প্রাপ্তি এখানেই যখন মানুষ কোন কিছু না পাওয়ার আশায় আমাকে তাদের ভাল লাগার কথা, ভালবাসার কথা বলে।’

এদিকে অপূর্ব আগের চেয়ে নিয়মিত হয়েছেন ফেসবুক ব্যবহারে। কারণ একটাই ফেসবুকে তার অনেকগুলো ভুয়া এ্যাকাউন্ট আছে। সেগুলোর মাধ্যমে যেন কেউ বিভ্রান্ত না হন এ কারণেই ফেসবুকে অপূর্বর নিয়মিত হয়ে উঠা। এখন শুটিংয়ের বাইরে অপূর্ব পুরো সময়টাই ঘরে দেবার চেষ্টা করছেন। কারণ গত বছর ২৭ জুন তাঁরই জন্মদিনে তিনি এক পুত্রসন্তানের বাবা হয়েছেন। নাম রেখেছেন আয়াশ। বাবার দায়িত্ববোধ থেকেই শুধু নয় মনের ভাল লাগা আর ভালবাসা থেকে অপূর্ব তাঁর কাজের বাইরে পুরো সময়টা এখন প্রিয়তাম স্ত্রী অদিতি এবং আদরের সন্তান আয়াশকেই দেয়ার চেষ্টা করছেন।

ছবি : আরিফ আহমেদ

প্রকাশিত : ২ এপ্রিল ২০১৫

০২/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: