মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ইয়েমেনে রিয়াদ-তেহরানের দ্বন্দ্ব

প্রকাশিত : ১ এপ্রিল ২০১৫
  • কামরুল হাসান

আরব বসন্তের সুবাতাস (!) বয়ে যাওয়া মধ্যপ্রাচ্যের দারিদ্র্যপীড়িত রাষ্ট্র ইয়েমেন দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে চলে এসেছে। ২০১১ সালে গণবিক্ষোভের মুখে সাবেক প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহর পদত্যাগের পর থেকে এমন অচলাবস্থা দেশটিতে। রাষ্ট্রক্ষমতা দখলে আনতে বিচিত্র স্বার্থের নানাপক্ষের (রাজনৈতিক, উপজাতি, আঞ্চলিক, সাম্প্রদায়িক) সংঘাতে সিরিয়া-লিবিয়ার মতো বিপর্যস্ত অবস্থা ইয়েমেনের। গৃহবিবাদের এমন পরিস্থিতিতে প্রতিবেশী সৌদি আরব এবং ইরান নিজেদের প্রভাব বলয় এবং নিজেদের পক্ষসমূহের স্বার্থ বজায় রাখতে নেমেছে ভিন্ন এক দৌড়ত্বে, যা সিরিয়ার পর এখন সৌদি-ইরানের অন্যতম ছায়া রণক্ষেত্রে পরিণত।

২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের পর রিয়াদ-তেহরানের সাপে-নেউলে সম্পর্ক। বাগদাদ শিয়া অধ্যুষিত তেহরানের আনুগত্যে আসার পর থেকে এ সংঘাতের শুরু। একযুগ আগের মার্কিনীদের আগ্রাসনের পর ইরাকের সুন্নিরা ক্ষমতাচ্যুত হন এবং শিয়া সমর্থিত নুরী আল মালিকী ক্ষমতায় বসেন। সুন্নি বিদ্বেষী সাবেক প্রেসিডেন্ট মালিকী ক্ষমতায় আসার পর হতে ইরাকজুড়ে সুন্নি নিপীড়ন বেড়ে যায় এবং জঙ্গীবাদের উত্থান ঘটে। ইরাকের সুন্নি জঙ্গীদের গোপনে সৌদি আরব সমর্থন দিয়ে আসত, যেন তারা শিয়া প্রধান সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে পারে। চার বছর আগের আরব বসন্ত এমন সংঘাতের পালে আরও হাওয়া যোগায়। শুরু হয় প্রভাবশালী দুই রাষ্ট্রের আন্তঃসাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্ব। মুসলিমদের দুই বড় গোষ্ঠীর এই সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্ব এখন মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যত নির্ধারক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। যার মূলে সুন্নিপ্রধান সৌদি আরব ও শিয়াপ্রধান ইরান। মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী এ দুই রাষ্ট্রের সংঘাতের বলী সিরিয়া ও ইরাক এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এবং এ তালিকার সর্বশেষ সংযোজন ইয়েমেন। মধ্যপ্রাচ্যের যে কোন দেশে সংঘাতের অর্থই এখন রিয়াদ ও তেহরানের প্রভাব খাটানোর আরেকটি প্রতিযোগিতা, আরেকটি ছায়াযুদ্ধ। এমন ছায়াযুদ্ধের বিস্তৃতির আরেকটি কারণ ইরানের পরমাণু ইস্যু। তবে ইরানের পরমাণু ইস্যুর চেয়ে ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের সানা দখল কোনভাবেই মানতে পারছে না সৌদি আরব। আরব বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র দেশ ইয়েমেন দীর্ঘদিন ধরেই সৌদি আরবের প্রভাব বলয়ে। বেশিরভাগ আরবই দেশটিকে সৌদি আরবের ‘পেছনের উঠান’ বিবেচনা করে। ইরানের মদদপুষ্ট শিয়া হুতিদের উত্থান তাই এখন সৌদি আরবের অন্যতম মাথা ব্যথার কারণ। দেশটির প্রতিবেশী রাষ্ট্রে ইরানের মদদপুষ্ট শিয়া হুতিদের ক্ষমতা দখল তাই কোনভাবেই মানতে পারছে না সুন্নিপ্রধান দেশটি। ইরানকে শায়েস্তা করতে প্রয়োজনে ইসরাইলকেও নিজের আকাশ সীমানা ব্যবহার করতে দিতে রাজি দেশটি। ইরানের আস্ফালনে কেবল সৌদি আরবই উদ্বিগ্ন নয়, বরং অন্যান্য সুন্নি দেশ (কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান) সমভাবে চিন্তিত। তাই ইয়েমেনের হুতিদের রুখতে ‘ডিসিসিভ স্ট্রম’ (চরম আঘাত) অংশ নেয় উপসাগরীয় সহযোগিতা কাউন্সিলের মিত্র রাষ্ট্রগুলো। এ হামলার মাঝেই অনুষ্ঠিত হচ্ছে মিসরে আরব লীগের সম্মেলন। যেখানে সুন্নিপ্রধান রাষ্ট্রপ্রধানরা দৃঢ়কণ্ঠে হামলা চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন এবং নিজেদের মাঝে সহযোগিতার বিষয়টির ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করেন। ইতোমধ্যে আরব দেশগুলোর সম্মিলিত বাহিনী তৈরির প্রস্তাবও আসে। আপাতত চল্লিশ হাজার সদস্যের একটি বিশেষ বাহিনী তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। আরব লীগের সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন ইয়েমেনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট আবদুরাব্বাহ মুনসুর আল হাদি। মিসরের অবকাশ যাপন কেন্দ্র শারম-আল শেখে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখলের পর হুতিরাই কার্যত দেশের ক্ষমতায়। হুতিদের সাহায্য করছে ইয়েমেনের সাবেক প্রেসিডেন্ট আলী আব্দুল্লাহ সালেহ্্র সমর্থক ও সেনাবাহিনীর বিদ্রোহী অংশ। নিরাপত্তা বাহিনীতে বিভাজনের কারণে বর্তমান প্রেসিডেন্ট হাদি বেশিদূর এগোতে পারেননি। গত জানুয়ারি মাসেই তাঁকে গৃহবন্দী করে হুতি বিদ্রোহীরা। ২০১২ সালে হাদি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হন। আরব বসন্তে সাবেক প্রেসিডেন্ট সালেহর ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর হাদি ক্ষমতায় আসেন। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা সালের ব্যাপক প্রভাব এখনও দেশটিতে লক্ষ্য করা যায়। সালেহর অনুসারীরা হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গেই বর্তমান প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে লড়াইরত।

এ তিন পক্ষের বাইরে ইয়েমেনে আল কায়েদা সংশ্লিষ্ট জঙ্গীগোষ্ঠী একিউপির ব্যাপক তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়। বিচিত্র স্বার্থের নানা পক্ষের সংঘাতে এখন যুক্ত হয়েছে সৌদি মিত্র রাষ্ট্রের বিমান হামলা। ইতোমধ্যে স্থল অভিযানেরও পরিকল্পনা আছে সুন্নি রাষ্ট্রদ্বয়ের। এ লক্ষ্যে সৌদি আরব ১,৫০,০০০ সৈন্য প্রস্তুত রেখেছে। এবং বাব অল মান্দাব বন্দরে মিসর ও সৌদি আরবের বেশ কয়েকটি ডেস্ট্রয়াব ভিড়েছে। ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট মনসুর আল হাদির অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে মূলত আরব রাষ্ট্রগুলোর এ বিমান হামলা। রাজধানী সানা থেকে এডেন পালিয়ে আসা প্রেসিডেন্ট হাদি কিছুদিন আগে নিরাপত্তা পরিষদের কাছেও এমন আহ্বান জানান। ইয়েমেনের বন্দরনগরী এডেনেও নিরাপদ ছিলেন না প্রেসিডেন্ট মনসুর আল হাদি। হুতি বিদ্রোহীরা সানা দখলের পর উত্তরাঞ্চলের সাদা ও বন্দরনগরী এডেনের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। হুতিদের আগ্রাসন ঠেকাতে এগিয়ে আসে সৌদি আরবের নেতৃত্বে অন্য সুন্নি প্রধান আরব রাষ্ট্র। নির্বাচিত বৈধ সরকারকে রক্ষায় গত বুধবার রাতে সানাসহ হুতিদের অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলা শুরু করে সৌদি আরব ও মিত্র রাষ্ট্র। অভিযানের প্রতি সমর্থন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো। কেবল চীন ও ইরান এ বিমান হামলার নিন্দা জানায়। ইরান সতর্ক উচ্চারণ করে বলেছে, ‘এ হামলা এক্ষণি বন্ধ করা উচিত। কারণ এতে ইয়েমেন আরও বৃহত্তর যুদ্ধ বেধে যাবে’। ছয় পরাশক্তির সঙ্গে ইরানের পরমাণু চুক্তির কারণেই দৃশ্যত দেশটি এখনও নিশ্চুপ রয়েছে।

প্রকাশিত : ১ এপ্রিল ২০১৫

০১/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: