আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

প্রসঙ্গ বাংলাদেশ ॥ স্বল্পোন্নত বনাম মধ্য আয়ের দেশ

প্রকাশিত : ২৯ মার্চ ২০১৫
  • ড. মিহির কুমার রায়

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ফোরামে রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে বলা হচ্ছে, দেশের অর্থনৈতিক সূচকগুলো এমনভাবে এগোচ্ছে যে, আগামী ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হয়ে যাবে। এই বক্তব্যের বাস্তবতা নিয়ে প্রথাগতভাবে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা খুবই চিন্তিত। এর প্রধান কারণ হিসেবে ধরা হয় ‘যুক্তিবাদী প্রত্যাশা’, যার অনুসারী অর্থনীতিবিদরা, রাজনীতিবিদরা নয়। অর্থনীতির চলকগুলো কতগুলো অনুমানের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত এবং এরই সূত্র ধরে আগামী ছয় বছর পর বাংলাদেশ মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হতে পারবে কিনা, তা কতগুলো চলকের গতি প্রকৃতির ওপর নির্ভর করবে, রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্যের ওপর নয়।

বেশ কিছুদিন আগে জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা (আংটাড) এলডিসি প্রতিবেদন-২০১৪-এর নামে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনের এবারকার প্রতিপাদ্য বিষয় হলো, কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি-২০১৫ পরবর্তী উন্নয়ন এজেন্ডা। তিন বছর পর পর তিনটি সূচক যথাক্রমে মাথাপিছু আয়, মানব সম্পদ উন্নয়ন সূচক ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকের ওপর নির্ভর করে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) নির্ধারণ করা হয়। এখন এলডিসি থেকে মধ্য আয়ের দেশে পৌঁছতে হলে যে সংখ্যাতাত্ত্বিক বিবেচনা তাতে দেখা যায় যে, মাথা পিছু আয় হতে হবে ১১৯০ মার্কিন ডলার, মানব সম্পদ সূচক ৬৬ এবং অর্থনীতির ভঙ্গুরতা সূচক ৩২। এর মধ্যে একটি দেশ যে কোন দুটি সূচক অর্জন করতে পারলেই, সেটি এলডিসি থেকে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করে থাকে। আংকটাডের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১৩ সালে বাংলাদেশের অবস্থান হলো মাথাপিছু আয় ৯০০ মার্কিন ডলার, মানব সম্পদ সূচক ৫৪.৭ এবং অর্থনীতির ভঙ্গুরতা সূচক ৩২.৪। প্রথম দুটি সূচকের বাড়তির প্রবণতা এবং তৃতীয় সূচকটির নি¤œমুখী প্রবণতা অর্থনীতির জন্য আশাপ্রদ।

বাংলাদেশ ১৯৭৫ সাল থেকে এলডিসিএর তালিকাভুক্ত হয়েছে এবং ২০১২ সালের ইউএনওএর মানদ-ে দেশটি একটি স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি)। সেই হিসেবে বাংলাদেশ অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা পায় এবং উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে কম সুদে ঋণও পায়। স্বল্পোন্নত দেশগুলোর অবস্থার মূল্যায়ন প্রতি তিন বছর পর পর করা হয় এবং সেই হিসাবে পরবর্তী মূল্যায়ন হবে ২০১৫ সালে, যেখানে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির কোন সম্ভাবনাই নেই। কারণ তিনটি মানদ-ের মূল্যায়নে এখনও বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে। পরবর্তী ২০১৮ সালে যদি বাংলাদেশকে এলডিসি থেকে বেরিয়ে আসার প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্তি হতে হয়, তা হলে মাথাপিছু আয়, মানব সম্পদ ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকে যুগান্তকারী অগ্রগতি সাধন করতে হবে। কাজটি খুব সহজ নয়। বর্তমান সরকারের রূপকল্প-ভিশন ২০২১ এ উক্ত সময়ে বাংলাদেশকে একটি মধ্য আয়ের দেশে পরিণত করার যে স্বপ্ন লালন করে চলেছে, তা বাস্তবায়ন হবে নাকি রাজনৈতিক দর্শন হিসেবে থেকে যাবে, তা ভবিতব্য। তবে যেভাবে দেশের অর্থনীতির চলকগুলো এগোচ্ছে যেমন জিডিপি প্রবৃদ্ধি, রফতানি, রেমিট্যান্স, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, খাদ্য নিরাপত্তা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, এমডিজি এর সামাজিক সূচক ইত্যাদি, এ ধারা অব্যাহত থাকলে স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব।

কিন্তু সন্দেহ একটা থেকেই যায়। বিশেষত রাজনৈতিক অস্থিরতায় স্বপ্ন নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই উড়িয়ে দেয়া যায় ন। যদি মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হতে হয়,তবে এখনও বাংলাদেশকে অনেক বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে হবে, বিশেষত প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে, অর্থনীতিকে বহুমুখীকরণের ক্ষেত্রে এবং অর্থনীতিকে বিশেষায়িত করার ক্ষেত্রে। এ ক্ষেত্রে অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তনের বিষয়টি অত্যন্ত জরুরী।

বাংলাদেশকে এলডিসি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ৮-১০ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। এলডিসি থেকে বেরিয়ে আসার পথে বড় একটি বাধা হলো সুশাসনের অপর্যাপ্ততা। বর্তমানে এলডিসিভুক্ত দেশের সংখা আছে ৪৮টি এবং ১৯৭১ সাল পরবর্তী আজ পর্যন্ত মাত্র ৪টি দেশ এলডিসি থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। এর মধ্যে সার্কভুক্ত দেশ মালদ্বীপ রয়েছে যারা তাদের বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করে এই গৌরব অর্জন করেছে। অপরদিকে এলডিসি থেকে বেরিয়ে আসার স্বপ্নে বিভোর বাংলাদেশকে তার সম্মানের স্বার্র্থে, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির স্বার্থে, এই গৌরব অর্জন করেতে হলে তার অবকাঠামো দুর্বলতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সুশাসনের ঘাটতি দূর করতে হবে সফলভাবে। যদিও কাজটি এত সহজ নয়।

কৃষি অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও ডিন, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা

প্রকাশিত : ২৯ মার্চ ২০১৫

২৯/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: