আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

তবু ঈর্ষণীয় সাফল্য

প্রকাশিত : ২৫ মার্চ ২০১৫
  • জাহিদুল আলম জয়

বাঙালী জাতির ইতিহাসে সেরা অর্জন ‘বাংলাদেশ’ নামের লাল-সবুজের দেশ পাওয়া। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানীদের মাথা নিচু করিয়ে স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে বাংলাদেশ। সেরা এই প্রাপ্তির পরও আবেগপ্রবণ এই জাতি অনেক কিছু পেয়েছে। তবে খেলাধুলা নির্দিষ্ট করে বললে ক্রিকেট যেন সবকিছুকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। রাজার খেলা হিসেবে খ্যাত এই খেলায় বাংলাদেশ দেখিয়ে চলেছে অবিস্মরণীয় সাফল্য। এবারের বিশ্বকাপ ক্রিকেটে কোয়ার্টার ফাইনালে খেলে ইতিহাস গড়েছে মাশরাফি বিন মর্তুজার দল। অনেকেই বলছেন, ১৯৭১ সালের পর ক্রীড়াঙ্গনে এটাই বাংলাদেশের সেরা প্রাপ্তি।

ক্রিকেটের জনক ইংল্যান্ডকে মাটিতে নামানোর পর দেশজুড়ে শুরু হয় আনন্দ, উৎসব। যার রেশ বহমান আছে এখনও। শেষ আটে পাড়ি জমানোর পর টাইগাররা সেমিফাইনালে খেলবে এমন স্বপ্ন বুনতে থাকেন ১৬ কোটি বাংলাদেশী। কিন্তু ১৯ মার্চ ভারতের কাছে কোয়ার্টার ফাইনালে হেরে বিদায় নিতে হয় মাশরাফির দলকে। তবে ওই ম্যাচে বাংলাদেশ হারেনি, হারিয়ে দেয়া হয়েছে। এমন দাবি দেশের আপামর ক্রিকেট ভক্তদের। শুধু বাংলাদেশীরাই নন, জঘন্য পক্ষপাতিত্বমূলক আম্পায়ারিং করে যে বাংলাদেশকে হারানো হয়েছে সেটা মেনে নিয়েছেন ভিনদেশী সাবেক ও বর্তমান গ্রেট ক্রিকেটাররা।

পক্ষপাতমূলক আম্পায়ারিংয়ের বিরুদ্ধে গোটা দেশে সমালোচনার ঢেউ বইয়ে যায়। জোর করে হারিয়ে দেয়া হলেও ক্রিকেটারদের পারফরমেন্সে মুগ্ধ হয়েছে দেশবাসী। তাই রবিবার মাশরাফি, মাহমুদুল্লাহ, মুশফিকরা দেশে ফেরার পর ভক্তদের ভালবাসায় সিক্ত হয়েছেন। ক্রিকেটারদের অবিস্মরণীয় সাফল্য দেশে বিরাজমান রাজনৈতিক অস্থিরতাকেও কিছু সময়ের জন্য থামিয়ে দেয়। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট টানা অবরোধের পাশাপাশি হরতালের মতো সহিংসতামূলক কর্মসূচী টানা চালিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বকাপে বাংলাদেশের দুর্দান্ত সাফল্যের কারণেই প্রথমবারের মতো ধ্বংসাত্মক হরতাল কর্মসূচী শিথিল করে বিএনপি। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপির নাশকতামূলক কর্মকা-ের কারণে এ পর্যন্ত অন্ততপক্ষে ১০০ জন নিরীহ মানুষ জীবন দিয়েছে। কম সময়ের জন্য হলেও ক্রিকেটাদের গৌরবগাথা অবশেষে সব বিভেদ ভোলাতে সক্ষম হয়। সাধারণ মানুষ মনে করছেন, শুধু একটি দিনের জন্য নয়, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সবসময়ের জন্য দেশের মানুষের কল্যাণার্থে কাজ করবে।

এবার অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে বাংলাদেশ দল গিয়েছিল কোয়ার্টার ফাইনাল খেলার স্বপ্ন নিয়ে। সেই দুরূহ স্বপ্ন পূরণের পথে ইংল্যান্ডের মতো শক্তিশালি দলকে নাকানি-চুবানি খাইয়েছে টাইগাররা। শেষ আটে ভারতের কাছে হারলেও বাংলাদেশ ক্রিকেটবিশ্বকে আরেকবার দেখিয়েছে নিজেদের জাত। এবারের বিশ্বকাপে শুরুটা বেশ ভাল হয় বাংলাদেশ দলের। আফগানিস্তানকে ১০৫ রানে হারিয়ে মিশন শুরু করে বাংলাদেশ। এ ম্যাচে বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান ৬৩ রানের ইনিংস খেলে প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে ওয়ানডেতে চার হাজার রান করার গর্বিত মালিক বনে যান। দ্বিতীয় ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে বৃষ্টির জন্য পরিত্যক্ত ম্যাচের সুবাদে ১ পয়েন্ট পেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে চলে যায় টাইগাররা। শ্রীলঙ্কার কাছে হেরে গেলেও এরপর স্কটল্যান্ডকে ৬ উইকেটে হারিয়ে দেয় বাংলাদেশ ৩১৯ রানের লক্ষ্য তাড়া করে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বাধিক রান তাড়া করে জেতার রেকর্ড গড়ে মাশরাফির দল। বিশ্বকাপে নিজেদের সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহও এটি।

এরপর ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচে ১৫ রানে জিতে কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করে বাংলাদেশ। ম্যাচে পেসার রুবেল হোসেনের দুর্দান্ত এক স্পেলে মুখ থুবড়ে পড়ে ইংলিশরা। ম্যাচের শুরুতেই নতুন দিগন্তের নিশানা দেখান মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ। তিনি প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে বিশ্বকাপে সেঞ্চুরি করার গৌরব দেখান। ১০৩ রানের ইনিংস খেলেন তিনি। গ্রুপের শেষ ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের কাছে ৩ উইকেটে হারলেও টাইগারদের পারফরমেন্স প্রশংসিত হয় সর্বমহলে। এ ম্যাচেও শতক হাঁকান মাহমুদুল্লাহ। বিশ্বকাপে টানা দ্বিতীয় শতক তিনি ছাড়া করেছেন আর মাত্র ৮ ব্যাটসম্যান। ১২৮ রানের ঝকঝকে ইনিংস খেলে অপরাজিত থাকেন তিনি। এরপর কোয়ার্টার ফাইনালে কি হয়েছে তা তো গোটা বিশ্বই দেখেছে। ভারতকে একপ্রকার ‘উপহার জয়’ দিয়েছে ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসি!

নিজেদের ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা সাফল্য পাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই মাশরাফিদের বরণে ভক্তদের ঢল নেমেছিল ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। ক্রিকেটারদের বরণ করতে আসা ভক্তদের মধ্যে কারও গায়ে শোভা পায় বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের জার্সি, কেউ আসেন জাতীয় পতাকা মাথায় বেঁধে, ব্যানার- ফেস্টুন ও প্ল্যাকার্ড নিয়েও হাজির হন অনেকে। হাজার হাজার ভক্ত-সমর্থক বিমানবন্দর এলকায় শামিল হয়েছিলেন। সমর্থকদের উৎসবের প্রবাহ বিমানবন্দর এলাকা ছাড়াও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের দুই প্রান্তে ব্যাপৃত ছিল। তাদের ব্যানার ও প্ল্যাকার্ডে মাশরাফি-সাকিব-মাহমুদুল্লাহ-রুবেল-মুশফিকদের স্বাগত জানিয়ে লেখা ছিল বিভিন্ন সেøাগান।

স্বপ্ন আর বাস্তবতার অপূর্ব সমন্বয় শেষে দেশে ফেরার পর মাশরাফির দলকে ফুলের শুভেচ্ছা আর ভালবাসায় সিক্ত করে বরণ করে নেয়া হয়। দেশে ফেরার পর বাংলাদেশ অধিনায়ক মাশরাফি ভবিষ্যতে আরও বড় সাফল্যের প্রতিশ্রুতি দেন। টাইগার কা-ারি বলেন, বিশ্বকাপে নিজেদের সেরাটা উজাড় করে খেলার চেষ্টা করেছি আমরা। বিশ্বকাপের আগে আমাদের সময়টা ভাল যাচ্ছিল না। সবাই জানেন যে ২০১৪ সাল আমাদের অত্যন্ত খারাপ কেটেছে। বিশ্বকাপের দু’টি প্রস্তুতি ম্যাচেও আমরা হেরেছিলাম। কিন্তু বিশ্বকাপ মঞ্চে আমরা যা করতে পেরেছি তা আনন্দের, অসাধারণ। দলের এমন সাফল্যের জন্য ভক্ত-সমর্থকদের ধন্যবাদ জানিয়ে মাশরাফি বলেন, দলের এই অর্জনের সবটুকু ভক্তদের জন্যই। আগামীতেও ভক্তরা এভাবে দলকে সমর্থন জানাবে আশা করছি। টাইগার অধিনায়কের বিশ্বাস, আগামী বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দল এবারের পারফরম্যান্সকেও ছাড়িয়ে যেতে পারবে। এ প্রসঙ্গে নড়াইল এক্সপ্রেসের ভাষ্য, আল্লাহর রহমতে বিশ্বকাপ মঞ্চে আমরা ভাল খেলেছি। গত জিম্বাবুইয়ে সিরিজের পর থেকেই আমাদের পারফরম্যান্সে উন্নতি হয়েছে। দল যদি এই পারফরম্যান্স ধরে রাখতে পারে তাহলে আগামীতে আরও বেশি সাফল্য পাব, এগিয়ে যাব। আমি বিশ্বাস করি, আগামী বিশ্বকাপে আমরা আরও ভাল করতে পারব। কপিল দেবের নেতৃত্বে ১৯৮৩ সালে ভারত এবং অর্জুনা রানাতুঙ্গার নেতৃত্বে ১৯৯৬ সালে শ্রীলঙ্কার বিশ্বকাপ জয় ক্রিকেট ইতিহাসের স্মরণীয় ঘটনগুলোর মধ্যে শীর্ষে। এ দু’টি বিশ্বকাপে ক্রিকেট দেখেছিল দুটি নতুন পরাশক্তির উত্থান। ’৮৩’র বিশ্বকাপ জিতে ভারত ও ’৯৬’র বিশ্বকাপ জিতে শ্রীলঙ্কা বিশ্ব ক্রিকেটে নিজেদের শক্তিমত্তার জানান দেয়। ভারত, শ্রীলঙ্কার পথ অনুসরণ করে বাংলাদেশও ক্রিকেটে পরাশক্তি হওয়ার পথে আছে। বিশ্বকাপে মাশরাফির নেতৃত্বে সাকিব, তামিম, নাসিররা বহির্বিশ্বকে দেখিয়েছে বাঘের গর্জন। ভারত, শ্রীলঙ্কার মতো বিশ্বকাপ জয়ে না হোক ২০১২ সালের এশিয়া কাপে রানার্সআপ ও এবারের বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে খেলে বাংলাদেশ জানান দিয়েছে, তারাও পরাশক্তি হওয়ার পথেই আছে। তিন বছর আগে এশিয়া কাপে বলতে গেলে পাল্টে যাওয়া বাংলাদেশকেই দেখে ক্রিকেট বিশ্ব। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে হার দিয়ে মিশন শুরু হলেও ওই ম্যাচেই বাংলাদেশ জানান দেয় শুধু অংশগ্রহণই তাদের লক্ষ্য নয়। পরের দুই ম্যাচে বিশ্বকাপের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ভারত ও রানার্সআপ শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো এশিয়ার সেরার আসরের ফাইনাল মঞ্চে জায়গা করে নেয় লাল-সবুজের দেশ। ফাইনালে পাকিস্তানের কাছে হারলেও বাংলাদেশের পারফরমেন্স সবাইকে বিমোহিত করে।

সাফল্যের এই ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়ে ২০১৪ সালে। কিন্তু সাময়িক এই ব্যর্থতা কাটিয়ে আবারও চেনা ছন্দে ফিরেছে টাইগাররা। বাংলাদেশের ক্রিকেটে পরিবর্তনের এ হাওয়া লেগেছে ২০১১ সালের অক্টোবরে সফরকারী ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে সিরিজ থেকে। এরপর ধারাবাহিকভাবে সাফল্য পেয়ে চলেছে টাইগাররা। এবারের বিশ্বকাপ ও ২০১২ সালের এশিয়া কাপের আগে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে সেরা সাফল্য ছিল ২০০৭ বিশ্বকাপ। ক্যারিবীয় দীপপুঞ্জে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে বাংলাদেশ হারিয়েছিল দুই পরাশক্তি ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে। যোগ্যতা অর্জন করেছিল সুপার এইটে খেলার। ২০১৫ সালে টাইগাররা খেলেছে কোয়ার্টার ফাইনালে। যে কারণে বদলে যাওয়া বাংলাদেশকে এখন বড় শক্তি হিসেবেই দেখছে ক্রিকেট বিশ্ব। শ্রীলঙ্কার কুমার সাঙ্গাকারা, ভারতের শচীন টেন্ডুলকরসহ আরও অনেকেই নিঃশঙ্কোচে এমন বলেছেন। প্রতিষ্ঠিত ক্রিকেট খেলুড়ে দেশগুলোতেও বাংলাদেশকে নিয়ে চলছে প্রশংসাবাণী।

সাবাশ বাংলাদেশ।

প্রকাশিত : ২৫ মার্চ ২০১৫

২৫/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: