কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথে বাংলাদেশ

প্রকাশিত : ১৫ মার্চ ২০১৫
  • এস. এম. শাহীনুজ্জামান

টেকসই উন্নয়নের শর্ত তিনটি। অর্থনীতি, সামাজিক ও পরিবেশ সূচকের উন্নয়ন এবং গণতন্ত্র। এই তিনের সমন্বয় ও বিধিবদ্ধ সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা টেকসই উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করে। এখানে রাষ্ট্র এবং সরকার কাঠামোর, বিশেষত শাসক শ্রেণীর কাজ হচ্ছে এই ধারাবাহিক কেন্দ্রীভূত উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করা। সাংবিধানিক উদ্যোগ এবং সামাজিক বিন্যাসে উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি টেকসই উন্নয়নের তিনটি সূচকের ভিত্তি মজবুত করে।

অর্থনৈতিক উন্নতির মানদ- হলো, অবকাঠামো উন্নয়ন, জীবনমান, দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক ভৌত অবকাঠামো, যা আমরা খুঁজে পাই রূপকল্প-২০২১, তথা রাজনৈতিক দিনবদলের সনদে। সামাজিক ও পরিবেশ সূচকের উন্নয়নের ক্ষেত্রে আমরা দেখি, ১৯৭২ সালে বিশ্বব্যাংক কর্তৃক প্রকাশিত ধারণা সূচক অনুসারে তৎকালীন সামাজিক উন্নয়ন সূচক যেমন, শিশু মৃত্যু/মাতৃমৃত্যুর হার, খাদ্য নিরাপত্তার বৈশ্বিক মাপকাঠি, মাথাপিছু আয় ১৩০ মার্কিন ডলার থেকে ৩০০ মর্কিন ডলারে উন্নীতকরণ, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর মান তৎকালীন সময়ের দ্বিগুণ অবস্থানে আনার সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৫০ বছর। কিন্তু বিগত ৬ বছরে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সুষ্ঠু পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন কাক্সিক্ষত লক্ষ্যের চেয়েও ১২২ গুণ বেশি অর্জন সম্ভব হয়েছে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং তার ওপর প্রতিস্থাপিত দার্শনিক মতবাদ অনুসারে গণতন্ত্র হলো একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া যা ক্রমান্বয়ে চর্চার মাধ্যমে পরিপূর্ণতা লাভ করে। বিশ্বের প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাগুলো কোন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিকশিত হয়নি। যেমন যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশ থেকে শুরু করে নিকটতম প্রতিবেশী দেশ ভারত, কোথাও গণতন্ত্র মেয়াদি ভিত্তিতে বিকশিত হয়নি। সেখানকার আজকের গণতান্ত্রিক অবস্থা শতাব্দী বা তারও বেশি সময়ের চর্চার ফসল। কিন্তু বাংলাদেশে চলে আসছে নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতার উৎসব। অথচ বিগত ৬ বছরের নিরবচ্ছিন্ন গণতন্ত্র, সুষ্ঠু নীতিমালা এবং রাজনৈতিক সরকারের সদিচ্ছা টেকসই গণতন্ত্রের আবহ এবং দৃষ্টিগাহ্য সাফল্য তৈরি করেছে।

২০০৮ সাল থেকে অদ্যাবধি সরকার জাতীয় খাদ্যনীতি এবং কার্যক্রম ২০০৮-২০১৫, গৃহনির্মাণ আইন-২০০৮, জাতীয় টেকসই উন্নয়ন কৌশল-২০০৯, জলমহাল ব্যবস্থাপনা নীতিমালা-২০০৯, পদ্মা সেতুর জমি অধিগ্রহণ আইন-২০০৯, জ্বালানি রূপান্তর আইন-২০১০, গ্যাসনীতি-২০১০, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল আইন-২০১০, সংশোধিত রূপান্তরিত জ্বালানি আইন-২০১১, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেস প্রকল্প আইন-২০১১, শিল্পনীতি-২০১১, টেকসই এবং রূপান্তরিত জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন-২০১২, জাতীয় পানি আইন-২০১৩, হাওর মাস্টারপ্ল্যান ২০১২-২০৩২, সমুদ্রসীমা উন্নয়ন কৌশল,ড্যাপ (ডিটেল এরিয়া প্ল্যান), দারিদ্র্য বিমোচন কৌশলপত্র ২০০৯-২০১১, তথ্য অধিকার আইন-২০০৯, জনপ্রশাসন সংস্কার কৌশলপত্র ২০১০-২০১৪ এবং ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ২০১১-২০১৫ ইত্যাদি গ্রহণ করেছে। এই আইন ও নীতিমালা বাস্তবায়নের ফলে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে দৃশ্যমান অর্থনৈতিক অগ্রগতির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো জিডিপি বৃদ্ধির হার। এই হার ২০০১-২০০৬ মেয়াদে যেখানে ছিল ৪.৮ হতে ৫.০০ শতাংশ, তা ২০০৮-২০১৪ মেয়াদে দাঁড়িয়েছে ৬.০০ হতে ৬.৭ শতাংশে। এই প্রবৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা এবং বৈরী রাজনৈতিক সহিংসতা সত্ত্বেও। মনে রাখা প্রয়োজন, এই অগ্রগতি অর্জনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান জিডিপির উচ্চ বৃদ্ধিহারসম্পন্ন দেশগুলোর মধ্যে ষষ্ঠ স্থানে উঠে এসেছে।

২০০১-২০০৬ মেয়াদে তৈরি পোশাক রফতানি হয়েছিল ১৬.০০-১৮.০০ বিলিয়ন ডলার। ২০০৮-২০১৪ মেয়াদে এই রফতানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০.০০-২৪.০০ বিলিয়ন ডলার। এখানেও বছরব্যাপী সহিংস রাজনৈতিক তৎপরতা ব্যাপকভাবে দৃশ্যমান হয়। বিশেষ করে মহাসড়কে পণ্যবাহী কাভার্ডভ্যান, ট্রাকে পেট্রোলবোমা হামলা, ঢাকার রাজপথে প্রকাশ্যে বিদেশী ক্রেতার গাড়িবহরে শিবির কর্তৃক ককটেল হামলা তো ছিলই, সঙ্গে ছিল প্রধান বিরোধী নেতার যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছে জিএসপি প্রত্যাহারের আবেদনের চিঠি এবং একজন নামকরা নোবেলজয়ীকে দিয়ে লবিং করানো।

২০০১-২০০৬ মেয়াদে দেশে রেমিট্যান্স আয় হয়েছিল ৬.০০-৮.০০ বিলিয়ন ডলার। ২০০৮-২০১৪ মেয়াদে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১০.০০-১৪.০০ বিলিয়ন ডলারে। পাঠকদের নিশ্চয়ই মনে আছে, ২০১১ সালে প্রকাশিত মধ্যাপ্রাচ্য সাময়িকীর সেই প্রতিবেদনের কথা, যেখানে উল্লেখ্য করা হয়েছিল জামায়াত-বিএনপির লবিং কিভাবে অজস্র অর্থ ব্যয় করেছিল জনশক্তি রফতানি বন্ধ করতে, যাতে অর্থনৈতিক সঙ্কট তৈরি করে সরকারকে ব্যর্থ করে দেয়া যায়। দারিদ্র্যে নিরসনে এই সরকারের সাফল্যও বিরাট। ১৯৯০-২০০৬ সময়ে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪০ শতাংশ। ২০০৮-২০১৪ সময়ে তা নেমে আসে ১৯.৭৫ শতাংশে। যেখানে ২৬ বছরে দারিদ্র্য কমেছে ৪০ ভাগ সেখানে মাত্র ৫ বছরে দারিদ্র্য কমেছে ২০ ভাগ।

নানা বাধা অতিক্রম করে অর্থনৈতিক গতি সঞ্চারে সরকারের গতিশীল এবং উদ্ভাবনী নীতিমালা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথকে ত্বরান্বিত করেছে। যেমন পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশীপে অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি ক্ষেত্রে বেসরকারী বিনিয়োগ উৎসাহিতকরণ, আইপিপি নীতিমালা দ্বারা বিদ্যুতক্ষেত্রে যুগান্তকারী সাফল্য অর্জন অন্যতম। বিস্ময়কর সাফল্য আসে টেলিকমিউনিকেশন খাতেও, যার বৈদেশিক বিনিয়োগের শেয়ার দাঁড়ায় ৪৩ শতাংশ।

২০০৮ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ব্যাপকভিত্তিক অবকাঠামো উন্নয়ন অথনৈতিক উন্নতির গতিকে ত্বরান্বিত করেছে ব্যাপকতর। এ সময়ের মধ্যে ৬০০০ কিলোমিটার গ্রামীণ নতুন পাকা রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে পদ্মা বহুমুখী সেতু, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-ময়মনসিংহ চারলেন রাস্তা, ঢাকা মেট্রো, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র, পায়রা সমুদ্রবন্দর, সমুদ্রসীমা অর্জন এবং তার সঠিক ব্যবহারের জন্য সমুদ্র উন্নয়ন কৌশলপত্র সমীক্ষা বাস্তবায়ন।

স্বাস্থ্য খাতে জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন সূচক অনুসারে ২০১১ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৮৭ দেশের মধ্যে ১৪৬ তম। মাথাপিছু জাতীয় আয় ছিল ১৫২৯ মার্কিন ডলার, মানুষের গড় আয়ু ৬৮.৯ বছর এবং মানব উন্নয়ন সূচক ছিল ০.৫০০, যা কিনা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ যেমন নেপাল, ভুটান, ভারত ও পাকিস্তানের তুলনায় অনেক অগ্রসরমান। তথ্য ও উপাত্তগুলোকে যদি ২০০৬ সালে এবং ২০১১ সালের মধ্যে তুলনা করা যায় তাহলে চিত্র দাঁড়ায় এমনÑ জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ২০০৬ সালে ১.৪২ শতাংশ এবং ২০১১ সালে ১.৩০ শতাংশ। শিশুমৃত্যুর হার হ্রাস ২০০৬ সালে ১০০০ জনে ৮৭ জন এবং ২০১১ সালে ১০০০ জনে ৩৯ জন। মাতৃ মৃত্যুর হার হ্রাস ২০০৬ সালে ১০০০ জনে ৩২২ জন এবং ২০১১ সালে ১০০০ জনে ১৯০ জন। গ্রাম পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো যেন স্বাস্থ্যসেবাকে সাধারণ মানুষের দুয়ারে নিয়ে গেছে।

এছাড়াও বিভিন্ন ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম যেমন ভিজিএফ, বয়স্কভাতা, মুক্তিযোদ্ধাভাতা, স্বনির্ভর খাদ্য কর্মসূচী, গ্রামীণ শব্দ ‘অভাব’-কে দূর করেছে। শিক্ষায় গত ৬ বছরে নিরক্ষরতার হার দূর করার সম্ভব হয়েছে নারীর ২৮ শতাংশ, পুরুষের ৫০.৪০ শতাংশ, প্রাপ্তবয়স্কদের ৩৫.৩ শতাংশ এবং সার্বিকভাবে ৪৪.৩০ শতাংশ। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষেত্রে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি উৎপাদনের জন্য আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। পুনঃবনায়নের আওতায় ১৫০০০০ হেক্টর ভূমিতে বনায়ন করা হয়েছে, যেখানে ২০০৬ পূর্ববতী কোন পদক্ষেপই ছিল না। খাদ্য নিরাপত্তার জন্য পটুয়াখালীতে তৈরি করা হয়েছে এশিয়ার চতুর্থ বৃহত্তম বীজাগার।

বাংলাদেশ আজ বিশ্ব বাস্তবতায় সাফল্যের নাম। বিশ্বের বিস্ময় এবং উদীয়মান সুদৃঢ় অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দেশ। সেই সম্ভাবনার বীজকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে পাকিস্তান, আফগানিস্তান, সিরিয়া, লিবিয়া, ইরাক, বানানোর চেষ্টা বা ধ্বংসাত্মক অপপ্রয়াস কেন? কেন প্রতিদিন নিরীহ-নিরপরাধ মানুষকে পেট্রোল বোমা মেরে পুড়িয়ে মারা হচ্ছে? কেন প্রতিদিন ভাংচুর-অগ্নিসংযোগ করে কোটি কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি করা হচ্ছে? সচেতন বিবেক জাগ্রত হোন, জানুন দেখুন বুঝুন এবং সিদ্ধান্ত নিন, এখনই সময় সিদ্ধান্ত নেয়ার।

লেখক : একজন তরুণ শিল্পোদ্যোক্তা

প্রকাশিত : ১৫ মার্চ ২০১৫

১৫/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: