মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

নারীমুক্তির একদিন

প্রকাশিত : ৯ মার্চ ২০১৫

দিনাজপুরে ধানের চাতালে কাজ করেন মালেকা বেগম। সকাল সাতটা থেকে বিকাল তিনটা, কোন কোনদিন চারটা-পাঁচটা পর্যন্ত কাজ করেন তিনি। কিন্তু টানা সাত-আট ঘণ্টা কাজ করেও ন্যায্য মজুরি পান না মালেকা। তাই মাঝে মাঝে আক্ষেপ আর অভিযোগ ঝরে পড়ে তার কণ্ঠে। পুরুষ শ্রমিকের সমান কাজ করেও পুরো মজুরি পান না তিনি। একজন পুরুষ যেখানে ৪০০-৫০০ টাকা মজুরি পান সেখানে মালেকা ও তার মতো কর্মরত অন্যান্য নারী শ্রমিকরা পান মাত্র ২০০-৩০০ টাকা। ধানের চাতালে কর্মরত শ্রমিকের বেশিরভাগই নারী। আর তারা সকলেই এরকম মজুরি বৈষম্যের শিকার। শুধু চাতালের কাজেই নয় কৃষিকাজ কিংবা রাস্তা নির্মাণের কাজেও নারী শ্রমিকরা এরকম মজুরি বৈষম্যের শিকার বলে জানান আরেক নারী শ্রমিক জোহরা। মজুরি বৈষম্যের এরকম চিত্র শুধু গ্রামে নয় দেখা যায় শহরেও ।

ঢাকার মগবাজার পোশাক তৈরি কারখানায় কাজ করে তাসলিমা। সে জানায় পুরুষ শ্রমিকের সমান কাজ করেও একই সমান মজুরি পান না তিনিও। অপর এক পোশাককর্মী সালেহা বলেন, ‘কাজ করি অপারেটরের আর বেতন পাই হেলপারের।’ শুধুমাত্র প্রান্তিক আয়ের নারীদের মধ্যে নয় কর্পোরেট কিংবা বিভিন্ন বেসরকারী খাতে কর্মরত নারীরাও বেতন বৈষম্যের শিকার। বেসরকারী আইটি ফার্মে কাজ করেন রাবেয়া। সমান পদমর্যাদায় চাকরি করেও তিনি তার পুরুষ সহকর্মীর চেয়ে বেতন কম পান বলে জানান। এমনকি দীর্ঘ কয়েক বছর চাকরি করার পরও কোন পদোন্নতি তিনি পাননি। মোটকথা কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ালেও তারা মজুরিবৈষম্য ও চরম অবহেলার শিকার হচ্ছেন প্রতিনিয়ত। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নারীর সম্পৃক্ততা বাড়লেও নারীর ভাগ্যে আদতে তেমন কোন উন্নতি ঘটেনি। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও প্রতিবছর ঘটা করে নানা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নারী দিবস পালন করা হয়েছে। ৮ মার্চ বিশ্ব নারী দিবস পালনে সরকারী-বেসরকারী নানা কর্মসূচীর আয়োজন করা হয়। কিন্তু নারী শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা আদায়ের লক্ষ্যে যে দিবসের সূচনা সে দাবি আজ শতবছরেও যে আদায় হয়নি সেদিকে কারো তেমন লক্ষ্যই নেই। এমনকি জার্মান কমিউনিস্ট আন্দোলনের নেত্রী ক্লারা ঝেটকিন যিনি এ দিবস পালনের প্রস্তাব করেন তাঁর দেশ খোদ জার্মানিতেও নারীর বেতন বৈষম্যের চিত্র দেখা যায়। সম্প্রতি ‘ইকুয়াল পে ইনিশিয়েটিভ’ নামের এক পরিসংখ্যানে বলা হয় যে, জার্মানে নারীরা পুরুষদের চেয়ে প্রায় এক-চতুর্থাংশ বেতন কম পান। তবে জার্মান অর্থনৈতিক ইনস্টিটিউট এ তথ্যের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করেছেন। তারা এ ব্যবধানকে মাত্র এক শতাংশ বলে উল্লেখ করেছেন। জার্মানির মতো উন্নত রাষ্ট্রে এ ব্যবধান কমাতে সরকার সম্প্রতি তৎপর হয়েছে বলে জানা যায়। কিন্তু আমাদের মতো উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে মজুরি ব্যবধানের পাশাপাশি নারীরা কর্মক্ষেত্রে নানা ধরনের অবহেলা ও বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। কিন্তু এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের টনক নড়ছে না।

বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র তৈরি পোশাক শিল্প। যেখানে কর্মরত শ্রমিকের ৮০ শতাংশই নারী। মালিক কর্তৃপক্ষ এমনকি সরকারও অনেক সময় গর্ব করেন আমাদের দেশের এ নারী শ্রমিকদের নিয়ে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে দেশের ভিত্তি বৃহত্তম এ শিল্পে কর্মরত নারী শ্রমিকরা তীব্র বেতন বা মজুরি বৈষম্যসহ নানা ধরনের অবহেলার শিকার। শুধু তাই নয় অস্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশে কাজ করলেও সেদিকে যেন মালিক বা কর্তৃপক্ষের কোন নজর দেবার সময় নেই। শুধু তাই নয়, প্রায় অর্ধেকেরও বেশি পোশাক কারখানায় মালিকরা নারীদের মাতৃত্বকালীন ছুটি ও বেতন দেয় না। ঐ বিশেষ সময়ে নারী শ্রমিকরা চাকরি ছাড়তে বাধ্য হয়। কোন কোন কোম্পানি ছুটি দিলেও বেতন দিতে নানা ধরনের টালবাহানা করে। তাই এসময়ে নারী শ্রমিকরা চাকরি হারানোসহ মজুরি নিরাপত্তাহীনতার শিকারও হন।

গত এক দশকে দেশের সকল ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য হারে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নারীরও অবদান বেড়েছে আগের তুলনায় অনেক বেশি। পোশাক শিল্পের মূল চালিকাশক্তি নারী শ্রমিকরাই। শুধু তাই নয় বর্তমানে মোট প্রবাসী শ্রমিকদের ১৩ শতাংশেরও বেশি নারী। যারা বিদেশে শ্রম দিয়ে দেশের বৈদেশিক মুদা উপার্জনকে আরও স্ফীত করে যাচ্ছে। দেশের মাঝারি ক্ষুদ্রসহ বিভিন্ন শিল্প উদ্যোক্তাদের ৩৫ শতাংশই এখন নারী। সরকারী-বেসরকারী অফিস, আদালতপাড়াসহ কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য সর্বত্র নারীর পদচারণা বেড়েই চলেছে। পাশাপাশি নারীরা অগ্রণী হয়েছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। শিক্ষা ও ক্ষমতায় নারীর মুক্তি নেই, পায়নি সমতা। বৈষম্য দূর বা সমতা লাভের জন্য যেন একটি দিনই সরব হয় সবাই। আর সময়টায় নারী অধিকার আদায়ের এ সংগ্রামের সকলেই থাকেন নীরব। মজুরি বৈষম্যের বিষয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ( বিআইডিএস) সম্প্রতি এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ৫৭ ভাগ কর্মজীবী নারীর মাসিক বেতন একই পদে ও সমান মর্যাদায় কর্মরত একজন পুরুষ কর্র্মীর বেতনের ৫২ ভাগ। তার অর্থ হলো এই যে, একজন পুরুষকর্মী ১০০ টাকা পেলে নারীকর্মী পান ৫২ টাকা। এছাড়াও বিআইডিএস’র কেরিয়ার টু ফিমেল এমপ্লয়মেন্ট শীর্ষক অপর এক জরিপে উল্লেখ করা হয়Ñ৩৩ শতাংশ নারী চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় শুধুমাত্র কম মজুরির কারণে। সমাজ নারীদের কাজের স্বীকৃতি দিলেও দেয়নি মজুরির সমতা। শতবছর আগে শুরু হওয়া আন্দোলন নারীকে আজ এই একবিংশ শতাব্দীতেও করতে হচ্ছে। যে দাবি নিয়ে নারী দিবসের সূচনা সে দাবি আজও প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

বিশ্বব্যাপী নারী দিবস পালিত হলেও এর উদ্দেশ্য আর লক্ষ্য যেন অনেকটা দেশ-কালভেদে ভিন্ন হয়ে গেছে। নারীর অগ্রগতি ছাড়া জাতির তথা উন্নয়ন দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই সমাজের সকল ক্ষেত্রে নারীর প্রতি বৈষম্য কমাতে হবে। বিশেষ করে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নারীর অবদানকে যথাযথ মূল্যায়ন করে মজুরি বা বেতন বৈষম্য কমাতে সরকার ও অন্যান্য কর্তৃপক্ষকে উদ্যোগী হতে হবে। আর এ ব্যাপারে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে শুধু দিবস পালন করলেই চলবে না এর উদ্দেশ্য-লক্ষ্য অর্জনে সর্বস্তরে শতভাগ সফলতা লাভের চেষ্টা করতে হবে। নারীমুক্তির জন্য একদিন নয় আন্দোলন করতে হবে প্রতিদিন। তাহলেই এ দিবস পালন সার্থক হবে।

যাপিত ডেস্ক

ছবি : আরিফ আহমেদ

প্রকাশিত : ৯ মার্চ ২০১৫

০৯/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: