মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

জিহাদী জন!

প্রকাশিত : ৪ মার্চ ২০১৫
  • কামরুল হাসান

ফরেন ফাইটার নিয়ে পশ্চিমাদের ধারণা উদ্বেগে পরিণত হয়, যখন মুখোশে ঢাকা ব্রিটিশ এক জঙ্গীর হাতে কতল হয় সাংবাদিকসহ বেশ ক’জন পশ্চিমা নাগরিক। গলা কেটে হত্যার এমন বর্বর ভিডিও প্রকাশ হওয়ার পর সকলেই তাকে জিহাদী জন হিসেবে চিহ্নিত করে। মূলত মুক্ত হওয়া এক বন্দী মারফত গোয়েন্দারা জানতে পারে হত্যা করা এই ব্রিটিশ ও তার অপর তিন সঙ্গীকে আইএস দি বিটলস নামেই সম্বোধন করত। আর জন লেননের নামের আদলেই তৈরি জিহাদী জন। সদ্য কিছু ই-মেইল অনুসন্ধান করে জানা যায়, জিহাদী জনের পুরো নাম মোহাম্মদ এমওয়াজি। তিনি একজন কুয়েতি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ এবং তার বয়স ২৬। আইএস জঙ্গীগোষ্ঠীর প্রাক্তন এক সদস্য আবু আইমান বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেনÑ আইএস জঙ্গীর পোস্টার বালকে পরিণত হওয়ার আগে এমওয়াজির সঙ্গে তার সিরিয়ায় পরিচয় হয়। অত্যন্ত নম্র এবং চুপচাপ স্বভাবের এমন যুবক কি করে বর্বর উপায়ে মানুষ হত্যা করছে, এ নিয়েও বিস্ময় প্রকাশ করেন আবু আইমান। আবু আইমান সিরিয়ায়Ñ আইএস জঙ্গীদের পক্ষ ত্যাগ করে পুনরায় ব্রিটেন ফিরে আসেন। সিরিয়ায় তাকে মহিলা ও শিশু হত্যার নির্দেশ দিলে আইমান আইএস সঙ্গ ত্যাগ করেন বলে জানান। আইমান আরও জানান, ব্রিটিশ নাগরিক এমওয়াজিকে ব্যবহার করে আইএস মূলত ইউরোপীয় জিহাদীদের আকৃষ্ট করছে। এমওয়াজি ব্যতিক্রম কোন ব্যক্তি নয়, বরং তার ব্রিটিশ উচ্চারণের জন্যই এমন কদর।

গত আগস্টে মার্কিন সাংবাদিক জেমস ফোলেকে গলা কেটে হত্যার পর প্রথম বিশ্ববাসীর নজরে আসেন মোহাম্মদ এমওয়াজি। পপ গ্রুপ এস ক্লাব ৭, ফুটবল টিম ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ক্লাবের ভক্ত এমন তরুণের আইএসে যোগদান সত্যিই বিস্ময়কর। কুয়েতে জন্ম এমওয়াজি ছয় বছর বয়সে তাঁর পরিবারসহ ব্রিটেন পাড়ি জমান। লন্ডনের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে বেড়ে ওঠা এমওয়াজি সেন্ট মেরি মেগডেলিন চার্চ অফ ইংল্যান্ডে প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করেন। পপ গান, ফুটবল ক্লাব, গেমস এসব নিয়েই ব্যস্ত থাকত নম্র স্বভাবের এই কিশোর। এমওয়াজিব একজন প্রতিবেশী জানান, এমওয়াজির পরিবার উগ্র মৌলবাদী ছিল না এবং স্বভাবে নম্র এ ছেলেটি ধার্মিক হলেও উগ্র ধর্মান্ধ নয়। বরং পড়াশোনা নিয়ে পরিশ্রম করা এ ছেলে ছিল বেশ কেতাদুরস্ত ।

২০০৬ সালে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করা এমওয়াজি ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে থাকে। প্রতিবেশী পাকিস্তানী কিংবা ব্রিটিশ সমাজের সঙ্গে মেলামেশা বন্ধ করে মোহাম্মদ শাকর নামের একজন উগ্রবাদীর সঙ্গে ওঠাবসা শুরু করে। মোহাম্মদ শাকর ছিলেন বিলাল-আল-বেরজায়ির বন্ধু। বেরজায়ি এবং শাকর দুজন ‘দি নর্থ লন্ডন বয়’ নামক সংগঠনের সদস্য। এ সংগঠনটি সোমালিয়া এবং সিরিয়ায় শত শত ব্রিটিশ যোদ্ধাদের রিত্রুট করেছে। আল-বেরজায়ি উত্তর আফ্রিকায় আল-কায়েদার প্রশিক্ষণ শেষে সোমালিয়ার জঙ্গী সংগঠন আল-শাবাবের পক্ষে যুদ্ধ করে। মার্কিন ড্রোন হামলায় তাঁর প্রাণ যাওয়ার পর বেরজায়ির পরিচয় জানা যায়। ব্রিটিশ অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই ফাইভ এ ঘটনার পর নিজ দেশে নজরদারি বৃদ্ধি করে। এবং এমওয়াজির সোমালিয়া জঙ্গী সংগঠন আল শাবাবের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার জন্য তাকে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়।

২০০৯ সালে পুনরায় এমআই ফাইভ এমওয়াজিকে আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদ করে এবং তাকে শারীরিকভাবে নির্যাতনও করা হয়। এমওয়াজি তার প্রতি এমন নিষ্ঠুরতার জন্য ব্রিটিশ মানবাধিকার সংস্থার কাছে এ সংক্রান্ত বেশকিছু ই-মেল প্রেরণ করেন। এমওয়াজি অভিযোগ করেন এমআই ফাইভ সদস্যরা তাকে জঙ্গী হতে বাধ্য করছে। এই কারণে সে ব্রিটেন ত্যাগ করে নিজ দেশ কুয়েতে ফিরে যেতে চায়। কেজ (পধমব) প্রতিষ্ঠানের একজন গবেষক আসিম কুরাইশী দাবি করেন, ‘এমওয়াজি অত্যন্ত চমৎকার একজন যুবক। ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা তাকে এমন উগ্রবাদের দিকে ঠেলে দেয়। ব্রিটেনের অভ্যন্তরে যে শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি তার পরিণতি এমওয়াজি। এমওয়াজিসহ অন্যদের এমন উগ্রপন্থা নিয়ে এখন অনেক প্রশ্ন। কিভাবে লন্ডনে বেড়ে ওঠা এসব যুবক সন্ত্রাসীদের খাতায় নাম লেখায়। নব্বই দশকের দিকে মুসলিম যুবকদের আইরিশ কিংবা শিখ ধর্মাবলম্বীদের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধতার দেখা মিলত। পশ্চিম লন্ডনে এমন সংঘবদ্ধ সংস্কৃতি বেশ পুরনো। কিন্তু জিহাদের নামে উগ্রপন্থার ধরণের শুরুটা একেবারেই নতুন। তাছাড়া এমওয়াজির কোন ক্রিমিনাল রেকর্ড ছিল না। ধারণা করা হয় এমওয়াজির এমন জিহাদী ভাবধারার মূল কারণ তার এক বাল্যবন্ধু। তারা দুজনেই ২০০৯ সালে ভ্রমণের উদ্দেশ্যে উত্তর আফ্রিকার দেশ তানজেনিয়ায় যান। কিন্তু গোয়েন্দা সংস্থা তাদের আটকের পর দেশে ফেরত পাঠান। ব্রিটিশ গোয়েন্দারা তাদের অনেক আগ থেকে নজরদারি করছিল। এমন পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে এমওয়াজি জানানÑ

‘এ ঘটনার পর ব্রিটেনে থাকা আমার জন্য প্রায় অসম্ভব ছিল। নিজেকে গোয়েন্দা নজরদারির কারণে মৃত মনে হতো। কোথাও যাওয়া কিংবা কারও সঙ্গে মেলামেশা করার স্বাধীনতা ছিল না আমার। এ কারণে আমি কুয়েত পাড়ি দিতে চেয়েছিলাম।’

কুয়েতে স্থায়ীভাবে বসবাসের উদ্দেশ্যে এমওয়াজি বিয়ে করেন এবং ২০১২ সালে পুনরায় লন্ডন সফর করেন। কিন্তু পরের বছর নাম পরিবর্তন করে নিখোঁজ হন এ জঙ্গী। সিরিয়ার একটি আশ্রয় শিবিরে এমওয়াজি তার অন্যান্য ব্রিটিশ বন্ধুদের সঙ্গে থাকত। অন্যান্য বিদেশী যোদ্ধারা পরস্পরের সঙ্গে মেলামেশা কিংবা নামাজ আদায় করলেও, এমওয়াজি ছিল ব্যতিক্রম। সব সময় নিশ্চুপ থাকা এই জঙ্গী কম্পিউটার বিজ্ঞানে স্নাতক এবং মেধাবী। তার এমন ভাবমূর্তি কাজে লাগায় আইএস জঙ্গী সংগঠন। মার্কিন সাংবাদিকসহ বেশ ক’জন বিদেশী নাগরিককে হত্যার ভিডিওতে এমওয়াজি ব্যবহার করেন। সেখানে তার ব্রিটিশ উচ্চারণে প্রথম এমওয়াজির পরিচয় পাওয়া যায়।

এমওয়াজির জীবন বৃত্তান্ত

১৯৮৮ জন্মÑ কুয়েত, ছয় বছর পর ১৯৯৪ সালে পরিবারসহ ইংল্যান্ড পাড়ি দেন।

২০০৯ : ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্ট মিনিস্টার হতে কম্পিউটার বিজ্ঞানে ডিগ্রী লাভ।

২০০৯ আগস্ট : উত্তর আফ্রিকার দেশ তানজানিয়ায় দুজন বন্ধুসহ অবকাশ যাপন করে যান কিন্তু দারুস সালামে প্রবেশ করতে অনীহা প্রকাশ করেন। এর পর আমস্টারডাম পাড়ি দেন। নেদারল্যান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের পর ইংল্যান্ড প্রবেশ করেন।

২০০৯ সেপ্টেম্বর : পরিবারের সঙ্গে থাকার উদ্দেশ্যে কুয়েত পাড়ি দেন।

২০১০ জুলাই : স্বল্পসময়ের জন্য ইংল্যান্ড আসেন কিন্তু ভিসা জটিলতার কারণে কুয়েত প্রবেশ করতে পারেননি।

২০১২ : সেল্টা ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ কোর্স পাস করেন।

২০১৩ : নিজের নাম পরিবর্তন করেন। কুয়েত ভ্রমণ করতে চাইলে গোয়েন্দা কর্তৃক বাধাপ্রাপ্ত হন। এরপর পরিবার জানায় তিনি নিখোঁজ। চারমাস পর পুলিশ তার পরিবারকে জানায় এমওয়াজি সিরিয়ায় প্রবেশ করেছে।

প্রকাশিত : ৪ মার্চ ২০১৫

০৪/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: