আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

অদ্ভুত দাঁড়কাক ॥ ফতোয়াতেও দমেননি

প্রকাশিত : ১৬ জানুয়ারী ২০১৫
  • আরিফুর সবুজ

ফতোয়া শব্দটি শুনলেই ভয় করে। মেরুদ- বেয়ে নেমে যেতে থাকে হিমাতঙ্ক। নামবেই না কেন, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অমানবিকতা, নিষ্ঠুরতা আর রক্তাক্ত হিংস্রতা। অথচ ফতোয়া শব্দটির মাহাত্ম্য অনেক। সুন্দর সুশৃঙ্খল পথে চলার পাথেয়। কিন্তু শব্দটির অপব্যবহারের কারণেই প্যাভলভের সাপেক্ষীকরণ মতবাদের মতো এই শব্দটি শোনার সঙ্গে সঙ্গে ভয়-আতঙ্ক চেপে বসে মনে, বুকে। সারা শরীরে। ধর্মকে বর্ম হিসেবে দাঁড় করিয়ে অসাধুজনের সওদাগিরিতে, ফতোয়াবাজিতে নিষ্পেষিত হয়ে আসছে মানুষ যুগে যুগে। ক্ষণে ক্ষণে। দেশে দেশে। ধর্মের ভেকধারী মনুষ্যরূপী শয়তানগুলো নিজ স্বার্থের কাছে ধর্মের সত্য বাণীকে বিকৃতভাবে হাজির করছে। এরা মুখোশধারী। এরা মানুষের বিশ্বাসকে পুঁজি করে দাপিয়ে বেড়ায়। হিংস্র নখের আঁচড়ে ক্ষতবিক্ষত করে তোলে ধর্মকে, ধর্মের বাণীকে। তবু এদের বিরুদ্ধে কথা বলার জো নেই। এরা হিংস্র। এরা ভয়ঙ্কর। সত্য কথা বললে, সত্য কথা লিখলেই কতল করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়বে। এটাই সত্য। নির্মম সত্য। তবু কেউ কেউ আছেন যারা ভয় পান না ফতোয়াবাজদের কৃপাণের। নির্ভীক এরা রুখে দাঁড়ান ধর্মের সওদাগরদের বিরুদ্ধে। প্রয়োজনে কলম ধরেন। খড়গের চেয়ে কলম ধারালো এই সত্যকে বুকে ধারণ করে এঁরা লিখে চলেন। এমনই একজন ব্যক্তি কামেল দাউদ।

সাংবাদিক ও লেখক হিসেবে খ্যাত কামেল দাউদ এমনই একজন কলম সৈনিক, যিনি মৌলবাদী গোষ্ঠীর রোষানলে পুড়ে যাওয়ার ভয় করেন না। মৃত্যুর পরোয়া করেন না। যা সত্য, যা চিরন্তন তা নিশঙ্কচিত্তে তুলে ধরেন কলমের কালিতে। যেদিন থেকে সাংবাদিক হিসেবে, লেখক হিসেবে কলম ধরেছিলেন, সেদিন থেকেই দুর্দমনীয় মনোভাব নিয়ে সত্য প্রতিষ্ঠায় কাজ করে চলছেন। শত প্রতিকূলতা তাকে সত্য প্রকাশে পিছপা করতে পারেনি। এই বলিষ্ঠ চিত্তের মানুষটিকে নিয়ে সম্প্রতি আলজিরিয়া জুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। ‘মেয়েরসলত কাউন্টার ইনভেস্টিগেশন’ (মেয়েরসলত কন্ট্রি ইনকুইটি) বইটিতে ধর্মের অবমাননা করা হয়েছে, এই অভিযোগ তুলে চরমপন্থী ইসলামী দলের নেতা সালাফি ইমাম আব্দেলফাতাহ হামাদাছি জেরাওয়ি ফেসবুকে কামেল দাউদকে মৃত্যুদ- দেয়ার ফতোয়া জারি করলে এমন উচাটন শুরু হয়ে যায়। জেরাওয়ি ফেসবুকে দাউদকে ধর্মত্যাগী আখ্যা দিয়ে লিখেছেন, ‘‘যদি আলজিরিয়ায় ইসলামী শরীয়াহ প্রয়োগ করা হয়, তবে তার শাস্তি মৃত্যুদ-। সে পবিত্র কোরান ও ইসলাম নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে। তার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সে মুসলমানদের মর্যাদাহানি করেছে। পশ্চিমা বিশ্ব এবং ইহুদীদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছে। আমরা আলজিরীয় সরকারের কাছে জনসমক্ষে আল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণাকারীর মৃত্যুদ-ের দাবি করছি।’’ জেরাওয়ি’র অভিযোগ গুরুতর। এই অভিযোগ যদি সত্য হয়, তবে যে কোন মুসলমানই ক্ষেপে যাবে। বিচারের মুখোমুখি দাউদকে দাঁড় করানোর জেরাওয়ির দাবিকে তারা সমর্থন দেবে। কিন্তু জেরাওয়ির এই অভিযোগ সত্য নয়। তা বইটি পড়ে মর্মার্থ উদ্ধার করলেই বোঝা যায়।

২০১৩ সালের অক্টোবরে তাঁর প্রথম উপন্যাস হিসেবে প্রকাশিত হয় ‘মেয়রসলত কাউন্টার ইনভেস্টিগেশন’ বইটি। প্রথম উপন্যাসেই বাজিমাত করে দেন তিনি। ইতোমধ্যে ‘ফ্রানকোইজ মোরিয়াক প্রাইজ’ এবং ‘দ্য ফাইভ কন্টিনেন্টস ফ্রানকোফোনি’ পুরস্কার লাভ করেছেন বইটির জন্য। তাছাড়া বইটি প্রিক্স গণকোর্ট পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছে। ফ্রান্সসহ তেরোটি দেশে বইটি বেস্ট সেলার হয়েছে। সমালোচকরা প্রশংসাও করেছে। বইটির সঙ্গে সঙ্গে কামেল দাউদের জনপ্রিয়তা আলজিরিয়া ছাড়িয়ে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে। সেই সঙ্গে এসেছে জীবনের হুমকিও। এই বইটি নিয়েই বিতর্ক, ফতোয়া। মেয়েরসলত হচ্ছে মদের নাম। আর ফতোয়া জারি করা ইমাম মদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেছেন বলেই হয়ত দাউদের প্রতি এত গোস্বা। নাম ছাড়াও ইমাম সাহেব অধার্মিকতার ছায়াও দেখতে পেয়েছেন গল্পের কাহিনীতেও। বইয়ের কাহিনী পড়ে মর্মার্থ না বুঝে শুধু সমালোচনার ঝাঁপি খুলে বসেননি, রীতিমতো প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছেন। বইটিকে খ্যাতনামা সাহিত্যিক ও দার্শনিক আলবার্ট কামুর বিখ্যাত বই ‘দ্য স্ট্রেঞ্জার’ এর নতুন সংস্করণ বলা যেতে পারে। কামুর বইয়ের কাহিনীকেই কামেল দাউদ নতুন মোড়কে নতুন ঢংয়ে উপস্থাপন করেছেন। সেই উপস্থাপনই এখন কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে তাঁর জন্য।

হারুন নামের সত্তর বয়সী এক বৃদ্ধের কাহিনীর মধ্য দিয়ে কামেল দাউদের ‘মেয়েরসলত কাউন্টার ইনভেস্টিগেশন’ উপন্যাসটির কাহিনী গড়ে উঠেছে। আত্মকথনধর্মী একটি বই। এতে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করা হয়েছে। উপস্থাপন করা হয়েছে প্রেমকে। মানুষের অন্তর্নিহিত সত্তার স্বরূপ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। কুপ্রবৃত্তির সঙ্গে নিত্য লড়াই আর তাতে হেরে যাওয়ার আখ্যান বর্ণনা করা হয়েছে। আঁকা হয়েছে ধর্মের প্রতি কুপ্রবৃত্তি তাড়িত মানুষের নিরাসক্তি, জাতক্রোধ, হিংস্রতা, পশুত্ব, মানবিকতার পরাজয়ের করুণ চিত্র। বইটির সারসংক্ষেপে আমরা দেখি, বৃদ্ধ হারুন মদে চুর হয়ে থাকে সবসময়। মৌঁতাতের এমনই এক সময় মরিয়ম নামক এক তরুণী খুন হয়ে যাওয়া মুসা সম্পর্কে জানতে হারুনের কাছে যায়। বেশ উৎসাহ নিয়েই হারুন মরিয়মকে পেছনের জীবন ইতিহাস ব্যাখ্যা করে। হারুনের বড় ভাই মুসা। তাকে মেরে ফেলা হয়েছিল। কিংবা মুসা আত্মহত্যা করেছিল। হারুন নিশ্চিত নয়। তবে ঐ ঘটনা হারুনের জীবনকে বদলে দিয়েছিল। সেই কাহিনীই মরিয়মের কাছে বলে চলে হারুন। হারুনের প্রতি মুসার ভালবাসা, তার মারা যাওয়া, হারুনের নিজের বেড়ে ওঠা, মায়ের পুত্র শোক, করুণ মৃত্যু এবং হারুনের নিজের জীবনের ধূসর ধুলাময় কাহিনী সে তুলে ধরে মরিয়মের কাছে। হারুনের বলে যাওয়া এই কাহিনীগুলো নিয়েই মেয়েরসলত কাউন্টার ইনভেস্টিগেশন বইটি।

হারুনের বড় ভাই মুসার মৃত্যুতে মা পুত্র শোকে উন্মাদ হয়ে উঠে। শোকে কাতর মায়ের মৃত্যুতে কাঁদেনি হারুন। বরং প্রতিশোধের আগুনে পুড়ে যাচ্ছিল সে। সব কিছু সম্পর্কে আস্থা হারিয়ে ফেলে। এমনকি আস্থা হারিয়ে ফেলে ধর্মের ওপরও। কুপ্রবৃত্তি দ্বারা তাড়িত হয় সে। ঘৃণ্যমনোবৃত্তি তার মাঝে বাসা বাঁধে। অভিশপ্ত জীবনে ঝুঁকে পড়ে সে। অতি তুচ্ছ কারণে জোসেফ নামক এক ব্যক্তিকে খুন করে অবলীলায়। এরপর একের পর এক অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। নৈতিকতা বোধের পালক খুলে পড়ে যায় মন ও মগজ থেকে। এক প্রতিবেশী ইমাম তার অপকর্ম সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়ে ধর্মীয় বয়ান দিলে সে ইমামকে কটাক্ষ করে ধর্মের অসাড়তার কথা উল্লেখ করে। আল্লাহ নিয়ে ভেবে ভেবে সময় নষ্ট করতে সে চায় না বলে ইমামকে জানায়। হারুনের এই বক্তব্যটিকেই কেন্দ্র করে সালাফি ইমাম কামেল দাউদের মৃত্যুদ-ের ফতোয়া জারি করেছে। দাউদকে ধর্মত্যাগী বলে আখ্যা দিয়েছে। কিন্তু উপন্যাসের কাহিনী বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দাউদ ধর্ম বা কোরানের অবমাননা করেননি। তিনি হারুনের সত্তার খারাপ দিকটিকে শুধু তুলে ধরেছেন। তিনি হারুনের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে মানুষের কুপ্রবৃত্তির তাড়না, উদ্ভট ও অযৌক্তিক ভাবনা, নিষ্ঠুরতা, প্রতিশোধ পরায়নতা ইত্যাদি নেতিবাচক বিষয়াদিই তুলে ধরেছেন। হারুন উপন্যাসের মূল চরিত্র হলেও নেতিবাচক চরিত্র হিসেবেই উপস্থাপন করা হয়েছে তাকে। সে ধর্মের বিরুদ্ধে, আল্লাহর বিরুদ্ধে যা বলেছে তা কুপ্রবৃত্তি দ্বারা তাড়িত হয়েই বলেছে। ফলে তার বক্তব্যকে ধর্তব্যর মধ্যে আনাই উচিত নয়। হারুনকে যদি মহান হিসেবে উপস্থাপন করা হতো তাহলে বলা যেত, দাউদ ইসলামের অবমাননা করেছেন। এই বিষয়ে দাউদ নিজেই বলেন, ‘‘মৌলবাদীরা আমাকে অধার্মিক বলছে। অথচ আমি এমন কিছুই করিনি বা লিখিনি। সবচেয়ে বড় কথা, আমি তাদের চেয়েও বেশি কোরান জানি। কিসে ইসলামের অপমান হয় আমি জানি।’’ কামেল দাউদের এই বক্তব্যকে সমর্থন করছেন দেশটির শিক্ষিত ও প্রগতিশীল সমাজ। দাবি করছেন কামেল দাউদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের।

সালাফি ইমামের ফতোয়াকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করেছেন আলজিরিয়ার গায়ক, অভিনেতা, লেখক, পরিচালকসহ বিক্ষুব্ধ শিল্পী সমাজ। তাঁরা এই আহ্বানের বিরুদ্ধে শুধু বিবৃতিই দেননি, এর প্রতিবাদে স্বাক্ষর গ্রহণ কার্যক্রমও নিয়েছেন। যেখানে হাজার হাজার মানুষ স্বাক্ষর করে চলছে। এর মধ্য দিয়ে ফতোয়ার বিরুদ্ধে তারা তাদের অবস্থান জানিয়ে দিচ্ছেন। নব্বইয়ের গৃহযুদ্ধকালীন সময়ে দেশের বুদ্ধিজীবীদের মৌলবাদীরা যেভাবে নির্মমভাবে হত্যা করেছে মিথ্যা অজুহাত দাঁড় করিয়ে, এখনও এমন কিছু করার ষড়যন্ত্র চলছে। সালাফি ইমামের এই আহ্বান সেই ষড়যন্ত্রেরই অংশ বলে বিদগ্ধজনরা মনে করছেন। সরকার থেকে এখনও এই মৃত্যু হুমকির জন্য কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে না। এখনও দাউদের নিরাপত্তার জন্য কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ওরান শহরে অরক্ষিত অবস্থাতেই বাস করছেন কামেল দাউদ। ধর্মমন্ত্রী দায়সারা গোছের প্রতিবাদ জানিয়েছেন হামাদাছির মৃত্যুদ-ের আহ্বানের। প্রতিবাদ জানাতে হয় বলেই তিনি জানিয়েছেন। কিন্তু তিনি দাউদকে লেখার সময় বিষয়বস্তু আর শব্দচয়নে সতর্কতা থাকার আহ্বান জানিয়ে যেন মৌলবাদীদেরই উৎসাহিত করেছেন। এই মনোভাবের কারণ হিসেবে বলা যায়, কামেল দাউদের প্রতিবাদী চরিত্র আর তাঁর কলমের ধার যা অনেক সময়ই সরকারকে শুধু খোঁচাই দেয়নি, অস্তিত্ব সঙ্কটেও ফেলে দিয়েছে। কামেল দাউদের নিরাপত্তা বিষয়ে সরকারের নীরবতা, নিশ্চুপতা, নিশ্চলতার বিরুদ্ধে সরব হয়ে উঠছে বিদগ্ধজনসহ আলজিরিয়ার সাধারণ মানুষ।

অকপট সত্যচারী এবং নির্ভীক লেখক হিসেবে খ্যাত কামেল দাউদ আলজিরিয়ার সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় এক নাম। কারণ তাঁর অন্যায়ের প্রতিবাদে দৃঢ়চেতা মনোভাব নিয়ে কলম ধরার বজ্রপাষাণ শপথ। কলমের কালিতে আলজিরিয়ানদের মনের কথাই তুলে ধরেন। যে কথা কেউ বলতে সাহস পায় না, তা তিনি নির্ভয়ে লিখে চলেন। শাসকের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন অসঙ্গতি। প্রয়োজনবোধে তুলোধুনো করতেও ছাড়েন না। প্রতিবাদী এই লেখক জন্মগ্রহণ করেন আলজিরিয়ার মোস্তাগানেম শহরে। সাল ১৯৭০। এমনই এক পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন যে সেখানে একমাত্র তিনিই লেখাপড়া করেছেন। যদিও বাবা পুলিশের লোক ছিলেন, কিন্তু তাঁর পরিবারের কেউই অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন ছিল না। লেখাপড়াটা তাদের কাছে ছিল যেন দুর্বোধ্য কোন এক বিষয়। তাদের আগ্রহও ছিল না। ব্যতিক্রম দাউদ।

তাঁর আগ্রহই তাঁকে উচ্চশিক্ষিত হতে সাহায্যে করেছে। আরবী মাতৃভাষা হলেও নয় বছর বয়স থেকে দাদার কাছ থেকে ফরাসী ভাষা শেখেন। পরবর্তীতে এই ভাষাতেই লেখালেখি করেন। ছোট বয়স থেকেই সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ ছিল। জুলর্ভানের বই, গ্রীক পৌরণিক কাহিনী তাঁকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখত। আরব ও মুসলিম সাহিত্যের বিভিন্ন বইও তিনি পড়তেন। সাহিত্যের পাশাপাশি তাঁর গণিতের প্রতি আগ্রহ ছিল। প্রথমে গণিতের ওপরই লেখাপড়া করেন। পড়ে উচ্চতর লেখাপড়া করেন সাহিত্যের ওপর। লেখাপড়া শেষ করে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। ফরাসী ভাষার পত্রিকা ‘কিউটিডাইন ডি’ওরান’ পত্রিকার রিপোর্টার হিসেবে কাজ করা শুরু করেন। রিপোর্টার হিসেবে কাজ করার তিন বছর পর তিনি ‘আমাদের মতামত, আপনার মতামত’ (রাইনা রাইকোম) নামের কলাম লেখা শুরু করেন। সেই থেকে সতেরো বছর ধরে এই কলাম লিখে চলছেন তিনি।

এছাড়াও একে একে রচনা করেন বেশ কয়েকটি ছোট গল্প ও উপন্যাসিকা। দ্য ফ্যাবল অব ডয়ার্ফ (২০০৩) বইটি কেইস স্টাডিধর্মী। এই বইটির বক্তা মানসিক ভারসাম্যহীন এক ব্যক্তি যে তিন মাস গুহায় বাস করেছিল। বিচ্ছিন্নতাবোধে আক্রান্ত এই ব্যক্তিটি বেড়ে উঠেছিল এমন এক পরিবেশের মধ্যে যা তার মাঝে আত্মহত্যার বীজ বপন করে। এবং মানসিক ভারসাম্যহীন করে তুলেছিল। এই বইটির মাধ্যমে দাউদ মানসিক পরিবর্তন কিভাবে ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন ঘটায় তা বর্ণনা করেন। ২০১১ সালে তাঁর গল্পের বইয়ের সঙ্কলন ‘মাইনোটুর ৫০৪’ প্রকাশিত হয় যা দ্য প্রিক্স ও ফাউন্ডেশন ওয়েপলার প্রাইজ লাভ করে। এই বইটিতে চারটি রূপকধর্মী গল্প আছে। হাস্যরসাত্মক ভঙ্গিমায় ঔপনেবেশিকত্তোর প্রজন্ম যে সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হয় সেগুলোকে কামেল দাউদ এই গল্পগুলোতে উপস্থাপন করেছেন। এছাড়াও তাঁর উল্লেখযোগ্য বইগুলো হলো ফারাও (২০০৫), দি আরব কান্ট্রিস অ্যান্ড ভাস্ট ও (২০০৮), দ্য প্রিফেস অব দ্য নিগ্রো (২০০৮), প্রেসিডেন্সিয়াল ইলেকশন (২০১৪) ইত্যাদি।

তাঁর বিখ্যাত কলাম রাইনা রাইকোম (আমাদের মতামত, আপনার মতামত) কলামগুলোর সঙ্কলন করে একটি বই প্রকাশিত হয়েছে। এই বইটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। কারণ আলজিরিয়ানদের কাছে কামেল দাউদের এই কলামটি খুবই জনপ্রিয়। বেশিরভাগ মানুষই শুধু এই কলামটি পড়ার জন্যই পত্রিকা কিনে থাকে। সপ্তাহে তিন দিন প্রকাশিত এই কলামগুলোতে কামেল দাউদ আলজিরিয়ার বিদ্যমান সমস্যাগুলোকে তুলে ধরেন। আলজিরীয় সমাজের গভীরে প্রোথিত মানুষের গোঁড়ামি, মৌলবাদ, মনুষ্যত্বহীনতা, অপরাধ প্রবণতা, দুর্নীতি, রাজনীতিবিদদের অসাধুতা, ধর্মের বিকৃতি কামেল দাউদের হৃদয়ে গভীর আঁচড় কাটে। তাই তিনি কলামে সমাজে বিদ্যমান সেই অসঙ্গতিগুলোই চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেন। এজন্য তিনি অনেকেরই বদ নজরে আসেন। সরকারী লোকেরা যেমন তাঁকে দেখতে পারে না, ভয় পায়, তেমনি অনেক সাধারণ মানুষও ভয় পায় তাঁকে। কেননা তিনি মানুষের চরিত্রগত দুর্বলতার স্বরূপ উন্মোচনে সিদ্ধহস্ত। বেশ কয়েকবারই তাঁকে পুলিশী নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে প্রতিবাদী লেখনীর জন্য। অনেক অপমান, লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সহ্য করতে হয়েছে। মৌলবাদীরা চিঠিতে অসংখ্যবার মৃত্যুর পরোয়ানা জারি করেছে। এগুলোতে তিনি অভ্যস্থ হয়ে গেছেন। ভয়ে থেমে যাননি। বরং জ্বলে উঠেছেন শতগুণ বেগে। এবারও তাই হয়েছে। সালাফি ইমাম যে ফতোয়া জারি করেছে, তাতে শঙ্কিত নন তিনি। দমে যাননি মোটেই। কিন্তু তাঁর নিরাপত্তার জন্য চিন্তিত তাঁর ভক্তকুল। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবির আওয়াজ আজ আলজিরিয়ার গণ্ডি ছাড়িয়ে সারা বিশ্বেই ছড়িয়ে পড়েছে।

arspatuary@gmail.com

প্রকাশিত : ১৬ জানুয়ারী ২০১৫

১৬/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: