রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বিক্রমপুরের জোড় মঠ এখন কালের সাক্ষী

প্রকাশিত : ১০ জানুয়ারী ২০১৫
  • সংস্কার শেষ না করে ফেলে রাখায় হয়েছে শ্রীহীন

মীর নাসির উদ্দিন উজ্জ্বল, মুন্সীগঞ্জ থেকে ॥ জোড় মঠ। প্রাচীন জনপদে বহু মঠ দেখা গেলেও এটি ব্যতিক্রম। একেবারে পাশাপাশি মঠ দুটি। তাই বলা হয় জোড় মঠ বা জোড়া মঠ। মুন্সীগঞ্জ জেলার টঙ্গীবাড়ি উপজেলার সোনারং গ্রামে এটি অবস্থিত। মঠ দুটির নির্মাণ শৈলী একই রকম এবং আকর্ষণীয়। মঠের নিচের শিবমন্দির ও কালী মন্দির রয়েছে। তাই এই মঠ দুটিকে জোড়া মন্দিরও বলা হয়ে থাকে। কালজয়ী বাঙালী সত্যেন সেনের সোনারং গ্রামের এই মঠকে ঘিরে পর্যটকদের ভিড় লেগেই আছে। মঠের মধ্যে কোন নামফলক নেই তবে পুরাকৃতি বিশেষজ্ঞ রাখী রায় জানিয়েছেন, এটি রূপ চন্দ্র তৈরি করেছিলেন তাঁর মা ও বাবার স্মৃতি রক্ষার্থে। পাশাপাশি দুটি মঠ হলেও একটি বড়। অপরটি সামান্য ছোট। বড়টির উচ্চতা ১৫ মিটার। নিচে এর স্কয়ার আকৃতির ৫ দশমিক ৩৫ মিটার গুণ ৫ দশমিক ৩৫ মিটার। বড়টি পশ্চিম পাশে এবং ছোটটি পূর্ব পাশে অবস্থিত। বড়টি রূপচন্দ্র তাঁর পিতার প্রতি স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নির্মাণ করেন ১৮৪৩ সালে। অপরটি মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নির্মাণ করেন ১৮৮৬ সালে। এমন জোড়া মঠ ইতিহাসে বিরল। বরিশালেও একটি জোড়া মঠ রয়েছে। তবে সেটির নির্মাণ শৈলী কিছুটা ভিন্ন।

এই মঠের নিচের মন্দিরে এক সময় পূর্জা-পার্বণও হতো। তবে মন্দিরটির আশপাশে এখন সনাতন ধর্মের লোকজন তেমন না থাকায় এবং মন্দিরটি ঝঁুিকপূর্ণ হওয়ায় এখন আর নিয়মিত পূজা হয় না। জনশ্রুতি রয়েছে এই মন্দির দুটি শিখর দেউলেল অন্তর্ভুক্ত। গ্রামের নাম অনুসারে মন্দির বা মঠ দুটির নাম সোনারং জোড় মঠ নামে পরিচিত। তবে গ্রামের নাম সোনারং কেন হলো তা নিয়ে রয়েছে মতভেদ। পেরিপ্লাস ও টলেমির বিবরণ থেকে জানা যায়, সে সময় বাংলার স্বাধীন হঙ্গারিডয় রাজ্য ছিল এবং কুমার নদীর মোহনায় গঙ্গেনগরীর অবস্থা ছিল। ধারণা করা হয় এই নদীর আশপাশে ছিল সোনার খনি। এই খনি থেকে উত্তোলিত সোনা মিশ্রিত মাটি অন্য স্থানে শোধন করে স্বর্ণ প্রস্তুত করা হতো। পরবর্তীতে এসব স্থানের নামের সঙ্গে সোনা নামটি যুক্ত হয়ে যায়। বাংলার সপ্তম শতক থেকে সোনাকান্দা, সুবর্ণবীথি, সুবর্ণরেখা নদী ও সোনারং ইত্যাদি নামের উৎপত্তি হয়। সোনারং গ্রামের নামটি সম্ভবত এভাবেই এসেছে। প্রাচীনকাল থেকেই সোনারং বিক্রমপুর নগরীর একটি সমৃদ্ধ এলাকা। প্রাচীন ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত মুদ্রা, মূর্তি, দেউল, পুকুরসহ নানা কিছুর সন্ধান পাওয়াই তা প্রমাণ করে।

সোনারং জোড় মন্দিরটি একই ভিতের ওপর স্থাপন হয়েছে। এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। প্রথমত এই জোড় মন্দিরের তিন দিকে পুকুর পরিবেষ্টিত ছিল। পুকুর বা খাল এখনও রয়েছে। তবে এখন মন্দিরের পূর্ব, দক্ষিণ এবং খালের পাশে উত্তরেও রাস্তা রয়েছে। এলাকাটি পশ্চিম সোনারং হিসেবে এখন পরিচিত। জোড় মঠের দক্ষিণ পাশের বিশাল সান বাঁধানো পুকুর এবং ঘাটলা মন কাড়ে। পশ্চিম দিকের সুউচ্চ মন্দিরটি কালী মন্দির এবং পূর্ব দিকেরটি শিব মন্দির। এই মন্দিরের উপরে ছোট ছোট বহু ছিদ্র রয়েছে। এই ছিদ্র দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেছে বহু কবুতর, ঘুঘু, টিয়াসহ নানা জাতের পাখি। প্রতিটি খোপ পাখিদের বাসায় পরিণত হয়। পাখির কলকাকলিতে মুখরিত হতো গোটা এলাকা। তবে গত কয়েক বছর ধরে এই মন্দির দুটিতে এখন আর তেমন পাখি দেখা যায় না। এই জোড় মঠ এলাকায় বহু সাপও দেখা গেছে। বিলুপ্তপ্রায় নানা জাতের বড় আকারে সাপ চোখে পড়েছে আশপাশের বাসিন্দাদের। কিন্তু এখন বসতি বেড়ে যাওয়ায় তা আর নেই। সুউচ্চ মঠের নিচে নানা ধরনের কারুকাজ রয়েছে। মন্দিরটির নিচের দিক থেকে সামান্য উঁচুতেই কারুকাজের মধ্যে তামার নানা নকশা ছিল। এই নকশার সঙ্গে ধাতব বস্তুর নকশাও ছিল। মন্দিরের ভেতরেও ছিল পাথরের মূর্তি। সেগুলো চুরি হয়ে গেছে। অযতœ আর অবহেলায় মন্দির দুটির অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেছে।

তবে চলতি বছর প্রতœতত্ত্ব অধিদফতর এটির সংস্কার কাজ শুরু করলেও অস্পূর্ণ অবস্থায় বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে মন্দিরের শ্রীবৃদ্ধির চেয়ে বেশি শ্রীহীন হয়েছে। নিচের মন্দিরের সামান্য কিছু কাজের পরই তা বন্ধ হয়েছে।

প্রতœতত্ত্ব অধিদফতরের আঞ্চলিক পরিচালক রাখী রায় জনকণ্ঠকে জানান, এ পর্যন্ত প্রায় ৬ লাখ টাকার কাজ হয়েছে। তবে আরও অনেক কাজ বাকি রয়েছে। সুউচ্চ এই মন্দিরে কাজের জন্য প্রায় ৪০ লাখ টাকার প্রয়োজন। বরাদ্দ পাওয়া গেলে বাকি ৮০ শতাংশ কাজও শুরু হবে। মূল্যবান স্থাপনাটি রক্ষায় সেই চেষ্টা চলছে।

প্রকাশিত : ১০ জানুয়ারী ২০১৫

১০/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: