আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

৪ বছরে ঢাকা সিটিতেই ২৭ হাজার ॥ তালাক বাড়ছে

প্রকাশিত : ৯ জানুয়ারী ২০১৫
  • নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ৪৯ হাজার ৩৮৪ আবেদন
  • তালাকের ক্ষেত্রে মেয়েরাই এখন এগিয়ে
  • বিপথগামী হচ্ছে তালাকপ্রাপ্তদের সন্তানেরা, বদলে যাচ্ছে সামাজিক বন্ধন

শর্মী চক্রবর্তী ॥ বিয়ে হলো নারী ও পুরুষের মধ্যে ধর্ম ও সামাজিকতার পবিত্র বন্ধন; যা পরিবারের সকল সদস্যকে নিয়ে সংসার করার আইনগত স্বীকৃতি। সংসারের নিয়মিত সমস্যায় মানুষ নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে টিকিয়ে রাখে তাদের বিবাহ বন্ধন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি বিয়ে নিয়ে ধারণা পাল্টে দিচ্ছে। সংসার থেকে মুক্তির আশায় অনেকেই একে অন্যের কাছ থেকে পৃথক হয়ে যাচ্ছে। সারাদেশেই বাড়ছে এ সংখ্যা । তবে আশ্চর্যজনকভাবে রাজধানী ঢাকাতেই বাড়ছে দাম্পত্য কলহ, বিয়েবিচ্ছেদ। ফলে পৃথক হওয়া পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সৃষ্টি হচ্ছে নানা সমস্যা। ব্যতিক্রমী দু’চারটি পরিবার বাদ দিলেও বেশিরভাগ লোকই নিজেকে সুখী মনে করতে পারছে না।

রাজধানীতে বছরের পর বছর ধরে তালাকের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাচ্ছে। নানা ঠুনকো কারণে স্বামী স্ত্রীকে তালাক দিতে দেখা যাচ্ছে। তালাকের ব্যাপারে এক সময় পুরুষরা সিদ্ধান্ত নিতে দেখা গেলেও বর্তমানে নারীরাই বেশি এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে; তালাক দিচ্ছেন স্বামীকে। ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের বিয়ে, তালাক রেজিস্ট্রির পরিসংখ্যানে এমন তথ্যই পাওয়া গেছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে হিসাব মতে, বছরের পর বছর তালাকের নোটিস সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। সিটি কর্পোরেশনের সালিশী বোর্ডের তথ্য মতে, মোট তালাকের ৭০ দশমিক ৮৫ ভাগ তালাক হয়েছে নারীর পক্ষ থেকে। বাকি ২৯ দশমিক ১৫ ভাগ তালাক দেয়া হয়েছে পুরুষের পক্ষ থেকে।

তালাকের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণ অনুসন্ধানে জানা যায়, সাধারণত স্বামীর সঙ্গে বনিবনা না হওয়া, একে অপরের মধ্যে সংসারের নানা কারণে সন্দেহ প্রবণতা সৃষ্টি, স্বামী কর্তৃক শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন, সংসারে মিথ্যা কথা বলার প্রতি ঝোঁক বেড়ে যাওয়া, পরকীয়া, মাদক আসক্তি, প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করা ও শারীরিক সম্পর্কে অক্ষমতাই তালাকের কারণ হিসেবে সিটি কর্পোরেশনের তথ্যে জানা গেছে। তবে এর বাইরে সমাজে তথ্যপ্রযুক্তির প্রভাবে মোবাইল ফোনের অপব্যবহার, ফেসবুক, টুইটার, স্কাইপিসহ নানা প্রযুক্তির বিকৃত ব্যবহার, অতিরিক্ত লোভ, অবৈধ অর্থ আয়ের চেষ্টা, সংসারে প্রয়োজনীয় সময় না দেয়া, স্ত্রী- সন্তানদের সময় না দেয়া ও সংসারের প্রতি উদাসীনতা, সহনশীলতা ও পারিবারিক মূলবোধের অভাব, বিদেশী অপসংস্কৃতির প্রভাব, বিদেশী সংস্কৃতির আগ্রাসন, নিজেদের মাঝে আত্মতুষ্টি না থাকা, একে অপরের মাঝে বোঝাপড়ার অভাব বা ধৈর্যচ্যুতি, পারিবারিক শিক্ষা ও সচেতনতা না থাকাসহ নানা কারণে তালাক দেয়ার ঘটনা ঘটে থাকে।

তবে কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, বিয়ের দীর্ঘদিন পরে কয়েকটি সন্তান জন্মের পরও স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তালাকের ঘটনা ঘটছে। এতে তালাক হওয়া দম্পতির সন্তানরা পারিবারিকভাবে পিতা অথবা মাতা না থাকায় অনায়াসে বিপথগামী হয়ে পড়ছে। বাবা-মায়ের এ ধরনের ঘটনা সন্তানদের ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলছে। ফলে অভিভাবকহীন এসব সন্তান খুব সহজেই হয়ে পড়ছে মাদকাসক্ত ও অপরাধপ্রবণ। সন্তানরা নিজেদের সবার কাছ থেকে আড়াল করে রাখে; যা তাদের মানসিকভাবে দুর্বল করে দেয় এবং হীনম্মন্যতায় ভোগে। তাদের জীবনটা হয়ে পড়ে দুর্বিসহ। এক্ষেত্রে দম্পতিরা তাদের সন্তানদের ভাল-মন্দকে গুরুত্ব না দিয়ে নিজেদের ভাল-মন্দকেই বেশি প্রাধান্য দেন। যেখানে সন্তানদের ভাল-মন্দের খবর রাখার প্রয়োজন বোধ করেন না কেউ।

ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের সালিশ পরিষদের একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, বিয়েবিচ্ছেদের মতো স্পর্শকাতর ঘটনা যেভাবে বাড়ছে তাতে তারাও উদ্বিগ্ন। তাদের মতে, প্রতিবছর যত আবেদন সালিশী বোর্ডের কাছে কিংবা কাজি অফিসগুলোতে জমা পড়ছে প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি। সামাজিক বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা পেতে এবং ছেলেমেয়ের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে অনেকেই সালিশী বোর্ড কিংবা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে আসেন না। অনেক সময় পারিবারিক এবং সামাজিকভাবেই বিষয়টি নিষ্পত্তি করা হয়ে থাকে।

তালাকের সংখ্যা দিন দিন বাড়ার কারণ হিসেবে সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, নারীরা পূর্বের চেয়ে অনেক স্বাধীন ও স্বনির্ভর হওয়ায় তারা মুখ বুঝে নির্যাতন সহ্য করতে চান না বলেই তালাকের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এই প্রবণতা বাড়তে থাকলে ভবিষ্যত প্রজন্ম বিপথগামী হবে, যা সমাজে ভয়াবহ সঙ্কট সৃষ্টি করবে বলে বিশেষজ্ঞ মহল উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সমাজের অন্য শ্রেণীর চেয়ে উচ্চবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর দম্পতিদের মধ্যে তালাকের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শতকরা ৭২ থেকে ৮০ ভাগ স্ত্রী তাদের স্বামীকে তালাক দিচ্ছে।

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১১ থেকে ২০১৪ সালের নবেম্বর পর্যন্ত রাজধানীতে তালাকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৭,০০৩। এর মধ্যে স্ত্রী কর্তৃক তালাক ৯,৮১৬ এবং স্বামী কর্তৃক তালাক ৫,২১৬। বছরওয়ারি হিসাবে ২০১১ সালে তালাক ৫,৩২২টি। ২০১২ সালে ৭৯৯৫। ২০১৩ সালে ৮২১৪ এবং ২০১৪ সালের নবেম্বর পর্যন্ত ৫৪৭২। আর এসবের মধ্যে ৭২ থেকে প্রায় ৮০ শতাংশ তালাক দিয়েছেন নারীরাই।

১৮ বছরের মাথায় স্বামীর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে একটি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা শারমিন আক্তার (ছদ্মনাম) স্বামীর বিরুদ্ধে বিয়েবিচ্ছেদের নোটিস দিয়েছেন। এ প্রতিবেদকের কাছে তিনি বলেন, দুই ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে ভালই চলছিল তাদের সংসার। স্বামী আলাউদ্দিন পুরান ঢাকায় একটি ওষুধের দোকানের মালিক। বছরখানেক আগে স্বামীর পরকীয়ার বিষয়টি জানতে পেরে তিনি তাকে বাধা দেন। স্বামীকে বোঝাতে গেলে তার ওপর নেমে আসে নানা অত্যাচার। দিনের পর দিন এসব অত্যাচার সহ্য করা তার পক্ষে একেবারেই অসম্ভব হয়ে উঠছিল। শারমিন আক্তার জানান, ছেলেমেয়েরা বড় হচ্ছে, প্রতিদিন এসব অনাকাক্সিক্ষত দৃশ্য তার কাছে বিরক্তিকর হয়ে উঠছিল। তার ভাষায়, বিয়েবিচ্ছেদ কোন স্বাভাবিক সমাধান নয় জেনেও তিনি এ পথ বেছে নিয়েছেন। প্রায় ৩ মাস আগে শারমিন আক্তারের দেয়া বিয়েবিচ্ছেদের নোটিসটি ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের অঞ্চলভিত্তিক সালিশী বোর্ড-২ এর কার্যালয়ে বর্তমানে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আছে।

মিরপুরের শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা আজিজুল ইসলাম (৩২) ও শাহিনা ইসলামের (২২) বিবাহিত জীবন ৭ বছরের। সংসার জীবনে ৩ বছরের একটি কন্যাসন্তান রয়েছে তাদের। গত মাসের প্রথমদিকে তিনি স্ত্রীর কাছ থেকে তালাকের নোটিস পান। হঠাৎ নোটিস পেয়ে তিনি হতবাক হয়ে যান। স্ত্রীর কাছে জানতে চান কি অপরাধে তাকে তালাকের নোটিস দেয়া হয়েছে। কিন্তু স্ত্রী কোন সদুত্তর দিতে পারেননি। তবে সালিশী বোর্ডের কাছে দেয়া বিয়েবিচ্ছেদের আবেদনে তিনি তার স্বামীকে মাদকসেবী ও যৌতুকের কারণে নির্যাতনকারী বলে উল্লেখ করেছেন। তবে আজিজুল ইসলাম তার বিরুদ্ধে আনা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। আজিজুল জানান, পাকিস্তান প্রবাসী স্ত্রীর খালাত ভাইয়ের সঙ্গে পরকীয়ার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তার ভাষায়, স্ত্রী চায় না তার সঙ্গে থাকতে, তাই আর কি করা। স্ত্রী তালাক দিতে চাইলে তাকে তো আর ফেরানো যায় না। বর্তমানে শাহিনা ইসলাম তার দুই সন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়িতে বসবাস করছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজধানীর এক ব্যবসায়ী দুই বছর পূর্বে ভালবেসে বিয়ে করেছিলেন তার প্রেমিকা সালমাকে। অভিজাত এলাকা বনানীর বাসিন্দা সুন্দরী স্ত্রীর কোন চাওয়া অপূর্ণ রাখেননি তার স্বামী। তারা মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডে গিয়ে হানিমুন করেছেন। তিনি স্ত্রীকে শপিংয়ের খরচ বাবদ প্রতিমাসে তার চাহিদা মাফিক টাকাও দিতেন। তবে ব্যবসায়িক প্রয়োজনে তিনি স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে বেশি সময় কাটাতে বা বেড়াতে পারতেন না। এ কারণে তিনি তার স্ত্রীর দুর্ব্যবহারের শিকার হন। এ অবস্থায় তার স্ত্রী ছেলে বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতে থাকেন। পরে সালমা স্বামীর সংসার ছেড়ে চলে যান লালমাটিয়ায় অবস্থিত তার পিতার বাসায়। দীর্ঘদিন স্বামী-স্ত্রী আলাদা থেকে এক পর্যায়ে ডিভোর্সের মাধ্যমে তাদের সংসার জীবনের সমাপ্তি ঘটে।

রাজধানীর পুরান ঢাকায় তিন ছেলেমেয়ে থাকা সত্ত্বেও স্বামীর সন্দেহ প্রবণতার কারণে প্রায়ই ঝগড়া হতো। সংসারে তাদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকা ও তার স্বামীর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের কারণে দুই জনের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়। এক পর্যায়ে তিনি তা সহ্য করতে না পেরে সন্তানদের ভবিষ্যতের চিন্তা না করেই স্বামীকে ডিভোর্স দিতে বাধ্য হন। পরবর্তীতে তার সন্তানরা হীনম্মন্যতায় ভুগতে শুরু করে এবং তারা নিজস্ব গ-ির বাইরে যেতে অনীহা প্রকাশ করে। এক সময় তারা আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকেও মানসিকভাবে দূরে চলে যায়। রাজধানীর মগবাজার এলাকার জেসিকা নওরিন নামের এক গৃহবধূ তিন বছর পূর্বে তার স্বামীকে ডিভোর্স দিয়েছেন। স্বামীর বিরুদ্ধে তার অভিযোগ ছিল মানসিক নির্যাতন। এই নির্যাতনে অসহ্য হয়েই তিনি স্বামীকে ডিভোর্স দেন।

২০১২ সালে প্রবাসী স্বামীকে ডিভোর্স দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষিকা। পারিবারিকভাবে তাদের বিয়ে হলেও প্রবাসী স্বামীর পরিবারের অন্য সদস্যরা মেনে নিতে পারেনি। বিয়ের পর ৪/৫ মাস স্বামীর সঙ্গে তার ভাল সম্পর্ক থাকলেও পরে তা আর থাকেনি। একপর্যায়ে ওই শিক্ষিকা অনুভব করেন পরিবারের অন্যান্য সদস্যের মতো তার স্বামীও তাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। প্রবাসে থেকে তার স্বামী পরিবারের অন্যান্য সদস্যের সঙ্গে নিয়মিত ফোনে যোগাযোগ রাখলেও তার সঙ্গে কম যোগাযোগ করতেন। এসব কারণে স্ত্রীর মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে তিনি প্রবাসী স্বামীকে ডিভোর্স দেন।

বিবাহ বিচ্ছেদের যত অভিযোগ ॥ ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের ১০টি অঞ্চলের সালিশী পরিষদ এবং কাজি অফিসগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে শুধু রাজধানীতেই ৪৯ হাজার ৩৮৪টি বিয়েবিচ্ছেদের আবেদন নিষ্পত্তির অপেক্ষায়। এছাড়া ৩ বছরে সালিশী বোর্ড ১৫ হাজার ৬৭১টি বিয়েবিচ্ছেদ রেজিস্ট্রি করেছে, যার মধ্যে ১১ হাজার ৮১৩টি তালাক দেয়া হয়েছে নারীর পক্ষ থেকে। বাকি ৪ হাজার ৫১৮টি দিয়েছেন পুরুষ। সিটি কর্পোরেশনের সালিশী বোর্ডের দেয়া তথ্য মতে, মোট তালাকের ৭০ দশমিক ৮৫ ভাগ তালাক দেয়া হয়েছে নারীর পক্ষ থেকে। বাকি ২৯ দশমিক ১৫ ভাগ তালাক দেয়া হয়েছে পুরুষের পক্ষ থেকে।

ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের আইন কর্মকর্তা মফিজুল ইসলামের ভাষায়, শহরের বস্তি এলাকার বাইরে সচ্ছল ও শিক্ষিত পরিবারের মধ্যেও অনাকাক্সিক্ষত এ ঘটনা একেবারেই কম নয়। তবে শহরের বস্তি ও গ্রামীণ জনপদের তালাকচিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। সেখানে নিরক্ষর ও কোন রকমে সাক্ষর জ্ঞানসম্পন্ন দম্পত্তির তালাক প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।

বিয়েবিচ্ছেদের পদ্ধতি ॥ আগে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের আইন বিভাগ থেকে বিচার সালিশ কার্যক্রম পরিচালিত হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিয়েবিচ্ছেদের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাওয়ায় ২০০৬ সালে ১০টি অঞ্চলে ভাগ করে অঞ্চলভিত্তিক সালিশ বোর্ড গঠন করে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন। ওই বছরের ১১ আগস্ট থেকে এসব অঞ্চলভিত্তিক অফিসে ১০ আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা সালিশী পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়াও সিটি কর্পোরেশনের ৯০টি ওয়ার্ডে রয়েছে ১শ’ কাজি অফিস।

সংশিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, স্বামী কিংবা স্ত্রী প্রথমে তালাকের নোটিস জমা দেন কাজি অফিসে। কাজি অফিস দু’পক্ষকে ছাড়াও নোটিসের কপি সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের সালিশী পরিষদে পাঠিয়ে দেয়। তবে কেউ চাইলে সরাসরি সালিশী পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছেও আবেদন করতে পারেন। মূলত ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইনের ৭ (১) ধারা অনুযায়ী সালিশী পরিষদের কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে থাকে। সালিশী পরিষদের চেয়ারম্যান সমঝোতার জন্য প্রথম দফায় উভয় পক্ষের কাছে নোটিস পাঠান। প্রথম নোটিস পাঠানোর সময় থেকে ৯০ দিনের মধ্যে যদি উভয়পক্ষ এক হয়ে সমঝোতা না করে তবে সালিশী পরিষদের চেয়ারম্যান তালাক কার্যকরের জন্য পদক্ষেপ নেয়। আর এখানেই এসে তৈরি হয় আইনের ফাঁকটি। কোন একপক্ষ তালাক না চাইলেও সালিশী পরিষদের নোটিস গোপন করে সুযোগ নেয় অপরপক্ষ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক ও বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ডক্টর খন্দকার মোকাদ্দেম হোসেন বলেন, সমাজের উচ্চবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রেণীর মাঝেই সবচেয়ে তালাক দেয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। এর তুলনায় মধ্যবিত্ত পরিবারে কম। উচ্চবিত্তদের ক্ষেত্রে স্বামীর চেয়ে স্ত্রী বা স্ত্রীর চেয়ে স্বামীর শিক্ষা অর্জন, আর্থিক সক্ষমতা বেড়ে যাওয়ার ফলে উভয়ের মাঝে ছাড় দেয়ার মনমানসিকতা না থাকা, পরস্পর পরস্পরের প্রতি সন্দেহ বাড়া, সহনশীলতা না থাকা, স্বামী বা স্ত্রীর অমতে বিয়ে দেয়া, শিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে সচেতনতা তৈরি হওয়া, সকল অন্যায় মুখ বুজে সহ্য করার সংস্কৃতি পরিহার করাসহ নানা কারণে রাজধানীসহ সারা দেশে তালাকের সংখ্যা বেশি হচ্ছে। এছাড়া পরিবারের লোকদের প্রয়োজনীয় সময় দেয়া, পারিবারিক সম্প্রীতি বৃদ্ধিতে একে অপরের মাঝে নিয়মিত কাউন্সেলিং না করা, পশ্চিমা সংস্কৃতির অতি দ্রুত আগ্রাসন নিজেদের মাঝে আয়ত্ত করা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের জন্য মোবাইল ফোন প্রযুক্তির অপব্যবহার বা বিকৃত প্রয়োগ করা, স্বামী বা স্ত্রীর শারীরিক অক্ষমতাও অনেকাংশে দায়ী। তাছাড়া পুরুষতান্ত্রিক এ সমাজে নারীর উত্থানের বিষয়টি অনেক পুরুষ মেনে নিতে পারে না। তাই অনেক সময় কয়েকটি সন্তান জন্মদানের পরও নারীকে তালাক দিতে দেখা যায়। এসবের পাশাপাশি নারীর ক্ষমতায়ন বৃদ্ধিও অনেকাংশে দায়ী। অপরদিকে নিম্ন শ্রেণীর মাঝে আর্থিক সক্ষমতা বাড়লে বা জৈবিক চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে কোন কোন ক্ষেত্রে পুরুষ তার শখ মেটাতে একাধিক বিয়ে করে। কিন্তু পরে একাধিক পরিবার চালানো কষ্টকর হয়ে পড়ে বিধায় তালাক দেয়ার প্রতি আগ্রহী হয়। তালাক বিয়েবন্ধনের মতো পবিত্র কাজের বিপরীত একটি কাজ। সমাজে অস্তিরতা কমাতে ও স্থিতিশীলতা আনতে তালাক বা বিয়েবিচ্ছেদ কমাতে শুধু ব্যক্তি নয় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন।

প্রকৃতপক্ষে সংসার জীবনে পদার্পণের পর প্রেম থেকে পরিণয় কিংবা বিয়ের চিত্রটি পাল্টে যেতে থাকে। স্বামী পুরুষটি রাতারাতি নিজেকে সংসারের প্রধান ও গুরুত্বপূর্র্ণ ব্যক্তি হিসেবে ভাবতে শুরু করে। পক্ষান্তরে স্ত্রীকে ঘরের মানুষ হিসেবে হাল্কাভাবে নেয়। ফলে প্রেমে যে মানুষটি ছিল ভালবাসাময়, রাতারাতি বদলে গিয়ে সে পরিণত হয় এক অন্য মানুষে। এর ফলে দাম্পত্য জীবনে তৈরি হয় এক অদৃশ্য দেয়াল। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এর সমাধান হয় বিয়েবিচ্ছেদের মাধ্যমে। সমাজ বিজ্ঞানীদের মতে, বর্তমানে নারী কর্তৃক তালাকের প্রবণতার পেছনে নারীর অধিক ক্ষমতায়নই মূল কারণ। তাদের মতে, শিক্ষার পাশাপাশি সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নারী যত এগিয়ে যাচ্ছে ততই বিয়েবিচ্ছেদের পরিমাণও বাড়ছে।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, বর্তমান সময়টা খুব অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সমাজের মানুষ খুব বেশি অধৈর্য হয়ে পড়ছে। পরিবারগুলোর মধ্যে নৈতিকতার চর্চা উঠে যাচ্ছে। পরকীয়া, পরিবারকে খুব বেশি সময় না দেয়া, পারস্পরিক সহমর্মিতার অভাব, আস্থাহীনতা, সম্মানবোধের অভাবÑসর্বোপরি যান্ত্রিকতার কারণে পরিবারগুলোর মধ্যে বেশিরভাগ ভাঙনের ঘটনা ঘটছে। অধিকাংশ বিয়েবিচ্ছেদের পেছনে পুরুষ বেশি দায়ী হলেও নারীই বেশি করে বিয়েবিচ্ছেদ চাইতে বাধ্য হচ্ছে। এর পেছনে নারীর ক্ষমতায়নের চেয়ে শিক্ষার হার ও সম্মানবোধ বেড়ে যাওয়াকে দায়ী বলে মনে করেন তারা।

এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট আইনজীবী ও মানবাধিকার নেত্রী এ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, নানা ধরনের অস্থিরতা, ভুল বোঝাবুঝি, পরকীয়াসহ নানা কারণে তালাকের প্রবণতা বেড়ে গেছে। শুধু রাজধানীতেই নয় সারাদেশে এখন তালাকের পরিমাণ বাড়ছে। আর বিশেষ করে নারীই তালাক দিচ্ছে বেশি। আগে নারী তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন ছিল না। নির্যাতিত হলেও সয়ে স্বামীর ঘরেই থেকে যেত। কিন্তু বর্তমান যুগে নারী সচেতন তারা তাদের অধিকার আদায় ও নির্যাতন থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য তালাকের পথ বেছে নেয়। নারীর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো সহনশীল মনোভাব থাকা। তারা সহশীল থাকলে তালাকের পরিমাণ এত বাড়ত না। এজন্য এই না যে নারীর প্রতি নির্যাতন হচ্ছে না। নির্যাতন হলেই সরাসরি তালাক দিতে হবে তা না; কিছুদিন দেখে-বুঝে তারপর এ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত, তাহলেই এই সংখ্যা কমানো সম্ভব। ক্ষমতায়নের কারণে নারী তালাকে পুরুষের চেয়ে এগিয়ে গেছে। পারিবারিক মূল্যবোধ ও সহনশীলতা ধরে রাখলেই এই সংখ্যা কমানো সম্ভব।

প্রকাশিত : ৯ জানুয়ারী ২০১৫

০৯/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: