মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

সৈয়দ শামসুল হকের কবিতায় চিত্রকল্প

প্রকাশিত : ২ জানুয়ারী ২০১৫
  • ৮ তম জন্মদিনে শুভেচছা
  • বীরেণ মুখার্জী

জীবনের উপলব্ধি ইন্দ্রিয়জ। কবি-শিল্পীরা তাঁদের সাহিত্যকর্মে ইন্দ্রিয়জ অভিজ্ঞতা প্রকাশে নানামুখী তত্ত্বের অবতারণা ঘটিয়েছেন। শিল্পকর্ম বিনির্মাণে গড়ে তুলেছেন নানা ফর্ম। এ তত্ত্বের আধুনিক ধারাটি হচ্ছে ‘চিত্রকল্প’। সাহিত্যকে বলা হচ্ছে, ‘সামগ্রিক জ্ঞান, অনুভূতি ও চৈতন্য যা হয়ে ওঠে পঞ্চেন্দ্রিয়ের কাছে অর্থময়, আবেগবাহী ও ব্যঞ্জনাধর্মী’-এ অর্থে, পাঠকের ইন্দ্রিয়কে নাড়া দিতে গিয়ে শিল্পস্রষ্টাকে তার কল্পনাশক্তির ওপর জোর দিতে হয়। কবির মৌলিক শক্তিও ‘কল্পনাশক্তি’ হিসেবে চিহ্নিত। যে কবির কল্পনাশক্তি যত প্রখর, সে কবির কবিতাও তত বেশি শক্তিশালী। কবি জীবনানন্দ দাশও ‘কল্পনাশক্তি’র ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। আব্দুল মান্নান সৈয়দ বলেছেন, ‘মানুষের সবচেয়ে বড় ক্ষমতা বুদ্ধি নয়, হৃদয় নয়-কল্পনা। কবিতা এত শক্তিশালী হয়ে ওঠে এ জন্যই যে কল্পনা তার পিছনে সবচেয়ে প্রধানভাবে সবচেয়ে উজ্জ্বলভাবে কাজ করে যায়।’ কবিতায় কল্পনাশক্তির প্রয়োগের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে ‘চিত্রকল্প’ অভিধাটি। কবিতার চিত্রকল্প দৃশ্যগত ও ইন্দ্রিয়গম্য হিসেবে পাঠকের উপলব্ধিতে আসে। সৈয়দ শামসুল হকের কবিতায় এ দুই ধরনের চিত্রকল্পেরই সন্ধান মেলে। চিত্রকল্পের ধারণাটি প্রাচীন হলেও বাংলা সাহিত্যে ত্রিশ কালপর্বে খ্যাত পঞ্চকবির হাতে চিত্রকল্পের সার্থক উপস্থিতি লক্ষণীয়। এরই ধারাবাহিকতায় পঞ্চাশের শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, সৈয়দ শামসুল হক প্রমুখ কবিদের অন্তর্মূল ধরে নাড়া দিয়েছিল কবিতার শরীরে সংহতি-ভাবনা। ফলে এই সময়পর্বের কবিরা কবিতা শরীরে প্রতিমা স্থাপনের কৌশল গ্রহণ করেন। চিত্রকল্প নির্মাণের জন্য ব্যক্তিগত উপলব্ধির প্রয়োগ ঘটান কবিতার শরীরে। যে কারণে এই সময়পর্বের কবিতায় চিত্রকল্পের নকশায় একটি সুচিন্তিত পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। শব্দের প্রতীকী তাৎপর্য ও নাটকীয়তায় কবিতায় চিত্রকল্পগুলো আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। এ ধারায় সৈয়দ শামসুল হককে অগ্রবর্তী হিসেবে শনাক্ত করা যায়। সৈয়দ হকের কবিতার বিষয়-প্রকরণ যেমন বহুমাত্রিক অনুভাবনা জারিত তেমনি আবহমান বাঙালী সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যঋদ্ধ। কবিতায় প্রেম, স্মৃতিকাতরতা, অবচেতন মনের আশা-আকাক্সক্ষা প্রকাশে তিনি সমসাময়িক কবিদের চেয়ে ব্যতিক্রম মনোভঙ্গির পরিচয় দিয়েছেন। কবিতায় সমকালীন মৌল প্রবণতাগুলো তুলে ধরতে কবিতাকে চিত্রকল্পের অবয়বে বিনির্মাণ করেছেন।

‘এখনও পরায় মনে পরাগের মতো রাত নেমে এলে বাংলার প্রান্তরে

সেই দূর কবেকার মেয়েদের দীর্ঘ কালো চুল

পাখির চিৎকার শুনে এখনও তো করে উঠি ভুলÑ

বুঝি সেই! সেই তারা! এখনও মেলার দিনে ডাকে যেন কেউ

আমারই এ ভুলে যাওয়া ডাকনাম ধরে।’

‘তবু বেঁচে থাকা অপরূপ’ কবিতায় কবিকে নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত মনে হলেও ভাবনাটি একটি সুস্পষ্ট গ্রাম্য দৃশ্যের ভেতর পাঠককে টেনে নিতে সক্ষম। তিনি ঘন ও জটিল জীবনের রূপায়ণ তুলে ধরেছেন এ কবিতায়।

‘আমি কার কাছে গিয়া জিগামু সে দুঃখ দ্যায় কেন,

ক্যান এত তপ্ত কথা, ক্যান পাশ ফিরা শোয়,

ঘরের বিছন নিয়া ক্যান অন্য ধান খ্যাত রোয়?

অথচ বিয়ার আগে আমি তার আছিরাম ধ্যান।

.... মানুষ এমন ভাবে বদলায়া যায়, ক্যান যায়?

পুন্নিমার চান হয় অমাবশ্যা কিভাবে আবার?

সাধের পিনিস ক্যান রঙচটা রদ্দুরে শুকায়?

সিন্দুরমতির মেলা হয় ক্যান বিরান পাথার?

মানুষ এমন তয়, একবার পাইবার পর

নিতান্ত মাটির মনে হয় তার সোনার মোহর।’

গল্পের পটভূমে রচিত ‘পরানের গহীন ভিতর’ কবিতাটি আবেগনির্ভর হলেও সুসংহত। এ কবিতায় জীবনের ব্যক্তিগত আকাক্সক্ষা ও বাসনার তীব্রতা লক্ষণীয়, যা পোড় খাওয়া সম্পর্কের ইতিবৃত্তকে ইন্দ্রিয়গম্য করে তোলে। সহজ ও সুনির্মিত দৃশ্যকল্পের কারণে কবিতাটি পাঠ মাত্রই পাঠকের হৃদয়ে সঞ্চারিত হয় এবং চৈতন্যলোকে ঠাঁই করে নেয়। কিংবাÑ ‘আমার কি আছে? গ্যাছে সুক/য্যান- কেউ নিয়া গ্যাছে গাভীনের বাঁটে যতটুক দুধ আছে নিষ্ঠুর দোহন দিয়া।’ সৈয়দ শামসুল হক অন্তস্থ স্বরে প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠে কবিতায় চিত্রকল্প এঁকেছেন। এ কবিতার মধ্য দিয়ে গোটা বাংলাদেশই চিত্রিত হয়ে ওঠে পাঠক হৃদয়ে। যেখানে নকল আভিজাত্যের কোনো প্রলেপ নেই।

ইংরেজী সাহিত্যে চড়বঃরপ রসধমব বা চিত্রকল্প নিয়ে নানা মত পরিলক্ষিত হলেও এজরা পাউন্ডের ‘অহ রসধমব রং ঃযধঃ যিরপয ঢ়ৎবংবহঃং ধহ রহঃবষষবপঃঁধষ ধহফ বসড়ঃরড়হধষ পড়সঢ়ষবী রহ ধহ রহংঃধহঃ ড়ভ ঃরসব’ উক্তিটি প্রণিধানযোগ্য। বলা যায়, সময় এবং পরিসরের খণ্ড ধারণা থেকে অভিজ্ঞতার মুক্তিই যথার্থ চিত্রকল্পের স্বরূপ। সৈয়দ শামসুল হকও সময়ের প্রেক্ষিত জীবনের আবেগঘন ভগ্নাংশগুলো তুলে ধরেছেন কবিতায়Ñ

‘বাংলার নদীতে সেই বিদ্যাপতি মহাজন বিখ্যাত ভাদরে

জলের তুমুল চুমো একদিন মনে মনে

কামরাঙা সে কার অধরে!

আমিই সে আমি বুঝি ভাদর বাদলে ভেজা মেয়েটির মুখ

করতলে তুলে নিই, রাখি ঠোঁটÑওতেই যা হয়েছিলো সুখÑ

এখনো ভুলিনি সেই দস্যিপনা প্লাবিত সবুজে!’

‘বাংলার নদীতে সেই’ কবিতাটিতে ‘জলের তুমুল চুমো’ কিংবা ‘ভাদর বাদলে ভেজা মেয়েটির মুখ’ চিত্রকল্পের মাধ্যমে কবি চিরচেনা আবহমান বাংলার প্রতিকৃতি অঙ্কন করেছেন। কবি সৈয়দ হক প্রকৃতি সত্তার অংশ হিসেবে প্রকৃতির অন্তর্গত ছল, রস ও জরার কাব্যিক রূপান্তর করেছেন যা চিত্ররূপের সঘন অবয়বে পাঠক হৃদয়ে ভেসে ওঠে। ব্যক্তিগত আবেগ ও চিন্তার সুষম বিন্যাস তার কবিতায় বহুমাত্রিক বোধ উৎপন্ন করে।

‘আমাদের এক নয়, অনেক জীবন।

মাঝে মাঝে মনে হয় সংখ্যা নয়, সংখ্যার বিভ্রমÑ

তবে একটিই জীবন! বিপরীত বিরুদ্ধ কি নয় তারা?’

‘হে অমর আগুনপাখি’ শিরোনামের দীর্ঘ কবিতায় তিনি জীবনকে সংখ্যাতত্ত্বে ফেলে নানাভাবে বিশ্লেষণ করে জীবনের মানে খুঁজেছেন। কখনো প্রকৃতির দ্বারস্থ হয়েছেন। লন্ডনের পাতাল ট্রেনের হইসেলের মধ্যে ঘোরলাগা দৃশ্যপটে কবি প্রিয় মাতৃভাষার অপেক্ষা করেছেন। আবার, এ কবিতায়Ñ

‘কত কাল কাটিয়েছি কত স্বৈরশাসকের বুটের তলায়,

চাবুকের প্রহারে প্রহারে আমি কুঁকড়ে গেছি, পউষের শীতেও কি আমি

রৌদ্রের প্রার্থনা নিয়ে দাঁড়াইনি জানাজার মতো মাঠ ব্যাপ্ত হাহাকারে?’

কবিতায় ‘স্বৈরশাসকের বুটের তলায়’ উল্লেখ করে তিনি স্বাধীন ভূ-খ-ে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের চিত্রকল্প এঁকেছেন। একাধিক স্বৈরশাসকের জাঁতাকলে পিষ্ট হওয়া কবি জীবনের ব্যক্তিক জীবনের ভিন্ন ভিন্ন উপলব্ধির কথা ব্যক্ত করেছেন। সময়ের বৈচিত্র্য ও কালের ব্যাপ্তিতে যাপিত জীবনে তিনি জেনেছেন অনেক কিছু। বাঙালী জাতির মঙ্গলভাষ্য রচনা করতে চেয়েছেন ‘কারবালা’ ও ‘কুরুক্ষেত্র’ ইত্যাদি মিথিক শব্দসমবায়ে। কবিতাটির শেষে ‘আগুনপাখি’ নিজেই পুরাণে পরিণত হয়। মানব জাতির অগ্রযাত্রায় ভষ্ম থেকে জন্ম নেয়া এই আগুনপাখিকে তিনি জাতির মুক্তি-দূত হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। যা কবির দেশপ্রেমের এক অমল দৃষ্টান্ত। দীর্ঘ এ কবিতা পাঠে পাঠক তার নিজের জীবনের বর্তমান, ভবিষ্যৎ, রাষ্ট্র-সমাজ, প্রকৃতি-পরিবেশ সম্পর্কিত চিন্তার আবর্তে ক্রিয়াশীল হয়ে পড়ে। এ কবিতাটিতে কখনো দৃশ্যকল্প আবার কখনো ইন্দ্রিয়জ চিত্রকল্পে সঘন বলা যায়।

‘সাহিত্য হল সমাজ-অন্তর্গত মানুষের চেতনালোকের চিত্রকল্পের অন্তর্গূঢ় শৈল্পিক প্রতিফলন’Ñ এই আলোকে শিল্প সৃষ্টির মূলাধারে প্রতিদিনের খ- খ- ঘটনা, কর্মকা-, ক্লেশভোগ, সহিষ্ণুতা, অভিজ্ঞতা নানাভাবে ক্রিয়াশীল থাকে। যা একজন কবি বিমূর্তাভায় কবিতায় প্রকাশ করেন। চিত্রকল্প যাকে পরিপূর্ণতা দেয়। কবি তাঁর অভিজ্ঞতা জারিত অনুচিন্তনের সঙ্গে সমকালীন পটভূমি প্রকৃতি জগৎ, ব্যক্তিক যন্ত্রণা বা মনোবেদনা, অবক্ষয়, বিকৃতি, স্বপ্ন ও অবচেতন স্তরের গহনে ডুব দিয়ে বিচিত্র বিষয় আহরণ করে গড়ে তুলেছেন কবিতার বাক্সময় বিশ্ব। যার হাতে সমকাল, ইতিহাস আর আধুনিকতা, পরস্পর হাত ধরাধরি করে কবিতার ক্ষেত্রকে করেছে উর্বর। হাজার বছরের বাংলা কবিতার ভিত্তিভূমে দাঁড়িয়ে কাহ্নুপা, বিদ্যাপতি, বড়–চন্ডিদাস হয়ে মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ, বুদ্ধদেব, জীবনানন্দ দাশের সহযাত্রী হয়ে বাংলা কবিতাকে মাধুর্যম-িত করে তুলেছেন সৈয়দ শামসুল হক। নিপুণ চিত্রকর্মে বাংলার মুখ এঁকেছেন আর নিবিড় মমতায় লালন করেছেন হাজার বছরের বাংলার ঐতিহ্য। সৈয়দ শামসুল হক চিত্রকল্পের উৎস হিসেবে নানামাত্রিক জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা, উপমা, অলংকার, উৎপ্রেক্ষা ইত্যাদি শিল্পভাবনার দারস্থ হয়েছেন। ভাষা প্রয়োগ দক্ষতায় এসব শিল্পশ্লিষ্ট উপকরণ দিয়ে ইন্দ্রিয়গম্য চিত্রকল্প বিনির্মাণ করেছেন।

প্রকাশিত : ২ জানুয়ারী ২০১৫

০২/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: