কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে

প্রকাশিত : ১৭ ডিসেম্বর ২০১৪
  • ব্যবহারকারীদের ওপর বাড়ছে গোয়েন্দা নজরদারি
  • ৮৪% দেশে এই নজরদারি ঠেকানোরও কোন আইন নেই
  • প্রযুক্তিবিদদের মতে এ ধরনের নিয়ন্ত্রণ সম্ভবই নয়

ফিরোজ মান্না ॥ ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা চলছেই। বিশ্বব্যাপী এই কাজটি জোরেশোরে চালাচ্ছে শাসক গোষ্ঠী। ইন্টারনেট এখন তাদের চোখের কাঁটা হয়ে দেখা দিয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইন্টারনেটকে গণতান্ত্রিক আন্দোলন থেকে শুরু করে অধিকার আদায়ের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করছে সাধারণ মানুষ। শাসক গোষ্ঠীর বন্দুকও ইন্টারনেটের আঘাতের কোন জবাব দিতে পারছে না। ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব ফাউন্ডেশন নামের একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে এমন কথা উঠে এসেছে। সংস্থাটি প্রতিবেদনে বলেছে, গোটা বিশ্বেই ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের স্বাধীনতা খর্ব করা হচ্ছে। এতে তৈরি হচ্ছে বড় ধরনের বৈষম্য। বিশেষ করে উন্নত দেশগুলোতে সাধারণ ব্যবহারকারীদের ওপর সরকারের গোয়েন্দা বাহিনী অনৈতিকভাবে নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছে। এতে মানুষের অধিকার হরণ করা হচ্ছে। তবে এই নিয়ন্ত্রণ সাময়িক বাধা হিসাবে দেখা হচ্ছে। কারণ ইন্টারনেটের হাজারো জানালা খোলা রয়েছে। একটা বন্ধ করলে আরেকটা খুলে যাচ্ছে।

সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়, ইন্টারনেট নজরদারি ঠেকাতে বিশ্বের ৮৪ শতাংশ দেশে কার্যকর কোন আইন নেই। আইন না থাকার পরেও ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা বিশ্বব্যাপী চলছে।

সম্প্রতি সংস্থাটির প্রতিবেদন উল্লেখ করে বিবিসি একটি প্রতিবেদন প্রচার করে। ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব ফাউন্ডেশন তার বার্ষিক প্রতিবেদনে ইন্টারনেট সেবাকে বিশ্বব্যাপী মৌলিক মানবাধিকার হিসাবে স্বীকৃতি দেয়ার প্রস্তাব করেছে। এই ফাউন্ডেশনের কর্ণধার স্যার টিমের নেতৃত্বে ৮৬টি দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক অগ্রগতিতে ওয়েবের প্রভাব নিয়ে গবেষণা চালানো হয়। ফাউন্ডেশনের গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ইন্টারনেট প্রযুক্তির অগ্রগতিতে সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছে ধনী দেশগুলোর নাগরিক। অনলাইনে নারীদের বিব্রতকর বা অপমানজনক পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করতে যথাযথ পদক্ষেপ নিচ্ছে না ৭৪ শতাংশ দেশ। ইন্টারনেট সেবায় নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করে এমন আইন নেই ৭৪ শতাংশ দেশে। যে কোন সামাজিক বা রাজনৈতিক কর্মকা-ে ইন্টারনেটের প্রভাবের বিষয়ে নিশ্চিত করেছে ৬২ শতাংশ দেশ।

সূত্র জানিয়েছে, আমেরিকা, ভারত, চীন, পাকিস্তান, ইউরোপের কয়েকটি দেশ ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়ে দিয়েছে। গোয়েন্দা নজরদারিতে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা সব সময় একটা শঙ্কিত অবস্থায় থাকছেন। বাংলাদেশেও ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। শুধু তাই নয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক-টুইটারেও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হবে। মানুষের প্রাণ খুলে কথা বলার সুযোগ করে দেয়ায় ইন্টারনেট শাসক গোষ্ঠী চক্ষুশূল হয়ে উঠেছে। তাই ইন্টারনেটকে যতটা সম্ভব নিয়ন্ত্রণ করে যাচ্ছে দেশে দেশের গোয়েন্দা সংস্থা। বিভিন্ন দেশে ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের জন্য গোয়েন্দাদের তথ্য প্রযুক্তির ওপর প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। যাতে করে তারা সব ধরনের ইন্টারনেট সিকিউরিটি ভেঙ্গে ব্যবহারকারীদের তথ্য জানতে পারেন।

তথ্য প্রযুক্তিবিদরা বলেন, ইন্টারনেটকে কোনভাবেই তারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। এই একটি মাত্র আবিষ্কার যার বিস্তৃতি আকাশের সমান। রয়েছে হাজারো উইন্ডো। একটা বন্ধ করলে আরেকটা খুলে যাচ্ছে। এরপরও নিয়ন্ত্রণ করে সাময়িক বাধার সৃষ্টি করা হচ্ছে। ইন্টারনেটের এতগুলো জানালা কোনভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের মতো দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের সংখ্যা যে হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে তা আমাদের স্বপ্ন দেখায়। ভিশন ২০২১ বাস্তবায়নে আমরা অনেক দূর এগিয়েছি। ইন্টারনেট এখন কালো রাজনীতির জন্য অশনিসঙ্কেত।

দুর্নীতি করে পার পাওয়া যাবে না। কোটি কোটি মানুষের চোখ কান ইন্টারনেট খুলে দিয়েছে। বিশ্বের বেশ কিছু দেশ গত বছর ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের জন্য জাতিসংঘের বিশেষ সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন (আইটিইউ) বিশ্বব্যাপী তথ্য ও টেলিযোগাযোগ খাতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়ার অনুরোধ জানিয়েছিল। আইটিইউর তত্ত্বাবধানে গত বছরের ডিসেম্বরে আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ সম্মেলন বা ওয়ার্ল্ড কনফারেন্স অন ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ২০১২ (ডব্লিউসিআইটি-১২) তে এই অনুরোধ জানানো হয়। ইন্টারনেটের অবারিত স্বাধীনতায় সীমাবদ্ধতা ও বিধি-নিষেধ আনার প্রস্তাব করা হয়েছিল। সেই প্রস্তাব বাস্তবে রূপ পায়নি।

সূত্র জানিয়েছে, ২০১২ সাল হচ্ছে ইন্টারনেট জয়ের বছর। ২০১৩ সালেই শাসক গোষ্ঠী ইন্টারনেটকে ভয় পেতে শুরু করেছে। তথ্য প্রযুক্তির এই মাধ্যমে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে গণতন্ত্রকামী বিপ্লবীরা। সোস্যাল মিডিয়ায় এতোদিন ধরে যে জাগরণের কথা বলা হয়েছিল সে জাগরণের চিত্র দেখেছে বিশ্ববাসী। মধ্য প্রাচ্যের অনেক দেশেই স্বৈরতন্ত্র থেকে মুক্তি পেতে ইন্টারনেটের মাধ্যমে ফেসবুক, টুইটার, ব্লগসহ নানা মাধ্যমে বিপ্লব সংগঠিত করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ২০১১ সালের টাইম ম্যাগাজিনে প্রচ্ছদ প্রতিবেদন হয়েছিল। আরব বিপ্লব থেকে ওয়ালস্ট্রিট আন্দোলন ইন্টারনেটের মাধ্যমেই ঘটেছে।

বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গণজাগরণ মঞ্চ, তিউনিসিয়ার জেসমিন বিপ্লব, মিসর, লিবিয়া কিংবা সিরিয়ার আরব বিপ্লব থেকে শুরু করে দেশে দেশে আন্দোলন স্পষ্ট করেছে তরুণরা। স্বাভাবিকভাবেই সরকার কিংবা শাসকগোষ্ঠীর বিপক্ষে গেছে ইন্টারনেট। তারা ইন্টারনেটের গলা টিপে ধরার চেষ্টা করেছে। কিন্তু কোন লাভ হয়নি। ১৯৮৮ সালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইন্টারনেটের জন্য প্রাথমিক অবকাঠামো ও নীতিমালা তৈরি করে। ওই নীতিমালাই চলে আসছে। ১৪ বছর পর ইন্টারনেটের ব্যাপকতা ও প্রসারের ফলে এই নীতিমালা পরিবর্তন করার সময় এসেছে বলে আইটিইউ মনে করছে। পাশাপাশি ইন্টারনেটের ব্যাপ্তির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকা সাইবার ক্রাইম, নিরাপত্তা ইস্যু, ইন্টারনেটভিত্তিক আন্দোলনকে এখনই সীমার মধ্যে টানতে না পারলে পরবর্তী সময়ে এসব সমাজে হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।

প্রকাশিত : ১৭ ডিসেম্বর ২০১৪

১৭/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: