রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

সব ক’টা জানালা...

প্রকাশিত : ১৬ ডিসেম্বর ২০১৪
  • তাপস মজুমদার

সব ক’টা জানালা খুলে দাও না-র মিউজিক টিউনটি বেজে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের সকলের হৃদয়মনে অনিবার্য অনুরণন তোলে রাজধানীর অনতিদূরে মাথা উঁচু করে দ-ায়মান জাতীয় স্মৃতিসৌধটি। অপূর্ব ও অননুকরণীয় এই ভাস্কর্যটি কিন্তু পাথরনির্মিত নয়; বরং বড় বেশি ইস্পাত রিইনফোর্সড পাথরখ- ও কংক্রিটে নির্মিত। তবুও আকার-আকৃতি-অবয়ব সর্বোপরি অবকাঠামোয় এটি এতই সুউচ্চ ও সুবিশাল, তদুপরি এতই নিরেট থমথমে ও গম্ভীর যে, সুনিশ্চিত প্রতীয়মান হয়, এটি বুঝিবা নিরেট পাথুরে। সন্নিকটস্থ সুবিস্তৃত গিরিরাজমালা হিমালয় পর্বত তথা সর্বোচ্চ শৃঙ্গের অধিকারী মাউন্ট এভারেস্টের বাংলাদেশীয় প্রতিরূপ যেনবা। আমাদের কাছে, আপামর বাঙালীর কাছে, যাদের রক্তের আনাচে-কানাচে বাঙালীর আদি রক্তশোণিত সতত প্রবহমান, তাদের কাছে এই জাতীয় স্মৃতিসৌধও যেনবা অহঙ্কারী উদ্যত ও চিরউন্নত এভারেস্ট তথা গিরিরাজ হিমালয়েরই প্রতিচ্ছবি; অনুরূপ অহঙ্কারী ও সমুদ্যত, সমুন্নত ও মহোন্নত, বলদৃপ্ত, সুকঠিন, সুদৃঢ়, সুসঙ্কল্পবদ্ধ সর্বোপরি শৌর্য-বীর্যে চিরউন্নত মম শির। এক কথায়, সে তো কোনদিনই মাথা নোয়াবার নয়।

স্বীকার করতেই হয় যে, গীতিকার নজরুল ইসলাম বাবু এবং সুরকার আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল যথাযথ ও যথার্থ কথা ও সুরে অনেকটা পাথুরে ভাস্কর্যসম এই সুবিশাল ও দৃষ্টিনন্দন স্মৃতিসৌধটিকে ঘিরে এক অপূর্ব ও অপার্থিব সুরেলা মায়াজাল বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছেন। সাবিনা ইয়াসমিন গানটি গেয়েছেনও চমৎকার, অনেকটাই ঐন্দ্রজালিক সুর ও মায়ায়। অবশ্য এটি সমবেত কণ্ঠেও মানায় বৈকি। এটা জেনেও ভাল লাগছে যে, সাবিনা ইয়াসমিন গীত গানগুলোর মধ্যে এটি তাঁর কাছেও বিশেষ প্রিয়।

জাতীয় স্মৃতিসৌধ সুমহান মুক্তিযুদ্ধে ত্রিশ লাখ শহীদানের আত্মার উদ্দেশ্যে নিবেদিত বিশাল সুনির্মিত ভাস্কর্য। হ্যাঁ, আমরা অবশ্যই একে ভাস্কর্য বলব। শহীদ মিনারও ভাস্কর্য নিশ্চয়ই। এদেশের একশ্রেণীর মূর্খ প্রায়ই মূর্তির সঙ্গে গুলিয়ে ফেলে ভাস্কর্যকে এবং মাঝেমধ্যেই সেসবের ওপর হামলা চালায়, ভাংচুর করে থাকে। সেইসব নালায়েক গ-মূর্খের উদ্দেশ্যে একরকম ঘৃণা প্রকাশ করা ছাড়া গত্যন্তর নেই। ঈশ্বর তাদের ওপর করুণা বর্ষণ করুন। তো এই সব শহীদানের উদ্দেশ্যে নিবেদিত সুরেলা কথামালা, সুর ও সঙ্গীত সর্বোপরি প্রায় পাথুরে অবয়বে নির্মিত ভাস্কর্যটি অনেকটাই প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে সমবেত লক্ষকোটি জনতার আগমনধ্বনি, সম্মিলিত গুঞ্জনধ্বনি ও যন্ত্রানুষঙ্গে। রহস্যম-িত ও মায়াবী সুরের আবছায়া আলো-আঁধারে চলে ত্রিশ লাখ শহীদের চুপি চুপি আনাগোনা, মৃদুমন্দ পদচারণা, বুকচাপা হাহাকার ও মর্মন্তুদ আর্তনাদÑ সর্বোপরি সজল-সঘন হৃদয় নিংড়ানো, হৃদয় মোচড়ানো আনন্দ-বেদনার শিহরণ। আর আমরা যারা বেঁচে-বর্তে আছি, তারা সারা বছর ধরে এই দিনটির জন্য, এই মহান বিজয় দিবস অথবা স্বাধীনতা দিবসের নানা আয়োজন-অনুষ্ঠানকে ঘিরে ত্রিশ লাখ শহীদানের আত্মার আগমনের প্রতীক্ষায় থাকি; কান পেতে রই, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রাপ্তি বা অর্জনের নিমিত্ত হৃদয়ের সমস্ত শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদনের জন্য। আর এইখানেই নিহিত রয়েছে জাতীয় স্মৃতিসৌধের অপূর্ব ও অভূতপূর্ব মাহাত্ম্য ও গাম্ভীর্য, সুদৃঢ় ও গভীর তাৎপর্য সর্বোপরি সুকঠিন মহিমান্বিত অবস্থান।

ঢাকা থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে সাভারের নবীনগরে ৮৪ একর জমিনের ওপর সুবিস্তৃত জাতীয় স্মৃতিসৌধ ও কমপ্লেক্সটির ভিত্তিপ্রস্তর ১৯৭২ সালে স্থাপন করেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। প্রকল্পটি তিনটি পর্যায়ে সম্পন্ন হয়ে প্রায় চূড়ান্ত রূপ লাভ করে ১৯৮২ সালে। গণপূর্ত বিভাগের সার্বিক তত্ত্বাবধানে এটি নির্মিত হলেও, এর মূল নক্সাকার ও স্থপতি সৈয়দ মাইনুল হোসেন, যিনি ২০১৪-এর ১০ নবেম্বর মাত্র ৬২ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। অত্যন্ত নিভৃতচারী ও প্রচারবিমুখ এই মানুষটি সম্পর্কে একটু পড়ে লিখব। দুঃখজনক হলো, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি প্রকাশিত বাংলাপিডিয়ার চতুর্থ খ-ের ১২ পৃষ্ঠায় তাঁর নাম ভুলভাবে লেখা হয়েছে মঈনুল হোসেন। বাংলাপিডিয়ায় জাতীয় স্মৃতিসৌধ সম্পর্কিত সংক্ষিপ্ত এই ভুক্তিটি লিখেছেন দু’জনÑএম শহিদুল আমিন ও এম যাকিউল ইসলাম। এর জন্য তাঁরা নিশ্চয়ই সম্মানীও পেয়েছেন। সে ক্ষেত্রে মূল স্থপতির নামের ভুলটি অমার্জনীয়, অগ্রহণযোগ্যÑ সর্বোপরি এ রকম একটি আকরগ্রন্থে কাম্য নয় কোন অবস্থাতেই।

এ প্রসঙ্গে আরও একটি দুঃখজনক ও অমার্জনীয় ঘটনার কথা পাঠকের জ্ঞাতার্থে উপস্থাপন না করে পারছি না। ১৯৮২ সালের ১৬ ডিসেম্বর সম্পন্নকৃত স্মৃতিসৌধটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এইচএম এরশাদ। অত্যন্ত দুঃখজনক ও পরিতাপের বিষয় হলোÑ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্থপতি সৈয়দ মাইনুল হোসেনকে আদৌ আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। লোক পাঠিয়ে তো নয়ই, এমনকি ডাকযোগেও নয়। এটি একশ্রেণীর ঈর্ষাকাতর, পরশ্রীকাতর বাঙালীর হঠকারী অবিমৃষ্যকারিতার আরও একটি জাজ্জ্বল্য প্রমাণ। তো এই স্থপতি সেদিন কী করেছিলেন?

স্বভাবতই অত্যন্ত অভিমানী, ভগ্নহৃদয় ভগ্নরথ শিল্পী ও স্থপতি সৈয়দ মাইনুল হোসেন এক বুক দুঃখ-বেদনা ভারাক্রান্ত হৃদয়মন নিয়ে অনাহূত, অনাদৃত, অবাঞ্ছিত, নিঃসঙ্গ একাকী দাঁড়িয়ে ছিলেন স্মৃতিসৌধের সামনে পাকা সড়কে, হাইওয়ের ওপর। অনুষ্ঠান শেষে একবুক হাহাকার ও দীর্ঘশ্বাস মোচন করে বাসে চেপে ফিরে এসেছিলেন রাজধানীতে। জনশ্রুতি বলে, এদিন সৈয়দ মাইনুল হোসেন একজন অতিসাধারণ দর্শনার্থীর মতোই লাখো জনতার ভিড়ে চুপি চুপি প্রবেশ করেন জাতীয় স্মৃতিসৌধের পবিত্র আঙ্গিনায় এবং নীরবে নিভৃতে চোখের জল ফেলেন- যে অশ্রুজল অবশ্যই মিশে আছে সংলগ্ন ছায়াসুনিবিড় জলাশয়ে। আমাদের জানা মতে, অত্যন্ত অভিমানী নিভৃতচারী ও প্রচারবিমুখ এই শিল্পব্যক্তিত্বটি জীবদ্দশায় তাঁর প্রাপ্ত্য সম্মান ও মর্যাদা পাননি বললেই চলে, একুশে পদক ব্যতিরেকে। কোন ধান্দাও করেননি কোনদিন, বাজাননি কোন ঢক্কানিনাদ। তবে মহাকালের বিচারে যে অবিস্মরণীয় ও অমোচনীয় সৃজনকর্মটি তিনি রেখে গেছেন, সে জন্য দেশ ও জাতি, যতদিন পর্যন্ত বাংলাদেশ টিকে থাকবে বৈশ্বিক মানচিত্রে, ততদিন পর্যন্ত অবশ্যই স্মরণ করবে তাঁকে। যেমন স্মরণ করবে ত্রিকালজয়ী এক গানের লেখক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীকে, আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারির জন্য, যেটি আলতাফ মাহমুদের সুরে আবদুল লতিফের কণ্ঠে গীত হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে কোটি কোটি বাঙালীর হৃদয়-মন-মনন ও কণ্ঠস্বরে। এক্ষণে আমরা এই মহান স্থপতি সৈয়দ মাইনুল হোসেনের স্মৃতির প্রতি মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে জানাই অন্তিম শ্রদ্ধার্ঘ্য।

জাতীয় স্মৃতিসৌধ মূলত সাতটি সমদ্বিবাহু ত্রিভুজ আকৃতির স্তম্ভের সমন্বয়ে নির্মিত ১৫০ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট একটি অনবদ্য স্থাপনা। অসমান উচ্চতা ও স্বতন্ত্র ভিত্তির ওপর সাতটি ত্রিভুজাকৃতির প্রাচীর দিয়ে পরিবেষ্টিত মূল সৌধটি। সর্বোচ্চ স্তম্ভটি সর্বনিম্ন দৈর্ঘ্যরে ভিত্তির ওপর, আর সর্বদীর্ঘ ভিত্তির ওপর স্থাপিত স্তম্ভটি সবচেয়ে কম উচ্চতায়। দেয়ালগুলো মাঝখানে একটি ভাঁজ দ্বারা কোণাকৃতির এবং পর পর সারিবদ্ধভাবে বসানো। অবকাঠামোটির সর্বোচ্চ বিন্দু, যা পরিচিত শীর্ষবিন্দু হিসেবে, ১৫০ ফুট উঁচু। সমগ্র পরিকাঠামো ও অবয়বটি এমনভাবে সুনির্মিত ও সুবিন্যস্ত যে, ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে একে ভিন্ন ভিন্ন অবয়ব ও অবকাঠামোয় পরিদৃষ্ট ও প্রতীয়মান হয়ে থাকে। সকাল-সন্ধ্যা, দিন বা রাতে রোদ্রালোক ও আলোকছটার মায়াবী মায়ায় বর্ণালীর বিভিন্নতাসহ ছায়া-প্রচ্ছায়ার চমৎকারিত্বও লক্ষণীয়। সর্বোপরি, প্রবেশপথের অক্ষ বরাবর সুবিন্যস্ত জলাশয়ে এর অনিবার্য সুদীর্ঘ তরঙ্গায়িত ও নিস্তরঙ্গ প্রতিফলন খুবই চমৎকার, সুস্নিগ্ধ, প্রায় অপার্থিব ও অলৌকিক।

১৯৭৮ সালে সৌধ নির্মাণের নক্সার জন্য একটি উন্মুক্ত জাতীয় প্রতিযোগিতার আহ্বান করা হলে, ৫৭ জন অংশগ্রহণকারীর মধ্যে সেরা নির্বাচিত হয় সৈয়দ মাইনুল হোসেনের সৃজনকর্মটি। তখন তাঁর বয়স মাত্র ২৬। সাতটি সমদ্বিবাহুবিশিষ্ট সুউচ্চ পিরামিডসদৃশ ভাস্কর্যটি ইস্পাতের রড-সিমেন্ট-পাথরের টুকরো-কংক্রিট ব্যবহারে অমসৃণভাবে নির্মিত হলেও, এর সংলগ্ন অন্যান্য অবকাঠামো ও পেভমেন্ট বিনির্মাণে ব্যবহৃত হয়েছে লাল রঙের ইট। বিভিন্ন উপাদান-উপকরণের ব্যবহার চারদিকের, চারপাশের উদার উন্মুক্ত আকাশরাজি, সবুজ বৃক্ষরাজি, প্রাকৃতিক নিসর্গ সৌন্দর্য, সুনসান নীরবতা, নিস্তব্ধতা, গভীরতা, সুস্থির লেক তথা জলাশয়Ñ সব মিলিয়ে এর তাৎপর্য ও ব্যঞ্জনা বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ। সাতটি স্তম্ভ সূচিত করেছে বাঙালীর মুক্তি ও স্বাধীনতা সংগ্রামের সাতটি বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতীকী উপস্থাপনা। পর্যায়গুলো হলো যথাক্রমে, ১৯৫২’র ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪’র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৫৬’র শাসনতন্ত্র আন্দোলন, ১৯৬২’র শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬’র গণঅভ্যুত্থান এবং সর্বোপরি ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুক্ত। সবচেয়ে ছোট স্তম্ভটি ’৫২ এবং সর্বাধিক উঁচুটি ’৭১। ভাস্কর্যশিল্পীর মতে, চারদিকে চারপাশে প্রচ- চাপ ও আলোড়নের ফলে ভূস্তরের, ভূত্বকের, ভূগর্ভের প্রচ- চাপ খেতে খেতে কিছু একটা সুকঠিন মৃত্তিকা ফুঁড়ে উঠে আসছে ক্রমশ ও পর্যায়ক্রমেÑ অনিবার্য উঠে যেতে চাইছে আকাশ ফুঁড়ে, আকাশ বিদীর্ণ করেÑএই সেই হিমালয় পর্বতসদৃশ গিরিরাজ এভারেস্টতুল্য জাতীয় স্মৃতিসৌধের অনিবার্য স্থাপনা ও সৃজনশীল অক্রেস্ট্রা, সর্বোপরি গ্রানাইট পাথরসদৃশ কংক্রিটের অভূতপূর্ব সুরমূর্ছনা।

ধরণীতলে যতদিন বাংলাদেশ ও বাঙালী জাতি বেঁচে থাকবে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম জাতি হিসেবে, ততদিন আমরা, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে মাথা নত করে এসে দাঁড়াব জাতীয় স্মৃতিসৌধের পাদদেশে, শ্রদ্ধা ও শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করব সর্বোত্তম হৃদয় নিংড়ানো ভাব-ভালবাসায়, পরম-পরিতৃপ্তি, অহঙ্কার ও আনন্দ, বেদনায় আর কান পেতে শুনব সেই বহুশ্রুত সঙ্গীত মূর্ছনাÑসব ক’টা জানালা খুলে দাও না ... এ সময় বিউগলে বাজবে সকরুণ অন্তিম সুরÑলাস্ট পোস্ট।

প্রকাশিত : ১৬ ডিসেম্বর ২০১৪

১৬/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন



ব্রেকিং নিউজ: