মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

পিতা-পুত্রের সাইকোড্রামা

প্রকাশিত : ২০ নভেম্বর ২০১৪
  • অনুবাদ : এনামুল হক

জর্জ ডব্লিউ বুশ যে একদিন প্রেসিডেন্ট হবেন তাঁর বাবা-মা কোনদিন কল্পনাও করেননি। ছেলের এমন এক উজ্জ্বল ভবিষ্যত তাঁরা কখনও দেখতে পাননি। ২০০০ সালে রিপাবলিকান দলের জাতীয় কনভেনশনের কয়েক সপ্তাহ আগে নিউইয়র্ক টাইমসের কলামিস্ট ফ্রাঙ্ক ব্রুনি বুশ পরিবারের সঙ্গে এক ঘরোয়া আলাপচারিতায় মিলিত হন। জর্জ বুশ ততদিনে রাজনৈতিক অঙ্গনে সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিত্ব। তারপরও বুশের বাবা মন্তব্য করেছিলেন, বুশ যে এতদূর পর্যন্ত আসতে পেরেছে তাতে তিনি বিহ্বল বোধ করছেন।

জর্জ বুশ ও তাঁর বাবা-মার সঙ্গে ব্রুনির আলাপচারিতার এক পর্যায়ে জর্জের ভাই জেব যোগ দেন। তারপর থেকে ব্রুনি লক্ষ্য করেন, সিনিয়র বুশকে কোন প্রশ্ন করলে অনেক সময় তিনি বলেছিলেন, জেবই বরং জবাব দিক, কারণ ওই সব থেকে ভাল জানে।’ সিনিয়র বুশের সে সময়কার দৃষ্টিতে জেবের প্রতি প্রশংসা ও মুগ্ধতার ছাপ ছিল, কিন্তু জর্জের প্রতি নয়। অথচ বাবার এই প্রশংসা পাওয়ার জন্য জর্জের জীবনের এতটা সময় ভেতরে ভিতরে তীব্র আকুতি ছিল এবং সেই সঙ্গে হয়তবা রাগও ছিল। বাবার মধ্যে তার প্রতি প্রশংসা বা মুগ্ধতা জাগ্রত করতে তাকে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছিল। প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার উদ্দেশ্য ছিল হয়ত নিজস্ব কৌশলে সেই প্রশংসার দাবিদার হওয়া এবং প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার ব্যাপারটা হয়তবা ছিল শেষ পর্যন্ত বাবার সেই প্রশংসা আদায় করে নেয়া। বাবা তো তাকে নিয়ে কোন উচ্চাশা পোষণ করেননি বরং তার সংশয়ই ছিল। কতকটা সেই অভিমান থেকে কিনা কে জানে জর্জ ডব্লিউ বুশ বাবার প্রতি এক ধরনের অগ্রাহ্যভাব দেখিয়েই দেশ শাসন করেছিলেন। তিনি তাঁকে দেখিয়ে দিয়েছিলেন কে আসলে ওস্তাদ। খেসারত যাই দিন না কেন তিনি ইরাকে হামলা চালিয়ে সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাত করেছিলেন। অথচ বাবা এই সাদ্দামকেই রেহাই দিয়েছিলেন। যে কৌশলেই হোক না কেন তিনি দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হয়েছিলেন, যা তার বাবা পারেননি। বুশ একটা বই লিখেছেন তার বাবাকে উদ্দেশ করে। নাম ‘৪১।’ প্রকাশিতব্য এই বইতে সম্ভবত এসব কিছু থাকবে না। তবে এটা হবে পিতা-পুত্র সাইকোড্রামার সর্বশেষ অধ্যায়, যা দেশের গতিপথ বদলে দিয়েছিল।

আমেরিকার রাজনীতিতে পিতা-পুত্রের এমন সাইকোড্রামা আরও আছে যেখানে ওভাল অফিসে আগতদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার তাদের জীবনে পিতার প্রাধান্য বা অনুপস্থিতির প্রভাব দ্বারা নির্ধারিত হয়েছে। মার্কিন রাজনীতির ইতিহাস হচ্ছে পিতা-পুত্রের নানান ইস্যুর ইতিহাস, যেখানে পুত্ররা পিতাকে প্রভাবিত করতে কিংবা ছাড়িয়ে যেতে, তার স্থান পরিগ্রহ করতে, প্রতিফল দিতে অথবা দায়মুক্ত করতে বাধ্য হয়েছে।

বারাক ওবামা কিংবা ক্লিনটন দুজনের কেউই সত্যিকার অর্থে কখনও তাদের পিতাকে জানতে বা চিনতে পারেননি। উভয়ের জীবনে পিতাদের অনুপস্থিতি থেকে তাদের উচ্চাভিলাষকে বিচ্ছিন্ন করা কিছুতেই সম্ভব নয়। তারা নিজেরাও সে কথা বলেছেন। ক্লিনটনের জন্মের মাত্র তিন মাস আগে বাবা এক দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলেন। ক্লিনটন তার আত্মকথায় লিখেছেন, বাবার এই স্মৃতিটা তাকে তরুণ বয়সে প্রবলভাবে সিক্ত করেছিল। অল্প বয়সে তারও মৃত্যু হতে পারে এই বোধটা তাকে জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত থেকে যতটুকু যা পারা যায় চয়ন করে নিতে এবং পরবর্তীকালে বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার চেষ্টা করতে চালিত করেছে।

ওবামার জন্মের অল্পদিন পরে তার বাবা-মার বিচ্ছেদ ঘটে। পরবর্তীকালে ওবামা একবারই মাত্র বাবাকে দেখেছিলেন যখন তাঁর বয়স ১০ বছর। তাঁর বাবা তখন এক মাসের সফরে কেনিয়া থেকে হাওয়াই-এ এসেছিলেন। পিতা-পুত্রের মধ্যে এই যে সংক্ষিপ্ত যোগাযোগ এবং দূরত্ব এটাই ওবামার স্মৃতিকথা ‘ড্রিমস ফ্রম মাই ফাদার’-এ প্রাধান্য পেয়েছিল এবং তাঁর সাফল্যের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছিল। ২০০৮ সালে নিউজউইকের সঙ্গে এক সাক্ষাতকারে ওবামা বলেছিলেন, ‘আপনার যদি এমন কেউ থাকে যিনি অনুপস্থিত তাহলে তরুণ বয়সে আপনার হয়ত মনে হবে কিছু একটা প্রমাণ করার দায়িত্ব আপনার রয়েছে। কালক্রমে সেটাই একটা বিশেষ ধারায় পরিণত হয়।’

এই ধারাটি আরও অনেক প্রেসিডেন্টের মধ্যেও লক্ষ্য করা যায়। ২০১২ সালে ‘হোয়াই সো মেনি পলিটিশিয়ানস্ হ্যাভ ড্যাডি ইস্যুজ?’ কাহিনীতে ব্যারন ইয়ংস্মিথ লিখেছেন, আমেরিকার রাজনীতি এমন সব কাহিনীতে পরিপূর্ণ যেখানে পিতারা থেকেও অনুপস্থিত, যেখানে তারা মদ্যপানে আসক্ত এবং সন্তানদের অবহেলা করে থাকেন।’ অতীতের দিকে তাকালে এমন প্রেসিডেন্টদের দেখা যাবে যারা তাদের পিতার কাছে ছিলেন ক্রীতদাসের মতো, যারা পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন, যারা পিতার কাছে অবহেলিত উপেক্ষিত ছিলেন বলেই পিতাদের চেয়ে বড় কিছু হবার, তাদের চেয়ে ভাল কিছু হবার চেষ্টা করেছিলেন। যেমন আব্রাহাম লিঙ্কন ও রোনাল্ড রিগ্যান। আবার এমন প্রেসিডেন্টও আছেন যাঁরা নিয়তি নির্ধারণের মতো বাবাদের ছক কেটে দেয়া পথ ধরে অগ্রসর হয়েছিলেন। যেমন জন এফ কেনেডি এবং উইলিয়াম হাওয়ার্ড ট্যাফট।

ক্লিনটনের অতৃপ্ত চাহিদা কি পিতার রেখে যাওয়া বিশাল শূন্যতা থেকে উদ্ভূত হয়েছিল। ওবামার জীবনের প্রথমদিকে যে নির্লিপ্তভাব গড়ে উঠেছিল সেটা কি পিতার কারণে তার মধ্যে সৃষ্ট হতাশার বিরুদ্ধে বর্ম হিসেবে কাজ করেছিল? পুত্রের ওপর পিতার রেখে যাওয়া এই বিশেষ ছাপগুলো আমেরিকার অতি সাম্প্রতিক প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রধান চরিত্রগুলোর মধ্যেও বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায়। ১৬ বছর বয়সে পল রায়ান বাবাকে হার্টএ্যাটাকে মারা যেতে দেখেন। তিনি বেড়ে ওঠার সময় নিজের শারীরিক সুস্থতা সম্পর্কে অতিমাত্রায় সচেতন ছিলেন। মিট রমনির বাবা প্রেসিডেন্ট হতে চেয়েছিলেন, পারেননি। মিট রমনি বাবার এই অপূর্ণ সাধ পূরণ করার চেষ্টা করেছিলেন। বিতর্কের শুরুতে তাকে কোন নোট পেপার দেয়া হলে তিনি ওতে অলঙ্করণ করে লিখতেন ড্যাড।

আল গোরও পিতার অপূর্ণ সাধ পূরণ করার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর পিতা সিনেটে নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু হোয়াইট হাউসে আসতে পারেননি। জন ম্যাককেইনের বাবা ও দাদা দু’জনেই ছিলেন মার্কিন নৌবাহিনীর চার তারকা এডমিরাল। তাদের গর্বিত করে তোলার লক্ষ্যেই তিনি প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।

সূত্র : নিউইয়র্ক টাইমস

প্রকাশিত : ২০ নভেম্বর ২০১৪

২০/১১/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: