ছবি: দৈনিক জনকণ্ঠ।
রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার খালাশপীরে অবস্থিত কয়লাখনি দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় জ্বালানি সম্পদের উৎস হিসেবে বিবেচিত হলেও প্রায় দুই দশক ধরে সিদ্ধান্তহীনতায় থমকে আছে প্রকল্পটি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই খনি থেকে কয়লা উত্তোলন শুরু হলে প্রায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। এতে দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে তৈরি হতে পারে হাজারো কর্মসংস্থানের সুযোগ।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় সরকারকে আমদানিকৃত কয়লা ও ব্যয়বহুল এলএনজির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। অথচ পীরগঞ্জ উপজেলার খালাশপীরের (মাগুরা) গ্রামে মাটির নিচে বিপুল জ্বালানি সম্পদ এখনো অনাবিষ্কৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৯-৯০ সালে প্রায় ২৫ বর্গকিলোমিটার এলাকায় চারটি কূপ খনন করা হয়। এর মধ্যে তিনটিতে উন্নতমানের বিটুমিনাস কয়লার সন্ধান পাওয়া যায়। সমীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, খনিটিতে মোট কয়লার মজুত প্রায় ৪৫১ মিলিয়ন টন। এর মধ্যে উত্তোলনযোগ্য কয়লার পরিমাণ প্রায় ২১০ মিলিয়ন টন। এই কয়লাখনি চালু হলে এখান থেকে উৎপাদিত কয়লা দিয়ে প্রায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। এছাড়া বছরে গড়ে প্রায় ৩ মিলিয়ন টন কয়লা উত্তোলন করা হলে ৫০ বছর পর্যন্ত এই খনি থেকে উৎপাদন অব্যাহত রাখা যাবে। এতে দেশের কয়লার চাহিদা দীর্ঘ সময়ের জন্য পূরণ হওয়ার পাশাপাশি অতিরিক্ত কয়লা রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সম্ভাবনাও তৈরি হবে।
স্থানীয় বাসিন্দা ফরহাদ বলেন, পীরগঞ্জের কয়লাখনি চালু হলে পুরো এলাকার অর্থনৈতিক চিত্র বদলে যেতে পারে। এতে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, গড়ে উঠতে পারে নতুন শিল্পাঞ্চল এবং উন্নত হবে যোগাযোগ ও অবকাঠামো ব্যবস্থা। আরেক স্থানীয় বাসিন্দা মহিদুল ইসলাম বলেন, এই কয়লাখনি উত্তোলন করা গেলে দেশের কয়লার চাহিদা পূরণ হওয়ার পাশাপাশি বিদেশে কয়লা রপ্তানির সুযোগ তৈরি হবে, যা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এদিকে ২০০৬ সালের আগস্টে খনির সমীক্ষা প্রতিবেদন পাঠানো হয় জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, পেট্রোবাংলা এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরে। তবে দীর্ঘ সময় পার হলেও এখনো প্রকল্পটির চূড়ান্ত অনুমোদন মেলেনি।
বর্তমানে প্রকল্পটিতে ১২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। তাদের কাজ মূলত গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা ও খনির রক্ষণাবেক্ষণে সীমাবদ্ধ।
প্রকল্পের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) অনুপ কুমার রায় বলেন, “গবেষণা কার্যক্রম চলমান রয়েছে। প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত আমরা প্রস্তুত রেখেছি। এখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সরকারের।”
পীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পপি খাতুন বলেন, “ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে ব্যস্ততার কারণে বিষয়টি সেভাবে দেখা হয়নি। এখন যেহেতু নির্বাচনী ব্যস্ততা নেই, তাই বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন মহলের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করা হবে।”
এ বিষয়ে পীরগঞ্জের সংসদ সদস্য মাওলানা নুরুল আমিন বলেন, “সংসদে সুযোগ পেলে পীরগঞ্জের কয়লাখনির বিষয়টি উত্থাপন করব, যাতে দ্রুত এটি উত্তোলনের উদ্যোগ নেওয়া যায়।”
দেশ যখন জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিকল্প উৎস খুঁজছে, তখন প্রশ্ন উঠছে—এত সম্ভাবনাময় একটি কয়লাখনি কেন প্রায় দুই দশক ধরেও সিদ্ধান্তহীনতায় পড়ে রয়েছে।
এম.কে








