মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে বোমা হামলায় নিহত মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার প্রবাসী আহমদ আলী (সালেহ আহমদ)-এর দাফন সম্পন্ন হয়েছে। দীর্ঘ প্রবাস জীবনের পর নিথর দেহে নিজ জন্মভূমিতে ফিরে এলেন এই রেমিট্যান্স যোদ্ধা।
সোমবার (৯ মার্চ) বাদ আসর উপজেলার গাজিটেকা শাহী ঈদগাহ ময়দানে নামাজে জানাজা শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
এর আগে দুবাই থেকে তার মরদেহ প্রথমে ঢাকায় আনা হয়। সেখানে প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ মরদেহ গ্রহণ করেন। পরে সোমবার দুপুরে তাকে বহনকারী বিমান সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বিমানবন্দরে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী নিজে উপস্থিত থেকে মরদেহ গ্রহন করেন। পরে মরদেহ তার গ্রামের বাড়ি বড়লেখার গাজিটেকা (বাঁশতলা) নিয়ে যাওয়া হয়।
জানাজায় উপস্থিত ছিলেন শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল, মৌলভীবাজার জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন, বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী অফিসার গালিব চৌধুরী, বড়লেখা প্রেসক্লাব সভাপতি আনোয়ারুল ইসলামসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনের কর্মকর্তা, আত্মীয়-স্বজন ও হাজারো মানুষ অংশ নেন। প্রিয়জনকে শেষ বিদায় জানাতে এসে অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। গ্রামের আকাশ-বাতাস যেন শোকের ভারে নীরব হয়ে ওঠে।
মরদেহ গ্রহণের সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এখন পর্যন্ত চারজন বাংলাদেশি প্রবাসী নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে একজনের মরদেহ দেশে আনা হয়েছে। বাকি তিনজনের মরদেহও প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হবে।
তিনি বলেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি ক্রাইসিস টিম গঠন করা হয়েছে। এই টিমের মাধ্যমে যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় আটকে পড়া প্রবাসীদের খাদ্য সহায়তা, আহতদের চিকিৎসা ও অন্যান্য জরুরি সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।
মন্ত্রী আরও জানান, প্রবাসীদের খোঁজখবর রাখতে কনস্যুলেটের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। যাঁরা আহত হয়েছেন বা অসুস্থ অবস্থায় আছেন, তাঁদের স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এ জন্য একটি হটলাইনও চালু করা হয়েছে।
লেবাননে বাংলাদেশি কনস্যুলেট না থাকায় সেখানে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)-এর মাধ্যমে বাংলাদেশি নাগরিকদের খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব নেয়ামত উল্যাহ ভূঁইয়া বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে প্রয়োজনে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজন হলে চার্টার্ড বিমানের ব্যবস্থাও করা হবে।
নিহতের মরদেহ গ্রহণ করতে বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন তাঁর মামাতো ভাই কামাল আহমদ। আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমার ভাই প্রায় ২৭ বছর ধরে প্রবাসে ছিলেন। তিনি আমাদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ছিলেন। সত্যিকারের একজন রেমিট্যান্স যোদ্ধা ছিলেন তিনি। তাঁর এক ছেলে থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত। সরকারের সহযোগিতায় মরদেহ দেশে আনা সম্ভব হয়েছে-এ জন্য আমরা কৃতজ্ঞ।”
তিনি আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধে নিহত প্রবাসী বাংলাদেশিদের ‘শহীদ’ হিসেবে ঘোষণা করার দাবি জানাচ্ছি।
জানা যায়, বড়লেখা উপজেলার গাজিটেকা (বাঁশতলা) গ্রামের বাসিন্দা আহমদ আলী ওরফে সালেহ আহমদ দীর্ঘদিন ধরে দুবাইয়ে ডেলিভারি ম্যান হিসেবে কাজ করতেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শনিবার সন্ধ্যায় ইফতারের পর কাজে বের হলে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় তিনি নিহত হন।
দেশে তাঁর বৃদ্ধা মা, স্ত্রী, তিন ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছেন। দীর্ঘ ২৭ বছর প্রবাসে কঠোর পরিশ্রম করে তিনি পরিবারের ভরণপোষণ চালাতেন। তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবারটি গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
প্রিয় মানুষটির নিথর দেহ ঘরে ফিরলেও আর ফিরবে না তাঁর হাসি, কণ্ঠ বা স্বপ্ন। তাই গ্রামের মানুষের চোখে জল আর হৃদয়ে বেদনা। একজন পরিশ্রমী প্রবাসীর বিদায়ে গাজিটেকা গ্রামে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।
রাজু








