ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ১৩ মার্চ ২০২৬, ২৯ ফাল্গুন ১৪৩২

ঠাকুরগাঁওয়ে আমদানি কমাতে দ্বিগুণ লাভবান হওয়ায় সাদা সোনায় স্বপ্ন বুনছেন তুলা চাষিরা 

এস, এম জসিম উদ্দিন, নিজস্ব সংবাদদাতা, ঠাকুরগাঁও

প্রকাশিত: ১৭:৪৯, ৬ মার্চ ২০২৬; আপডেট: ১৭:৪৯, ৬ মার্চ ২০২৬

ঠাকুরগাঁওয়ে আমদানি কমাতে দ্বিগুণ লাভবান হওয়ায় সাদা সোনায় স্বপ্ন বুনছেন তুলা চাষিরা 

ঠাকুরগাঁওয়ে সাদা সোনার হাসি ফুটছে। হাইব্রীড ডিএম-৪ জাতের তুলার ফলনে খুশি কৃষকরা, বাড়ছে আবাদ। দেশের বস্ত্র খাতে তুলার ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও এগিয়ে আসছে। উন্নতমানের বীজ সরবরাহ ও মাঠ পর্যায়ে পরামর্শ দেওয়ার মাধ্যমে কৃষকদের তুলা চাষে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় ঠাকুরগাঁও জেলায় এবার হাইব্রীড ডিএম-৪ জাতের তুলার চাষ করে খরচের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ লাভবান হচ্ছেন চাষিরা। 

ঠাকুরগাঁওয়ে বিভিন্ন ফসলের মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, দিগন্তজোড়া সাদা শুভ্র তুলার ক্ষেত এখন নতুন সম্ভাবনার প্রতীক হয়ে উঠেছে। সবুজ গাছের ডগায় ডগায় সাদা তুলা বাতাসে দোল খাচ্ছে। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষা মানুষের মৌলিক চাহিদার মধ্যে বস্ত্র অন্যতম। আর বস্ত্র উৎপাদনে তুলা অপরিহার্য কাঁচামাল। বিশ্ববাজারে তুলার চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৮০ লাখ বেল তুলার চাহিদা থাকলেও উৎপাদন হয় মাত্র ১ দশমিক ৬০ থেকে ২ দশমিক ৪০ লাখ বেল, যা মোট চাহিদার মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশ। ফলে অধিকাংশ তুলা বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এই আমদানি নির্ভরতা কমাতে কাজ করছে সরকারি সংস্থা তুলা উন্নয়ন বোর্ড এবং বীজ উৎপাদনকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গুলো। উন্নত হাইব্রীড ডিএম-৪ জাতের বীজ বাজারে আনার পর ঠাকুরগাঁও জেলায় তুলা চাষে আগ্রহ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

যে জেলায় আগে তুলা চাষ সম্পর্কে তেমন ধারণাই ছিল না, সেই জেলায় এখন অনেক কৃষক তুলা চাষ করে লাভের মুখ দেখছেন। তুলা এমন একটি ফসল যার প্রতিটি অংশ অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আঁশ থেকে তৈরি হয় সুতা ও বস্ত্র, বীজ থেকে পাওয়া যায় ভোজ্য তেল ও খৈল, আর গাছের অংশ ব্যবহৃত হয় জ্বালানি ও কাগজ শিল্পে। এমনকি জমির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধিতেও সহায়ক এই ফসল। দিগন্তজোড়া সাদা তুলার হাসি তাই এখন ঠাকুরগাঁওয়ের কৃষকদের স্বপ্ন আর সম্ভাবনার নতুন অধ্যায়।

এলাকার কৃষক নুরুজ্জামান, মনিরুজ্জামান, সরুজ আলি, এহসান আলি, ইয়াকুব আলিসহ আরও অনেকে জানান, ৩৩ শতাংশের এক বিঘা জমিতে ডিএম-৪ জাতের তুলা চাষে খরচ হয় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। ফলন হয় ১৮ থেকে ২০ মণ। বর্তমানে প্রতি মণের বাজার মূল্য প্রায় ৪ হাজার টাকা হিসেবে এক বিঘা জমির তুলা বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৭৫ হাজার টাকায়। এতে লাভ থাকছে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা। কম পরিশ্রমে ভালো লাভ হওয়ায় আগামী মৌসুমে তুলা চাষ আরও বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা জানান তারা। তবে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং সার ও কীটনাশকের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন কৃষকরা। 

ঠাকুরগাঁও তুলা উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তার তথ্য মতে, ২০২১-২২ অর্থবছরে উফশী ও হাইব্রীড মিলিয়ে ৪২৬ হেক্টর জমিতে তুলা আবাদ হয় এবং উৎপাদন হয় ২ হাজার ৮১৬ বেল। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৫২ হেক্টর, কিন্তু আবাদ হয়েছে ৪৯১ হেক্টর জমিতে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আবাদ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৬৪ হেক্টরে। হেক্টরপ্রতি ফলন হয়েছে প্রায় ৪ টন। পঞ্চগড়, দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁও জেলা নিয়ে গঠিত ঠাকুরগাঁও জোনে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ হাজার ৪০০ হেক্টর, আবাদ হয়েছে ১ হাজার ৩৭৯ হেক্টর। এই জোনে প্রায় ৪ হাজার তুলা চাষি রয়েছেন এবং এবার ৩০০ জন কৃষককে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। 

বীজ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান লাল তীর সীড লিমিটেড এর রংপুর বিভাগীয় কর্মকর্তা  মেহেদী হাসান খান বলেন, উন্নত জাতের বীজ সরবরাহ ও নিয়মিত মাঠ পরিদর্শনের মাধ্যমে কৃষকদের কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ফলন ও মান ভালো হওয়ায় ডিএম-৪ জাত দ্রæত জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সবজি সহ অন্যান্য ফসলের মতো তুলা চাষ বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ ও কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করছেন তারা। 

ঠাকুরগাঁও জোনে প্রধান তুলা উন্নয়ন কর্মকর্তা সেলিনা আকতার বলেন, উৎপাদন প্রক্রিয়া সহজ ও লাভজনক হওয়ায় কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। প্রণোদনা, প্রশিক্ষণ ও সার্বিক সহায়তার মাধ্যমে ভবিষ্যতে দেশের মোট চাহিদার অন্তত ১৫ থেকে ২০ শতাংশ তুলা দেশেই উৎপাদনের লক্ষ্যে কাজ করছে তুলা উন্নয়ন বোর্ড।

দিগন্তজোড়া সাদা তুলার হাসি এখন ঠাকুরগাঁওয়ের নতুন সম্ভাবনার প্রতীক। সঠিক পরিকল্পনা, ন্যায্য মূল্য ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে -এই সাদা সোনা হতে পারে দেশের বস্ত্রখাতের আমদানি নির্ভরতা কমানোর অন্যতম ভরসা।

রাজু

×