সীতাকুণ্ডের ডোমখালী খাল দীর্ঘদিন খনন না করায় পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড পৌরসদরের দক্ষিণ মহাদেবপুরের রেলওয়ে খালের (ডেবার উত্তর পাশে) বাসিন্দারা বর্ষা আসলেই আতঙ্কে থাকেন। কারণ গত ১৫ বছর ধরে পলি জমে খালটি ভরা হয়ে যাওয়ায় খালের আশপাশের বাসিন্দাদের বাড়িঘর জলাবদ্ধতায় নিমজ্জিত থাকে। এমনকি ওই এলাকায় অবস্থিত উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণ, সীতাকণ্ড পৌরসভা ভবন প্রাঙ্গণ, ভূমি অফিস কার্যালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় পানি জমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। সীতাকুণ্ড উপজেলার বারৈয়াঢালা ইউনিয়নের ডোমখালী গ্রামের কৃষক মোশাররফ হোসেন (৪৩)। তার জমিতে বোরো চাষ করার প্রয়োজনীয় পানির সংস্থান নেই।
কারণ, তাঁর জমির আশপাশের শাখা খালগুলো মরে গেছে। তবে কাছাকাছি একটি বড় খালের পানি ওই এলাকার একটি ইরি গোলাতে সেচ কাজে ব্যবহার করা হয়। সেখান থেকে ড্রেনের মাধ্যমে তার জমিতে পানি আনতে খরচ পড়ে যায় অনেক বেশি। তাই ইচ্ছা থাকলেও তিনি বোরো আবাদ করতে পারেন না। মোশাররফ হোসেনের মতো সীতাকু- উপজেলায় এমন অনেক কৃষক আছে, বোরো মৌসুমে পানির অভাবে যাদের জমি অনাবাদি পড়ে থাকে। অন্যদিকে বর্ষায় সু-ুভাবে পানি নিষ্কাশন হতে না পেরে এলাকায় বাড়িঘরে পানি উঠে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। যার ফলে সীতাকু-ের তিন লাখ বাসিন্দার বর্ষা আতঙ্কে থাকতে হয়।
উপজেলা কৃষি কার্যালয়, কৃষক ও সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের জন প্রতিনিধিদের মতে, খননের অভাবে এবং অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত স্লুইস গেটের কারণে এ উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ ১৫টি খাল মরে গেছে। এগুলো খনন করা গেলে আরও প্রায় তিন হাজার হেক্টর জমি বোরো চাষের আওতায় আনা সম্ভব বলে তারা মনে করেন। সরেজমিনে দেখা গেছে, সীতাকু- উপজেলার সবচেয়ে বেশি বোরো আবাদ হয় বারৈয়াঢালা, সৈয়দপুর, মুরাদপুর ও বাড়বকু- ইউনিয়নে। এই চারটি ইউনিয়নে মধ্যে রয়েছে ১৫টি বড় খাল। খালগুলো হলো - সীতাকু- পৌর সদরের রেলওয়ে খাল (ডেবার উত্তর পাশে), হাসান গোমস্তা খাল, শেখপাড়া খাল, ঈদিলপুর খাল, কুমিরা খাল, ডোমখালী খাল, বদর খাল, মহালঙ্গা খাল, বঁাঁকখালী খাল, অন্তর খাল, গুপ্তা খাল, মান্দারীটোলা খাল, কামানীয়া খাল, উলানিয়া খাল, গুলিয়া খাল।
প্রতিটি খালের সঙ্গে রয়েছে অনেকগুলো শাখা খাল। শাখা খালগুলোর পাশেই রয়েছে মহালঙ্গা বিল, লালানগর বিল, বগাচতর বিল, বাঁকখালী বিলঅলিনগর বিল, হাতীলোটা বিল, নডালিয়া বিল, লক্ষণের বিল, গোপ্তাখালী বিল, ভাটেরখীল বিল, গুলিয়াখালী বিল। বড় বড় খালগুলোয় জোয়ারের সময় পানি থাকলেও ওই শাখা খালগুলোতে পানি থাকে না। উপজেলার পানি নিষ্কাশনে নদীকেন্দ্রিক রয়েছে ১৫টি খাল। এলাকা ভিত্তিক জলাবদ্ধতা দূরীকরণের সঙ্গে চাষাবাদের পানি জোগানদানে উপকার ভোগী হয়ে কাজ করছে খালগুলো। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে খনন কাজ না হওয়ায় ওপর থেকে নেমে আসা খালগুলো হয়ে উঠেছে জনগণের গলার কাঁটা। এ অবস্থায় ভরাট ও দখলের কবলে পড়ে পানি নিষ্কাশনের পরিবর্তে খালগুলো জনদুর্ভোগের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয়রা বলেন, বর্ষায় পানি নিষ্কাশিত হতে না পেরে প্লাবিত হয়ে ঘরবাড়ি, রাস্তা-ঘাটে ঢুকে পড়ে চরা ও খালের পানি। জলাবদ্ধতা স্থায়ী রূপ লাভ করায় বসবাসের অনুপোযোগী হয়ে পড়েছে পুরো এলাকা। এ ছাড়া জমে থাকা পানিতে আবাদি জমির চাষাবাদ বন্ধ হয়ে প্রতিটি এলাকায় দেখা দিয়েছে খাদ্যাভাব। কিন্তু যুগ যুগ ধরে জনদুর্ভোগে নাকাল হয়ে পড়লেও সমস্যা সমাধান নেই বলে জানান তারা। বারৈয়াঢালা ইউনিয়নের মহালঙ্গা গ্রামের কৃষক আব্দুল আউয়াল শরীফ(৪৫) জানান, তাঁর জমিতে সেচের জন্য খাল থেকে পানি তুলতে জোয়ারের অপেক্ষায় থাকতে হয়। এতে সেচকাজ মারাত্বক ব্যাহত হয়। তিনি বলেন, এই শাখা খালগুলো খনন করতে পারলে এ অঞ্চলে বোরো ধান আরও ভালো হবে। সরকার যদি এদিকে একটু নজর দেয়,তাহলে চাষবাদে অনেক সুবিধা হবে।
বারৈয়াঢালা ইউনিয়ন বিএনপির আহবায়ক ডা.কমল কদর জানান, তাঁর ইউনিয়নের ৫টি খাল খননের অভাবে মাটি ও পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে। পাহাড়ি এলাকায় কৃষকরা ভালো ফলন করলেও উপকুলীয় এলাকায় অনেক বিল চাষবাদহীন পড়ে আছে। তিনি বলেন, শুষ্ক মৌসুমে খননের উদ্যোগ নিলে এ এলাকায় ফলন বাড়বে। চট্টগ্রাম উত্তর জেলা কৃষক দলের আহবায়ক ও বাড়বকুন্ডের বাসিন্দা বদরুল হোসেন জানান, উপকুলীয় এলাকায় বেশিরভাগ জমি অনাবাদী পড়ে আছে। লবণাক্তের কারণে কৃষকরা চাষ করার আগ্রহ হারাচ্ছে।
এই এলাকার বড় বড় খাল খননের পাশাপাশি শাখা খালগুলো জরুরি ভিক্তিকে খনন করা প্রয়োজন। বারৈয়াঢালা ইউনিয়নের দায়িত্বরত উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা পিপাস কান্তি চৌধুরী জানান, এখানকার খালের পানি লবনাক্ত হওয়ায় কৃষক বোরো চাষ করতে আগ্রহী হয়ে উঠে না। যার কারণে শুষ্ক মৌসুমে এই তিন ইউনিয়নে বেশিরভাগ জমি অনাবাদী পড়ে থাকে। তবে খানগুলো খনন করলে বোরো চাষ বাড়বে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ জানান, সীতাকুন্ডে মাত্র ১০ হেক্টর জমিতে বর্তমানে বোরা চাষ হচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে খালগুলোতে পানি থাকে না।
উপজেলার প্রতিটি খাল খনন করা গেলে আরও অন্তত তিন হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষের আওতায় আনা সম্ভব। এতে অন্য ফসলের চাষও সহজ হবে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফখরুল ইসলাম জানান, উপজেলার ভরাট খালগুলো খননের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ভরাট খালের তালিকা করা হচ্ছে। ধারাবাহিকভাবে সব ভরাট খাল খনন করা হবে।
প্যানেল হু








