ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ৩০ জুন ২০২৬, ১৬ আষাঢ় ১৪৩৩

আক্কেলপুরে ৫২১ বছরের ঐতিহ্য

গোপীনাথপুর দোল পূর্ণিমা মেলায় জমজমাট ঘোড়ার হাট

মো: সকেল হোসেন, আক্কেলপুর, জয়পুরহাট

প্রকাশিত: ১৫:২৭, ৪ মার্চ ২০২৬

গোপীনাথপুর দোল পূর্ণিমা মেলায় জমজমাট ঘোড়ার হাট

ছবি: দৈনিক জনকণ্ঠ।

জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী গোপীনাথপুর দোল পূর্ণিমার মেলায় এবারও জমে উঠেছে ঘোড়ার হাট। যুবরাজ, কালামানিক, কিরণমালা, তেহজী, কালাপাহাড়, কালো রাজা এমন নানা আকর্ষণীয় নামে সাজানো ঘোড়াগুলোকে ঘিরে প্রতিদিনই ভিড় করছেন নানা বয়সী দর্শনার্থী। ঘোড়ার ক্ষিপ্রতা, বুদ্ধিমত্তা ও শক্তিমত্তায় যেন নামেরই প্রতিফলন মেলে। বিশেষ করে ‘যুবরাজ’ নামের ঘোড়াটি তার বিদ্যুৎগতির দৌড়ে সবার নজর কেড়েছে। পছন্দের ঘোড়া কিনতে ক্রেতাদের মধ্যেও চলছে তুমুল দরকষাকষি ও প্রতিযোগিতা।

আয়োজকরা জানান, উত্তরাঞ্চলে একমাত্র বড় পরিসরে ঘোড়া বেচাকেনা হয় গোপীনাথপুর দোলের মেলায়। প্রতি বছর দোল পূর্ণিমা উপলক্ষে মাসব্যাপী এই মেলার আয়োজন করা হলেও পশুর হাট বসে প্রথম ১০ দিন। মঙ্গলবার (০৩ মার্চ) দোল পূর্ণিমার দিন থেকেই দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ঘোড়া ব্যবসায়ীরা মেলায় আসতে শুরু করেছেন। ঘোড়ার পাশাপাশি মহিষ, গরু, ভেড়া ও ছাগল কেনাবেচাও চলছে সমানতালে।

দরদাম চূড়ান্ত হওয়ার পর পাশের খোলা মাঠে ঘোড়ার দৌড় দেখিয়ে ক্রেতাদের সন্তুষ্ট করা হয়। নওগাঁ জেলার ধামইরহাট উপজেলা থেকে আসার এবার ‘যুবরাজ’ নামে ভারতীয় সুন্ধি জাতের একটি ঘোড়ার দাম হাঁকা হয়েছে ১১ লাখ টাকা, যা মেলায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।

মেলা কমিটির তথ্যমতে, প্রায় ৫২১ বছরের পুরনো এই ঐতিহ্যবাহী মেলা শুরু থেকেই ঘোড়া ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য খ্যাত। স্বাধীনতার পর নেপাল, ভুটান, ভারত, পাকিস্তান এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকেও উন্নত জাতের ঘোড়া এখানে বিক্রির জন্য আনা হতো। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় মেলার জায়গা ছোট হয়ে যাবার কারণে আগের সেই মেলার জৌলুস নেই। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ঘোড়সওয়ার ও মালিকরা এ মেলায় অংশ নেন।

মেলায় ঘোড়া নিয়ে এসেছেন নওগাঁ জেলার ধামইরহাট উপজেলার সোহরাব হোসেন। তার ‘যুবরাজ’ নামের ভারতীয় সুন্ধি জাতের ঘোড়াটির দাম হাঁকা হয়েছে ১১ লাখ টাকা। ইতোমধ্যে সাড়ে ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত প্রস্তাব পেলেও তিনি আরও ভালো দামের আশায় অপেক্ষা করছেন।

দিনাজপুর বিরল উপজেলা মো. লায়েক তিনি প্রথম বারের মত এবার তাঁর কালো রাজা নামে একটি ঘোড়া নিয়ে এসেছে যার দাম রেখেছেন ৭ লাখ টাকা। ভালো ভালো দাম পেলে তিনি বিক্রি করে দিবেন বলে জানান।

অন্যদিকে গাইবান্ধা থেকে আসা জালাল উদ্দিন জানান, বাপ- দাদার আমল থেকে তারা এ মেলায় ঘোড়া নিয়ে আসছেন। এবার ছোট-বড় মিলিয়ে ৪৫টি ঘোড়া এনেছেন, তবে আনুষ্ঠানিক টোল রশিদ না পাওয়া পর্যন্ত বেচাকেনা শুরু হচ্ছে না।

ক্রেতা-বিক্রেতাদের দাবি, ঘোড়দৌড় প্রদর্শনের জন্য বিস্তৃত মাঠের প্রয়োজন হলেও মেলার পরিধি কিছুটা সংকুচিত হওয়ায় বেচাকেনায় বিঘ্ন ঘটছে।

মেলা কমিটির সভাপতি ও গোপীনাথপুর ইউপি চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান জানান, ঘোড়ার মেলা হলেও গ্রামীণ ঐতিহ্যের সব আয়োজনই রাখা হয়েছে। তবে রমজান মাসের কারণে সার্কাস ও যাত্রাপালার মতো বিনোদনমূলক আয়োজন বন্ধ রাখা হয়েছে। ঈদের পর প্রশাসন অনুমতি দিলে বিনোদন মূলক আয়োজন রাখা হবে।

আক্কেলপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহীন রেজা বলেন, মেলা উপলক্ষে বিপুল মানুষের সমাগম হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ ও আনসার সদস্যরা মোতায়েন রয়েছেন।

ইতিহাস ও বিভিন্ন তথ্যসূত্রে জানা যায়, প্রায় সোয়া পাঁচশ বছর আগে নন্দিনী প্রিয়া নামে এক সাধক বর্তমান গোপীনাথপুর গ্রামের এক কিলোমিটার উত্তরে গভীর জঙ্গলে নদীর তীরে একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করে পূজা-অর্চনা শুরু করেন। সে সময় বাংলার শাসক ছিলেন আলাউদ্দিন হোসেন শাহ। তিনি গোপীনাথপুর এলাকায় সফরে এসে ওই সাধকের আতিথ্য গ্রহণ করেন। সাধকের আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়ে নবাব তাম্রফলকে লিখে গোপীনাথপুর ও গোপালপুর মৌজার সম্পত্তি দেবোত্তর হিসেবে দান করেন।

সেই দানের সূত্র ধরেই প্রতি বছর দোলযাত্রা উপলক্ষে এখানে মেলার আয়োজন হয়ে আসছে। শতাব্দী পেরিয়ে আজও ঐতিহ্য, ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতির অনন্য মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে গোপীনাথপুরের দোল পূর্ণিমার মেলা।

এম.কে

×