ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ৩০ জুন ২০২৬, ১৬ আষাঢ় ১৪৩৩

দম ফেলার ফুরসত নেই ব্যবসায়ীদের

রমজানে নারান্দিয়ার হাতেভাজা মুড়ির চাহিদা দেশজুড়ে

নিজস্ব সংবাদদাতা, টাঙ্গাইল

প্রকাশিত: ২২:৩০, ৩ মার্চ ২০২৬

রমজানে নারান্দিয়ার হাতেভাজা মুড়ির চাহিদা দেশজুড়ে

টাঙ্গাইল- কালিহাতীর নারান্দিয়া ইউনিয়নের প্রায় ১৫টি গ্রামের কয়েক’শ মোদক হাতে ভাজা মুড়ি তৈরি করে থাকে

টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার নারান্দিয়ার মোদক সম্প্রদায়ের হাতে ভাজা মুড়ির চাহিদা ও সুনাম রয়েছে দেশজুড়ে। পবিত্র রমজান মাসের ইফতারির রকমারি উপাদানের মধ্যে মুড়ি অত্যাবশকীয়। মুড়ির চাহিদা সারা বছরব্যাপী থাকলেও রোজার সময় উৎপাদন এবং বিক্রি বহুগুণে বেড়ে যায়। ফলে মুড়ি ব্যবসায়ীরা বছরজুড়ে অপেক্ষায় থাকেন রমজান মাসের জন্য। আবার অনেকে এ মাসে মৌসুমি ব্যবসা হিসেবে মুড়ি উৎপাদন এবং বিক্রি করে থাকেন। বর্তমানে এখানকার মুড়ি তৈরির কারিগর ও ব্যবসায়ীদের দম ফেলার ফুসরত নেই।
টাঙ্গাইলসহ দেশের ৮ জেলায় মুড়ি সরবরাহ হয়ে থাকে জেলার কালিহাতীর নারান্দিয়া ইউনিয়ন থেকে। এখানকার উৎপাদিত হাতে ভাজা মুড়ির সুনাম দেশের বিভিন্ন স্থানে। মুড়ি উৎপাদনের সঙ্গে নারান্দিয়া গ্রামের মানুষ অনেক পূর্ব থেকেই জড়িত। এখানে দুইভাবে মুড়ি উৎপাদন হয়Ñহাতে ভেজে ও মেশিনের সাহায্যে। মুড়ি উৎপাদনকারী এলাকাগুলোর মধ্যে নারান্দিয়া ইউনিয়ন শীর্ষে। নারান্দিয়ার শতাধিক বাড়িতে হাতে ভেজে মুড়ি উৎপাদন হয়। মেশিনের সাহায্যে মুড়ি উৎপাদন নতুন সংযোজন হলেও হাতে ভেজে মুড়ি তৈরি এবং বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে শতাধিক পরিবার অনেক আগে থেকেই। বিশেষ করে মোদক সম্প্রদায়।
এছাড়া কালিহাতী উপজেলার নারান্দিয়া, মাইস্তা, নগরবাড়ী, দৌলতপুর, লুহুরিয়া ও সিংহটিয়াসহ প্রায় ১৫টি গ্রামের কয়েক’শ পরিবার হাতে ভেজে মুড়ি তৈরি করে থাকে। একজন ১ দিনে এক থেকে দেড় মণ চালের মুড়ি ভাজতে পারেন। প্রতি মণ চালে ২২ থেকে ২৩ কেজি মুড়ি হয়। প্রতি কেজি মুড়ি পাইকারি ৯০-১০০ টাকা এবং খুচরা ১০০ টাকার ওপরে বিক্রি হচ্ছে। মূলত গ্রামের মহিলারাই হাতে ভেজে গুণগত মানসম্মত মুড়ি তৈরি করেন। দৌলতপুর গ্রামের রাধারানী মোদক বলেন, আমরা বংশ পরম্পরায় এ মুড়ি ভাজা ও ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। আমি ৩৮ বছর ধরে মুড়ি ভাজি।

ধান সেদ্ধ করে রোদে শুকানোর পর আবার সেই ধান মেশিনে মাড়াই করে মুড়ি ভাজার জন্য চাল তৈরি করা হয়। পরে সেই চাল দিয়ে লবণ জলের মিশ্রণে আগুনে তাপ সহ্য করে বিশুদ্ধ মুড়ি ভাজতে অনেক পরিশ্রম হয়। সবকিছুর দাম বেশি। পরিশ্রমের তুলনায় তেমনটা লাভ হয় না। অধীর মোদক বলেন, মুড়ি ভাজার প্রতি মণ ধান ১ হাজার ৩০০ টাকা। এক মণ ধানের মুড়ি ভাজতে খড়ি, লবণ, যাতায়াত ও ধান ভাঙ্গানোর খরচ আরও ১৫০ টাকা। সব খরচ বাদে বেশি লাভ হয় না। কনিকা রানী মোদক ও সুরেন্দ্র কুমার বর্মণ বলেন, এক মণ ধানের মুড়ি ভাজলে ৪০০-৫০০ টাকা লাভ হয়। তা দিয়ে চলে না। আমরা সরকারি সহযোগিতা চাই। 
মুড়ির কারিগরসহ সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে জানা যায়, প্রতিদিন প্রায় ২ লাখ টাকার হাতে ভাজা মুড়ি উৎপাদন এবং কেনাবেচা হয়। তবে পরিশ্রমের লাভ বেশিরভাগই চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে। রমজান মাসে দূর-দূরান্ত থেকে পাইকাররা পিকআপ, ভ্যানসহ বিভিন্ন যানবাহনে বস্তাভর্তি মুড়ি কিনে টাঙ্গাইলের প্রত্যন্ত এলাকায় বিক্রি করেন। যাতায়াত ব্যবস্থা ভাল থাকায় পার্শ্ববর্তী সিরাজগঞ্জ, ঢাকা, ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর, বগুড়া ও গাজীপুরে নারান্দিয়ার মুড়ি সরবরাহ হয়। তবে প্রযুক্তির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছেন না হাতে ভাজা মুড়ি উৎপাদনকারীরা।

মেশিনে মুড়ি ভাজতে সময় কম লাগে, কিন্তু তুলনামূলকভাবে লাভ বেশি। অন্যদিকে হাতে মুড়ি ভাজতে সময় বেশি লাগে; কিন্তু লাভ সামান্য। ফলে হাতে ভাজা মুড়ি উৎপাদনকারীরা দিন দিন এই কাজ ছেড়ে অন্য পেশায় ধাবিত হচ্ছেন এবং অনেকেই চলে গেছেন। এই পেশাকেই টিকিয়ে রাখতে উৎপাদনকারী এবং ব্যবসায়ীরা সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন। এদিকে মেশিনের সাহায্যে বিপুল পরিমাণ মুড়ি প্রতিনিয়ত উৎপাদন হলেও হাতে ভাজা মুড়ির চাহিদা এখনো অপরিবর্তিত রয়েছে। মেশিনে ভাজা মুড়ি সাদা ও লম্বা করতে ক্ষতিকর রাসায়নিক ইউরিয়া কিংবা সোডা ব্যবহারের অভিযোগ থাকায় একশ্রেণির মানুষ সর্বদাই বিষমুক্ত হাতে ভাজা মুড়ি খেয়ে থাকেন।

টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক শরীফা হক বলেন, নারান্দিয়ার হাতে ভাজা মুড়ির চাহিদা ও সুনাম রয়েছে। এর সঙ্গে জড়িত প্রান্তিক মানুষকে অবশ্যই সরকারি সাহায্য করার সুযোগ আছে। তাদের তালিকা করে কম সুদে ঋণ স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে সাহায্য করার উদ্যোগ নেব। সেইসঙ্গে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখানকার হাতে ভাজা মুড়ির ব্র্যান্ডিং ও আরও প্রচার প্রসারের ব্যবস্থা করা হবে।

প্যানেল হু

×