কুয়াশার মোড়ক খুলে রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়ায় নড়াইলে রোরো ধান আবাদে ধুম পড়েছে
কুয়াশার চাদর সরে গিয়ে রৌদ্রোজ্জ্বল আকাশ দেখা দিতেই নড়াইলজুড়ে শুরু হয়েছে বোরো ধান রোপণের উৎসবমুখর পরিবেশ। মাঠে মাঠে এখন কৃষকেরা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করছেন। কোথাও চারা তোলা, কোথাও জমি তৈরি, আবার কোথাও চলছে চারা রোপণের কাজ। বীজতলা, সার, কীটনাশক ও সেচ সবকিছুই পর্যাপ্ত থাকায় কৃষকদের মুখে স্বস্তির হাসি দেখা যাচ্ছে।
জেলা কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, চলতি বোরো মৌসুমে নড়াইল জেলায় ৫০ হাজার ২৯৭ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। নড়াইলে আগের তিন বছরের তুলনায় এ বছর বেশি জমিতে ধান চাষ হচ্ছে। সবকিছু অনুকূলে থাকলে এবার ফলনও ভালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বোরো মৌসুমের শুরুতে শীত ও ঘন কুয়াশার কারণে কিছুটা দেরিতে শুরু হয়েছিল রোপণ কার্যক্রম। অনেক কৃষকই তখন ঠিকমতো জমিতে নামতে পারেননি।
তবে প্রায় ২০ দিন আগে আবহাওয়ার পরিবর্তন ঘটতেই পরিস্থিতি বদলে যায়। নড়াইলের আকাশে এখন ঝলমলে রোদ, সঙ্গে হালকা শীতের আমেজ। এই আবহাওয়া বোরো ধান রোপণের জন্য সবচেয়ে উপযোগী। অনুকূল পরিবেশ পেয়ে কৃষকেরা এখন পুরোদমে ধান লাগাচ্ছেন। গ্রামের পর গ্রামজুড়ে দেখা যাচ্ছে সবুজের প্রস্তুতি।
নড়াইল সদর উপজেলার চৌগাছা গ্রামের কৃষক ইব্রাহিম শেখ বলেন, তিনি ১৮০ শতক জমিতে বোরো চারা রোপণ করেছেন। তার ভাষায়, এখন পর্যন্ত চারা বা পাতোর কোনো সমস্যা নেই। সবকিছু ঠিকঠাক চলছে। একই গ্রামের আতাউর রহমান জানান, তিনি তিন একর জমিতে ধান লাগিয়েছেন। শুরুতে শীতের কারণে একটু ঝামেলা হলেও এখন আবহাওয়া খুব ভালো। সার, কীটনাশক কিংবা সেচ কোনো কিছুর সংকট নেই। ৭৫ বছর বয়সী কৃষক বাদশা শেখ বলেন, জমি চাষ করে মই দিয়ে সমতল করার পর চারা লাগানোর কাজ করছেন তিনি। বয়স হলেও মাঠের কাজ ছাড়তে পারেননি।
তার মতে ভালো ফসল হলে সব কষ্ট ভুলে যাওয়া যায়। আগের দিনে গরু দিয়ে জমি চাষ করা হতো। এখন সেই চিত্র বদলেছে। কৃষক মোহাম্মদ মোরাদ বলেন, বর্তমানে পাওয়ার টিলার দিয়ে জমি চাষ করা হচ্ছে। এতে সময় কম লাগে, পরিশ্রমও কম হয়। খরচের দিক থেকেও এটি তুলনামূলক সাশ্রয়ী। এতে করে কৃষকেরা কম সময়ে বেশি জমি প্রস্তুত করতে পারছেন, যা বোরো মৌসুমে বড় সুবিধা।
নড়াইলের অনেক কৃষকই এবার রডমিনিকেট জাতের ধান চাষে আগ্রহী হয়েছেন। কৃষক সাগর শেখ জানান, তিনি ১৩৫ শতক জমিতে এই জাতের ধান রোপণ করেছেন। তার মতে রডমিনিকেট ধানের ফলন ভালো, বাজারে দামও ভালো পাওয়া যায়। তিনি আরও বলেন, এই ধানের ভাত খেতে সুস্বাদু। পাশাপাশি বিছালি বা খড়ও ভালো হয়, যা গবাদিপশুর খাবার হিসেবে কাজে আসে। তাই অনেক কৃষকই এই জাতের দিকে ঝুঁকছেন।
বিভিন্ন এলাকার কৃষকেরা জানান, বোরো মৌসুমের শুরু থেকেই সার, কীটনাশক ও বিদ্যুৎচালিত সেচের তেমন কোনো সংকট নেই। প্রয়োজন অনুযায়ী সবকিছু পাওয়া যাচ্ছে। কৃষকদের আশা, যদি মৌসুমের শেষ পর্যন্ত আবহাওয়া অনুকূলে থাকে এবং সেচ ও বিদ্যুতের সমস্যা না হয়, তাহলে এবার সোনালি ফসল ঘরে তুলতে কোনো বাধা থাকবে না।
এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নড়াইলের উপ-পরিচালক মুহাম্মদ আরিফুর রহমান জানান, ২০২৫-২৬ বোরো মৌসুমে জেলায় ৫০ হাজার ২৯৭ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৪-২৫ মৌসুমে ৫০ হাজার ২৮০ হেক্টর এবং ২০২৩-২৪ মৌসুমে ৫০ হাজার ২৩০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছিল। অর্থাৎ বিগত তিন বছরের ব্যবধানে নড়াইলে মোট ৬৭ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ বৃদ্ধি পেয়েছে।
কৃষি বিভাগ আরও জানায়, চলতি মৌসুমে ২ হাজার ৬৩৫ হেক্টর জমিতে বীজতলা করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ আদর্শ বীজতলা। ফলে চারার দিক থেকেও কোনো সংকট নেই। এ পর্যাপ্ত বীজতলা থাকায় কৃষকেরা সময়মতো জমিতে চারা রোপণ করতে পারছেন, যা ভালো ফলনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
প্যানেল হু








