ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ২৭ এপ্রিল ২০২৪, ১৪ বৈশাখ ১৪৩১

প্রভাবশালীরা প্রাসাদের বিভিন্ন অংশ ভেঙ্গে দোকানপাট, বাড়িঘর নির্মাণ করে চলেছে

হারিয়ে যাচ্ছে স্মৃতিবিজড়িত জিনজিরা প্রাসাদ

প্রকাশিত: ০৬:৩৬, ১ সেপ্টেম্বর ২০১৮

  হারিয়ে যাচ্ছে স্মৃতিবিজড়িত জিনজিরা প্রাসাদ

স্টাফ রিপোর্টার ॥ মোগল সুবেদারদের স্মৃতিবিজড়িত কেরানীগঞ্জের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ঐতিহাসিক ‘কস-ই জাজিরা’ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। স্থানীয়রা এটিকে ‘জিনজিরা প্রাসাদ’ বা ‘হাওলি নওগড়া’ নামেই চেনেন। বর্তমানে প্রভাবশালীরা প্রাসাদের বিভিন্ন অংশ ভেঙ্গে সেখানে দোকানপাট, বাড়িঘর নির্মাণ করে চলেছেন। অযত্নের পরও কয়েক শ’ বছরের পুরাতন এই প্রাসাদের শেষ চিহ্নটুকু এখনও মাথা উঁচু করে রয়েছে। নিশ্চিহ্ন হতে চললেও বহু যুগের এই স্থাপনা রক্ষায় এখনও কেউ এগিয়ে আসছে না। জানা যায়, বাংলার মোগল সুবেদার দ্বিতীয় ইব্রাহিম ১৭ শতকের শেষার্ধে জিনজিরা প্রাসাদটি নির্মাণ করেন। পুরান ঢাকার বড় কাটারা প্রাসাদ দুর্গের দক্ষিণে বুড়িগঙ্গা নদীর প্রান্ত ঘেঁষেই বড় কাটারার আদলে এই জিনজিরা প্রাসাদ নির্মিত হয়। প্রমোদকেন্দ্র হিসেবে নির্মিত হলেও পরে সেখানে বাস করতেন মোগল সুবেদার মুর্শিদ কুলি খান। ১৭০৩ সালে তার রাজস্ব প্রশাসন দফতর মকসুদাবাদে স্থানান্তরের পূর্ব পর্যন্ত প্রাসাদটি তার আবাসস্থল ছিল। এরপর বিভিন্ন সময়ে ঢাকা সফরকালে তিনি এই প্রাসাদেই অবস্থান করতেন। ঢাকার নায়েব নাজিম নওয়াজিশ মুহাম্মদ খানের প্রতিনিধি হোসেন কুলি খানের পারিবারিক আবাসস্থলও ছিল এই প্রাসাদ। বাংলার ইতিহাসের বহু বিয়োগান্তক ঘটনার সাক্ষী এই প্রাসাদ। ১৭৫৪ সালে হোসেন কুলি খানের হত্যাকান্ডের পর তার মা, স্ত্রী, বোন, ছেলেমেয়ে এবং হেরেমের কয়েক নারীকে এখানে বন্দী রাখা হয়। পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের পর আলীবর্দী খানের স্ত্রী শরিফুন্নেসা, নবাব সিরাজউদ্দৌলার মা আমেনা বেগম, স্ত্রী লুতফুন্নেসা বেগম, মেয়ে কুদসিয়া বেগম ওরফে উম্মে জোহরাও এই প্রাসাদেও বন্দী ছিলেন। তাদের সঙ্গে বন্দী রাখা হয় পলাশীর যুদ্ধের অন্যতম ষড়যন্ত্রকারী ঘসেটি বেগমকেও। বাংলাপিডিয়ার বর্ণনা অনুযায়ী, জিনজিরা প্রাসাদে ছিল মূল প্রাসাদ ভবন, সুবিস্তৃত দ্বিতল হাম্মাম, দক্ষিণের সদরে প্রহরীকক্ষসহ দ্বিতল প্রবেশ ফটক এবং অষ্টকোণী পার্শ্ববুরুজ। পলেস্তারাবিশিষ্ট দেয়ালঘেরা কক্ষগুলো ছিল আয়তাকার এবং উপরে কুঁড়েঘর আকৃতির চৌচালা খিলানাকার ছাদ। বাইরের দেয়াল ছিল সুপ্রশস্ত ও ভিত্তিমূল গভীর। প্রাসাদটির নির্মাণকৌশল বড় কাটারার আদলে হলেও এর মোট আয়তন ও কক্ষ ছিল ছোট কাটারার চেয়েও অনেক কম। চারদিকে পানির মধ্যে কয়েক একর জমিতে নির্মিত প্রাসাদটি দেখতে অনেকটা দ্বীপের মতো ছিল। এর আদি নাম ছিল ‘কস-ই জাজিরা’। ধারণা করা হয়, কস-ই জাজিরা নামের অপভ্রংশ থেকেই জিনজিরার নামকরণ হয়েছে। সরেজমিনে দেখা যায়, ইতিহাসের বহু ঘটনার সাক্ষী জিনজিরা প্রাসাদ বর্তমানে নিশ্চিহ্নপ্রায়। এর আদি রূপ সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। তবে একটি অংশ এখনও কালের সাক্ষী হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো। অযত্ন-অবহেলায় এর বাইরে বিভিন্ন গাছের শিকড় জড়িয়ে আছে। ঐতিহাসিক প্রাসাদটি রক্ষণাবেক্ষণ না করায় সেখানে বসতি গড়ে তুলেছেন স্থানীয়রা। নির্মাণ করা হয়েছে বড় দালান ও দোকানপাট। জিনজিরার হুক্কাপট্টি, হাফেজ রোড এবং গোলজারবাগ এলাকার একাধিক বাসিন্দা জানান, ১২/১৫ বছর আগেও প্রাসাদটির ৩টি পৃথক অংশ বিভক্ত আকারে টিকে ছিল। কিন্তু সে অংশগুলোও ধ্বংস করে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে দালান। স্থানীয়রা এই প্রাসাদকে ‘হাওলি নওগড়া’ নামে ডাকেন। হাওলি শব্দটি হাভেলি থেকে এসেছে, যার অর্থ দালান। তাই এই প্রাসাদটি ধ্বংস করে যে গ্রাম এখানে গড়ে উঠেছে তার নামকরণ করা হয়েছে ‘হাওলি’। কেরানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহে এলিদ মাইনুল আমিন জানান, এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি রক্ষার জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। জিনজিরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাজী সাকুর হোসেন সাকু বলেন, এই প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাটি আমার ইউনিয়নে অবস্থিত। তাই এই প্রাসাদটি রক্ষার জন্য যতটুকু সম্ভব চেষ্টা করা হচ্ছে।
×