মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের চর্চা- বিকাশে অনন্য সংযোজন বইমেলা

প্রকাশিত : ১ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • অমর একুশে গ্রন্থমেলা আজ শুরু

মোরসালিন মিজান ॥ আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো ফেব্রুয়ারির প্রথম দিন আজ রবিবার থেকে শুরু হচ্ছে অমর একুশে গ্রন্থ মেলা ২০১৫। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের চর্চা-বিকাশ, বাঙালী সংস্কৃতির বহমান উদার-অসাম্প্রদায়িক ধারায় অনন্য সংযোজন বইমেলা। বাংলা একাডেমি আয়োজিত মাসব্যাপী মেলা বিকেলে উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শুধু গ্রন্থকে কেন্দ্র করে এমন মেলা সারা বিশ্বেই বিরল। ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত বইমেলা সারা দুনিয়ার বাঙালীর আবেগ ভালবাসার অনিন্দ্য সুন্দর প্রকাশ।

গত বছরের মতো এবারও বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়াদী উদ্যান- দুই আঙিনায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে অমর একুশে গ্রন্থমেলা। পরিসর আরও বাড়বে এবার। বিগত যে কোন মেলার পরিসরের চেয়ে এই পরিসর শুধু বড় হবে না, কয়েকগুণ বড় হবে। একাডেমি প্রাঙ্গণ ছাড়াও বিশালায়তনের যে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, এর প্রায় পুরোটাই ব্যবহার করা হবে। ফলে এখন পর্যন্ত একাডেমি আয়োজিত সবচেয়ে বড় পরিসরের মেলা হবে এটি।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মায়ের ভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষায় প্রাণ বিলিয়ে দিয়েছিল বাঙালী। রফিক, শফিক, বরকত, জব্বারের তাজা রক্ত গড়েছিল নতুন ইতিহাস। তাঁদের রক্তে নতুন প্রাণ পায় আমরি বাংলা ভাষা। ভাই হারানোর এই ব্যথা আর রাষ্ট্রভাষা বাংলার গৌরব ধারণ করেছে অমর একুশে গ্রন্থমেলা। শুরুটা করেছিলেন চিত্তরঞ্জন সাহা। ১৯৭২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বর্ধমান হাউজের বটতলায় চট পেতে বসেছিলেন তিনি। সেখানে ৩২টি বই ছড়িয়ে রাখা ছিল। বাংলাদেশী শরণার্থী লেখকদের লেখা এসব বই প্রকাশ করে চিত্তরঞ্জন প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বাংলা সাহিত্য পরিষদ (বর্তমান মুক্তধারা প্রকাশনী)। বইগুলো স্বাধীন বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পের প্রথম অবদান। সীমিত বই নিয়ে এই প্রকাশক একাই উদ্যোগটি অব্যাহত রাখেন। ১৯৭৬ সালে উদ্যোগটির সঙ্গে যুক্ত হয় আরও কয়েকটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। ১৯৭৮ সালে মেলার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয় বাংলা একাডেমি। ১৯৭৯ সালে মেলার সঙ্গে যুক্ত হয় বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি। ১৯৮৩ সালে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক থাকাকালে কাজী মনজুরে মওলা বাংলা একাডেমিতে প্রথম অমর একুশে গ্রন্থমেলা আয়োজন করেন। বর্তমানে মেলা সম্প্রসারিত হয়েছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত।

প্রতিবারের মতো এবারও ১ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হবে। রবিবার বিকেলে বাংলা একাডেমিতে অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৫ উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি থাকবেন সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। বাংলা একাডেমির সভাপতি প্রফেসর এমেরিটাস আনিসুজ্জামানের সভাপতিত্বে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখবেন সংস্কৃতি সচিব ড. রণজিৎ কুমার বিশ্বাস। স্বাগত বক্তব্য রাখবেন একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। একই মঞ্চে উদ্বোধন করা হবে আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন। সম্মেলনে আসা বিদেশী অতিথিদের মধ্যে অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখবেন জার্মানির সাহিত্যিক হান্স হার্ডার, ফরাসি লেখক ফ্রাঁস ভট্টাচার্য, বেলজিয়ামের সাহিত্যিক ফাদার দ্যতিয়েন এবং ভারতের রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য গবেষক ও ভাষাবিদ ড. পবিত্র সরকার। অনুষ্ঠানে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০১৪ বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। উদ্বোধনী আনুষ্ঠানিকতা শেষে মেলার বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখবেন প্রধানমন্ত্রী। এর পর সাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হবে গোটা আয়োজন।

আয়োজক সূত্র জানায়, এবার গ্রন্থমেলার বাংলা একাডেমি অংশে ৯২টি প্রতিষ্ঠানকে স্টল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এখানে মোট ইউনিট ১২৮টি। বহেরাতলা সেজেছে লিটলম্যাগে। ৭২টি ম্যাগাজিনকে বর্ধমান হাউজের দক্ষিণ পাশে লিটল ম্যাগাজিন কর্নারে জায়গা করে দেয়া হয়েছে। ক্ষুদ্র প্রকাশনা সংস্থা এবং ব্যক্তি উদ্যোগে প্রকাশিত বই বিক্রি ও প্রদর্শনের জন্য জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের স্টলে রাখা যাবে। নজরুল মঞ্চ ঘিরে থাকছে আলাদা শিশু কর্নার। ৩২টি শিশু-কিশোর প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে ৪২ ইউনিট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। সব ধরনের শিশুতোষ বই এখানে পাওয়া যাবে। শিশুদের নিয়ে শিশু প্রহরসহ বিভিন্ন আয়োজনও থাকছে এখানে। একাডেমি চত্বরের বড় অংশজুড়ে থাকবে সরকারী ও এনজিওসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের স্টল। সে অনুযায়ী, ২৫টি সরকারী প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হয়েছে ৪৪ ইউনিট। ১৯টি মিডিয়া ও আইটি প্রতিষ্ঠানকে ২০ ইউনিট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। ১৭ অন্যান্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হয়েছে ২২ ইউনিট। বাংলা একাডেমিরও স্টল থাকবে এখানে। এছাড়া বর্ধমান হাউসের পাশে স্থাপিত মেলা মঞ্চে প্রতিদিন আয়োজন করা হবে গুরুত্বপূর্ণ সেমিনার ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এটুআই কর্তৃপক্ষ গ্রন্থমেলায় তাদের নিয়মিত কার্যক্রমের পাশাপাশি এবার গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন, তথ্যকেন্দ্রের সর্বশেষ খবরাখবর এবং মেলার মূল মঞ্চের সেমিনার প্রচারের ব্যবস্থা করবে। নজরুল মঞ্চে এবারও নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা থাকবে। অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৫-এর প্রচার কার্যক্রমের জন্য বর্ধমান ভবনের পশ্চিম বেদীতে থাকছে তথ্যকেন্দ্র। তথ্যকেন্দ্রের উত্তর পার্শ্বে আছে একটি মিডিয়া সেন্টার। লেখকদের জন্য একাডেমি প্রাঙ্গণে তৈরি করা হয়েছে একটি লেখক কুঞ্জ।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিশাল পরিসরে স্টল সাজিয়েছে মূল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো। এখানে ৩৫১টি প্রতিষ্ঠানকে সর্বমোট ৫৬৫টি ইউনিট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে ৪৩৭টি ইউনিট। মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ১০৬ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে ১ ইউনিট করে, ৯৬ প্রতিষ্ঠানকে ২ ইউনিট করে, ৪৫ প্রতিষ্ঠানকে ৩ ইউনিট করে এবং ১টি প্রতিষ্ঠানকে ৪ ইউনিটের স্টল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এ অংশের নতুন সংযোজন প্যাভিলিয়ন। প্রথমবারের মতো ১১টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে ৪০০ বর্গফুটের প্যাভিলিয়ন প্রদান করা হয়েছে। ১০টি প্যাভিলিয়ন সাজিয়েছে ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড- ইউপিএল, অনুপম প্রকাশনী, আগামী প্রকাশনী, সময় প্রকাশনী, মাওলা ব্রাদার্স, অন্যপ্রকাশ, অনন্যা, সাহিত্যপ্রকাশ, কাকলী প্রকাশনী ও পাঠক সমাবেশ। প্যাভিলিয়ন প্রতিটির আয়তন ২০ ফিট বাই ২০ ফিট। সকলেই প্যাভিলিয়ন সুন্দর ও আকর্ষণীয় করার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন। সবচেয়ে বড় প্যাভিলিয়নটি বাংলা একাডেমির। এ ছাড়াও মেলায় বাংলা একাডেমির ৪টি বিক্রয় কেন্দ্র থাকবে। একটি সাজানো হবে একাডেমি প্রকাশিত শিশু-কিশোরতোষ গ্রন্থ দিয়ে। সবক’টি বিক্রয় কেন্দ্র থেকে ৩০ ভাগ ছাড়ে বই কেনার সুযোগ পাবেন পাঠক। একাডেমির ২০০০ সালের আগে প্রকাশিত বই কিনতে ছাড় পাওয়া যাবে ৭০ ভাগ। এবারের গ্রন্থমেলায় বাংলা একাডেমি শতাধিক নতুন বই পাওয়া যাবে। তবে মেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো বই বিক্রি করবে ২৫ ভাগ ছাড়ে।

মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রবেশের জন্য রাখা হয়েছে একটি মাত্র পথ। টিএসসি ও ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউশনের পাশ দিয়ে মেলা থেকে বের হওয়া যাবে। রাখা হয়েছে দুটি পথ। স্টলের সামনের চলাচল-পথে ২০ ফিট করে খোলা জায়গা রাখা হয়েছে। ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অবস্থিত স্বাধীনতা স্তম্ভ ও এর পার্শ্ববর্তী জলাধারকে নান্দনিকভাবে গ্রন্থমেলার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। বাংলা বর্ণমালা ও ভাষা শহীদদের প্রতিকৃতি ও মহান ভাষা আন্দোলনের তথ্য সংবলিত নানান স্মারকে প্রতিফলিত হচ্ছে অমর একুশে। গত মেলার পর প্রয়াত ১৩ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের স্মৃতি-স্মারক স্থাপন করা হয়েছে দুই ভেন্যুতে। প্রয়াতদের মধ্যে রয়েছেন কবি আবুল হোসেন, দার্শনিক সরদার ফজলুল করিম, ভাষাসংগ্রামী ও লেখক বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান, ইতিহাসবিদ সালাহ্উদ্দীন আহ্মদ, চিত্রশিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, শিক্ষাবিদ জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, সংগীতশিল্পী ফিরোজা বেগম, ভাষাসংগ্রামী আবদুল মতিন, জাতীয় স্মৃতিসৌধের স্থপতি সৈয়দ মাইনুল হোসেন, সাংবাদিক এবিএম মুসা, শিশুসাহিত্যিক এখলাসউদ্দিন আহমদ, স্বাধীন বাংলা বেতারের গীতিকার গোবিন্দ হালদার ও জিনবিজ্ঞানী মাকসুদুল আলম।

আয়োজকসূত্র জানায়, গ্রন্থমেলার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সকল প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। প্রবেশপথে থাকছে আর্চওয়ে। মেলার সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবে বাংলাদেশ পুলিশ, র‌্যাব, আনসার, বিজিবি, গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। নিশ্চিদ্র নিরাপত্তার জন্য মেলা প্রাঙ্গণে থাকছে ৭৫টি ক্লোজসার্কিট ক্যামেরা। গ্রন্থমেলা সম্পূর্ণ পলিথিন ও ধূমপানমুক্ত থাকবে।

গ্রন্থমেলা ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ছুটির দিন ব্যতীত প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। ছুটির দিন বেলা ১১টা থেকে রাত ৯টা এবং ২১ ফেব্রুয়ারি সকাল ৮টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মেলা চলবে।

সংবাদ সম্মেলন ॥ অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৫ উপলক্ষে শনিবার বাংলা একাডেমিতে আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান বলেন, আমরা একটি বিশ্বমানের বই মেলা উপহার দিতে চাই। লক্ষ্যে পৌঁছতে সাধ্যমতো চেষ্টা করা হয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা মেলার কোন ক্ষতি করবে নাÑ এমন আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, বাংলা একাডেমির বইমেলা বাঙালীর প্রাণের মেলা। এ মেলা চিত্তের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। স্বাধীনতার শক্তিকে বেগবান করছে। অমর একুশে গ্রন্থমেলা জাতির বিকাশের মুখ্য ভূমি। কোন বিবেকবান মানুষ এমন আয়োজনের ক্ষতি করতে পারে না। এ ব্যাপারে সকল মত পথের মানুষের সহায়তা কামনা করেন তিনি। এবার একই সময়ে আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন আয়োজন করছে বাংলা একাডেমি। এ আয়োজন অমর একুশের মেলার সঙ্গে কেন? সংবাদ সম্মেলনে বার বার এই প্রশ্ন ওঠে। জবাবে মহাপরিচালক বাজেটের দোহাই দেয়ার চেষ্টা করেন। বলেন, এ সময় সরকারের কাছ থেকে থোক বরাদ্দ পাওয়া যায়। তবে ভবিষ্যতে দুটি আয়োজন একসঙ্গে হবে না বলে জানান তিনি।

প্রকাশিত : ১ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

০১/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: