ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ০৫ অক্টোবর ২০২২, ২০ আশ্বিন ১৪২৯

চারশ’ বছরের ইতিহাস

ঈশা খাঁ-মানসিংহের যুদ্ধক্ষেত্র, বিপন্ন স্মৃতিচিহ্ন

শেখ আব্দুল আওয়াল

প্রকাশিত: ২৩:৪০, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২২

ঈশা খাঁ-মানসিংহের যুদ্ধক্ষেত্র, বিপন্ন স্মৃতিচিহ্ন

গফরগাঁওয়ে দখলদাররা মুছে ফেলছে ৪শ’ বছরের ইতিহাস ঈশা খাঁ-মানসিংহের সেই যুদ্ধক্ষেত্র

গিয়াস উদ্দিন মামুদ শাহের রাজত্বের শেষভাগে- ১৫৩৬ সালের কাছাকাছি সময়ে ঈশা খাঁর জন্ম হয়। গিয়াস উদ্দিনের মৃত্যুর পর সলিমান খাঁ নিজেকে সুলতানের  বৈধ উত্তরাধিকারী বলে ঘোষণা করেন। সেই সময় দিল্লীতে পাঠান শের শাহ শূরী তখ্্ দখল  করেছেন। সলিমান খাঁ পাঠানদের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পড়লেন। বাংলার পাঠান শাসক ইসলাম শাহ শূরীর সঙ্গে যুদ্ধে তিনি নিহত হলেন। তার দুই নাবালক পুত্র ঈশা খাঁ আর ইসমাইল খাঁকে ক্রীতদাস হিসাবে বিক্রি করে তুরানে পাঠিয়ে দেয়া হলো।
ইসলাম শাহর মৃত্যুর পর বাংলায় কররানী বংশের শাসন শুরু হয়। তাজ খাঁ কররানী বাংলার শাসক হলে ঈশা খাঁর মামা (অনেকের মতে তার কাকা) তার অধীনে চাকরি নেন। সুলতানের রাজদফতরে থাকার সুবাদে সুযোগ বুঝে খোঁজখবর করে দুই ভাগ্নে- ঈশা খাঁ আর ইসমাইল খাঁকে তুরান থেকে বাংলায় ফিরিয়ে আনেন।
এরপর থেকে শুরু হয় ঈশা খাঁর অন্য এক জীবন। তাকে প্রতিশোধ নেয়ার দীক্ষা দিয়ে গড়ে তোলা হয়। ঈশা খাঁ হয়ে ওঠেন ন্যায়পরায়ণ শাসক, যোদ্ধা। মোগল আমলে বাংলার বারো ভূঁইয়াদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ঈশা খাঁর বীরত্ব ৪০০ বছর ধরেই মুখে মুখে। মোগল সেনানায়ক মানসিংহকে লড়াইয়ে হারিয়ে তিনি অক্ষুণœ  রেখেছিলেন বাংলার স্বাধীনতা। এই লড়াই যেখানে সংঘটিত  হয়েছিল সেটি ছিল ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার  টাঙ্গাব গ্রামে। স্থানটি শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত।
নদীর পূর্ব তীরে ছিল রাজা মানসিংহের রাজধানী টোক নগরী (বর্তমানে কাপাসিয়া উপজেলার উত্তর-পূর্বাংশ)। মানসিংহ ১৫৯৫ সালে রাজস্থান থেকে তার রাজধানী টোক নগরীতে স্থানান্তর করে নিয়ে আসে। ব্রহ্মপুত্র ও শীতলক্ষ্যার সঙ্গমস্থলে ব্রহ্মপুত্রের দক্ষিণ তীরে ছিল টাঙ্গাব গ্রাম ও টোক নগর। ব্রহ্মপুত্র নদের অপরপারে ঈশা খাঁর বিখ্যাত দুর্গ এগারসিন্দুর। এটি পড়েছে কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলায়।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, গফরগাঁও উপজেলার টাঙ্গাব গ্রামে ঈশা খাঁ-মানসিংহের যুদ্ধ হয়েছে ৪২০ বছর আগে। এ সময়টুকুর মধ্যে রাজনৈতিক অনেক উত্থান-পতন হয়েছে। কিন্তু এ স্মৃতি ধরে রাখার জন্য আজও কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। যা হয়েছে তা হলো ঐতিহাসিক  যুদ্ধের এই ময়দান দখলে ভূমি খেকোদের মহোৎসব। ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনে ভাষা শহীদদের স্মরণে ১৯৭২ সালে  গড়ে তোলা হয় সেখানে একটি শহীদ মিনার। বিগত ৫০ বছরে এর আশপাশের সব জায়গা দখলের কারণে শুধু শহীদ বেদিটুকু নিয়ে মিনারটি যুগ যুগ ধরে সাুক্ষী হয়ে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে।
যুদ্ধক্ষেত্রের প্রায় ১৬ একর খাসজমির একাংশ বেদখল হয়ে গড়ে উঠেছে বসতবাড়ি। বাকি অংশে ফসল চাষ করা হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর কিছু উৎসাহী মানুষ ছোট্ট একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করে স্মৃতির পাতায় একটু হলেও আঁচড় কাটতে সক্ষম হলেও তা আজ দখলদারিত্বের কারণে সেটিও উপড়ে ফেলা হয়েছে।
ঈশা খাঁর অনুপস্থিতিতে মানসিংহ আক্রমণ করেন ঈশা খাঁর দুর্গ এগারসিন্দুর। সংবাদ পেয়ে ঈশা খাঁ দুর্গ রক্ষায় ছুটে আসেন। কিন্তু তার  সৈন্যরা এতই ক্লান্ত ছিল যে, তারা যুদ্ধ করতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে ঈশা খাঁ মানসিংহকে একক যুদ্ধের আহ্বান জানান।
ওই লড়াইয়ের আগে ঠিক হয়, যিনি যুদ্ধে জয়ী হবেন তিনিই বাংলার কর্তৃত্ব লাভ করবেন। মানসিংহ এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলে শুরু হয় লড়াই। প্রথম দিনের লড়াইয়ে মানসিংহ নিজে না এসে অজ্ঞাতনামা এক যুবককে পাঠান। যুবক ছিলেন মানসিংহের জামাতা। ঈশা খাঁ তাকে চিনতে পারেন এবং যুদ্ধে যুবকটির মৃত্যু হয়। ঈশা খাঁ এর পর মানসিংহকে তার ধিক্কার দিয়ে ফিরে আসেন। এতে মানসিংহ নিজে যুদ্ধক্ষেত্রে আসেন এবং ঈশা খাঁর সঙ্গে তুমুল লড়াই হয়। একপর্যায়ে মানসিংহের তরবারি ভেঙ্গে গেলে ঈশা খাঁ তাকে আঘাত না করে নিজের তরবারি মানসিংহকে দেন। কিন্তু মানসিংহ তরবারি না নিয়ে ঘোড়া থেকে নেমে আসেন।
ঈশা খাঁ তখন মানসিংহকে মল্লযুদ্ধে আহ্বান করেন। কিন্তু মানসিংহ তা গ্রহণ না করে ঈশা খাঁকে আলিঙ্গন করেন। তার সাহস ও মহানুভবতায় মুগ্ধ হয়ে তার সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করেন।
মানসিংহ শিবিরে ফিরে গেলে তার রানী তাকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। তিনি ভয় পাচ্ছিলেন, মোগল সম্রাট আকবর এই ঘটনায় মানসিংহকে হত্যা করবেন এবং তিনি বিধবা হয়ে যাবেন।
এরপর ঈশা খাঁ নিজেই এই সমস্যা সমাধান করেন। তিনি মানসিংহের সঙ্গে স¤্রাট আকবরের দরবারে যেতে রাজি হন। সেখানে গেলে ঈশা খাঁকে বন্দী করেন স¤্রাট। পরে মানসিংহের কাছে সব কথা শুনে তিনি ঈশা খাঁকে ২২ পরগণায় আধিপত্য ও মসনদ-ই আলী উপাধিতে ভূষিত করে স্বদেশে ফেরত পাঠান।
এই ২২ পরগণার একটি ভাওয়ালবাজু। এর অংশ তপ্পারন ভাওয়াল। এই এলাকায় যুদ্ধ হয়েছিল বলে এর নাম হয় রণ ভাওয়াল। গফরগাঁও এলাকার অধিকাংশ অংশ রণ ভাওয়াল পরগণার অন্তর্ভুক্ত ছিল।
রাজা মানসিংহ কয়েকটি যুদ্ধে জিতলেও বাংলায় মোগল আধিপত্য বিস্তারে ব্যর্থ হন। তিনি বাংলায় তার দুই ছেলেকে হারান এমনকি স¤্রাট আকবরের সময় বাংলার শুধু একাংশে মোগল কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। মোগল এলাকার পশ্চিমে রাজমহল, পূর্বে বগুড়া, শেরপুর, উত্তরে ঘোড়াঘাট, দক্ষিণে সাতগাঁও ও বর্ধমান পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ভাটিতে মোগলদের কোন কর্তৃত্ব ছিল না। পূর্বে ও দক্ষিণে অন্যান্য ভূঁইয়া ও জমিদাররা অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নিত। অর্থাৎ বেকায়দায় পড়লে মোগল বশ্যতা স্বীকার করত। প্রকৃতপক্ষে তারা স্বাধীনভাবে রাজ্য শাসন করত।
এদের মধ্যে যারা মোগলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন, তারাই বারো ভূঁইয়া নামে পরিচিত। বারো সংখ্যাটি বহু অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। প্রকৃত পক্ষে ভূঁঁইয়াদের সংখ্যা ১২ জনের বেশি ছিল। বারো ভূঁঁইয়াদের উৎপত্তি হয় বাংলার আফগান শাসনামলে। শের শাহের মৃত্যুর পর তার ছেলে ইসলাম শাহের রাজত্বকালে সোলায়মান খান বিদ্রোহ করেন। ইসলাম শাহের মৃত্যুর পর দিল্লীতে যেমন বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় তেমনি বাংলাতেও তার প্রভাব পড়ে। এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে বারো ভূঁইয়ার উদ্ভব হয়।
আকবরের সময় নেতাসহ বারো ভূঁঁইয়ার সংখ্যা ছিল ১৩ জন। তারা হলেন: ঈশা খাঁ, মসনদ-ই-আলী (নেতা), ইবরাহীম নারাল, করিমদাদ, মুসাজাই, মজলিশ দিলাওয়ার, মজলিশ প্রতাপ, টিলাগাজী, বাহাদুর গাজী, সুলতান গাজী, সেলিম গাজী, কাসিম গাজী। এলাকাবাসীর দাবি, এই দখলদারদের হাত থেকে ঐতিহাসিক জায়গাকে উদ্ধার করে সরকার গড়ে তুলতে পারে পর্যটন কেন্দ্র। ঈশা খাঁ-মানসিংহের যুদ্ধ ক্ষেত্রটি পর্যটন কর্পোরেশনের আওতায় আনাসহ ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনের শহীদ মিনারটি রক্ষা করার দাবি এলাকাবাসীর।