মূলত মেঘলা, তাপমাত্রা ২৭.৮ °C
 
২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬, ১১ আশ্বিন ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

শুভবোধ জাগানোর এখনই সময়

প্রকাশিত : ১৪ জানুয়ারী ২০১৬

খ্রীষ্টফার পিউরীফিকেশন

প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সে তো প্রকৃতির অমোঘ ক্রিয়া। দুর্লঙ্ঘ তার পরিণতি। প্রাকৃতিক দুর্যোগে বনের পশু, সমস্ত ভূচর, জলচর, আকাশের পাখি নিজেদের বাঁচানোর তাগিদে প্রাণপণ ছুটে পালায় নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে। কিন্তু মানুষ? তাদের তো জীবজন্তুর মতো গায়ে অমিত শক্তি নেই। নেই ছুটে চলার সামর্থ্য। পাখির মতো পাখাও নেই উড়ে যাবে অকুস্থল ছেড়ে অন্যত্র। তাই মানুষের আয়ত্তে যখন কৌশলগত কিছুই ছিল না, তারা অনুসরণ করতে চেয়েছে সেই পশুদের। হাপিত্তেশ করেছে পাখিদের দেখে। হায়, অন্তত পাখিদের মতো যদি পাখাও থাকত তাহলে কতই না ভাল হতো! জলোচ্ছ্বাসের তোড়ে যখন ঘাস-পাতায় ছাওয়া কুটির, আবাসস্থল সমস্ত সমূলে ভেসে যেতে শুরু করেছে, তখন কাছাকাছি অপেক্ষাকৃত উঁচু জায়গায় অথবা গাছের ডাল বেয়ে উপরে উঠে প্রাণ বাঁচাতে চেষ্টা করেছে মানুষ।

তারপর কালের পরিক্রমায় মানুষের চিন্তা চেতনার উন্মেষ ঘটেছে। তারা শারীরিক দিক দিয়ে পশু-পাখির চেয়ে দুর্বল হয়েও বুদ্ধিমত্তায় শ্রেষ্ঠত্বের স্বাক্ষর রাখতে শুরু করেছে। ঝড়, সাইক্লোন, বন্যা ইত্যকার নৈমিত্তিক প্রাকৃতিক উপসর্গগুলোকে প্রতিরোধ করতে না পারলেও এ সমস্ত আপদ-বালাই থেকে কিভাবে সম্ভাব্য কম সময়ে নিজেকে, নিজের আত্মীয়-পরিজনসহ অন্যদের দূরে রাখা যায় তার উপায় উদ্ভাবন করতে শুরু করেছে। এমনকি বৃষ্টি, ঝড়, বন্যার পূর্বাভাসও দিতে শুরু করেছে। এতে করে নানাবিধ প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষের প্রাণহানি ব্যাপকভাবে কমতেও শুরু করেছে। সভ্যতার ক্রমবিকাশের সঙ্গে মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে নিজেদের সমন্বিত করে চলতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বাঁচার উপায় উদ্ভাবনের পাশাপাশি মানুষ এ সমস্ত দুর্যোগের কারণ নিরূপণেরও চেষ্টা চালিয়ে বিজ্ঞানের আশীর্বাদে হয়েছে সফল।

বিজ্ঞানের এ চরম উৎকর্ষের যুগেও, কোন এলাকা কখন ভূমিকম্পে আক্রান্ত হবে নির্দিষ্টভাবে তা আগে জানা এক রকম দুরূহই রয়ে গেছে। তবে পারিপার্শ্বিক অবস্থা নিরীক্ষণ করে মানুষ ভূমিকম্পের আশঙ্কা ও এর ভয়াবহতা অনুমান করতে পারছে। তো, ভূমিকম্প রাতের বেলায়, কিংবা প্রকাশ্য দিবালোকে হোক তাতে মানুষের ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কাই থাকে বেশি। ভূমিকম্প মানেই হলো, দুমড়ে মুচড়ে আশপাশের সমস্ত কিছু মুহূর্তে মানুষের মাথার উপর ভেঙে পড়া। আর এত জঞ্জালের নিচে চাপা পড়ার অর্থই হলো, প্রাণ রক্ষার সমস্ত প্রচেষ্টা ও সম্ভাবনার অনেকটাই ভ-ুল হয়ে যাওয়া। ভূমিকম্পের মতো মহাপ্রলয়ে তখন কে কাকে বাঁচাতে ছুটে আসতে পারবে? কোথায় থাকবে অগ্নি নির্বাপণের ফায়ার ব্রিগেড? কোথায় হাসপাতাল? কোথায় পাওয়া যাবে এ্যাম্বুলেন্স? হুমড়ি খেয়ে ভেঙে পড়া স্তূপীকৃত অট্টালিকার ওপর অট্টালিকা, যানবাহন চলার সমস্ত পথই রুদ্ধ করে দেবে! হায়! হায়! উল্টে যাওয়া নগরীর কোথায় কোন নিভৃতে প্রাণ বাঁচার আকুতি নিয়ে অবুঝ শিশু গলা ছেড়ে চিৎকার করছে, কে শুনতে পাবে তা কত কিশোর-কিশোরী কত নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা ‘পানি পানি’ বলে হাহাকার করবে। ‘বাঁচাও বাঁচাও’ বলে গলা ফাটাবে? আরও বিপদের বিষয় হলো, ভূমিকম্প আক্রান্ত এলাকায় তাৎক্ষণিক কোন কিছুই সহজলভ্য হবে না তখন!

তবে মানুষ এখন বুঝতে পারছে, যত প্রাকৃতিক আপদ-বালাই রয়েছে, তার সংঘটনের জন্য মূলত মানুষই দায়ী। এখন নিশ্চিত বোঝা যাচ্ছে, প্রকৃতি প্রেম বলতে যা বুঝায়, তা অপরিণামদর্শী কতিপয় মানুষের হৃদয় থেকে উজাড় হয়েই যাচ্ছে। বিশ্ব প্রকৃতি মানুষকে অকৃত্রিম ভালবাসলেও মানুষের এই পরম বন্ধুর জন্য তাদের অন্তরের ভালবাসা দিনে দিনে ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে। প্রকৃতির প্রতি তাদের দায়বদ্ধতাও শূন্যের কোঠায় চলে যাচ্ছে। তারা নির্মমভাবে কোদাল, কুড়াল, ড্রেজার, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি চালায় প্রকৃতির গায়। তাতে প্রকৃতির শরীর নিরন্তর ক্ষতবিক্ষত হয়ে চলেছে। তার হৃদয় মনও সঙ্গে রক্তাক্ত হচ্ছে। মানুষের এই অমানবিক ব্যবহারে সে মহা ত্যক্ত বিরক্ত হচ্ছে। পরিণতিতে তাই দিনে দিনে মানুষের প্রতি তার রুদ্র ব্যবহার চরম মাত্রা পাচ্ছে।

এখন, এই পরিস্থিতিতে পৃথিবীর সমস্ত মানুষের উচিত তাদের প্রকৃত বন্ধু প্রকৃতির কোলে ফিরে যাওয়া। তার আশ্রয়ে নিজেদের সমর্পণ করা। জরুরী ভিত্তিতে প্রকৃতির উপর দমন পীড়নের সব ধরনের হাতিয়ার গুটিয়ে নেয়া উচিত। বিকাশমান মানব সভ্যতার নামে, নগরায়ণের ধুয়া তুলে প্রকৃতিকে আর হত্যা করা নয়। সুনামি, ভূমিকম্প, ভূমিধস, সাইক্লোন, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা, অতিবৃষ্টি, মাঠের সবুজ প্রান্তর বিবর্ণ হয়ে যাওয়া, ফসলহানি, ফসলি জমির উর্বরতা নাশ, মৎস্য, পশু-পাখি, বন্যপ্রাণীর প্রজাতি ধ্বংস হয়ে যাওয়া, মানবদেহে সংক্রমিত এইডস, ক্যান্সার, নতুন নতুন রোগব্যাধি, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, পর্বতের তুষার অতিমাত্রায় বিগলিত হয়ে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, স্বাদু পানির পরিমাণ কমে লবণাক্ত পানির স্তর বৃদ্ধি পাওয়া, সুপেয় পানিতে আর্সেনিক ও বাতাসে নিঃসরিত কার্বনের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়া, খাবারে ভেজাল ও রাসায়নিক দ্রব্য মিশ্রণ, কীটপতঙ্গ দমনের নামে ফসলে বিষ প্রয়োগ... এত কিছুর জন্য কি আমরা স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ, দায়ী নই? তবে ইচ্ছে করলেই আমরা মানুষ প্রকৃতিকে ভালবেসে, এ সমস্ত উপসর্গ দমন করতে পারি।

আর নয় সময় নষ্ট। আর নয়, এ পৃথিবীর আয়ু শেষ করে দেয়া। এ পৃথিবীকে, এ সবুজ নিসর্গকে, মানুষসহ প্রকৃতিবান্ধব সমস্ত জীব-জন্তুকে রক্ষা করার দায়িত্ব সকলেরই। আমরা স্রষ্টার সৃষ্টিকে বাঁচাতে চাই। আমরাও বাঁচতে চাই। এব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া ও তা শুরু করার আমাদের শেষ সময় এখনই।

আমেরিকা থেকে

প্রকাশিত : ১৪ জানুয়ারী ২০১৬

১৪/০১/২০১৬ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: