কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

নিজামুদ্দিনের বিপদ

প্রকাশিত : ৩ জুলাই ২০১৫
  • সাজিদ উল হক আবির

‘তারা বিধেয় হ্রীং হুং হ্রীং

বগলা বাজা ক্রিং ক্রিং

কুল্লুকার ঐং হলিং ঐং

অঙ্গুষ্ঠাং ভ্যাং ঘ্রং ঘ্রং

শাং শিং শিং ভ্যাদা ভ্যাদা

চুরের বাপ চুর ঘোড়ার ল্যাদা’

মন্ত্রটা দু’বার টেনে টেনে পড়ার পর তৃতীয়বারের বার নিজামুদ্দিন টের পায় যে, তার দুপাটি দাঁত ঠক ঠক করছে, কপাল থেকে দরদরিয়ে ঘাম পড়ছে এবং আরও বারকয়েক মন্ত্রটা পড়ার চেষ্টা করলে তার আলজিব খসে পড়বে খুব সম্ভব।

তবুও সে দীর্ঘদিনের সংস্কারবশত ভক্তিভরে কপালে দু’হাত ঠ্যাকায়- ‘তা বাবাঠাহুর এ মন্ত্রেই কাম হবে কচ্চেন?’

গাঁয়ের বিশিষ্ট তান্ত্রিক ভোলা ঠাকুর চোখ বুজেই বলেন, ‘হবে হবে’, পরে হুঙ্কার দিয়ে চক্ষু ম্যালেন- ‘হবেই হবে! ভোলা বাবার আশীর্বাদ নয়তো কি ভেইসে যাবে কচ্চিস?’

বামহাতের কানি আঙ্গুল দিয়ে কান খোঁচাতে খোঁচাতে ডান হাতটা মেলে ধরেন ভোলাবাবা নিজামুদ্দিনের সামনেÑ‘ঝাইরে কাশতো অহন বাপু। ম্যালা দিকদারি করিসনে।’

নিজামুদ্দিন চেহারায় শান্তশিষ্ট অবুঝ অবুঝ ভাব এনে বলে, ‘তা কত চাচ্চেন বাবাঠাহুর?’

সব সম্প্রদায়ের মানুষের নিকট জাগ্রত পীর, পান্তোয়া গ্রামের একমাত্র তান্ত্রিক ভোলাঠাকুর তার রক্তচক্ষু এবার নিজামুদ্দিনের দিকে স্থির করেন, ‘ফাজলামো পেয়েচিস তরা? বলি, তরা কি সব ফাজলামো পেইচিস?’

ভোলা ঠাকুর অ্যাঁ অ্যাঁ করে আরও কী সব বলে, নিজামুদ্দিন তার বিন্দুবিসর্গও বোঝে না। বাবাজীর দৃষ্টিতেই শেষে না ভস্ম হয়ে যায়, সেই ভয়ে সে লুঙ্গির খুঁট থেকে অতি নরম দোমড়ানো-মোচড়ানো একটা পঞ্চাশ টাকার নোট বের করে এগিয়ে দেয়।

‘শালে! ই কী দিলি বে? এ ট্যাহা মুই চালাতে পারব? মন্তরের জোর কমে যাবে কই দিচ্চি কোলম!’

‘পারবেন বাবাঠাহুর, বিলক্ষণ পারবেন’- পায়ের ধুলো নিয়েই কোনক্রমে নিজামুদ্দিন একলাফে আখড়ার বাইরে এসে প্রায় ছিটকে পড়ে। তারপর, অতি ধীরে, তার অর্ধশতকের অভ্যস্ত পা গ্রামের প্রান্ত থেকে টেনে নিয়ে চলে তাকে গ্রামের ভিতরে।

‘শালের দরবেশ সাজলেই পারতেম বাপুহ। একদিনেই কত ট্যাহা কামায় গো!’Ñআপন মনে গজরাতে থাকে সে, ‘মন্তর মুখাস্ত? সে দেখা যাবিনি। ভর সকালে উঠি পুসকুনিতে দশ ডুব, সেও দেয়া যাবে। কিন্তু একমুঠ করে মাটিও যে খাতে কলো সাথে, সে ক্যামনে খাবো? তয় যদি মন্তর কাজ না করে?’

কথা কইতে কইতে নিজের সাথে পরিচিত পথে এগুতে থাকে পান্তোয়া গ্রামের সুপরিচিত চোর নিজামুদ্দিন, ওরফে নিজাম চোরা।

নিজামুদ্দিনের বহুমুখী বিপদ। নিজাম হতাশ হয়ে ভাবে তার শৈশবের কথা, যে সময় বিপদগুলো ছিল সব সরল রৈখিক। ঘুরেফিরে সব সমস্যার শেষ মাথা গিয়ে মিলত ক্ষুণিœবৃত্তি নিবারণের সাথে। পেট ঠা-া তো দুনিয়া ঠা-াÑ এই ছিল তখনকার মূলমন্ত্র। আর এখন, এই পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই বয়সে এসে তার জীবন যেন সমস্যার সমবায় সমিতি খুলে বসেছে। একেকটা করে হাজির হয়, গ্যাঁট হয়ে বসে তারপর ডেকে ডেকে বাকিগুলোকে হাজির করে।

লেখকেরা যেভাবে গল্প উপন্যাসের প্লট সাজান, ঠিক সে মতোই পান্তোয়া গ্রামেও বেশ কিছু বাধা কুশীলব আছে। একজন রাশভারী চেয়ারম্যান, তার কুটিল সাঙ্গোপাঙ্গ, গ্রামের বিবেকরূপী স্কুলের হেডমাস্টার, গোবেচারা- ভালো মানুষ গোছের একজন মসজিদের ইমাম, গুজবে কান দেয়া এবং ক্যাওয়াজে ব্যাপক আগ্রহী একদল গ্রামবাসী, কয়েকজোড়া লাইলি-মজনু, গ্রামের বদ্ধপাগল ঘণ্টুÑ চোখ লাল করে দিনের বেশিরভাগ সময় বসে থাকবে বড়বাড়ির পুকুরপাড়ে আর হঠাৎ বায়ু চাড়া দিয়ে উঠলে হেইহেই করে মানুষদের লাঠি নিয়ে তাড়া করবে।

কুশীলবদের লিস্টিতে দাঁড়ি পড়ে গ্রামের বাঁধা চোর নিজামুদ্দিনকে দিয়ে, যার বড় কোন দাও মারার খায়েশ বা সাহস কোনটাই নেই, কিন্তু হাতটানের বদঅভ্যাসের কারণে প্রায়শই গ্রামবাসীর পিটিয়ে হাত মশকো করার আহ্লাদের শিকার হয় সে।

নিজামুদ্দিনের চল্লিশ বছর পর্যন্ত চলছিল সবকিছু বেশ ভালোভাবেই। ঘরে বউ ছিল, মেয়ে ছিল একটা মাত্র। খাটাখাটনির প্রয়োজন পড়ত কিছুটা বেশি বটে, কিন্তু মনে সুখ ছিল নিজামুদ্দিনের তখন। কিন্তু হঠাৎ মেয়েটার মা মারা গেল, মেয়েটা ও পাশের গাঁয়ের উঠতি রংবাজ আবুলের সাথে ভাব-ভালোবাসা বাঁধিয়ে বিয়ে করে বসল। নিজাম দ্বিমত করার মতো কোন আদর্শিক ভিত্তি পেল না। নিজে আজীবন চুরি করেছে, মেয়ের জামাই পাশের গ্রামের হারুন চেয়ারম্যানের ডানহাত হিসেবে বিখ্যাত বা কুখ্যাতÑ পরিচয় হিসেবে মেয়েজামাইয়ের জন্য খুব একটা খারাপ না। এভাবে, চল্লিশ পেরিয়ে একচল্লিশে পা রাখতেই নিজাম দেখে তার ঘর বিরান, খালি একদম।

নিজামুদ্দিনের বিপদ শুরু হয় এরপর থেকেই। তার মাথায় প্রথম যে চিন্তাটা এলো তা হচ্ছেÑ নিজামুদ্দিন আউলিয়ার মতো এত বড় বুজুর্গের নামে তার নাম, সে চুরি করে কেন? চোরের নাম কি কোন পীর দরবেশ আউলিয়ার নামে হয়? তার বাপের কি একটুও আক্কেল পছন্দ ছিল না? এত বড় আউলিয়া, ইয়া আল্লাহ মাবুদ!

নিজামুদ্দিনেরা বংশানুক্রমিকভাবে সিঁধেল চোর। নিজামুদ্দিনের বড় দাদা অবশ্য প্রতাপশালী চোর ছিলেন। ব্রিটিশ আমলে তাকে ধরতে সাহেব পুলিশ পর্যন্ত এসে হাজির হয়েছিল তাদের ভিটের দোরগোড়ায়, এ বড় গর্বের ইতিহাস নিজামুদ্দিনের পরিবারের জন্য।

তবে খালি পারিবারিক ঐতিহ্যের গল্প ভেজে পেট চলে না। দিনের শেষে নিজামুদ্দিন এক ছিঁচকে চোরই বটে, যে মাঝে মধ্যে এপাড়ায় ওপাড়ায় ঘুরে পেটের ক্ষুধা নিবারণের আশায় ছোটখাটো দাও মারে।

এই পরিবারের সবাই ছেড়ে চলে যাবার পর তার মনে বাসা বেঁধেছে এ এক অদ্ভুত বৈরাগ্যচেতন। মাথায় কেবল একটা প্রশ্ন ঘোরেÑ নাম তার নিজামুদ্দিন আউলিয়ার নামে অথচ সে জীবন চালায় সে পাপ কাজ করে।

সে দুঃখ থেকেই হয়তো সে মাঝে মাঝেই বাজারে টং দোকানের পাশে বসে দরাজ গলায় গজল ধরেÑ

‘হায় বড়পীর আব্দুল কাদের, জিলানের জিলানি

তোমারও নামের গুণে আগুন গোলে হয় পানি’!

সেদিন তো এক চ্যাংড়া ছোঁড়ার সাথে নিজামুদ্দিনের প্রায় হাতাহাতি লেগে গিয়েছিল! ছেলে বলে কি না নিজামুদ্দিন আউলিয়া আর বড়পীর জিলানি এক লোক নয়, ভিন্ন ভিন্ন দু’জন ব্যক্তি! শুনে নিজাম ক্ষেপে আগুনÑ দুই দিনের ছোঁড়া বলে কী? কাল এসে পরে বলবেÑ ইরান আর খোরাসান এক না, কাবুল আর ইস্তাম্বুল দুটো আলাদা দেশ, মালয়েশিয়া আর ইন্দোনেশিয়া শহর পৃথিবীর দুই কোনায় অবস্থিত!

তবে ছোঁড়াটা ভালো টেঁশিয়ে দিয়েছিল নিজামুদ্দিনকে। তারপর থেকে আর কারো সাথে তর্কে যায় না সে, কেউ আগ বাড়িয়ে কিছু বলতে এলে সে চক্ষু মুদে গলায় আরও অতিরিক্ত দু’চামচ দরদ ঢেলে নবোদ্যমে গাওয়া শুরু করেÑ

‘হায় বড়পীর আব্দুল কাদের... ’

তার এই আধ্যাত্মিক চিন্তার ফল হয়েছে এই যে নিজামুদ্দিন তার চুরির সহজাত ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। একজন চোরের অমূল্য সম্পত্তি হচ্ছে চুরি করার অদম্য স্পৃহা। কারো শরীরে অথবা গায়ে ছোটবড় যে কোনো জিনিস দেখে তার মনে হবেÑ এ জিনিস তার ঘরে বা তার শরীরে থাকলে কতই না ভালো হতো! স্বর্ণালঙ্কার, টাকা-পয়সা, খাদ্যদ্রব্য থেকে নিয়ে নিত্য প্রয়োজনীয় সব দ্রব্যের প্রতি থাকতে হবে এ অদম্য আকর্ষণ। রাত বাড়ার সাথে সাথে মন গাঁইগুই করা করা শুরু করবে। মন চাইবে ঘরের কোণ থেকে সরিষার তেলের বোতলটা নিয়ে বসে তেল দিয়ে দলাই মলাই করে বেশ খোলতাই একখানা চেহারা বানাতে। এই ইচ্ছেগুলো তো প্রায় গেছেই, নিজামুদ্দিনের চৌর্যবৃত্তিতেও ধরা পড়ছে ইদানীং মারাত্মক ঘাপলা। চুরি করতে গিয়ে ইদানীং প্রতি চার বাড়ির তিনটিতে সে ধরা খেতে খেতে বাঁচে।

হাঁটতে হাঁটতে বড়বাড়ির পুকুর পাড়ে এসে নিজামের বুক ছ্যাঁত করে ওঠে, বুকের ভেতর ধুকপুকিয়ে ওঠে এবং তার স্মরণ হয়ে যায় ব্যাঙ্গের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা আরেকখানা বিপদের কথা। কোন এক বাড়িতে সফলভাবে চুরি করার পর ইদানীং তার প্রবলভাবে ইচ্ছা জাগে সেই বাড়ির লোকজনের কিছু একটা উপকার করবার।

মাসখানেক আগে সে সলিমুদ্দির বাড়িতে সিঁদ কেটে আধামণ চাল, উঠোনের মাচা থেকে দু’খানা কচি লাউ আর দাওয়ায় ঝোলানো একটা প্রিন্টেড লুঙ্গি নিয়ে সফলভাবে সটকে পড়ে। এরপর থেকেই তার ভেতরটা কেমন যেন কামড়াতে থাকে সলিমুদ্দির পরিবারের জন্যে। মনে তীব্র একটা ইচ্ছা জেগে ওঠে ওদের কিছু একটা উপকার করবার।

প্রায়শ্চিত্ত, যদি বলতে চান, তা করার একটা সুযোগ অবশ্য নিজামুদ্দিন পেয়ে যায় দিনকয়ের মধ্যেই। সলিমুদ্দির ছোট ছেলে, ৩-৪ বছর বয়সী গিয়াসুদ্দিনকে সে দেখে বড়বাড়ির পুকুরপাড়ে, তাদের নারিকেল গাছের নিচে দাঁড়িয়ে কচি ডাবগুলোর দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতে। নিজামুদ্দিন তার গলার সবটুকু স্নেহ ঢেলে জিজ্ঞেস করে, ‘কিরে বাপ, ডাব খাবি?’

ছোট্ট গিয়াসুদ্দিনের ফ্যালফেলে লোভাতুর দৃষ্টিই প্রমাণ করে যে সে পারলে এখনি গোটা তিন ডাব পেড়ে খায়, শেষমেশ ডাবের শাঁস চাকুম চুকুম করে খাবার শব্দ যেন নিজামুদ্দিন ছেলেটার চোখের দিকে তাকিয়েই শুনতে পায়। কিন্তু বেচারার তো গাছে চড়ার অভ্যেস নেই। তাই আপাতত ডাবের দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া সে কিছু করতে পারছে না।

এরপরের কাহিনী সংক্ষেপ অনেকটা এ রকম যে, নিজাম তরতরিয়ে বানরের মতো গাছে উঠতেই সলিমুদ্দি তার বাড়ির দাওয়া থেকে নিজামকে গাছে চড়তে দেখে যা বোঝার সব নিজের মতো করেই বুঝে ফেলে টাঙ্গি নিয়ে দুর্ধর্ষ গতিতে ছুটে আসে চিৎকার করতে করতে। গিয়াসুদ্দিন, যে এতক্ষণ বেশ সুবোধ অবুঝ বানরছানার মতো আশেপাশে ঘুরঘুর করে হুপ হুপ বা এ জাতীয় কিছু একটা শব্দ করছিল, সে বাপের রুদ্রমূর্তি দেখে ভূতগ্রস্তের মতো দৌড়ে পালাতে চেষ্টা করে। তার জাঙ্গিয়ার রবার ঢিলে হয়ে যাওয়ায় তা খুলে দু’পায়ের মাঝে আড়াআড়ি লটকে যায় এবং সে দড়াম করে একখানা আছাড় খায়। কিন্তু কি এক অজানা ভয়ে উঠে পড়ে জাঙ্গিয়া টেনে এক হাতে ধরে রেখে দৌড়ুতে গিয়ে এবার শুকনো মাটিতেই আবার আছাড় খায় দড়াম করে। সে বুঝতে পারে বাপের হাতে আসন্ন ধোলাই থেকে রক্ষা পাওয়ার পথে তার প্রধান শত্রু তার জাঙ্গিয়াখানা। আব্রুও কখনো কখনো শত্রু হতে পারে ছোট্ট গিয়াসুদ্দিন মাত্র ৪ বছর বয়সেই এই দিব্যদর্শন লাভ করে এবং জাঙ্গিয়া খুলে (হারিয়ে যাতে না যায় সে ভয়ে) মাথায় টুপির মতো করে পরে দিগি¦দিকশূন্য হয়ে পুনরায় দৌড় লাগায়। আর আমাদের নিজামুদ্দিন ডানে বামে তাকিয়ে তার বিখ্যাত গজল গাইতে গাইতেই নারিকেল গাছ থেকেই সরাসরি পুকুরে লাফ দেয়।

সলিমুদ্দি পুকুর পাড়ে এসে পৌঁছুলে শুনতে পায় পুকুরের ওপার হতে ভেসে আসা গজলের আওয়াজÑ

‘হায় বড়পীর আব্দুল কাদের, জিলানের জিলানি... ’, ইত্যাদি ইত্যাদি।

যাই হোক, এ সব আধ্যাত্মিক এবং আধিভৌতিক সমস্যারও একটা হাল করা যেত, যদি না পান্তোয়া গ্রামে আজাদ চোরের আবির্ভাব ঘটত।

আজাদের অতীতের ব্যাপারটা অস্পষ্ট, কিন্তু তার চেহারাতেই এমন কিছু আছে, যাতে করে তাকে কেউ সচরাচর খুব একটা ঘাটায় না।

আজাদ চোরা এসেছে এই পান্তোয়া গ্রামে আজ বছরতিনেক। এর মতো দক্ষ সিঁধেল চোর এ তল্লাটে আগে কেউ কখনো দেখেনি। এমন সূক্ষ্মভাবে সে তার কাজগুলো করে যে গ্রামবাসীরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করে, আজাদ চলাফেরা করলে ছায়াও অর নাগাল পায় না।

আজাদের আগমনের পূর্বের দিনগুলো একরকম কেটে যাচ্ছিল নিজামুদ্দিনের। মোটের ওপর বেশ শান্তিতেই চলে যাচ্ছিল তার একার সংসার। কিন্তু আজাদ এসে যেই না চিলের মতো ছোঁ মারা শুরু করল আশপাশের গাঁয়ের মানুষের জিনিসপত্রে, মানুষ হয়ে গেল আগের থেকে অনেক বেশি সাবধান। এলাকায় এলাকায় পাহারা বসানো হলো যুবকদের উদ্যোগে, ঘরগুলোয় হয়ে উঠল ক্রমশ একেকখানা দুর্গের মতো। নিজামকে এখন পেটের দায় মেটাতে বেশ বেগ পেতে হয়।

যাই হোক, এতে করে তার নামের কুদরতি ব্যবস্থাপনার ওপর বিশ্বাস আরও জোরদার হলো। যেন তার ভবিতব্যই ছিল শেষ বয়সে এসে সে চুরিচামারি ছেড়ে দেবে একদম।

দিনকয় নিজামুদ্দিন বেশ খাটাখাটনি করল, খুব চেষ্টাচরিত্র করল ভদ্রস্থ কোন একটা কাজে ভিড়ে যাবারÑ মোট বওয়া, দিনমজুরি, ক্ষেতির কাজ ইত্যাদিতে। কিন্তু সে অবাক হয়ে লক্ষ করল, তাকে কেউ বিশ্বাস করে না। কেউই পারতপক্ষে তাকে কাজে নিতে চায় না। আর কোন কাজ যদি ভাগ্যের জোরে জুটেও যায়, তবে সে কাজের শেষে নিজামুদ্দিন হিসাব একদম কড়ায় গণ্ডায় বুঝিয়ে দিলেও মালিক তাকে সন্দেহ করে। সাথে জোটে গালিগালাজ আর গঞ্জনা।

ব্যর্থ মনোরথে পুনরায় চুরিতে ফিরতে গিয়ে নিজামুদ্দিন দেখে নতুন আরও একখানা বিপদ! এলাকার ও আশপাশের ছিঁচকে যে সব চোর-বাটপাড় একবেলা ভাত তো আরেকবেলা কিলÑ এই করে করে হাত মশকো করছিল, তারা আজাদ চোরাকে গুরু বানিয়ে একদম মাথায় চড়িয়ে বসেছে। আজাদের পায়ের ধুলা মাথায় নিয়ে তারা দিন শুরু করে। যে নিজামুদ্দিনকে এতদিন তারা যথেষ্ট ভক্তিশ্রদ্ধা, মান্যিগন্যি করত, সে নিজামুদ্দিনের সাথে আজকাল পথে দেখা হলেই তারা সমানে ব্যঙ্গবিদ্রƒপ ও কটূক্তিতে বিঁধিয়ে মারে পারলে। বলে, নিজামুদ্দিন চুরি ছেড়ে পুনরায় চুরিতে এসেছে, সে চোর জাতির কলঙ্ক।

গঞ্জনা, লজ্জা, তীব্র শোকÑ সব মিলিয়ে জীবনের প্রতি একদম বীতিশ্রদ্ধ হয়ে নিজামুদ্দিন আজ গিয়েছিল গাঁয়ের জাগ্রত পীর ও তান্ত্রিক ভোলাঠাকুরের কাছে মন্ত্রদীক্ষা নিতে, যাতে করে চুরিবিদ্যায় সে তার যৌবনকালের হারানো জৌলুস ফিরে পায়।

মন্ত্রতন্ত্র পর্যন্ত সব ঠিকই ছিল, (যদিও আজ ঈদের আগের চাঁদরাতেই হাত থেকে গোটা পঞ্চাশ টাকা ছুটে গেল, যার ফলে আগামীকাল ঈদের দিন হয়তো পলান্নের বিলাসিতাটুকু আর করা হয়ে উঠবে না) সকাল সকাল পুকুরে গিয়ে দশ ডুব দেয়া, এও হয়তো সে কোনভাবে করে ফেলতে পারত, কিন্তু সমস্যা বাধল একমুঠ করে মাটি খাওয়া নিয়ে। সে আবার কীভাবে খায় রে বাবা!

‘যাউক, চলুক সব যেভাবে চইলবার’Ñ নিজেকেই নিজে প্রবোধ দেয় বটে, তবে দৈনিক একমুঠো মাটি খাবার ব্যাপারটা সে চাইলেও মাথা থেকে বের করতে পারে না। বাড়ির কাছাকাছি এসেছি আসছি করতে করতে সে আবার দরাজ গলায় তার গজল ধরে-

‘ওয় হোয়,

আয় বড়পীর আব্দুল কাদের... ’।

কিন্তু, তার দু’বাড়ি পর, আজাদ চোরার বাড়ির দিক থেকে ভেসে আসা কোলাহল তাকে টেনে নিয়ে যায় সেদিকে। স্বাভাবিক কৌতূহলে এগিয়ে গিয়ে সে যা দেখে তাতে তার হাত-পা পেটের ভেতর ঢুকে যাওয়ার উপক্রম হয়। আজাদকে বেদম ঠ্যাঙ্গানি দিচ্ছে একদল পুলিশ। দুই বাঁশের ফাঁকে তার পা গলিয়ে দুজন কনস্টেবল পালাক্রমে লাফাচ্ছে একত্রে, আরেকজন গজারির লাঠি দিয়ে সমানে বাড়ি মেরে চলেছে তার পায়ের পাতার নিচে।

নিজামুদ্দিন কান আরেকটু খাড়া করে বুঝতে পারল, পুলিশ আজাদকে এখান থেকে দু’গ্রামের পর বালি চেয়ারম্যানের বাড়িতে সিঁধ কাটার দায়ে সন্দেহ করছে। চেয়ারম্যানের বাড়ির প্রায় দশ ভরি স্বর্ণালঙ্কার আর নগদ আড়াইলাখ টাকা খোয়া গেছে গতরাতে। চুরির অঙ্ক আর বালি চেয়ারম্যানের নাম শুনে নিজামুদ্দিনের আরেকবার ভয়ের ঠ্যালায় হাত-পা পেটের ভেতরে সেঁধবার উপক্রম হয়।

নিজামুদ্দিন আল্লা-রসুলের নাম নিয়ে কাঁপতে কাঁপতে নিজের বাড়িতে ফিরবে এমন সময় হঠাৎ আজাদের বউ, যে তার স্বামীর ওপর পুলিশের প্রথম আঘাতের তোড়েই সংজ্ঞা হারিয়েছিল, সে চেতনা ফিরে পেয়ে বাড়ির ভেতর হতে ছুটে এসে দারোগা সাহেবের পায়ে ঝাঁপিয়ে পড়েÑ

‘ছার আল্লাতালার দুহাই লাগে ছার! আইজ চানরাইত ছার! আজ মোর মরদটাকে এভাবে মারিয়েন না ছার! আল্লারওস্তে ছাড়ি দেন ছার আল্লাহ আপনার ভালো কইরবে! মুই পুয়াতি ছার, ভ্যাইন পরে হকালে ঈদ হুজুর! এই সুমায় অরে লই জাইয়েন না ছার! মুই কই জামু ছার!ও ছার...!’

গোটা দৃশ্যটার মজা দেখতে উপস্থিত গ্রামের সবার মধ্যে সবচেয়ে বেশি জোরে ধাক্কা দেয় নিজামুদ্দিনকে। সে এর আগে আজাদের বউকে দেখেনি কখনো। মেয়েটার মুখের আদল অনেকটাই তার মেয়ের মতো। তার মেয়ের সাথে যোগাযোগ নেই অনেকদিন। এর মধ্যে তার মেয়েও পোয়াতি হয়েছে হয়তোবা, হয়তো তার একটা ফুটফুটে শিশু হবে শীঘ্রই, হয়তো বা হয়ে গেছে কে জানে?

এই ভাবতে ভাবতেই নিজামুদ্দিন টের পায় সে শীঘ্রই মহাবিপদে পড়তে চলেছে! আজাদের বউয়ের মুখ তার মেয়ের মুখের মতো ভাবতে ভাবতে তার অন্তর বিগলিত হতে শুরু করে, পরক্ষণেই সে তীব্রভাবে বিপরীতমুখী চিন্তা শুরু করে কিন্তু এই আজাদের জন্যে তার আজ পেটের ভাতে টান পড়েছে!

হঠাৎ আবার কোত্থেকে খেয়াল এসে জুড়ে বসেÑ তার তো তিন কুলে কেউ নেই, কাল ঈদের দিন তার জেলে কাটানো যা, বাড়িতে কাটানও তাই, পরক্ষণেই সে জোরপূর্বক সে চিন্তা দমানোর চেষ্টা করে, ভাবেÑ আজাদের জন্যেই তার এত লজ্জা অপমান গঞ্জনা। নিজাম চোর বিপাকে পড়ে যায়।

যেন মন্ত্রটা? কিন্তু, সে তো মাটি খায়নি, তবুও...

নিজামুদ্দিন টের পায় সে বিরবির করে পড়ে চলছে-

‘তারা বিধেয় হ্রীং হুং হ্রীং...’।

‘স্যার, মাফ চাই’ নিজামুদ্দিন ঝাঁপিয়ে পড়ে দারোগার পায়ে, ‘আজাদরে ছাড়ি দেন, চুরি মুই করিছি’।

দারোগা আজাদের রক্তাক্ত মুখে দশাশই একখানা ঘুষি হাঁকিয়ে রুমাল দিয়ে মুছে হাত পরিষ্কার করছিল তখন। নিজামুদ্দিনের কথায় তার ঠোঁটের এক কোণায় খেলে যায় এক চিলতে ক্রুর হাসিÑ ‘ও নিজাম, ইটা তুমার চুরি? তুমি সিঁধ কাটছ চিয়ারম্যানের বাড়ি? তইলে তো মুইও পুলিশের চাকরি ছাড়ি মন্ত্রী মিনিসটার হই যাইতাম কবে। মশা মারি আর হাত গান্দা করা লাকতো না’।

‘ছার, বিশ্বাস না হয় মোর বাড়ি ছার্ছ করি দেখেন, চুরির সব মালামাল মোর বাড়ি’ Ñনিজামুদ্দিন বেশ জোর দিয়ে বলে।

কনস্টেবলেরা নিজামের বাড়ি সার্চ করে এসে হতভম্বের মতো বলে, চুরির সব মাল অক্ষরে অক্ষরে পাওয়া গেছে নিজামের বাড়িতে। দারোগা সাহেব অবাক হন, কিন্তু তার চেয়েও বেশি দুঃখিত হন একখানা জবর ধোলাইয়ের সম্ভাবনা হাতছাড়া হওয়ায়। মুখ গোমড়া করে বলেন- ‘ ধ্যাস শালার, এই বুড়ারে অহন মারি কি কইরতাম। ইডারে তো মারিও সুখ নাই, কবে ক্যাঁক করি মরি যায়...’

তারপরেও কনস্টেবলদের গোটা কয়েক লাঠির কোঁতকা খেতে খেতে নিজামুদ্দিন লক্ষ করে তার মেয়ে, থুক্কু থুক্কু, আজাদের বউয়ের মুখে আকাশ ভাঙ্গা হাসি, দু’চোখ ভরা কৃতজ্ঞতা, তার মন চায়, মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে। বলতে- মারে, তোর এই বাপ আছে না! তুই কান্দস ক্যান রে মা?

জিপে চড়ে বসে নিজামুদ্দিন আড়চোখে একবার আজাদের দিকে তাকায়। আজাদের চোখ থেকে ঠিকরে পড়ছে বিস্ময়, আর নিজামুদ্দিনের জন্যে শ্রদ্ধা, আরও বাদবাকি অনুভূতিগুলো নিজাম পড়ে উঠতে পারে না।

‘হু হু বাবা, আর পাইরতা না আমার লগে’ নিজামুদ্দিন মৃদুকণ্ঠে বলে, ‘ভোলাবাবার মন্তর মাটি খাওয়া ছাড়াই কাজে দেয় আজাদ, তোর উস্তাদির দিন শ্যাষ!’

জিপ পান্তোয়ার ধূলি উড়িয়ে যখন শহরের দিকে রওনা হয়, পান্তোয়ার শেষ প্রান্তে, বাঁশবাগানের ফাঁক ফোকর দিয়ে তখন ঈদের বাঁকা চাঁদ উঠে গেছে। আর আমাদের নিজামুদ্দিনের মনে তখন অদ্ভুত এক প্রশান্তি!

প্রকাশিত : ৩ জুলাই ২০১৫

০৩/০৭/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: