মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

কবিতায় জল ও জীবন

প্রকাশিত : ৩ জুলাই ২০১৫
  • মুহাম্মদ ফরিদ হাসান

বাংলা কবিতার উপকরণে যেসব বিষয় ঘুরে ফিরে বার বার আসে, প্রতিবারেই আন্দোলিত করে কবিমানসকে তার মধ্যে বর্ষা ও বৃষ্টি অন্যতম। বাংলাদেশ যে সবুজ-শ্যামল, সুজলা-সুফলা তার কারিগর আষাঢ়-শ্রাবণের মেঘ ঘন ঘন দিনগুলোই। বর্ষার আগমনে বরাবরই বাংলা খুঁজে পেয়েছে তার প্রাণ। ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা পেয়ে এসেছে শত শত বছর ধরে। সোঁদা মাটির গন্ধ, বৃষ্টি কিশোরী চুড়ির শব্দ, কদম-কেয়ার রূপ লাবণ্য যেমন হাজার বছর পূর্বে বাঙালীদের মুগ্ধ করেছে, বিমোহিত করেছে, অপার্থিব সুখ দিয়েছে কবি হৃদয়কে, তেমনি বর্তমানেও একই ছন্দে, অপার লীলায় মনকে নাড়া দিয়ে যায় বর্ষা। বর্ষা যে ভবিষ্যতের মেঘময় দিনগুলোকেও নতুন করে রাঙাবে তাতে সন্দেহ নেই।

কবিতার আঙ্গিকে বর্ষা ও বৃষ্টি বন্দনার কথা আলোচনা করতে গেলে প্রথম যে কবির নামটি মনে পড়ে তিনি হচ্ছে মহাকবি কালিদাস। তাঁর রচিত ‘মেঘদূত’-এ তিনি বর্ষার রূপ লাবণ্য, বিরহ-প্রেম যেভাবে তুলে ধরেছেন বাংলা সাহিত্যের পরবর্তী কোনো কবি তা সেভাবে তুলে ধরতে পারেননি। সমগ্র ‘মেঘদূত’ জুড়েই বর্ষা ও বৃষ্টির এক নান্দনিক বন্দনা। মেঘদূতের নির্বাসিত যক্ষ তার প্রেমিকাকে মেঘের মাধ্যমে জানাতে চেয়েছিলেন তার বিরহ-ব্যথা। কবি কালিদাস মনে করেছেন বর্ষায় বিরহ আরো প্রকট হয় যদি প্রিয়জন দূরে থাকে। তাইতো কবির বিরহ উক্তি- ‘মেঘালোকে ভবতি সুখি-নোহপ্যন্যথাবৃত্তি চেতঃ/কণ্ঠাশ্লেষে প্রণয়িণিজনে কিং পুনরদূরসংস্থে।’

কালিদাসের পরে যার কবিতায় বর্ষা পূর্ণ যৌবনে ধরা দিয়েছে, বর্ষার নানা প্রসঙ্গ এসেছে বার বার তিনি নিঃসন্দেহে রবীন্দ্রনাথ। তাঁর বর্ষার কবিতাগুলোর মধ্যে ‘আষাঢ়’, ‘নববর্ষ’, ‘আষাঢ় সন্ধ্যা’, ‘বর্ষার রূপ’ ও ‘বর্ষার দিনে’ উল্লেখযোগ্য। বর্ষণমুখর দিনের জন্যে যেনো সবসময়ই জিইয়ে থাকে কথার ঝুড়ি। বৃষ্টির রিমিঝিমি ছন্দে যেন প্রিয়ার কাছে বলা যায় গ্রীষ্মের সব জমানো কথা। বর্ষায় উন্মুখ যেন থাকে মানব হৃদয়। তাই কবি বলেন,

‘এমন দিনে তারে বলা যায়

এমন ঘনঘোর বরষায়-

এমন মেঘস্বরে বাদল-ঝরঝরে

তপনহীন ঘন তমসায়।’

-বর্ষার দিনে; রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

বর্ষা নতুন করে জন্ম দেয় প্রকৃতিকে। যে প্রকৃতি দীর্ঘদিন ছিলো রূপ-রসবিহীন, বৃষ্টির প্রথম ধারায় সঙ্গীতের মতো সেই পৃথিবীতে নেমে আসে অমিত স্বর্গের সুধা। মাটি ফুঁড়ে গজিয়ে ওঠে ঘাস, কেয়া-কদম সাজে বাতাসী গন্ধে। এমন প্রকৃতি দর্শনে বিস্ময়ে অভিভূত হয় মানুষ। মাথা নত হয়ে আসে। তাই আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে কবির উপলব্ধি-

‘বছর বছর দেখি এই : আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে

মেঘ করে কালো হয়, মেঘ ফেটে বৃষ্টি নামে অমোঘ সঙ্গীতে;

-ধরিত্রী পূর্ণ হয় আস্বাদে, আঘ্রাণে, রূপে, রসে।

আবার নোয়াই মাথা প্রকৃতির আশ্চর্য গণিতে :

মিথ্যার পাথর ফুঁড়ে জেগে ওঠে লক্ষ-লক্ষ ঘাস

স্তব্ধ, বোবা জুঁই গাছের ফুলে ফুলে প্রথম প্রকাশ’

-আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে; আবদুল মান্নান সৈয়দ।

জনজীবনে বর্ষার প্রভাব, ঘোর আকর্ষণ যে কতটুকু তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বাদল দিনের স্থান কাল পাত্র নেই। বৃষ্টি ছোঁয়া যেমন পেতে পারে তৃষিত জমি, হলদে বৃক্ষরাজি; তেমনি ছোঁয়া পেতে পারে গরিব কৃষক, সচকিত ব্যবসায়ী। বৃষ্টি যেন তার শীতল জলে সিক্ত করে যায় দেহ-মন সবকিছু। ‘বৃষ্টি’ কবিতায় এমনি চিত্রাবলী এঁকে তুলেছেন আবিদ আজাদ-

‘রিমঝিম রিমঝিম বৃষ্টির গুঞ্জন ওঠে এয়ারকুলারে,

ওড়ে লেজতোলা ঘুরন্ত পাখির মতো ফাইলের কাগজ,

শার্সি ভেদ করে এসে অজস্র তারার মতো বৃষ্টির ঝাপটা

লাগে ঘন কালো

মেঘ জমে থাকা সেক্রেটিরিয়েট টেবিলে,

কর্পোরেশনের কেরানির গরিব জামায়

বৃষ্টি নামলো নুলো-ল্যাংড়ার পুঁজিহীন উচ্ছন্ন কোমরে।

এই রিমঝিম উদাসীন বৃষ্টির ছোঁয়ায় কারো চুলে

স্বপ্নের আঙ্গুল থেকে ঝরে থাকে হীরার অজস্র কুচি কুচি ফুল’

বর্ষার রাত হঠাৎ-ই কথা বলে। গোপনে মৃদুস্বরে জানান দেয় তার হাজার বছরের ইতিহাস। বর্ষণমুখর রাতে মনে এসে জড়ো হয় কতো স্মৃতি। বৃষ্টি ফোঁটাগুলো তর তর করে এসে জানান দেয় একদিন তোমার মা ছিলো, যিনি এখন নেই, তোমার আদরের বন্ধুটি ছিলো-যে হারিয়ে গ্যাছে কোনো এক শ্রাবণ দিনে। হারিয়ে যাওয়া প্রেম-বাসনাকে নাড়া দিতে যেনো বৃষ্টি নামের জলের শিশু নামে পৃথিবীতে। মানুষের কানে কানে বলে জলের কথা-জীবনের কথা-

‘অঝোর ধারায় বৃষ্টি...কাল রাত্রে বৃষ্টি নেমেছিল,

মৃত্যুর পাহাড় থেকে কাল রাত্রে এসেছিলো মেঘ,

যেখানে জমের মূর্তি বিদায়ের পথ খুঁজে নিল

সে কোহে-নেদায় কাল জেগেছিল দুর্জয় আবেগ।

বহু শতাব্দীর আত্মা নিকষ্ মেঘের অন্ধকারে

বলেছিল একে একে অসম্পূর্ণ জীবনের কথা

(বিদ্যুৎ চমকে ছায়া অপসৃয়মান); বারে বারে

উদ্ভাসিত হয়েছিল তৃপ্তিহীন প্রাণের ব্যর্থতা।

থামেনি তবুও সেই কাহিনীর ধারাবাহিকতা;

অজস্র বর্ষণে মেঘ কাল রাত্রে বলেছিল কথা ॥’

-অঝোর ধারায় বৃষ্টি; ফররুখ আহমদ।

বৃষ্টি যেন পুরাতন পৃথিবীকে ধুয়ে মুছে নূতন করে সাজায়। বৃষ্টির জলীয় ধারায় সবকিছু সুন্দর থেকে ক্রমশঃ সুন্দরতম হয়। খাল-বিল ভরা পানি, আউশ ধানের ক্ষেত, কাদা ভরা রাস্তা, রংধনুর সাত রঙ বর্ষার নিত্য অনুষঙ্গ।...ক্রমাগত জলের ধারায় সিক্ত হয় বিবাগী মাটির দেহ। মাটি গলে গলে মিশে যায় জলে। ভেজা কদমের গন্ধে উন্মন হয় মন। চারদিকে যতদূর যা দেখা যায় সবই যেনো ছুঁয়ে যায় হৃদয়। তুচ্ছ জিনিসও হৃদয়গ্রাহী হয়। বর্ষার আবেদন এমনই। ‘অথবা শীতল দীঘি’ কবিতায় আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ এমনি ছবি তুলে ধরেছেন এভাবে-

‘আকাশে কাপাসফুল

তুলতুলে বৃষ্টির গুঁড়ি

ভাঙা ডাল অপরূপ

কালো কাক সেও সুন্দরী।’

বর্ষার বৃষ্টি কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভাসিয়ে নিয়ে যায় দুঃসহ স্মৃতির ভার। ধুয়ে মুছে সাফ করে দেয় জীবনের পথ। তখন কবির মনে হয় বৃষ্টির ধারায় আবছা আবছা মুছে যাচ্ছে সময়-স্মৃতি। মুছে যাচ্ছে করুণ ছটা-

‘...বৃষ্টির বিপুল জলে ভ্রমণ-পথের চিহ্ন

ধুয়ে গেছে, মুছে গেছে

কেবল করুণ ক’টা

বিমর্ষ স্মৃতির ভার নিয়ে সহর্ষে সদল বলে

বয়ে চলে জল পৌরসমিতির মিছিলের মতো

নর্দমার ফোয়ারার দিকে,-

-বৃষ্টি, বৃষ্টি; শহীদ কাদরী।

বর্ষা জীবনে গতি আনে। নতুন উদ্যম নিয়ে আসে দুরন্ত বর্ষা। ব্যর্থতা, কষ্ট, হতাশার বেদনা তাই অনেকেই ধুয়ে নিতে চান বর্ষার আষাঢ়ি জলে। তাই প্রার্থনা হয় বৃষ্টি জলে যেন ধুয়ে যায় দুঃখ, অপ্রাপ্তির ক্ষতচিহ্ন-

‘এবার বর্ষার জলে ধুয়ে নেবো মলিন জীবন

ধুয়ে নেবো আপাদমস্তক এই ভিতর-বাহির,

নববর্ষার জলে পরিপূর্ণ সিক্ত হবো আমি,

এই শ্রাবণের ধারাজলে ধুয়ে নেবো আমার শরীর

ধুয়ে নেবো এই বুক, ধুয়ে নেবো ব্যর্থতার গ্লানি...’

-এবার বর্ষার জলে; মহাদেব সাহা।

বৃষ্টির জলছাপে মুছে যাক অশুভ দৃষ্টি, মুছে যাক রক্ত নিনাদ। তার পরিবর্তে স্থান নিক নূতন পৃথিবী। অনাবিল প্রশান্তির আর শ্যামল পৃথিবীর প্রত্যাশায় সবসময়ই কবির প্রার্থনা-

‘একবার বৃষ্টি হোক, অবিরাম বৃষ্টি হোক ঊষর জমিনে,

নিরীহ রক্তের দাগ মুছে নিক জলের প্লাবন,

মুছে নিক পরাজিত ব্যর্থ বাসনার গান, গ্লানির পৃথিবী।

তুমি যদি বনস্পতি তবে প্ররোচনা দাও, বৃষ্টি হোক-

বনভূমি, বৃক্ষময় হাত তবে প্রসারিত করো,

মেঘের জরায়ু ছিঁড়ে নামুক জলের শিশু

জন্মের চিৎকারে ভরে দিক অজন্মা ভুবন।’

-বৃষ্টির জন্যে প্রার্থনা; রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ।

কবিই যে কেবল কাব্য রচনা করেন তা নয়, মহাকাব্য রচনা করে বৃষ্টিও। ধূসর জমিনে মেঘের কলমে বৃষ্টি লেখে তার ইতিহাসের মহাকাব্য। মনে হয় বৃষ্টি যেন এক প্রাচীন কবি, ধরিত্রীর বুকে প্রতি বছরই সে লিখছে নতুন কাব্য-

‘...প্রাচীন কবির মতো বসে মেঘের কলমে ঘষে

লিখিল সে এই কাব্য পৃথিবীর মাটির কাগজে,

গাছের পাতায়, ঘাস-শীষে

দরদালানের ভাঙা ছাদে, টিনের কার্ণিশে।’

-বৃষ্টির বন্দনা; নির্মলেন্দু গুণ।

রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ বা মহাদেব সাহার বৃষ্টি বিষয়ক কবিতায় পরাজয়-ব্যর্থতা গোছানোর নির্মল আহ্বানের সন্ধান মিললেও কবি আবুল হাসান তাঁর কবিতায় এনেছেন ভিন্ন দৃষ্টি। বৃষ্টি তাঁর কাছে শুধুই বৃষ্টি নয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের হাতিয়ারও। কবি বৃষ্টির তরবারিতে ছিন্ন করতে চান দুর্ভিক্ষ, মহামারী, অন্যায়কে। ‘বশীকরণ মন্ত্র’ কবিতায় আমরা বৃষ্টির প্রতি কবি আবুল হাসান এমনি এক ভিন্ন আহ্বান দেখতে পাই-

‘যা বৃষ্টি তুই যা, আরে দুর্ভিক্ষাকে খা,

আরে মেয়ের ঊরু বুকের শুরু, বিড়াল ধরে খা।

নিতম্বে যে নতুন রাষ্ট্র রাজদ্রোহীর হা

ওদের কাছে নগ্ন হয়ে আর তো পারি না,

যা বৃষ্টি তুই যা।’

যেই বৃষ্টির জন্য এত উন্মুখ অপেক্ষা সেই বৃষ্টি যদি নাইবা আসে? আষাঢ়ের বর্ষণমুখর রূপের দর্পণ যদি না মেলে তবে কেমন হবে প্রকৃতি? কেমন হবে মাঠ-ঘাট, ফসলের ক্ষেত, কেমন হবে জনজীবন? অনাবৃষ্টি আর অভিশাপ বাঙালীর কাছে সমার্থকই বটে হবে বটে। ‘বৃষ্টির প্রার্থনা’ কবিতায় অনাবৃষ্টিতে কবি ওমর আলীর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন এভাবে-

‘জ্যৈষ্ঠের খরায় মাঠ পুড়ে গেছে, কচি ধান পুড়ে

তামাটে হয়েছে, তবু বৃষ্টি নেই, গরম বাতাস

বয় শুধু, কৃষকের হাহাকার চতুর্দিক জুড়ে।

অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পানে চেয়ে ক্লান্ত দীর্ঘশ্বাস।’

অনাবৃষ্টিতে ফসলি জমি ফেটে চৌচির। হতাশ কৃষক কুল। কৃষাণীর মুখে অস্থিরতা। বৃষ্টির জন্য ব্যাকুল চোখ যেন প্রার্থনা করে, মায়াময় পল্লীবালার মুখ যেন বৃষ্টির প্রার্থনায় বার বার বলে, চুপি চুপি বলে-

‘পিঙ্গল বিহ্বল ব্যথিত নভোতল

কই গো কই মেঘ উদয় হও-

সন্ধ্যার তন্দ্রায় মুরতি ধরি আজ

মন্দ্র-মন্থর বচন কও...।’

-মেঘদূত; কালিদাস। অনুবাদ : সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত।

অনাবৃষ্টিতে কৃষক-কৃষাণী যেমন বৃষ্টির জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে তেমনি অপেক্ষা করেন কবিও। এই অপেক্ষা হৃদয়ের তাগিদে- এই অপেক্ষা নিরন্তন। বৃষ্টির জন্য এই ব্যগ্র অপেক্ষা কবির-

‘টেবিলে রয়েছি ঝুঁকে, আমি চাষীর মতো বড়

ব্যগ্র হয়ে চেয়ে আছি-খাতার পাতায় যদি জড়ো

হয় মেঘ, যদি ঝরে ফুল্ল বৃষ্টি।’

-অনাবৃষ্টি; শামসুর রাহমান।

বৃষ্টির প্রত্যাশায় থাকে সাধারণ মানুষজনও। ‘আয় বৃষ্টি ঝেপে/ধান দিবো মেপে’ ছড়া ধরে শিশু-কিশোররা। বৃষ্টি কামনায় ব্যাঙের বিয়ে দেয়া হয়। আর কত কি! অনাবৃষ্টিতে ছোট বড় সবাইর যেনো একান্ত কামনা-

‘এসো বৃষ্টি,

এসো তুমি অতল ভূতলে রুদ্ধ স্তম্বিত পাষাণে

দীর্ঘ দগ্ধ প্রতীক্ষার পরে।

এসো মুগ্ধ কল্পনার মূলে, এসো তুমি সত্তার শিকড়ে,

মুক্ত করে সৃষ্টির উদ্দাম বীজ,

ছিন্ন করো স্তব্দতার পাষাণ-শৃঙ্খল।

তোমার ঝঞ্জার স্বরে শূন্যতার কুহরে-কুহরে

জন্মের প্রচণ্ড মন্ত্র উচ্চারিত হোক

ভেসে যাক স্থলিত পাহাড়...’

-বৃষ্টি; বুদ্ধদেব বসু।

পৃথিবীর প্রার্থনায় অবশেষে বহু আরাধ্য আকাশবাসী বৃষ্টি বিন্দু বিন্দু করে ঝরে পড়ে মৃত্তিকা বন্দনায়। ফলশ্রুতিতে ধরিত্রী হয় সবুজ, জীবনে আসে স্বস্তি। কিন্তু বৃষ্টি যে আমাদের শুধু উপকারই করে তা বলা চলে না। বৃষ্টি যেন নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য অভিশাপ। গরিবের জন্য আতঙ্ক। পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের ‘আসমানী’ কবিতার আসমানী আমাদের চোখে সেই শ্রেণীর মানুষের প্রতিবিম্বই তুলে ধরে।

আষাঢ়-শ্রাবণ বর্ষাকাল হলেও সব ঋতুতেই বৃষ্টির দেখা কম-বেশি পাওয়া যায়। বর্ষার আগমনে প্রকৃতিতে মানব হৃদয়ে যে আবেশ সৃষ্টি হয়-বর্ষা বিদায়ে তা ব্যথাতুর বিদায় আমরা লক্ষ্য করি। কদম-কেয়া, যৌবনা নদী বর্ষার বিদায়ে হাহাকার করে। বর্ষা বিদায় যেন মন ও প্রকৃতির জন্য রেখে যায় অসীম বিরহ। তাই বর্ষার প্রস্থানে প্রকৃতির প্রতিক্রিয়া ও কবির জিজ্ঞাসা-

‘ওগো বাদলের পরী!

যাবে কোন্ দূরে, ঘাটে বাঁধা তবে কেতকী পাতার তরী!

ওগো ও ক্ষণিকা, পূর্ব-অভিসার ফুরাল কি আজি তব?

পহিল ভাদরে পড়িয়াছে মনে কোন্ দেশ অভিনব?

তোমার কপোল-পরশ না পেয়ে পান্ডুর কেয়া-রেণু,

তোমারে মরিয়া ভাদরের ভরা নদী তটে কাঁদে বেণু!’

-বর্ষা-বিদায়; কাজী নজরুল ইসলাম।

কিন্তু বর্তমানে প্রকৃতির বৈরিতার কারণে ঘোর ঘন বর্ষার দেখা পায় না মানুষ। মানুষ বাড়ছে। পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। ফলে বদলাচ্ছে ঋতুর বৈচিত্র্য। প্রবীণরা বৃষ্টির দিনের যে অনুভূতি দশ/বিশ বছর আগে সঞ্চার করতে পেরেছিলেন সে অনুভূতি বর্তমান প্রজন্মের হৃদয়ে প্রাকৃতিক কারণেই তা আজ ধরা দেয় না। কেয়াবন, কদম ফুল, মেঘের গর্জন শুনে উজিয়ে আসা কৈ মাছ, টিনের চালে ঘোর বর্ষণের রিনিঝিনি শব্দের সন্ধান খুবই কম মেলে। ক’ যুগ আগের ঘোর ঘন-ঘটার বর্ষা তাই এখন শুধুই স্মৃতি। প্রবীণ মানুষের স্মৃতি আউরিয়ে কবির রোমন্থন-

‘ঐশ্বর্য হারানো মানুষের থাকে বৃষ্টির বিবিধ

পাতা ছেঁড়া অন্ধকার গল্প, যার দাঁড়ি, কমা নেই,

প্রবীণের চোখ ঠিক জানে ওইখানে একদিন

কেয়াবন ছিলো, পাশেই কদম গাছ,

এক রাতে সকল উজাড়

নিয়ন বাতির নিচে জ্বলে না জোনাকি,

আর

এখন কেবল স্মৃতির উতালা ঘ্রাণ

মাঝরাতে খুলে যায় শ্রাবণের শব্দে,

ঘুম আসে না একলা রাতের হাওয়ায়

-বৃষ্টির বিবিধ পাঠ; সোহরাব পাশা।

বর্ষার সব স্বরূপ বর্তমানে দেখা না মিলুক, না হোক কেয়া বন দর্শন, তবু চোখে ঘোর বর্ষণের প্রত্যাশা থাকবে, আসবে অতীতের স্মৃতিকাতরতা। অপেক্ষার প্রহর থাকবেÑকখন আসবে ঝুম বৃষ্টি? কখন? পূর্বের হারিয়ে যাওয়া বর্ষার দিনগুলো নিয়ে মানুষের আক্ষেপ থাকবেই, থাকবে চিরন্তন প্রত্যাশা। মানুষ যতদূর এগিয়ে চলে, চলুক। সভ্যতার জাহাজ ছুটে চলুক তার গন্তব্যে। তবু জীবন ও জগতের খোরাকে মানুষের বৃষ্টি চাই-ই, চাই। এ প্রত্যাশা নিয়ে কবিও স্থির দৃষ্টিতে অপেক্ষা করেন, মহামতি বৃষ্টি নামুক তবে, সিক্ত হোক ভূমি, সিক্ত হোক মানুষের প্রাচীন দেহ-

‘কতদূর এগুলো মানুষ!

কিন্তু আমি ঘোর লাগা বর্ষণের মাঝে

আজও উবু হয়ে আছি। ক্ষীরের মতন গাঢ় মাটির নরমে

কোমল ধানের চারা রুয়ে দিতে গিয়ে

ভাবলাম, এ মৃত্তিকা প্রিয়তম কিষাণী আমার।

বর্ষণে ভিজছে মাঠ। যেন কার ভেজা হাতখানি

রয়েছে আমার পিঠে। আর আমি

ইন্দ্রিয়ের সর্বানুভূতির চিহ্ন ক্ষয় করে ফেলে

দয়াপরবশ হয়ে রেখেছি আমার কালো দৃষ্টিকে সজাগ।’

-প্রকৃতি; আল মাহমুদ।

প্রকাশিত : ৩ জুলাই ২০১৫

০৩/০৭/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: